#বেলীফুলের_ইতিকথা(১০)
#মীরাতুল_নিহা
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে বস্তির এই ছোট ঘরটাতে অস্থিরতা যেন দেয়াল চুইয়ে পড়ছে। আয়েশা এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে। তার কপালে ব্যান্ডেজটা এখনো সাদা হয়ে ফুটে আছে অন্ধকারের মাঝে। বেলী ফিওনাকে ঘুম পাড়িয়ে আয়েশার পাশে এসে বসল। আয়েশার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি দেখে বেলীর বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই ঘরের অন্য পাশ থেকে ফারহানের কর্কশ গলা ভেসে এল। ফারহান আর তৃষ্ণা তখনো ঘুমায়নি। ফারহান একটা বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল,
“আমি কিন্তু, বাপু সোয়াব কামাতে এখানে আসি নাই। ফ্রিতে থাকা-খাওয়ার হোটেল এইটা না।”
তৃষ্ণা আয়না দেখে নিজের চুল ঠিক করতে করতে যোগ করল,
“তা তো বটেই! নিজে তো অন্ন ধ্বংস করতাছে, আবার সাথে জুটিয়ে আনছে এক আপদ। আমাগো পকেটে কি টাকা ওড়ে নাকি?”
আয়েশা অপমানে আর থাকতে পারল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে বেলীকে বলল,
“আমি আর থাকব না রে। আমি চলে যাই। ফুটপাতে পড়ে থাকলেও শান্তি, কিন্তু তোর সংসারে অশান্তি আমি সইতে পারতাছি না।”
বেলী আয়েশার হাত টেনে আবার বসিয়ে দিল। তার দুচোখে তখন আগুনের হলকা।
“আমার সংসার বলে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সুতরাং সে সংসারে অশান্তির ভয় আমি করছি না আয়েশা!”
সে ফারহানের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,
“ফারহান, মনে রাখবে আইনত এখনো আমি তোমার বউ। এই ঘরটা যতটা তোমার, ততটা আমারও। আমার ঘরের এক কোণে আমার বোন থাকবে, তাতে তোমার অনুমতির প্রয়োজন আমি দেখি না।”
ফারহান খেঁপে গিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“বড় বড় কথা বলিস না বেলী!”
তৃষ্ণা মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “আইচ্ছা দেখমু কতদিন এই দরদ টিকে! চাল ফুরাইলে বুঝবা কত জ্বালা।”
আয়েশা বেলীর বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল। সে বুঝতে পারছে, বেলী তাকে আগলে রাখার জন্য নিজের জীবনের শেষ শান্তিটুকুও বিসর্জন দিচ্ছে। বেলী আয়েশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাবল—কাল তাকে টিউশনিতে যেতে হবে। কাজ খুজতে হবে। তাকে এখন আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে।ওদিকে ফারহান আর তৃষ্ণা ফিসফিস করে নতুন কোনো ফন্দি আঁটছে।
সকাল হতেই বেলী রান্নায় হাত দিল। তার শরীর ক্লান্ত থাকলেও মনটা ছিল পাথরের মতো শক্ত। হাঁড়িতে চাল চাপিয়ে দিয়ে পাশের চুলায় পাতলা করে ডাল আর আলু-পেঁপে দিয়ে একটা সবজি চড়াল। অভাবের সংসার, এর বেশি কিছু জোটানোর সামর্থ্য আপাতত নেই। রান্না শেষ হতেই বেলী আয়েশাকে ডাক দিল।
“আয়েশা, আয়। গরম গরম দুটো ভাত খেয়ে নে। সারাদিন তোকে আবার ফ্যাক্টরিতে খাটতে হবে।”
আয়েশা ইতস্তত করে বেলীর পাশে এসে বসল। তার চোখেমুখে কুণ্ঠা। সে জানে, এই ভাতের প্রতিটি দানা কতটা কষ্টের। ঠিক যখন বেলী আয়েশার থালায় এক হাতা ডাল তুলে দিতে যাবে, তখনই ফারহান ঘর থেকে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে এল। ফারহান আড়চোখে থালার দিকে তাকিয়ে এক কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল,
“বাহ! রান্নাবান্না তো রাজকীয় হয়েছে দেখছি। কিন্তু বড় বউ, চাউল কি আসমান থেকে পড়ে? তোগো পেট চালাতেই আমার নাভিশ্বাস উঠছে, তার ওপর আবার এই মেহমানের পাত ভরে দিতাছোস?”
আয়েশা ভাতের গ্রাস হাতে নিয়েও থেমে গেল। ফারহান আবার বলল,
“আয়েশারে বলি—ফ্রিতে থাকা-খাওয়ার দিন শেষ। কাইল রাত হয়ে গেছিল। তাই বেশি কিছু কইনাই।”
“আমি টাকা দিয়ে দিমু।”
আয়েশা বস্তির কাছের একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যা পায়, তার সবটুকুই রাহেলা বেগম কেড়ে নেন। আজ আয়েশার মাথার ওপর ছাদ নেই, টাকা নেই। বেলী আয়েশার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
“তুই টাকার কথা কেন তুলছিস আয়েশা? আমি কি তোর কাছে টাকা চেয়েছি?”
ফারহান মাঝখান দিয়ে ফের বলল,
“তাইলে এখনি দেও টাকা!”
“এখন কই পামু? বেতন পাইলে দিয়ে দিমু ফারহান ভাই।”
“গার্মেন্টসে তো কাজ করো, সবে মাস শুরু হইছে জানি, কিন্তু মাস শেষে বেতন না পাওয়া পর্যন্ত কি আমি আমার ঘরের অন্ন দান সতর করব না-কি? বেতন পাইলে টাকা দিবা সেই আশায় আমি কি নিজের পেটে গামছা বাঁধমু?”
তৃষ্ণা ততক্ষণে দরজায় এসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে। সে বাঁকা হেসে যোগ করল,
“তা তো বটেই! নিজেরই ঠাঁই নাই, আবার আরেকজনের অন্ন জোগায়! বড় বউ তোমার তো টিউশনি আছে, আজ টাকা নিয়ে আসো। নইলে এই উপরি মানুষের খরচ তো আর ফারহান একা টানতে পারব না।”
আয়েশা থালা সরিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল। চোখে জল টলমল করছে তার।
“আমি আর ভাত খামু না। আমি চইলা গেলেই তো হয়।”
বেলী আয়েশার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর ফারহানের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“চাল আমি বেশি করে ফুটিয়েছি ফারহান। আমার ভাগের অর্ধেক আমি আয়েশাকে দিচ্ছি। এতে তোমার পকেটে টান পড়ার কথা না। আর শোনো, ও মাস শেষে বেতন পেলে ওর থাকা-খাওয়ার হিসেব কড়ায়-গণ্ডায় চুকিয়ে দেবে। তার আগে যদি আমার বোনের ভাতের থালা নিয়ে আর একটা কথা বলো, তবে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।”
ফারহান কিছু একটা বলতে গিয়েও বেলীর চোখের জেদ দেখে দমে গেল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“আইচ্ছা দেখুমু, কতদিন এমন দরদ উথলে পড়ে!”
বেলী ফারহানের কথা উপেক্ষা করে আয়েশার পাতে আরেকটু সবজি তুলে দিয়ে বলল,
“খা আয়েশা। কারো কথায় কান দিস না। তোর শরীর ঠিক না থাকলে কাজ করবি কী করে? তুই শুধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চিন্তা কর, বাকিটা আমি দেখে নেব।”
আয়েশা অশ্রুসজল চোখে ভাতের গ্রাস মুখে তুলল। বেলী বুঝতে পারল, এই লড়াইটা কেবল শুরু। সামনে আরও বড় ঝড় আসছে। বেলীর কড়া কথা শুনে ফারহান আর বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়াল না। অপমানে আর রাগে গজগজ করতে করতে সে শার্টটা কাঁধে ফেলে তেজ দেখিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজায় একটা লাথি মেরে বলে গেল,
“খাও তোমরা দুই সতী মিলে! দেখি ফুরাইলে কার কাছে হাত পাতো!”
ফারহান চলে যেতেই তৃষ্ণা আয়েশ করে পিঁড়িতে বসল। সে কোনোদিনও রান্নাঘরে হাত দেয় না, কিন্তু খাওয়ার সময় তার নবাবী মেজাজ ষোলো আনা।
“খানা দাও বড় বউ!”
বেলী উত্তর দিল,
“হাত দুইটা কি সাথে নেই? না-কি কেটে ফেলেছো!”
তৃষ্ণা আঁতকে উঠে বলে,
“আমার হাত তো লগেই আছে।”
“হাত যেহেতু আছে তাহলে খাবার বেড়ে খেতে পারছো না? নাকি আমি খাইয়ে দিব?”
তৃষ্ণা বিদঘুটে হাসি দিয়ে বলে,
“খাওয়ায় দিলে তো ভালোই হয়।”
“বিষ খাওয়াব, খাবে?”
মুখ বেঁকিয়ে নিজেই খাবার প্লেটে তুলে নিলো।
তৃষ্ণা প্রথম গ্রাস মুখে দিয়েই নাক ছিটকাল।
“উফ! ডালটা তো একদম পানসে হয়েছে! আর এই সবজিতে কি তেল-মশলা দাও নাই? মুখে দেওয়া দায়! আমার তো এসব গলায় আটকায়।”
বেলী তৃষ্ণার কথায় কান দিল না। সে তখন পরম মমতায় ফিওনাকে খাওয়ানো দেখছিল। আয়েশা একপাশে বসে বাটি থেকে আলু সেদ্ধ হাত দিয়ে একদম মিহি করে চটকাচ্ছে। ফিওনা ছয় মাসে পা দিয়েছে। মাতৃদুগ্ধ এখন আর ওর ছোট পেটের জন্য যথেষ্ট নয়, তাই আজ থেকে উপরি খানা শুরু হয়েছে। আয়েশা খুব যত্ন করে আলু সেদ্ধটুকু নরম করে ফিওনার মুখে তুলে দিচ্ছে। ফিওনা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে তার কচি মুখে সেই খাবারটুকু নিয়ে চিবোনোর চেষ্টা করছে। তৃষ্ণা থালা থেকে একটা আলু আলাদা করে ফেলে দিয়ে কর্কশ গলায় বলল,
“শোনো বড় বউ! আমার কিন্তু এসব খেয়ে দিন কাটবে না। ফারহান আমাকে বলেছে মাছ-মাংস খাওয়াতে। ঘরে মাছ আছে না? যাও, চটপট আমাকে একটা মাছ ভেজে দাও তো। তৃষ্ণা কি আর ডাল দিয়ে ভাত খাওয়ার মেয়ে?”
বেলী শান্তভাবে তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঘরে যা ছিল সবই রান্না হয়েছে। বাড়তি মাছ বা মাংস কেনার টাকা আপাতত আমার কাছে নেই। ফারহান যদি বাজার করে আনে তবেই রান্না হবে, তার আগে এই ডাল-ভাতই সই।”
তৃষ্ণা এবার আয়েশার দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপ করে বলল,
“ওহ! বুঝেছি। মেহমান খাওয়াতে গিয়ে আমাদের পেটে এখন পাথর বাঁধতে হবে? পরের বোঝা টানতে গিয়ে নিজের ঘরটাই এখন শ্মশান বানাইতাছে!”
আয়েশা ফিওনাকে খাওয়াতে খাওয়াতে থমকে গেল। তার চোখে আবার জল টলমল করতে শুরু করল। কিন্তু বেলী দমল না। সে আয়েশাকে চোখ দিয়ে ইশারা করল ফিওনাকে খাওয়ানো জারি রাখতে। তারপর তৃষ্ণাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“খাওয়ার ইচ্ছা থাকলে খাও, আর না থাকলে উঠে যাও। তবে মনে রেখো তৃষ্ণা, এই ঘরে আমি কাজ করি বলেই এখনো চুলা জ্বলে। যেদিন আমি হাত গুটিয়ে নেব, সেদিন তোমার ওই পালিশ করা নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে খেতে হবে।”
তৃষ্ণা রাগে গিজগিজ করতে করতে কোনোমতে কয়েক লোকমা ভাত মুখে পুরল। বেলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিওনার দিকে তাকালো। এই এক চিলতে হাসিমুখের জন্য সে হাজারটা তৃষ্ণা আর ফারহানের বিষ হজম করতে রাজি। আজ থেকে ফিওনার মুখে অন্ন উঠেছে, এই খুশিতেই বেলীর পেট ভরে গেছে।
তৃষ্ণা থামলো না। থালা ঠেলে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে তখন বিষাক্ত হাসির রেখা। বেলীর মুখে হাসি থাকাটা সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছিল না। সে এবার কর্কশ গলায় বলতে শুরু করল,
“রান্না আরো ভালো করে কইরো।”
“অত ভালো করতে হলে নিজে করে খাও!”
“এত বড় বড় কথা কিসের? কাম করতে না পারলে কেমনে হইব?”
বেলী চোখ উঁচিয়ে উত্তর দিল,
“তোমার মতন অন্যের স্বামীকে বিয়ে করে খেতে হবে না। আমি কাজ করেই খাই।¡
“স্বামী ধরে রাখার মুরোদ তো নেই! এই যে ফারহান আমার কাছে কেন আইছে জানো? তোমার মতো কাঠখোট্টা মেয়ের সাথে আর যাই হোক, ঘর করন যায় না। বিয়া করাটাই বোধহয় তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। ফারহান তো বলে, তোমার কাছে নাকি কোনো সুখ নাই। নাকি তোমার শারীরিক কোনো অক্ষমতা আছে যে বরকে খুশি করতে পারো না? ”
তৃষ্ণার প্রতিটি শব্দ তীরের মতো বেলীর বুকে বিঁধছিল। এতদিন সে সব মুখ বুজে সহ্য করেছে—অনাহার, অপমান, সতীনের ঘর সবই সয়েছে সে। কিন্তু আজ নিজের আত্মসম্মানে এমন কুরুচিপূর্ণ আঘাত সে আর সইতে পারল না। বেলীর চোখের মণি দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ঘরের কোণে পড়ে থাকা পুরনো শক্ত শলার ঝাড়ুটা এক হ্যাঁচকায় তুলে নিল।
তৃষ্ণা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেলী বাঘিনীর মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
“অনেক বলেছিস! এবার তোর নোংরা মুখটা বন্ধ করার সময় হয়েছে!”
বেলী হাত চালিয়ে ঝাড়ু দিয়ে তৃষ্ণাকে মারতে শুরু করল। ঠাস ঠাস করে ঝাড়ুর বাড়িগুলো তৃষ্ণার পিঠে আর পায়ে গিয়ে পড়ছে। তৃষ্ণা চমকে গিয়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল,
“ওরে বাবারে! মরে গেলাম রে! কে আছিস বাঁচা!”
আয়েশা ফিওনাকে নিয়ে এক কোণে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। সে বেলীকে থামানোর চেষ্টা করল,
“বেলী! থাম!”
কিন্তু বেলী তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। তার মনে হচ্ছিল, সে তৃষ্ণাকে নয়, বরং তার জীবনের ওপর চেপে বসা সমস্ত অন্ধকারকে ঝেটিয়ে বিদায় করছে। যতক্ষণ না ঝাড়ুটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গুড়ো হলো, ততক্ষণ বেলী মেরেই চলল। তৃষ্ণা মেঝেতে পড়ে আর্তনাদ করছে। তার ফর্সা পায়ের দিক থেকে কালচে রক্ত বের হতে শুরু করেছে শলার আঘাতে। বেলী হাঁপাচ্ছিল। সে ভাঙা ঝাড়ুর অবশিষ্টাংশটুকু তৃষ্ণার দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হিংস্র গলায় বলল,
“ আজ তো কেবল ঝাড়ু দিয়েছি, এরপর যদি আমার চরিত্র বা আমার নারীত্ব নিয়ে একটাও নোংরা কথা বলিস—তবে তোকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব। বললি না? আমি শারীরিক ভাবে অক্ষম? এবার বুঝেছিস তো আমার শরীর অক্ষম না সক্ষম?”
তৃষ্ণা ভয়ে আর ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে ঘরের কোণে পড়ে রইল। তার সেই দর্প চূর্ণ হয়ে গেছে। বেলী আয়েশার কোল থেকে ফিওনাকে নিজের বুকে টেনে নিল। তার হাত দুটো এখনো কাঁপছে, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত শান্তি। সে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে চোখের পানি মুছে শক্ত হয়ে দাঁড়াল। আয়েশাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আয়েশা, তুই সাবধানে যাস। বক্সে দুপুরের খাবার দিয়ে দিয়েছি। আমি রাইসাকে পড়াতে যাচ্ছি। ফিওনাকে সাথে নিয়ে গেলাম।”
বেলী আর পেছন ফিরে তাকাল না। রুগ্ন বস্তির সেই গলি পেরিয়ে সে শহরের বড় রাস্তার দিকে পা বাড়াল। আজ তার চলার গতিতে এক অন্যরকম তেজ।
#চলবে
#বেলীফুলের_ইতিকথা (১১)
#মীরাতুল_নিহা
বেলী বেরিয়ে যেতেই ঘরের ভেতর এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। তৃষ্ণা মেঝের ওপর বসে ডুকরে কাঁদছিল না, বরং তার চোখে ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের ঝিলিক। সে ধীরে ধীরে বসে নিজের ফর্সা পা দুটোর দিকে তাকাল। ঝাড়ুর বাড়ির দাগগুলো লাল হয়ে ফুটে উঠেছে, কিছু জায়গায় চামড়া ছিলে গেছে। তৃষ্ণা দাঁতে দাঁত চেপে নিজের নখ দিয়ে ছিলে যাওয়া চামড়াটা সজোরে এক টান দিল। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত বেরিয়ে এল। যন্ত্রণায় তার মুখটা কুঁচকে গেলেও সে থামল না। সে এটাই চাইছিল। রক্তাক্ত ক্ষতটা যখন বেশ বীভৎস রূপ নিল, তখন সে আলুথালু বেশে মেঝের ওপর শুয়ে পড়ল।
খানিক পরেই ফারহান ঘরে ফিরল। হাতে করে তৃষ্ণার জন্য কিছু খাবার নিয়ে এসেছিল সে। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তৃষ্ণার ওই অবস্থা দেখে তার হাত থেকে প্যাকেটটা পড়ে গেল।
“তৃষ্ণা! এ কী অবস্থা তোমার? কী হইছে?”
ফারহান চিৎকার করে দৌড়ে এল।
তৃষ্ণা এবার শুরু করল তার অভিনয়। ন্যাকামি ভরা গলায় ফুঁপিয়ে কেঁদে সে ফারহানের পা জড়িয়ে ধরল।
“ওগো, তুমি থাকতে আমার এই দশা ক্যান হইলো? তোমার বড় বউ আমাকে অমানুষের মতো পিটিয়েছে। আমি শুধু কইছিলাম তোমার জন্য মাছ রাঁনতে, আর অমনি সে ঝাড়ু নিয়ে আমার ওপর চড়াও হইছে। দেখো আমার পা’টার কী হাল করছে!”
ফারহান তৃষ্ণার রক্তাক্ত পা দেখে যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। তার চোখের মণি রাগে লাল হয়ে উঠল।
“বেলীর এত বড় সাহস! আমার ঘরে থেকে আমার বউয়ের গায়ে সে হাত তোলে? ও কি নিজেকে এই ঘরের মালিক ভাবতে শুরু করছে?”
তৃষ্ণা কাঁদো কাঁদো গলায় আবার বলল,
“সে তো কইয়া ইদিল, এই ঘর নাকি তার। আমি পরগাছা। সে আমাকে মারতে মারতে কইছে তোমাকে নাকি সে গুনেও না। আমি এর বিচার চাই ফারহান। যদি তুমি আজ বিচার না করো, তবে আমি বিষ খেয়ে মরব, তবুও এই অপমান সইব না!”
ফারহান সজোরে দেয়ালে একটা ঘুষি মারল। তার ভেতরের পশুটা যেন জেগে উঠেছে। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“বিচার হউব তৃষ্ণা! এমন বিচার হবে যে বেলী সারা জীবন মনে রাখব। সে ভাবছে সে অনেক বড় হয়ে গেছে? আজ আসুক ও ঘরে, ওর সব তেজ আমি দেখে ছাড়ব!”
তৃষ্ণা ফারহানের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি হাসল। সে জানে, ফারহানকে উস্কে দেওয়ার কাজটা সে সফলভাবে করতে পেরেছে। ওদিকে বেলী তখন রাইসাকে পড়াতে ব্যস্ত, সে কল্পনাও করতে পারছে না যে ঘরের ভেতর তার জন্য কী ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হয়েছে।
বস্তির মাঝখানটায় আজ যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। গোল হয়ে বসেছে বিচার সভা। এই বস্তির সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ আখতার রহমান বিচারক হয়ে বসেছেন। বাজারের বড় মুদি দোকানদার তিনি, বস্তির সবাই তাকে তেমনি সমীহ করে চলে। ফারহান বিচারের দাবিতে ফেটে পড়ছে। পাশেই তৃষ্ণা বসে আছে, তার চোখেমুখে শয়তানি কান্না। সে মাঝেমধ্যেই কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকছে আর একটু পরপর পায়ের কাপড় উঁচিয়ে সবাইকে সেই রক্তাক্ত ক্ষত দেখাচ্ছে। তৃষ্ণা ফুঁপিয়ে বলছে,
“দেখেন আখতার ভাই, দেখেন সবাই! আমি তো মানুষ, কোনো জানোয়ার না। সামান্য তর্কের জেরে ও আমাকে এমন করে মারল? আমি কি এই সংসারে মার খাওয়ার জন্য আইছি?”
আখতার রহমান হাতের তসবিহ ঘুরিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
“হুম, দেখলাম। কিন্তু একপক্ষের কথা শুনে তো আর রায় দেওন যায় না। বেলী আসুক, তারপরই চূড়ান্ত কথা হইব।”
সকাল গড়িয়ে দুপুে হতে চলেছে। ফিওনাকে কোলে নিয়ে বেলী বস্তিতে ঢুকল। রোদে পুড়ে ক্লান্ত মুখটা তার ফ্যাকাশে হয়ে আছে। সকালে তৃষ্ণাকে মারার পর তার মনে এক ধরণের অনুতাপ হচ্ছিল। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি আসতেই এত জটলা দেখে সে থমকে গেল। ফারহানের ঘরের অদূরেই মানুষের এই ভিড় দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল। বেলী প্রথমে ভেবেছিল হয়তো বস্তিতে কোনো অঘটন ঘটেছে। কিন্তু ভিড়ের মাঝখান থেকে ফারহানের তেজালো গলা শুনে সে সব বুঝতে পারল। ফারহান চেঁচিয়ে বলছে,
“ওই তো আসতাছে আমার বড় বউ! পন্ডিতি কইরা এখন ঘরে ফিরছে!”
বেলী ধীর পায়ে জটলার দিকে এগিয়ে গেল। মানুষের উৎসুক দৃষ্টিগুলো তার ওপর বিষের মতো বিঁধছে। ফিওনা তখন রোদে গরমে একটু কান্নাকাটি করছে। বেলী ভিড় ঠেলে মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। বেলী যখন ভিড় ঠেলে নিজের ঘরের দিকে এগোতে চাইল, তখনই ফারহান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পশুর মতো তেড়ে এল। বিচারসভার মর্যাদা কিংবা আখতার রহমানের উপস্থিতি—কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সে এক ঝটকায় বেলীর চুলের মুঠি শক্ত করে ধরল।
“তোর কত বড় সাহস! সবাই বইসা আছে আর তুই তেজ দেখায়া চইলা যাস? আমার তৃষ্ণারে মারছস না? আজ তোরে আমি মেরেই ফেলব!”
চুলের গোড়ায় প্রচণ্ড টানে বেলী যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। তার চোখের কোণে জল এসে গিয়েছিল, কিন্তু সে দাঁতে দাঁত চেপে তা আটকে রাখল। ফারহানের এই অতর্কিত হামলায় তার কোলে থাকা ফিওনা ছিটকে পড়ে যেতে নিচ্ছিল। বেলী শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাচ্চাকে আঁকড়ে ধরল। পাশেই একজন দাঁড়িয়ে ছিল, বেলী টাল সামলে দ্রুত ফিওনাকে তার কোলে বাড়িয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল,
“ চুলের মুঠি ধরলে কেন? কিসের বিচার!”
ফারহান রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে বলল,
“কী হইছে মানে? তুই তৃষ্ণার গায়ের চামড়া তুইল্লা দিছস, আর এখন সতী সাজছ? আখতার ভাই, দেহেন এই মেয়ের কত বড় আস্পর্ধা! ওরে আজ আমি এইখানে আস্ত রাখুম না।”
আখতার রহমান ধমক দিয়ে ফারহানকে থামালেন। “ফারহান! হাত ছাড়ো ওর। বিচার সভায় হাত তোলা মানে আমারে অপমান করা। ছাড়ো কইতাছি!”
ফারহান অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেলীর চুল ছেড়ে দিল। বেলী মাথা সোজা করে দাঁড়াল। তার এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো ঠিক করতে করতে সে আখতার রহমানের চোখের দিকে তাকাল।
“বেলী, ফারহান বিচার চাইছে। তুমি নাকি বিনা দোষে তৃষ্ণাকে ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করছো? কথা কি সত্যি?”
বেলী একটুও দমল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ আখতার ভাই, মেরেছি। তবে শখের বশে মারিনি। এই মেয়েটি আমার ঘর ভাঙার পর এখন আমার নারীত্ব আর চরিত্র নিয়ে জঘন্য কথা বলছে। আমি যদি আজ প্রতিবাদ না করতাম, তবে ও কাল আরো আশকারা পেতো।”
তৃষ্ণা এবার আরও জোরে কান্না শুরু করল,
“শুনলেন তো! ও নিজেই স্বীকার করছে। এখন আপনারা বিচার করেন। আমি এই বাড়িতে আর এক মুহূর্ত নিরাপদ না! কবে জানি জান নিয়ে নেয় মাবুদ!”
ফারহান তেড়ে এল বেলীর দিকে,
“তোর এত সাহস হয় কেমনে? তুই আমার বউয়ের গায়ে হাত তুলবি আর আমি বসে থাকব?”
বেলী তাচ্ছিল্য করে বলল,
“আমিও তো তোমার বউ ফারহান। আমার গায়ে যখন মনে আর মুখে আঘাত লাগে, তখন তুমি কোথায় থাকো?”
আখতার রহমান এবার হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলেন। তিনি বেলীর ক্লান্ত মুখ আর কোলের বাচ্চাটার দিকে একবার তাকালেন। বিকেল হয়ে আসছে, আজই মাহিকে পড়ানোর প্রথম দিন হওয়ার কথা ছিল। বেলী ভেবেছিল একটু বিশ্রাম নিয়ে পড়তে বসবে, কিন্তু তার ভাগ্যে আজ অন্য কিছু লেখা আছে।
বিচার সভা এখন এক চরম উত্তেজনার মোড়ে দাঁড়িয়ে। বস্তিবাসী মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে।
আখতার রহমান গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন,
“বেলী, তুমি কি সত্যিই অনুতপ্ত নও?”
বেলী তপ্ত গলায় উত্তর দিল,
“আখতার ভাই, আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি। যে অন্যায় দিনের পর দিন আমার ওপর হয়ে আসছে, আজ তার বাঁধ ভেঙে গেছে। আমি যা করেছি, তার জন্য এক বিন্দুও অনুতপ্ত নই। আত্মসম্মান বাঁচাতে যদি হাতে ঝাড়ু বা কোনো অস্ত্র তুলে নিতে হয়, তবে আমি বারবার তাই করব।”
“কাজটা ঠিক হইলো বেলী?”
আখতার রহমানের গম্ভীর প্রশ্নের মুখে বেলী এক মুহূর্তের জন্যও কুঁকড়ে গেল না। বরং ফিওনাকে প্রতিবেশির কোলে দিয়ে সে যখন ভিড় ঠেলে মাঝখানে এসে দাঁড়াল, তখন তার অবয়বে এক অদ্ভুত তেজ। রোদে পোড়া তামাটে মুখে ঘামের বিন্দুগুলো যেন একেকটা স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলছে।
বেলী সোজা আখতার রহমানের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল—
“হ্যাঁ, তবে কাজটা খুব একটা রুচিসম্মত হয়নি ঠিকই, কিন্তু যে ময়লা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়, সেখানে হাত নোংরা করে লাভ নেই।”
উপস্থিত প্রতিবেশীদের মধ্য থেকে দুই-তিনজন মহিলা এবার ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করল। মাঝবয়েসী জমিলা বেগম একটু গলা উঁচিয়েই বললেন,
“আসলে কথা তো মিছা না আখতার ভাই। জলজ্যান্ত বউ থাকতে আবার বউ ঘরে আনছে ফারহান, সেই জ্বালা বেলী কতদিন সইব? ও তো রক্তমাংসের মানুষ! জ্বালা মেটাইছে, ঠিকই করছে।”
আরেকজন তাল মিলিয়ে বলল,
“সতীন আনলে এমন ঘটা কইরা মারামারি হইবোই। ফারহানেরই দোষ, ও ঢং দেখায়া আরেক মাইয়া ঘরে আনছে কেন?”
পুরো জটলার হাওয়া যেন ধীরে ধীরে বেলীর দিকে ঘুরতে শুরু করল। তৃষ্ণা এতক্ষণ ন্যাকামি করে কাঁদছিল, এখন প্রতিবেশীদের কথা শুনে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বিকেলের মরা আলোয় বেলীর ছায়াটা আজ অনেক দীর্ঘ দেখাচ্ছে। বেলী আন্দাজ করছে , আজ থেকে ফারহানের সাথে তার সম্পর্কের শেষ সুতোটুকুও ছিঁড়ে যাবে।
ফারহান চিৎকার করে উঠল,
“আখতার ভাই, এর বিচার না হইলে আমি আজ খারাপ কিছু করুম! আজ ঝাড়ু দিয়ে মারছে পরশু দা দিয়ে কিছু করব না গ্যারান্টি কি? আমার বিচার চাই!”
বেলী এবার ফারহানের দিকে ফিরল। তার চোখের চাউনিতে এমন ঘৃণা ছিল যে ফারহান অবচেতনেই এক পা পিছিয়ে গেল। বেলী তপ্ত গলায় বলল—
“ফারহান, বিচার চাইছো? যে স্বামী নিজের ঘরে পরনারী তুলে এনে নিজের স্ত্রীর মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, যে বাবা বাচ্চার কথা চিন্তা করে না! ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেয় তার মুখে বিচারের কথা মানায় না। আখতার ভাই, এই মেয়েটি আজ সবার সামনে দাঁড়িয়ে বিচার চাইছে, অথচ কয়েক ঘণ্টা আগে ঘরের ভেতরে সে আমার নারীত্ব আর আমার চরিত্রের ওপর যে নোংরা অপবাদ দিয়েছে, তা উচ্চারণ করার ক্ষমতাও আমার নেই। সে আমার বিছানা, শরীরের খবর নিতে এসেছিল আমি শুধু বুঝিয়ে দিয়েছি, আমি যেমন ঘর সংসার সামলাতে জানি, তেমন নিজের সম্মান রক্ষা করতেও জানি।”
আখতার রহমান থমকে গেলেন। বেলীর কথার ওজন আর ওর মার্জিত ভঙ্গি তাকে ভাবিয়ে তুলল। তিনি ফারহানের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললেন,
“থামো ফারহান! বেলী তো কোনো মিছা কথা কইতেছে বইলা আমার মনে হয় না। ও শিক্ষিত মেয়ে, ওরে আমরা চিনি। তৃষ্ণা, তুমি কি ওর চরিত্র নিয়া কিছু কইছিলা? খালি তর্কের জেরে এতকিছু?”
তৃষ্ণা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে ভেবেছিল ন্যাকামি করে সবাইকে নিজের দিকে টেনে নেবে, কিন্তু বেলীর এই সাহসের সামনে তার সব চাল উল্টে যাচ্ছে। সে তোতলামি করে বলল,
“আমি… আমি তো শুধু…”
বেলী কোল থেকে ফিওনাকে আবার নিজের বুকে টেনে নিল। তারপর আখতার রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল
“আখতার ভাই, বিকেলের আলো পড়ে আসছে। আমার এখন জরুরি কাজ আছে। আমি এখানে দাঁড়িয়ে কুৎসিত তর্কে সময় নষ্ট করতে চাই না। বিচার যদি করতেই হয়, তবে আমার চরিত্র আর ওর পায়ের চামড়া নিয়ে নয় বিচার করুন ফারহান কেন ঘরে বউ থাকা সত্বে বিয়ে করেছে! নিজের বাচ্চার খাবারেে টাকা না দিয়ে আমোদ-প্রমোদ করছে। আর হ্যাঁ, আমি এই ঘরেই থাকব। দেখার ইচ্ছা আছে কার কত ক্ষমতা আমাকে বের করার!”
আজ বিকেলে মাহিকে পড়ানোর প্রথম দিন। এই নোংরা পরিবেশের রেশ যেন সেসবের ওপর না পড়ে, সেদিকেই তার এখন একমাত্র লক্ষ্য। ওদিকে বিচার সভায় এক পিনপতন নীরবতা।
ফারহানকে পাশ থেকে খোঁচাচ্ছে তৃষ্ণা।
“কেমন পুরুষ তুমি? বউর সুবিচার আনতে পারো না!”
তৃষ্ণার উস্কে দেওয়া কথায় ফারহান তখন রাগে কাঁপছে। আখতার রহমানের দিকে তাকিয়ে সে আবারও চিৎকার করে উঠল,
“আখতার ভাই, আমি বিচার চাই! আমি নিজের টাকা দিয়া খাওয়ায় পড়ায় এসব মানতে পারমু না।”
বেলী এবার অবজ্ঞার হাসি হাসলো। ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
“খাওয়া-পরার খরচ দিচ্ছ বলে তুমি অনেক বড় উদ্ধার করছ ফারহান? কিন্তু তুমি যে আমার অনুমতি না নিয়ে পরকীয়া করলে, ঘর থাকতে বাইরে নতুন করে বিয়ে করলে সেটা কি অপরাধ না? আমার এই দুধের বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে একবারও কি তোমার মায়া হয়েছিল? তুমি আমাকে ঠকিয়েছ, আমার সংসার তছনছ করেছ। তোমার এই এত এত অন্যায়ের কী শাস্তি হবে, তার বিচার কি আখতার ভাই করবেন?”
ফারহান বেলীর এই সরাসরি আক্রমণে সে যেন কথা হারিয়ে ফেলল। ভিড়ের মধ্য থেকে দুই-একজন প্রবীণ নারী তখন ঠেস মেরে বলে উঠলেন,
“আরে বেলী, স্বামীর সংসার করতে গেলে কত কী সইতে হয়! কত মানুষের ঘরেই তো সতীন আছে। একটু সবুর করলে কি হইতো না? অহন ঝগড়াঝাঁটি কইরা কী লাভ?”
বেলী তপ্ত গলায় উত্তর দিল,
“না খালাম্মা, আমি আর সইতে পারব না। সওয়ার একটা সীমা থাকে। যে স্বামী নিজের স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করতে পারে না, তার কাছে অন্ন নেওয়া মানে বিষ পান করা।”
ফারহানের পৌরুষে যেন বেলীর এই কথাগুলো চাবুকের মতো লাগল। সে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে উঠল,
“এতই যখন তেজ তোর, তবে আমার সংসারে আছিস কেন? সইতে না পারলে যা এখান থেকে!
বআইচ্ছা! তোর তো অনেক দেমাগ! তবে শোন, তোর মতো অহংকারী মা°গিরে আমার দরকার নাই। যে স্বামীর কথা শোনে না। কয়ডা দিন ধইরা যা করতাছোস তুই আর সহ্য করতে পারব না! শোনেন সবাই। আজ এই মুহুর্তে সবাইকে সাক্ষী কইরা তোরে আমি আজই আজাদী দিয়া দিলাম। **এক তালাক… দুই তালাক… তিন তালাক! যা, আজ থেকে তুই আমার জন্য হারাম।”
পুরো বস্তিতে যেন একটা বজ্রপাত হলো। মুহূর্তেই চারদিক নিস্তব্ধ। আখতার রহমান তসবিহ ধরা হাতটা থামিয়ে দিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। বেলী এক মুহূর্তের জন্য যেন কেঁপে উঠল। তার দীর্ঘদিনের সংসার, তার ভালোবাসা, তার তিল তিল করে গড়া স্বামী নিয়ে গড়া স্বপ্নগুলো চোখের সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। চোখ বেয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তেই আলগোছে মুছে নিল।
#চলবে
