#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||অন্তিম পর্ব||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা
আচ্ছা আব্বু, তারপর তুমি আর মা নানু বাড়িতে যাওনি?” ছোট্ট সাত বছরের ছেলে তৌহিদের মুখে এই কথা শুনে অতীত থেকে বর্তমান চোখে ভাসমান হলো তৌকিরের। তৌকির তাঁর ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
– “আর যাওয়া হয়নি। তবে একদিন তোমার মেজো মামা কাফেলের সঙ্গে রাস্তায় আমার দেখা হয়েছিল।”
“আর হ্যাঁ, আমার ভালো করেই ঠিক মনে আছে।”
যানবাহন চলিতো রাস্তার একপাশে আমি বসে লোহা পেটাচ্ছিলাম। তোমার আম্মুকে যখন তার বাবার বাড়ি থেকে এনেছিলাম, তখনই আমার রেস্টুরেন্টের কাজটা চলে যায়। তোমার সজিব চাচু তার বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে আমাদের থাকতে দিয়েছিল। তারপর কামারের কাজটাকেই বেছে নিতে হয়েছিল আমায়। কয়েকশো মানুষের ভিড়ে লোহা পিটিয়ে লোহাকে যন্ত্রে রূপান্তরিত করাই আমার কাজ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেই সময়।
তোমার মামা সেই দিন আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে ছুটে এসেই বলেছিল,
– “আমার বোন কেমন আছে?”
কথাটা শুনে আমি মাথা তুলে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আগের মতো তার চোখে-মুখে কোনো ইগো বা তাচ্ছিল্যের কিছুই আমার চোখে পড়েনি।
আমার তখন কপাল ও চুল থেকে চুয়ে চুয়ে ঘাম পড়ছিল। আমি পেছনে পাইকোর গাছের নিচে থেকে ছোট একটা টুল টেনে তোমার মামাকে বসতে দিয়েছিলাম। সে কোনো কিছু না বলেই নির্দ্বিধায় সেখানে বসে পড়েছিল। তার হাতে ছিল চকচকে জরির কাজ করা একটা বিয়ে বা রিসেপশনের কার্ড। সেটা হাতে না পাওয়া অবধি বোঝার উপায় ছিল না এটা কিসের।
আমার পাশাপাশি বসেই আমার দিকে তাকিয়ে তোমার মামি আর সে মৃদু হেসে দিল আমার দিকে তাকিয়ে। সেই সময় দোকানে কাজ করত তোমার বয়সের এক বাচ্চা, নাম তার বাবলু। আমি বাবলুকে চিৎকার করে ডেকে দিয়ে বললাম,
-“দুই কাপ চা নিয়ে আয়।”
ছেলেটার পরনে খয়েরি গেঞ্জি ও শর্ট প্যান্ট ছিল। ভাবনার বিষয় হলো, প্যান্টের তলা প্রায় সময় দেখতাম ছেঁড় থাকতো। ভালো একটা প্যান্ট পড়তে বললে বলতো,
– “কি যে কন ভাই! কামের সময়ে নাকি নয়া কাপড় পইড়া ঘুরুম? ধুর!” বলেই পাগলাটে হাঁসি মুখে তার থাকতো।
সেই দিনও ব্যতিক্রম ছিল না। বাবলুকে চা নিয়ে আসতে বলেই আমি তোমার মামার দিকে তাকিয়ে বললাম,
– “আচ্চা! রাস্তার খোলা চা কি চলবে?”
কাফেল তখন বললো,
-“কি যে বলেন! আমি কখন বললাম যে ফাইভ স্টার হোটেলের চা লাগবে!”
তারপর আবারও বললো,
– “কই, আমার বোনের কথা তো কিছু জানালেন না?”
আমি সেই দিন সে সময়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
-“সকালে ঘুম থেকে উঠে আসার সময় ভালো দেখে রেখে এসেছি। এখন তো আর আমি বাড়িতে নেই, তাই বলতে পারছি না। তবে হ্যাঁ, আর একটু অপেক্ষা করলে তোমার বোন আমার জন্য ভাত সাজিয়ে নিয়ে আসবে। যদিও প্রতিদিন আসে না। বাবলু গিয়ে বাড়ি থেকে আনে দুপুরের খাবার নিয়ে আসে প্রতিদিন।
কিন্তু আজকে বাবলুর তাঁর নানীকে নিয়ে সরকারি হাসপাতালে যাবে।”
সেই সময় কথা শেষ করেই তোমার মামার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিছু বলতে চেয়েও যেন বলতে পারছিল না সে।
একটু সময় নিয়ে আমার সামনে নিজের হাতে ধরে থাকা সেই কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
– “আর এক সপ্তাহ পর আমার বিয়ে। মাইজার সঙ্গে। আপনার কথা অনুযায়ী সেই দিন তার সামনে ভিডিও কলে আমি সবকিছু বলেছি। এই যে, সে যদি আমাকে সত্যিই ভালোবেসে থাকে, তাহলে সে আমাকে বিয়ে করে যেন আমার সঙ্গেই, আমার বাড়িতেই থাকে। আমি ছেলে হয়ে কখনোই বাবা আর মাকে ছেড়ে যেতে পারবো না বাকি সব ভাইদের মতো করে। সত্যি ভালোবাসলে সে যেন চলে আসে আমার কাছে। আমরা বিয়ে করে একটা সংসার গড়বো। সে মেনে নিয়েছে। সে সবকিছু মেনে নিয়ে এই বিয়েতে রাজি হয়েছে, ভাই। আমার খুব ইচ্ছা, আপনি আর বোন আমাদের বাড়িতে আর একবারের জন্য ফিরে চলুন।”
খুব সম্মান ও প্রতিহত দিয়ে কথাগুলো বলেছিল সেই দিন কাফেল। তবে আমার কাছে কোনো উত্তর ছিল না। আমি তখন বললাম,
– “এই কার্ড আমাকে না দিয়ে যেন দৌরুতিকে দেওয়া হয়। সে যা বলবে, তাই হবে।”
তারপর দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন হয়। কেউ কারো সঙ্গে কোনো একটা কারনে কথা বলতে পারছে না যেনো। কাফেল বসে থাকে তখনও। এর কারণ, বোনের সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরবে সে। তৌকির একটু পর আবার লোহা পেটাতে শুরু করলো। খানিক সময় পরেই তৌকির তাঁর দিকে তাকিয়ে আগের চিন্তায় ডুব মারলো। এই তো সেই দিনের কথা, যখন তৌকির আর দৌরুতি একে-অপরের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হতেই দরোজায় তার সামনে পড়ে যায় তাঁরা দুইজন।
“তার বোনকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?” ‘সে এই প্রশ্ন করায় তৌকির বলেছিল,
– “যেটা আগে করার দরকার ছিল, আজকে করছে সে। তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের আলাদা একটা সংসার গড়তে যাচ্ছে।”
যাওয়ার পথে তৌকির কাফেলের দিকে তাকিয়ে ফিরে বললো,
– “আর হ্যাঁ, আপনারও কিন্তু উচিত সঠিক ভালোবাসা খুঁজে নেওয়া। আপনি যদি মনে করে থাকেন, আপনার ভালোবাসা পেতে হলে ভালোবাসার কাছে যেতে হবে, তাহলে ভুল ভাবছেন। ভালোবাসা নিজ ইচ্ছায় আপনার কাছে এসে ধরা দেবে। তাই বলছি, অন্যের জন্য জন্মদাতা মা-বাবাকে ছাড়ার কথা কল্পনাও করা ভুল। মেয়েটা সত্যি যদি আপনাকে ভালোবেসে থাকে, তাহলে সে নিজ ইচ্ছায় আপনার কাছে ছুটে আসবে। এত বাহানা কখনো সে করবে না। আমি আসি।”
কথাগুলো বলার মাধ্যমে বুঝতে পারলো, সেই দিন দুই ভাই-বোন কথা বলার সময় তৌকির আগে সব শুনে ফেলেছিল। তবে কেন জানি তার কথা কাফেলের খুব মনে ধরে গিয়েছিল। তৌকিরের কথা অনুযায়ী কাফেল নিজেই সে মেয়েটাকে আসতে বলে। সে যেতে পারবে না তার কাছে। নিজের সবকিছু ছেড়ে ,এটা তার কাজ নয়।
এরপর কাফেল বাড়িতে প্রবেশ করতেই সব ঘটনা জানতে পারে। তবে তার মধ্যে রাগ কাজ করে না। কেন জানি খুশিও হতে পারলো ন সে। তবে তার মনে হতে লাগলো, সবকিছুই ঠিক আছে কাফেল।
বাড়িতে ঢুকেই আলফা খানমকে অসুস্থ অবস্থায় পায় সে।
অনেক সময় ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো কাফেল।
একটু পর খেয়াল করলো রাস্তার অপর প্রান্তে একটা কালো বোরখা পরিহিত মেয়ে হাতে খাবারের বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা ও শরীরের কোনো চিহ্ন বোঝার উপায় নেই মেয়েটার। পরনের বোরখা যে বেশ দামি টাকার হবে, তা-ও নয় কিন্তু।
খাবারের বাটি নিয়ে এসে সামনে রেখে ইশারায়ই কাফেলকে কিছু বললো দৌরুতি। কাফেল তা দেখে আহ্ করে তাকিয়ে রইল। প্রায় আট মাস পর নিজের বোনকে এমন দেখে সে সত্যিই অবাক হয়েছে। সে অনেক সুখে আছে, তা বোঝার উপায় যথেষ্ট বুঝতে পারছে ও দেখছে সে।
তার মধ্যে হঠাৎ করে তৌকির বললো,
– “আপনার বোন আপনাকে সালাম করেছেন।”
কাফেল চোখ নামিয়ে সালামের উত্তর দিল। একইভাবে তাকেও কার্ড দিল, কিন্তু দৌরুতি ইশারায় না করে দিল। সে আর কখনো ওই বাড়িতে যাবে না, যে বাড়িতে তার স্বামীকে খুব তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মনে করা হয়।
কাফেল সব বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে শেষ বারের মতো সেই দিন দৌরুতিকে বলেছিল সে,
– “আচ্ছা, তোকে আমার বিয়েতে আসতে হবে না। শেষ একবারের জন্য মাকে দেখতে আসিস। মা এখন প্যারালাইসিস হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। মা তোমাদের কথা প্রায় বলে। যদি আসো, তো খুব ভালো লাগবে।”
এই কথা শুনে সেই দিন দৌরুতি তৌকির এর দিকে তাকিয়ে রইল। তৌকির একটা প্রশ্ন করলাম, যেমন,
-“কি করে এমন হলো?”
কাফেল তখন বললো,
– “তোমরা বাড়ি ছাড়ার পরেই এমন হয়েছে।”
তবে এটা মায়ের আগে থেকেই দেখা দিয়েছিল। সেটাকে তাঁর কাজের জন্য এতট সে নিজেই ভ্রুক্ষেপ করেননি তিনি।”
সেই দিন আমরা তোমার নানীর সঙ্গে দেখা করতে যাই। দেখা করার কিছু দিন পর শুনতে পেলাম, তিনি মারা গেছেন।
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
“দুই বাপ-ছেলে একসঙ্গে বলে উঠলো।”
তৌহিদ বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
-“এরপর আর কখনো যাওয়া হয়নি নানী বাড়িতে?”
তৌকির বললো,
-“না, আর যাওয়া হয়নি। জানাজার সময়ে একবার।”
তৌকির তাঁর ছেলেকে সব কথা বলে তার ছেলে তৌহিদ এর কপালে চুমু দিয়ে আবার কিছু কথা বললো,
“শোন বাবা, একটা কথা বলি। তোমার জীবনে এমন অনেক মানুষ আসবে। তবে তুমি শক্ত হয়ে সামনে দাঁড়াবে। কোনো কিছুতেই থেমে যাবে না তুমি। দুনিয়া ও জীবন পরীক্ষাশালা, এখান থেকে অনেক কিছুই শেখা যায়। এই যেমন তোমার জীবনে অনেক মানুষের আগমন হবে। কেউ ঠকাবে, কেউ শেখাবে, কেউ বা মায়ায় ফেলে চলে যাবে। কেউ তোমার বিশ্বাস অর্জন করবে আর সব সময়ের জন্য তোমার মায়ের মতো পাশে থাকবে।”
কথাগুলো শেষ হতেই পেছন থেকে দৌরুতি ছোট্ট বাচ্চা ছেলে তৌহিদের কান চেপে ধরে ইশারায় বললো,
-“পড়ার টেবিল ছেড়ে পালিয়ে এসেছে।”
তৌহিদ মায়ের কাছ থেকে নিজের কান ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে ঘরে চলে গেল। তারপর দৌরুতি তৌকিরের কাছে বসে ইশারায় বললো,
-“সে আজকে কি খাবে?”
দৌরুতির হাত শক্ত করে ধরে তার কাছে টেনে নিল তৌকির বললো,
-“যা তুমি খাওয়াবে আজকে। আর শোন কিছু কথা বলি আমার এই জীবনে আবার শুরু হলে তুমিই কিন্তু শেষ ও তুমিই বাকুমবতী। তোমার কি মনে হয় না, ইতিকে ছেড়ে দেওয়া উচিত?”
দৌরুতি তার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বাহিরের বারান্দায় দৌড়ে গিয়ে পাখির খাঁচা নিয়ে আসলো তার কাছে। এরপর আগের সবকিছু মনে করে জানালার পাশে গিয়ে ছেড়ে দিল ইতিকে। উড়াল দিল পাখি খোলা আকাশে আপন তরে।
তৌকির তাঁর কাছে গিয়ে দৌরুতির কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো,
– “তুমি কথা বলতে পারো না, দৌরুতি? কিন্তু তুমি তো চোখে হাজার খানিক শব্দ বুনন করো। তুমি মনে মনে ব্যাকুলতা সৃষ্টি করো। তুমি আমার বাকুমবতী, তা কি জানো?শোন দৌরুতি, দ্বিতীয় বার যদি নতুনভাবে জীবন শুরু করে নিতে পারতাম, সেই জীবনেও তুমিই হতে আমার প্রথম স্ত্রী।”
“আমার ভেঙে পড়া ভরসাহীন জীবনে তুমি ছিলে শিশিরকণা। আমার সব নেগেটিভ চিন্তাকে তুমি শেষ করে আমার অন্তরে জায়গা করে ফেলেছ। আমি হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর তোমার হাতটা ছাড়তে পারবো না।
তুমি ছিলে আমার প্রতিটি কাজে। কখনো এটা বলোনি যে, এই কাজের জন্য তোমাকে লজ্জায় পড়তে হতে পারে। আজ আমি অনেক বড় বুটিকসের দোকানের মালিক, শুধু তোমার আর আমাদের সন্তানের জন্য।
তুমি আমার বেরঙিন ঘরকে যখন প্রথমবার এসেই পাকা গিন্নির মতো গুছিয়ে দিয়েছিলে, আর আমি কাজ হারিয়ে ক্ষুধার্ত পেটে ঘরে ঢুকেছিলাম, তখনই মনে হয়েছিল এই দুনিয়ায় মধুর সম্পর্ক ছিল পবিত্র স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। নিজ হাতে যখন তুমি পানি এগিয়ে দাও, তখন নিজের কষ্টকে কিছুই মনে হয় না আমার।
আমি বুঝেছি, ভুল মানুষ আসে। তারা আসে মানুষ চেনাতে। আর কিছু মানুষ আসে সঠিক হয়ে, ভুল থেকে ফুলকে চেনাতে।”
—— সমাপ্তি ——
