Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"বেলীফুলের ইতিকথাবেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-১+২+৩

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-১+২+৩

#মীরাতুল_নিহা
#বেলীফুলের_ইতিকথা (১)

“বেলী! তোর জামাই আরেকটা বিয়া করছে! তোর সতীনরে লইয়া দাঁড়াইয়া আছে—দেইখা যা জলদি!“

কথাটা কানে যেতেই বেলী থমকে দাঁড়াল। প্রতিবেশী আয়েশার হাঁপানো মুখ দেখে মনে হলো না এটা কোনো মশকরা। তবুও বেলীর মাথায় প্রথমেই এল, হয়তো ভিত্তিহীন কিছু! কিন্তু এমন কথা নিয়েও কি কেউ ঠাট্টা করে? তবু দোনা-মোনা ভাব মাথা থেকে ঝেড়ে সে তড়িঘড়ি দরজার দিকে গেল। দরজা ফাঁক করতেই চোখে পড়ল—আয়েশার কথার হুবহু সত্য চিত্র। তার স্বামী ফারহান বরবেশে দাঁড়িয়ে, আর পাশে নতুন বধূ সাজা এক মেয়ে। ফারহানের কণ্ঠে সেই পরিচিত বাঁজখাই সুর,

“বেলী! আরে বউ… থুরি—বড় বউ! আমার নতুন বউরে বরণ করে ঘরে তুল!”

বেলীর নিঃশ্বাস যেন এক লহমায় বন্ধ হয়ে গেল। শরীরটা পাথরের মতো অনড়। সে সামনে এগিয়ে দাঁড়াতেই ফারহান আবার চেঁচিয়ে উঠল,

“আরে নতুন বউ আইছে! চোখে কী হইছে তোর? দেখতেছিস না নাকি?”

“তুমি সত্যিই বিয়ে করেছো?”

“হ, এই যে বউ!”

উত্তর শুনে, বেলী কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শুধালো,

“কিন্তু, কেন ফারহান!”

ফারহান বিরক্তি নিয়ে, কিছুটা খাপছাড়া ভাবেই উত্তর করল,

“স্পষ্ট কথা! আমার তোরে ভাল্লাগছে নাহ্! তাই বিয়ে করেছি।”

“আর আমাদের বাচ্চা! ফিওনা! ও?”

“বাচ্চার বাপ তো আমি, সবাইই জানে। এইটা আর কি?”

“বাচ্চা থাকতেও আরেকটা বিয়ে কিভাবে করতে পারলে ফারহান! বুক কাঁপল না তোমার?”

বেলীর একের পর এক প্রশ্নে ফারহানের বিরক্তির সাথে সাথে এবার রাগ চওড়া হলো! হাত ঝাড়া দিয়ে বলল,

“সর তো! বউ দাঁড়িয়ে আছে কতক্ষণ ধরে, দেখছিস না? কানা না-কি তুই?”

ফারহানের জবাব শুনে বেলীর চোখের কোনে পানি টলমল করছে। কোনো নারীই মেনে নিতে পারবে না তার স্বামীর আরেকটি বিয়ে! বেলীর ভেতরও ঠিক একই রকমের তিক্ত জঘন্য অনুভুতি হচ্ছে! তবুও শক্ত কন্ঠে ফের শুধোয়,

“তাহলে আমি কে?”

বেলীর প্রশ্ন শুনে ফারহান বাঁকা হেঁসে জবাব দিল,

“তুমিও বউ! তবে বড় বউ আর কি! এটা নিয়ে মন খারাপ করিও না! সমস্যা নাই, সবকিছু সমানে সমানে হবে।”

এক মুহূর্তও দেরি করল না বেলী। সপাটে এক চড় ফারহানের গালে গিয়ে পড়ল। তারপর দোলনায় ঘুমিয়ে থাকা নিজের পাঁচ মাসের দুধের বাচ্চাটাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে দরজা ধপ করে বন্ধ করল। ফারহান থ মেরে দাঁড়িয়ে রইল—দু’চোখ বড় বড় করে। তারপর নতুন বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে পুনরায় বলতে আরম্ভ করল,

“দরজা ক্যান বন্ধ করলি! আমি আমার বউরে নিয়ে বাসর কোথায় করব?”

ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ নেই। বেলী চুপচাপ। দু’টো রুম বিশিষ্ট ঘরটাতে আর থাকার মতন জায়গা নেই। প্রথম রুমে একটি চৌকির উপর মাদুর পাতা আছে। আর কিছু টুকটাক জিনিসপত্র। যেমন সিন্দুক হতে বিভিন্ন ড্রাম, আলনা। দ্বিতীয় রুমে রয়েছে খাট সমেত সুন্দর বিছানা। যেই বিছানায় এতদিন বেলীর সাথে ফারহান ছিল। বেলী ছিল, মধ্যবিত্ত ঘরের শান্ত, লক্ষ্মী মেয়ে। কিন্তু সেই শান্ত মেয়েটাই একদিন বাবা-মা’র সমস্ত নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালো। কারণ— ফারহান। দু’জনের সম্পর্কটা প্রায় দেড় বছরের। সেই দেড় বছরের প্রত্যেকটি দিন ছিল স্বপ্ন দিয়ে বোনা, ভরসা দিয়ে গড়া। ফারহান তার কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। বাবা মা’র যুক্তি, নিষেধ শুনেনি!
বিয়ে করেছিল তারা। বিয়ের পর মাসখানেক দারুণ চলছিল সব। ফারহানের যত্ন, তার ভালোবাসা— সব কিছুতেই একটা নতুন জীবন খুঁজে পাচ্ছিল বেলী। কিন্তু সেই সুখের মেঘে ঘুটঘুটে অন্ধকার জমতে শুরু করলো খুব দ্রুত। আস্তে আস্তে বেলী ফারহানের ভেতরের আরেকটা মানুষকে জানতে পারলো। সেই মানুষটা, যাকে সে আগে কখনও দেখেনি। দেড় বছরের ভালোবাসার মানুষটা কেমন যেন অচেনা এক রাক্ষসে পরিণত হলো। বেলী কান্না করে উঠলো। অঝোরে, বাঁধনহারা কান্না। এই কান্না শুধু দুঃখের নয়, এই কান্না তার ভুল সিদ্ধান্তের, তার হারানো স্বপ্নের। ফারহানকে বিয়ে করার জন্য যে মূল্য সে দিচ্ছে, সেটা যেন এই এক এক ফোঁটা চোখের জলেই লেখা আছে।
বাচ্চা মেয়েটা বমি করে দিয়েছে! বেলী দ্রুত চাদর সরিয়ে দেখলো, কাপড়ে আর বিছানায় বমি লেগে আছে। এই মুহূর্তে পরিষ্কার না করলে বিছানায় শোয়া দায়। অথচ দরজা খুললেই মুখোমুখি হতে হবে সেই ভয়ংকর বাস্তবতার। কিন্তু বাচ্চাটার জন্য তাকে বেরোতেই হলো। ঘৃণা আর যন্ত্রণায় দাঁতমুখ শক্ত করে বেলী দরজা খুললো। প্রথমেই চোখ গেল ঘরের ভেতরের দৃশ্যটার দিকে। বিছানায় দুজন অর্ধ নগ্ন মানুষ। ফারহান এবং সেই নতুন বউ।

“কি ব্যাপার? এখানে কি? কোনো প্রাইভেসি না-ই না-কি!”

ফারহানের প্রশ্নে বেলী সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নতুন বউ তখন, বুকের আঁচল সামলাতে ব্যস্ত। ফারহানর পড়নে শুধু একটা লুঙ্গী! বেলীর বুঝতে বাকি রইল না, এ কীসের আয়োজন! ভেতরে থাকা রাগটা পুনরায় প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসলো,

“আঁচল সামলানোর কি দরকার! তোদের মতন মহিলারা বুকের আঁচল ফেলেই অন্য পুরুষ মানুষদের আকৃষ্ট করে!”

উত্তর পছন্দ হলো না ফারহানের! উঠে গিয়ে বেলীর সামনে দাঁড়াল। চোখ দু’টো রাগে বড়বড় করল। যেন বেলীকে এখনি গিলে খাবে! সর্তক করে দিচ্ছে খুব সাবধানে!

“বেলী! সাবধানে কথা বল।”

“যা করেছে, তাই বলেছি। গায়ে লাগার কি হলো?”

ফারহান বেলীর হাত ধরে একটু দূরে দাড় করাল। বেলী সহসাই ফারহানের হাত ছেড়ে দিল! ফারহান তড়িৎগতিতে রুমে গেল। গিয়েই মনের আনন্দে দ্বিতীয় বউকে ডাক দিতে নিচ্ছিল তখনি দেখে বিছানা ভর্তি বমি এবং প্রস্রাব! সাথে সাথে খুশি মুখটা মলিন হয়ে গেল। বেরিয়ে এসে আগের মতন চিল্লিয়েই বলতে লাগল,

“বাচ্চা এসব করেছে পরিষ্কার করিস নি এখনো?”

ফারহানের প্রশ্নে বেলী কোনো উত্তর করল না! সোজা দরজা খুলে বাহিরে গেল। ফারহানের দ্বিতীয় বউ তখন প্রশ্ন নিয়ে তাকাতেই ফারহান হেঁসে উঠে! যেন এই বাজে পরিস্থিতি তার কাছে কিছুই না। তাদের বাসর রাত খুবই মধুর হবে। সে আশ্বাসই দিচ্ছে ঠোঁটের কুটিল হাসি দ্বারা।

“মনে হয় গেছে! কাছে আসো তো ময়না পাখি!”

ফারহানের ঠোঁটে বিশ্রী হাসি দেখা দিল। যে হাসির মানে কামনার! যৌনাকাঙ্ক্ষার!

“বাসর রাতে বাসর না করলে হয়? জলদি আসো!”

সে পুনরায় তার নতুন বউর বুক থেকে শাড়ির আঁচল টান মেরে খুলে দিল। উন্মুক্ত গলা বুকে উম্মাদের মতন তার স্পর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছিল! মেয়েটিও আঁকড়ে ধরেছে সুঠাম দেহের পুরুষটিকে। অদ্ভুত জগৎে চলে গেছে দু’জনে ইতিমধ্যে! চারিদিকে কি হচ্ছে তার যেন কোনো হুঁশ নেই! ওদিকে বেলী কল থেকে এক বালতি পানি ভরে নিয়ে দ্রুত ফিরে এলো ঘরে। চরম ক্রোধ আর প্রতিহিংসার বশে বেলী সেই পানির সাথে একমুঠো শুকনো মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে এনেছে! ঘরে ঢুকেই সে কোনো কথা না বলে, সেই এক বালতি পানি ছুড়ে মারলো দুজনের দেহের ওপর।
ঠাণ্ডা পানির ঝাপটায় দুজনই চমকে ভরকে উঠলো। ফারহান আর নতুন বউ— দুজনেই তীব্র জ্বালা অনুভব করলো। মরিচের গুঁড়ো, আর বিছুটি পাতা মেশানো সেই পানি তাদের চোখে মুখে কোমল ত্বকে লাগতেই শুরু হলো জ্বলন আর অসহ্য চুলকানি! নতুন বউটি যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো। তার বাসর রাতের স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে। বেলী এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। চোখে একরাশ ঘৃণা নিয়ে দ্রুত সেই দরজা বন্ধ করে দিলো। নিজের পাঁচ মাসের মেয়েকে কোলে চেপে সে ঘরের এক কোণে গিয়ে বসলো। ফারহান এবার কুকুরের মতন চিল্লাতে লাগলো!

“বেলীরে বেলী! দরজা খুইলা দে! পানি দে! জ্বলে গেল চোখমুখ!”

বেলী নিশ্চুপ। ফারহান সহ্য করতে না পেরে এবার অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে লাগল,

“বেলী, কু°ত্তা*** তোরে যদি আমি একবার পাই। আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না!”

বেলী ভেতর থেকে সবই শুনলো। উত্তর করল না। চুপচাপ বাচ্চাকে বুকে নিয়ে বসে আছে। না চাইতেও চোখ বেয়ে নেমেছে অঝোর ধারায় শ্রাবণ!

ওদিকে নতুন বউর চোখে বেশ ভালো করে মরিচ ঢুকেছে। চোখে হাত দিয়ে রুমের এদিক থেকে ওদিক হাঁটছে, একটু পানির আশায়! বেলী ঘরের ভেতর থেকেও তালা বন্ধ করে দিয়েছে যাতে পানির জন্য বের হতে না পারে। জ্বালায় যেন বেশ ভালো করেই ছটফট করে দু’জন! বেশ অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর ফারহানের চিল্লাচিল্লি শুনে বেলীও প্রতি উত্তর করে,

“তোমার নতুন বউর শরীরে, অনেক জ্বলুনি আর চুলকানি, তাই না? এত চুলকানি যে বিবাহিত তারউপর এক বাচ্চার বাপকে বিয়ে করেছে! ভাবো একবার কি পরিমাণে চুলকানি তার সর্বাঙ্গে! আজ তো হিসেব মতন বাসর রাত? তোমার এবং তোমার নতুন বউর চুলকানি মিটিয়ে দিলাম। এবার দু’জন দুজনের জ্বলুনি, চুলকানি ইচ্ছেমতন কমাও! সারারাত পড়ে আছে। আমি বিরক্তও করব না!”

#চলবে!

#বেলীফুলের_ইতিকথা (২ + ৩)
#মীরাতুল_নিহা

ক্লান্ত হয়ে পড়া পৃথিবীটাকে যেন জাগিয়ে তুলতে চাচ্ছিল ভোরের প্রথম আলোকরেখা। পূর্ব আকাশে সূক্ষ্ম একটা সোনালি দীপ্তি জমে উঠেছে। ঘরের মাটিতে অল্প আলো পড়তেই দেখা গেল বেলীর মুখ। শুকনো কান্নার দাগে তার গাল আরও সরু, আরও কেমন যেন একরাশ নিঃসঙ্গতার রেখায় ভরতি।
ফিওনা তখনো শান্ত ঘুমে আচ্ছন্ন—বাচ্চাদের ঘুমের আলাদা এক ভাষা থাকে, যেন অস্থির পৃথিবীর মাঝে তারাই একমাত্র প্রশান্তির দলিল। বেলী কিছুক্ষণ মেয়ের মুখে তাকিয়ে রইল। সেই ছোট্ট ঠোঁটদুটো, নরম নিঃশ্বাস, মোলায়েম গাল—সবকিছুই তার ক্লান্ত বুকের ওপর এক টুকরো আশ্বাসের বাতাস বইয়ে দিল। যেন পৃথিবীর সব যন্ত্রণা এই ছোট্ট দেহটার স্পর্শে খানিকটা দূরে সরে যায়। দিন মানেই দায়িত্ব। দায়িত্ব মানেই বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দরজার ছিটকিনি উঠাতেই টিক করে শব্দ হলো, আর সাথে সাথেই চোখে পড়ল, ফারহান দরজার পাশে মেঝেতে কুঁকড়ে শুয়ে আছে। শরীরজুড়ে লাল ফোলা দাগ। জ্বলন্ত কয়লা ছিটিয়ে দিলে যেমন দাগ হয়, ঠিক তেমন। চোখ-মুখ ঘোলাটে। চুল এলোমেলো হয়ে কপালে আটকে আছে। নতুন বউটার অবস্থা তার চেয়েও বেশি বিষণ্ণ—চোখ লাল, গায়ের আঁচল কাঁধ থেকে নামতে নামতে কোথায় থেমে আছে বলা মুশকিল। বেলীর ঠোঁটে খুব ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। খুব ক্ষীণ, খুব ক্ষণস্থায়ী।
কিন্তু সেই হাসির পিছনেই ছিল একরাশ নরম যন্ত্রণা, যেটা খুব কম মানুষই বোঝে। যতই হোক, মানুষটা তার স্বামী। তাকে কষ্টে কুঁকড়ে থাকতে দেখে বেলীর মনে অজান্তেই একটা বিরহের রেখা আঁচড় কাটল।
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে কঠিন করে ফেলল সে।
সহানুভূতি দুর্বলতার আরেক নাম। দুর্বল হলে চলবে না। চোখ না মিলিয়েই পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। হাওয়া তখনো একটু ঠাণ্ডা। রাতে ভালো করে খাওয়া হয়নি বলে সকাল সকালই বেলীর ক্ষিদে পেয়েছে! রান্নার জন্য কলসি নিয়ে পুকুরঘাটে পৌঁছতেই শোনা গেল মেয়েমানুষদের চাপা হাসাহাসি।
এই পাড়ায় কোনো ঘটনার খবর কখনো যেন, পুরনো হয় না। আয়েশা, রহিমা, সালমা—সবাই বসে আছে পুকুরের পাড়ে। কারও হাতে কাঁসার থালা, কারও হাতে বালতি। নিত্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য আসলেও এদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যকে নিয়ে আলোচনা করা।বেলীকে দেখতেই তাদের মুখের হাসি থেমে গেল।
এক ধরনের কৌতূহলী নীরবতা ছড়িয়ে গেল চারদিকে। বেলী কারো দিকে না তাকিয়ে পুকুরের ধারে হাঁটু গেড়ে বসল। কলসি দু’হাতে ধরে পানিতে নামাল। ঠিক তখনই সালমা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল—

”কি’গো বেলী? হুনলাম ফারহান কাইলকে নতুন বিয়া কইরা ঘরে আনছে! তুমি কই আছিলে?”

“বাহিরে দেখতে পেয়েছো আমাকে কালকে?”

বেলীর উত্তর শুনে সালমা ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করল,

“না, তো। তা দেখিনি !”

বেলী এক পলক তাকাল সালমার দিকে। এই প্রতিবেশী নামক মহিলাগুলোই কালকে একপ্রকার চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে ছিল, কি হয় দেখার জন্য! অথচ কেউ একটু ভরসা দিতে এগিয়ে আসেনি! সেজন্যই বেলী ত্যড়াভাবেই উত্তর দিল,

“দেখতে যখন পাওনি, তখন তো বোঝার কথা আমি ঘরেই ছিলাম!”

বেলীর উত্তর পছন্দ হলো না সালমার! চোখমুখ কুঁচকে ফেলল সাথে সাথে।

“সতীন নিয়ে ঘরে আছিলে বুঝি?”

বেলী উত্তর দেবার আগেই পাশ থেকে আয়েশা প্রতি উত্তর করল,

“এসব বাদ দে! মেয়েটার কপাল পুড়লো। ওর এখন আমাদের দরকার।”

বেলী এবার স্মিত হাঁসলো। চোখে চোখ রেখে বলল,

“কপাল আবার পুড়ে না-কি? আল্লাহ যা লিখেছে তাই হবে। আমি নিশ্চিত, আল্লাহ সবটুকু খারাপ আমার ভাগ্যে লিখেনি।”

সে আজ আর কাঁদতে রাজি নয়। চোখ তুলে তাকালে হয়তো দেখবে করুণার ঢল, আর মাথা নিচু করলে দেখবে টিটকারি। সে কোনো দিকেই তাকাল না। এক মূর্ত কঠিন নীরবতা নিয়ে সে দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করল। হুট করেই তীব্র ক্ষুধা অনুভব করল সে। পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল! কলসি নামিয়ে সে দ্রুত রান্নাঘরের কোণে গেল। গ্যাস শেষ হয়ে আছে প্রায় মাসখানেক হলো। ফারহানকে বারবার বলার পরও সে কানে তোলেনি। বেলী শুকনো লাকড়ি হাতে নিল। চুলা জ্বালাতে গিয়ে ধোঁয়া আর ছাইয়ে দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। তবুও সে ধৈর্য ধরল। কয়েকটি দেশলাই কাঠি নষ্ট হওয়ার পর, অবশেষে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ার বুক চিরে আগুন জ্বলে উঠল। আগুনের লালচে আভা তার চোখের তিক্ততাকে কিছুটা ঢাকল। পরিষ্কার জলে চাল ধুয়ে সে হাঁড়িতে ভাত বসাল। ভাতের ফেনা উঠে এসেছে হাঁড়ির গা বেয়ে। বেলী এক মনে ফেনা ফেলে দিতে ব্যস্ত। লাকড়ির ধোঁয়ায় তার চোখ দুটো লাল, সেই লালিমা যেন তার ভেতরের ক্রোধকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। ঠিক সেই সময়, ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়া ফারহানের ঘুম ভাঙল। চোখ রগড়াতে রগড়াতে সে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। সারা গায়ে বিছুটির পাতার জ্বালা তখনও বিদ্যমান, চামড়া জায়গা-জায়গায় ফুলে লাল হয়ে আছে। গত রাতের চরম অপমান আর যন্ত্রণার স্মৃতি মনে পড়তেই তার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল। সে এক ঝটকায় রান্নাঘরের দিকে তেড়ে গেল।

“বেলী! কু***, তুই আমার সাথে…

ক্রোধে ফারহানের কথা শেষ হলো না। সে দেখল, বেলীর হাতে একটি লম্বা খুন্তি। খুন্তিটির ফলা সে এখন চুলার ভেতরে জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে দিয়ে রেখেছে। ইস্পাতটা ধীরে ধীরে রক্তিম হয়ে উঠছে। ফারহান যখন একেবারে কাছে চলে এসেছে, বেলী তখন আচমকা ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো ভয় নেই, আছে এক শীতল, ভয়ানক স্থিরতা। সে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত খুন্তিটি ফারহানের মুখের সামনে তুলে ধরল। খুন্তির আগুনের হলকা ফারহানের মুখে এসে লাগল।

“কী বলছিলে? শেষ করো?”

বেলীর কণ্ঠস্বর শান্ত, তীক্ষ্ণ শাণিত।

“গতকাল রাতে তোমার বাসর পূর্ণ করে দিয়েছিলাম। আজ ভোরেও যদি সেই একই কথা বলতে আসো, তবে এই খুন্তি দিয়ে আরেকবার তোমার সব জ্বালা মিটিয়ে দেব—চিরতরে। বুঝেছো তো, তারপর কি হবে?”

উত্তপ্ত খুন্তি আর বেলীর চোখের সেই হিংস্র ভাব দেখে ফারহানের তেড়ে আসা পা দুটো সেখানেই থেমে গেল। এক রাতের ব্যবধানেই যেন সে বুঝে গেল, এই বেলী তার চেনা লক্ষ্মী মেয়ে নয়। মুহূর্তে তার সমস্ত আস্ফালন চুপসে গেল। ক্রোধের বদলে তার চোখে এখন এক মিশ্রিত। সে যেভাবে লোভাবেই জানে।

মেয়েটার রাগ একটু বেশিই। কিন্তু সুন্দরী মেয়েদের রাগ হয়তো সৃষ্টিকর্তাও আলাদা করে সাজিয়ে দেন। তাই সেটা নাকি মন্দ লাগে না। তেমনটাই হয়েছে ফারহানের ক্ষেত্রে। তার চোখে বেলীর চেয়ে হাজার গুণ বেশি মনোহর তৃষ্ণা । লালচে চুল, চিকন ভ্রুর সরু ছায়া, গোলাপি মোটা ঠোঁট ভাবতেই মনে হয়, এখনই গিয়ে চেপে ধরে চুমু খাবে। তাছাড়া মেয়েটি যে অবিবাহিত! একজন বিবাহিত, এক সন্তানের পিতা হয়েও সে এমন অতিব সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেছে, এই ভাবনা সবসময় তাকে অদ্ভুত এক গর্ব ও উত্তেজনায় ভরিয়ে রাখে। সব মিলিয়ে তার খুশির সীমা থাকার কথা নয়। কিন্তু সেই খুশির দুই দিন আজ। অথচ ফারহান কিচ্ছুটাই করতে পারছে না। বউয়ের গায়ের গন্ধটুকু পর্যন্ত ঠিকমতো ছুঁয়ে দেখেনি। এই অপার্থিব আনন্দটাও যেন তার ভাগ্যে বেমানান হয়ে আছে। রাগে-দুঃখে এক সময় বাইরে বেরিয়ে গেল।

দরজা খুলতেই সর্বপ্রথম চোখে পড়ল তৃষ্ণাকে। চৌকির ধারে বসে আয়নার সামনে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক বুলিয়ে চলেছে। বেলীর বুকের ভেতরটা হঠাৎই ধক করে উঠল। এমন দৃশ্য দেখে যে কারও হাত উঠে যেতে পারে, সে-ও চাইল, ঠাস করে দু’টো চড় বসিয়ে দিতে। পরক্ষণেই সে ইচ্ছেটাকে গিলে ফেলল। দোষ যখন নিজের মানুষটির, তখন পর মানুষকে দোষারোপ করেই বা কী লাভ! তবুও সে আলগোছে গিয়ে চৌকির এক কোণে বসল।
গলা খাঁকড়ি দিয়ে জানান দিল উপস্থিতি। কিন্তু তৃষ্ণা যেন নিজের জগতে নিমগ্ন। আয়নায় নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে থাকা রঙের উপরেই তার সমস্ত মনোযোগ। কেউ এসেছে কি-না সে বহুদূরের বিষয়।
অবশেষে বেলী ঠাণ্ডা স্বরে বলল—

“আপনি কি বয়রা নাকি? এভাবে লিপস্টিক লাগিয়ে যাচ্ছেন!”

মেয়েটি বিরক্ত হলো। খুব বিরক্ত যাকে বলে। ভ্রু দু’টো কুঁচকে বেশ ঝাঁঝালো কন্ঠে প্রতি উত্তর করল,

“হায় আল্লাহ! এইডি কি কথা! তোর মুখে তালা পড়ুক!”

মেয়েটির সম্মোধনে অবাক হলো বেলী! যেখানে সে আপনি করে বলছে, আর বিনিময়ে মেয়েটি তাকে তুইই! ব্যবহারই ব্যক্তিত্বের পরিচয়। মেয়েটির ব্যক্তিত্ব যে কিরকম তা জানতে কিংবা বুঝতে বেলীর আর বাকি রইল না।

“শিক্ষা দিক্ষা থাকলে কেউ এভাবে কথা বলে না!”

বলেই বেলী গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কপালে টিপ আঁকায় ব্যস্ত তৃষ্ণা যেন নিজের সাজগোজ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দায় দায়িত্ব তার ওপর নেই। বাইরে বেরুতেই বেলীর চোখে পড়ে আয়েশাকে। পাতলা গড়নের, সফেদ ওড়না কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটছে মেয়েটি হাতভর্তি বাজারের থলি। আয়েশা এখন অর্নাসের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। পড়াশোনায় আরও অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু এক বছরের গ্যাপ তার জীবনটাকে খানিকটা পিছিয়ে দিয়েছে। বেলীর সঙ্গে তার বয়সও প্রায় সমান—তাই একধরনের অদৃশ্য বন্ধুত্বও জেগে থাকে দুজনের মধ্যে।

“আয়েশা, শোন?”

হাঁটতে হাঁটতে থলি সামলে আয়েশা বলল,

“একটু পর শুনতেছি। আগে এই বাজারডা রাইখা আসি।”

মিনিট দুয়েক পরই সে ফিরে এলো। নিঃশ্বাস সামান্য হাঁপানো, কপালে ঘাম চিকচিক করছে।

বেলী তাকাতেই প্রথম প্রশ্ন করে ফেলল,

“ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছিস দেখছি!”

আয়েশা মুচকি হেসে উত্তর দিল,

“বাজারে এত্ত ভিড়! পুরুষ মানুষের ভিড়ে তো পা ফেলার জায়গাই নাই। তার ভিতর আমি একটা মাইয়া মানুষ… বুঝোসই তো কত হ্যাপা পোহাতে হয়!”

আয়েশার কথায় বেলীর মেয়েটার প্রতি অদ্ভুত মায়া জাগল ।তবুও ভাবনাটা অন্যদিকে ছিল। একটু ইতস্তত করে ধীরে ধীরে বলল—

“একটু হেল্প করতে পারবি রে?”

আয়েশা চোখ তুলে তাকাল, কপালের ঘাম আঙুলের পিঠে মুছে নিয়ে বলল,

“কী হইছে? ক তো।”

বেলী কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। মুখে যেন দ্বিধার ছায়া। তারপর নরম গলায় বলল—

“আমাকে একটা ছোটোখাটো কাজ বা যে কোনো চাকরির সন্ধান দিতে পারবি? আমার এদিক থেকে বের হওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে!”

আয়েশা কিছুটা চিন্তিত মুখ করে উত্তর দিল,

“চাকরি! কিন্তু আমার তো তেমন চেনাশোনা নাই নে বেলী। আর চাকরির জন্য তো অনেক সার্টিফিকেট লাগে। তোর আছে নি কিছু?”

আয়েশার কথায় ভাবনায় পড়ে গেল বেলী! সত্যিই তো, তার কাছে তো একটা সার্টিফিকেটও নেই। আর যাও আছে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ অব্দিই। তারপরে পড়াশোনা ও হয়নি আর!

“ভুলেই গেছিলাম আমার কাছে কিছু নেই! বাড়ি থেকে আসার সময় বুঝিইনি এতকিছু লাগবে। ভেবেছিলাম জীবনটা অন্যরকম হবে। কিন্তু এত অন্যরকম হবে টেরও পাইনি!”

বেলীর কথায় আক্ষেপের সুর স্পষ্ট! আয়েশা সেটা বুঝে নীরবে এড়িয়ে গেল প্রসঙ্গ।

“তুই তো টিউশনি পড়াতে পারিস বেলী। অর্নাস তৃতীয় বর্ষ অব্দি পড়ছস না?”

“হ্যাঁ, তবে তৃতীয় বর্ষের ক্লাস তেমন করার সুযোগ পাইনি। এতগুলো বছর বাপের টাকা নষ্ট করে পড়েইছি যা! তার সার্টিফিকেটটুকু অর্জন করতে আর পারলাম না!”

“মন খারাপ করিস না। তুই পড়াশোনায় উজ্জ্বল। আমারে অনেক সাহায্য করছস তুই। দেখি, টিউশনি পাওয়া যায় কি না। যদিও এই বস্তিবাসীতে শিক্ষার মর্যাদা কেউ দেয় না।”

বেলী আক্ষেপের সুরে বলল,

“দেখি কি আছে এই কপালে! কিছু একটা করতেই হবে, এখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে হবে।”

“শোন বেলী, একদম নরম হবি না। ওই মহিলাকে আর ফারহান ভাইকে টাইটে রাখবি! যতদিন আছস। নইলে পেয়ে বসবে!”

“তা আর আমায় বলে দিতে হবে না রে। কাল মরিচের গুঁড়ো দিয়েছি। সকালে খাবার বন্ধ করেছি। বাকিটুকুও শায়েস্তা করে ফেলব। তবে আর যাই হউক, আমিও এই নরকের সংসার থেকে মুক্ত হব আর ওদেরও শাস্তি দিব। কষ্ট শুধু আমি একা পাব কেন!”

আয়েশা মুঁচকি হাসল বেলীর কথা শুনে। বেলী পড়াশোনায় ও যেমন মেধাবী তেমনি সাহসও বেশি। যার কোনোটাই আয়েশার মধ্যে নেই! এমনকি রূপটুকুও সৃষ্টিকর্তা তাকে কম দিয়েছে বলে তার ভীষণ আক্ষেপ!

আয়েশার সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে বেলী কলপাড়ের দিকে এগোল। চোখ-মুখে পানি মাখা, রুমে ঢুকতেই নজরে পড়ল ফারহান আর তার নতুন বউ আরাম করে বসে বিরিয়ানি খাচ্ছে। বিস্ময়ে বেলী চারপাশে খুঁজল ফিওনাকে, কিন্তু পেল না।

“ফিওনা কোথায়, ফারহান?”

ফারহান তখন কেবল খাবারের একটি পিস মুখে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বেলীর ডাক শুনে অদ্ভুতভাবে বিষম লেগে অস্থির হয়ে গেল। অমনি তৃষ্ণা আদুরে ভঙ্গিতে মাথায় হাত দিয়ে পানি খাইয়ে দিল। বেলী বাঁজখাই কণ্ঠে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,

“তুমি এখানে কেন?”

ফারহান আরামসে চিকেনের পিসে কামড় দিয়ে বলল,

“আমার বিছানায় আমি ক্যান! এটা কি কোনো প্রশ্ন হইলো বউ?”

উত্তর শুনে বেলীর গা একপ্রকার রিঁরি করে উঠল। রাগে সে ফারহানের শার্টের কলার চেপে ধরল। ফারহান চোখ বড় বড় করে তাকাল। বেলী তার দিকে তোয়াক্কা না করে রক্তিম অক্ষিযুগল দিয়ে জিজ্ঞেস করল
“গলা টিপে দেবার আগে, গলা দিয়ে শব্দ কর!”

“তোর মেয়েকে চৌকিতে শুইয়ে রেখেছি। আসার সময় দেখতে পাসনি নাকি?”

বেলী ফারহানকে ছেড়ে মেয়ের কাছে ছুটে গেল। তাড়াহুড়োর কারণে আগে চোখে পড়েনি। মেয়েটিকে বুকে নিয়ে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর আবার ফারহানের দিকে ফিরে দাঁড়াল।

“আমি আমার মেয়েকে নিয়ে এখানে শোবো।”

বেলীর কথায় তৃষ্ণা চোখ-মুখ কুঁচকে আহ্লাদী কণ্ঠে বলল,

“আমি চৌকিতে ঘুমাইতে পারুম না! আবার কালকের মতন কাহিনি হইব!”

“ঘুমাইতে না পারলে, আরেক মহিলার স্বামীকে বিয়ে কেন করেছিস! চৌকিতে ঘুমাতে পারবে না কিন্তু অন্য মহিলার স্বামীর সাথে ঠিকই শুতে পারবা, তাই না? লজ্জা নেই?”

বেলীর তেজী কণ্ঠে তৃষ্ণা খানিক ভড়কে উঠল। সে ফারহানের কাছে এগিয়ে বসল। ফারহান এবার উঠে দাঁড়াল।

“তিশু, আমার নতুন বউ। তোর জন্য কালকে চৌকিতে রাখছি। আজ বিছানায় ঘুমাবো।”

“আমার মেয়ে চৌকিতে শুবে?”

“কি হইছে তাতে?”

“ও ব্যাথা পেতে পারে। ঘুম হবে না ভালো।”

“ যা বলছি তাই। চৌকিতে শুলে তোর ওই নরম বাচ্চা শক্তপোক্ত হয়ে যাবে! বেশি বাড় বাড়িস না! ভালো হবে না। ফুট এখান থেকে!”

ফারহানের তাচ্ছিল্যময় কথা শুনে বেলীর রাগে শরীর কেঁপে উঠল। কিছু না বলে সে চুপচাপ রুমে ঢুকে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস তুলল। রুম থেকে বের হতেই ফারহান দরজাটি ধরে জোরে বন্ধ করে দিল। বেলী তা লক্ষ্য না করেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। এই শহরে একটি বাচ্চা নিয়ে চলা, চারটে কথা না। একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই, নিরাপদ আশ্রয়… এত কিছুর জন্যই সহ্য করতে হচ্ছে এই ভার। ঠিক তখনই বাইরে থেকে দরজায় কড়া নারা ওঠল। আওয়াজ শোনা মাত্রই বেলী মেয়েকে বুকে চেপে ধরে ঘরের কোণে দাঁড়ালো। চোখ খুলে দেখল বাহিরে দাঁড়িয়ে আদনান। তার প্রতিবেশীই বলা যায়। আদনান বেলীকে দেখে প্রথমে হালকা কণ্ঠে সালাম দিল। বেলীও ছোট্ট মাথা নুয়ে হালকা আদব জানাল।

“ফারহান আছে কি?” আদনান জিজ্ঞেস করল।

“না।” বেলী স্বল্পস্বরেই বলল।

উত্তর না শুনেই বেলী ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল‌ আদনান কিছুক্ষণ থমথমে তাকিয়ে রইল। এভাবে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া! কেমন জানি লাগল। বেলী মেয়েকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরেছে।
ওদিকে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। ঘড়ির কাঁটায় তখন টিকটিক করে দশটা বাজছে।

হঠাৎ আবার দরজায় আওয়াজ হলো। ফারহান জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। বেলী চৌকিতে শুয়ে রয়েছে, মেয়েকে বুকে চেপে ধরে। ফারহানের জোরে দরজা চেপে দেওয়া শোরে যেন পুরো কক্ষে কম্পন ছড়িয়ে গেল। দরজার বাইরে থেকে ফারহানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, তীক্ষ্ণ এবং অধৈর্য।

“দরজা খোল, বেলী!”

কিন্তু ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। বেলী তার শিশুকন্যাকে বুকে জড়িয়ে খাটের এক কোণে পাথরের মতো নিশ্চল। তার নীরবতা যেন দরজার বাইরের হট্টগোলকে আরও প্রকট করে তুলল।
ফারহান আবার হাঁক দিল,

“কথা বলছিস না কেন? আমার বাথরুম পেয়েছে, খোল বলছি!”

বেলী তখনও নিরুত্তর, যেন ঘরের মধ্যে কেবল একটা শূন্যতা বিরাজ করছে। তার এই অদ্ভুত নীরবতা দরজার ওপাশের পুরুষটিকে আরও অস্থির করে তুলল। দশ মিনিটের মতো সময় পার হয়েছে। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। হঠাৎ বেলীর নাকে একটা বোটকা, অসহ্য গন্ধ ভেসে এল। মুহূর্তেই তার মুখাবয়বে একটি সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল, সে বুঝে গেল যা হওয়ার হয়ে গেছে। বাইরে থেকে আসা দুর্গন্ধটি যেন তার অনুমানকে নিশ্চিত করল। ঠিক তখনই, পাশে দাঁড়ানো তৃষ্ণার বিকট আওয়াজ শুনতে পেল সে।

“ছিহ্! ছিহ্! এ কী করলে তুমি? এত বড় পুরুষ, আর প্যান্টের মধ্যে এসব!”

ফারহানের কণ্ঠে এবার তীব্র অসহায়তা।

“কতক্ষণ আঁটকে রাখা যায়? আজ সকালে বাথরুমে যাই নাই। সন্ধ্যায় পেট পুরে খাওয়াতে এখন জোরে ধরছে! বেলীরে বেলী! তুই কেন দরজা খুললি না? নির্ঘাত মরছিস! তোর জন্য আজ এই…”

এরপর শুরু হলো অকথ্য গালাগালি। ফারহানের কণ্ঠস্বর রাগে কাঁপছিল। ঘরের ভেতর শুয়ে থাকা বেলী এই সব গালিগালাজকে উপেক্ষা করে গেল। বরং তার মনে এক শীতল তৃপ্তি, এক নীরব মজা অনুভব হচ্ছিল। দরজার ওপারে তাদের অসহায়ত্ব যেন তার প্রতি হওয়া দীর্ঘদিনের অবিচারের সামান্য প্রতিদান। এর কিছুক্ষণ পর, তৃষ্ণার মধ্যেও একই রকম অস্থিরতা দেখা দিল। তার চাপা গোঙানি আর এপাশ-ওপাশ করা জানান দিচ্ছিল, তারও প্রস্রাবের বেগ এসেছে। আধা ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই তৃষ্ণার দুর্বল প্রতিরোধও ভেঙে গেল। প্রথমে তার দু’পা ভিজে উঠল, তারপর সেই ঘোলাটে তরল গড়িয়ে দরজার সামনের মেঝেটিকেও সিক্ত করে দিল।
ঐ বিশ্রী, তীব্র বোটকা গন্ধটা বেশিক্ষণ চাপা থাকল না। ঘরের দরজার নিচ দিয়ে তরল পদার্থ গড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই গন্ধটা বেলীর রুমেও ছড়িয়ে পড়ছিল। পাশের রুমের মানুষজন এই দরজা ধাক্কাধাক্কির আওয়াজে সজাগ হয়ে উঠেছিল। চাপা গুঞ্জন আর ফিসফিসানি শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন প্রৌঢ়া মহিলা দরজার কাছে এসে কপালে ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন করলেন,

“কী হইছে? এত আওয়াজ কিসের?”

ঠিক এই মুহূর্তে, বেলী তার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্তভাবে ঘর থেকে বের হলো। সে সাবধানে দরজাটা খুলে বাইরে পা রাখল। দরজার বাইরে তখনো ফারহান আর তৃষ্ণার রাগ মেশানো ফোঁসফোঁসানি শোনা যাচ্ছে। পাশের ঘরের মহিলা বেলীকে দেখতে পেয়েই উদ্বিগ্নভাবে এগিয়ে এলেন,

“ দরজা খুলতে এত চিল্লানি কেন?”

বেলী একটি শীতল, শান্ত হাসি হেসে বলল,

”আহা, আপনারা কেন এত চিন্তা করছেন? কিছু হয়নি তো।”
মহিলাটি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালেন। বেলী শান্ত কণ্ঠে তার প্রশ্নের উত্তর দিল,

“আসলে, আমার বর আর তার ছোটো বউ (শাহনাজ) দু’জনে মিলে একটু নির্জনে সময় কাটাতে চেয়েছিল। আমাকে নিজেই বলে দিয়েছে, কেউ যেন তাদের বিরক্ত না করে। তাই আমি দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসেছি।”
বেলী অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল,

“দয়া করে আপনারাও বিরক্ত করবেন না আর। ওদের এখন সুন্দর সময় কাটছে। এইটুকু ব্যক্তিগত সময় তো তাদের, তাই না? আপনারা বরং নিজ নিজ ঘরে যান। ওদের আনন্দ উপভোগ করতে দিন!”
বেলীর এই শান্ত, দৃঢ় কথা এবং তার মুখের হাসি দেখে আশেপাশের লোকজনের কৌতূহল কিছুটা স্তিমিত হলো। তারা বেলীর কথা বিশ্বাস করল অথবা বিশ্বাস করার ভান করল এবং আস্তে আস্তে সরে গেল। বেলী তখন পা বাড়াল আয়েশার কাছে রাত্রিযাপনের আশায়। আজকে এ ঘরে থাকলে বমি করেই অজ্ঞান হতে হবে!

#চলবে?

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ