#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৫||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা
পুরো ড্রইং রুম অন্ধকার রেখে দুই ভাই-বোন মিলে মুভি দেখা শুরু করেছে। দুইজনের চোখ টিভির পর্দায়। এই তো শুরুর দিকে মাত্র মুভিটি। কাফেল সোফার উপরে বসে আছে, আর দৌরুতি নিচে। কাজের মেয়ে জামিয়া এসে এক বাটি পপকর্ন দিয়ে চলে গেল, আর তার সাথে ফলের জুস। জামিয়া খালা ঘর থেকে যাওয়ার পথে অবশ্য বিরবির করে বলেও গেলেন,
-“মাগো মা, এমনে করে কেউ ঘর অন্ধকার কইরা ভূতের সিনেমা দেখে? আমার তো ঘরে অন্ধকার দেখেই ভয় করতাছে।”
অনেক সময় পার হয়েছে দেখে দৌরুতি কাফেলের প্যান্ট ধরে একটা টান মারে।
কাফেল দাঁত কেলিয়ে দৌরুতির দিকে তাকিয়ে বলে,
-“দেখ দেখ, এইবার বেশ মজা পাবি মুভি দেখে।”
দৌরুতি আরো একবার টান মারলো। তা দেখে কাফেল আবার বললো,
-“টানাহেঁচড়া করিস কেনো?”
দৌরুতি ইশারা করে বলতে লাগলো যে,
-“মেয়েটা কে? যার জন্য সে এত খুশি?”
কাফেল দৌরুতির কাছে সুরুত করে নেমে তার পাশে বসে তার হাত ধরে বললো,
-“আমার একটা সাহায্য কর। বাবাকে বলে আমাকে দেশের বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দে। আমি বাইরে যেতে চাই এবং ওইখানে গিয়ে তাকে বিয়ে করে সেটেল হবো। আসলে মেয়েটা ওর ফ্যামিলির সঙ্গে কানাডায় থাকে, আর তুই তো জানিস বাবা আমাকে কখনো সেখানে যেতে দিবে না। হাজার খানেক কথা শুনাবে, বলবে আমার মাথা গরম, আমি ছোট, আমার রক্ত গরম, আমি এসবের যোগ্য না। আসলে তুই বুঝতে পারছিস দৌরুতি, আমি কি বলতে চাইছি? আমি চাই তুই বাবাকে বলবি আমি কাজের জন্য যাবো, দেশের বাইরে, নইলে সে যেতে দিবে না।”
কথাগুলো বলেই কাফেল টিভির দিকে আবার ঘুরে তাকিয়ে রইল। দৌরুতি কাফেলের দিকে ইশারা করে বললো,
-“তুই বলছিস আমি বাবাকে মিথ্যা কথা বলবো?”
আবার কি যেনো ভেবে দৌরুতি কাফেলের কাঁধে মাথা রেখে ইশারায় বুঝিয়ে দিলো,
-“বাড়ি থেকে সে-ও বাকি ভাইদের মতো তাকে একা করে চলে যাবে? অন্ততপক্ষে এটা বলুক যে মেয়েটা কে ছিল?”
বেশ মনমরা হয়ে কথা গুলো বললো সে।
কাফেল তখন বললো,
-“এসবের মধ্যে সে আর যেতে চায় না। আর বিয়ে করলেই তো জানতে পারবি। তবে দৌরুতি যেন নিজেকে একা না মনে করে। তার সঙ্গে তার তিন ভাই আছে, তার দেখভাল করার জন্য। সে কিন্তু এই বাড়ির রাজকন্যা। কেউ যদি তাকে ধোঁকা দেয়, তাহলে কিন্তু তাঁরা তিন ভাই তাকে তার অবস্থান বুঝিয়ে দেবে। এটা যেন সে মাথায় রাখে। আর হ্যাঁ, তুই একটু বাবাকে বলিস, বাবা তোর কথা খুব মানে।”
দৌরুতি খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো কাকে এই কথাগুলো বলা হচ্ছে।
দুই ভাই-বোন আর কিছু না বলেই টিভির দিকে চোখ রাখলো।
একটু পর দরজা খোলার আওয়াজ পেতেই দুজন মিলে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ একজন আস্তে আস্তে হেঁটে আসছে। তা দেখে দৌরুতি কাফেলের শার্ট খামচে ধরলো। কাফেলেরও ভয়ে কপালে ঘাম জমে গেছে। টিভিতে ভূতের মুভি, আর দরজায় জলজ্যান্ত ভূত, বাপরে, ভয় করবে না!
একটু পর কেউ বললো,
-“আমি কি ভিতরে আসতে পারি?”
পরক্ষণেই গলার স্বর শুনে চিনে ফেললো দৌরুতি, এটা আর কেউ নয়, তৌকির আহমেদ। তার বিবাহিত ভূত।
ঘরের লাইট জ্বালানো হলো সাথে সাথে। তৌকির দৌরুতি ও কাফেলের কাছে আসলো। আর তাদের অবাক করে দিয়ে নাক চুকিয়ে বললো,
-“আমিও কি তোমাদের সঙ্গে বসে মুভি দেখতে পারি?”
দৌরুতি কাফেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাফেল দৌরুতির দিকে তাকিয়ে বললো,
-“আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমাতে যাবো। তোমরা দেখো, আমি আসি।”
কাফেল কিছুটা ইগোর সঙ্গে চোখ বেঁকিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো সে।
তা অবশ্য তৌকির এর চোখ এড়াতে পারলো না।
দৌরুতির হাত কাঁপছে, ভিতরে একটা আনন্দও খুশি সব কাজ করছে। দৌরুতি ইশারা করে কাঁপা হাতে বললো,
-“সে দূর থেকে এসেছে, পোশাক পরিবর্তন করে আসুক।”
তৌকির তার কথা বুঝতে পেরে সেখানেই নিজের পরনের শার্ট খুলে রেখে দিল সোফায়। আর দৌরুতিকে বউয়ের মতো করেই হুকুম দিয়ে বললো,
-“শার্টটা ঘরে যেন রেখে দেই।”
দৌরুতি লক্ষ্মী বউয়ের মতো মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তৌকিরের পরনে শুধু সাদা একটা গেঞ্জি আর প্যান্ট ছিল।
দৌরুতি তৌকিরকে সোফায় বসতে ইশারা করলো। তারপর নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসলো। জামিয়া খালা চা বানানোর সময় তার দিকে আহ্ মুখে তাকিয়ে ছিল। বেশ লজ্জায় লাল মুখ হয়ে আছে, এটাও চোখে পড়লো। দৌরুতির যাওয়ার পথে তাকিয়ে ছিল সে।
চা এনে তৌকিরের সামনে রাখলো। তারপর এমন করে দাঁড়িয়ে থাকলো যেন এটা তার বাপের বাড়ি না, শ্বশুরবাড়ি, স্বামী অনুমতি দিলে সে বসবে।
তৌকির তাকে চোখের ইশারা করে পাশে বসতে বললো।দৌরুতি কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তৌকিরের পাশে বসলো। তৌকির মুভির দিকে তাকিয়ে বললো,
-“এই মুভিগুলো দেখে এত ভয় পাওয়ার কি আছে বুঝলাম না। গাঢ় মেকআপ, চোখে-মুখে রং, তার সঙ্গে ভিন্ন রঙের কন্টাক্ট লেন্স। পোশাক কালো, দেখতে আজরাই ভাব লাগলেও ভয়ের কিছু না।”
দৌরুতি তৌকিরের দিকে থতমতিয়ে তাকিয়ে রইল।
ইমোট হাতে তুলে নিয়ে মুভি বদলিয়ে দিল তৌকির।
তৌকিরের চোখ টিভির দিকে থাকলেও হাত দিয়ে দৌরুতিকে নিজের কাছে টেনে নিল। দৌরুতির চোখ মার্বেলের মতো বড় হয়ে গেল। গলায় ধুকপুক করছে কিছু একটা।
তা অবশ্য তৌকিরের চোখ এড়ায়নি। তৌকির সামনে টেবিলে রাখা জগ থেকে পানি ঢেলে দৌরুতিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
-“খেয়ে নিয়ে রুমে এসো, তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার।”
একের পর এক অবাক করে দেওয়া ব্যাপার স্যাপার ঘটছে তার সঙ্গে। ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’, অপ্রত্যাশিতভাবে কাছে টেনে নেওয়া, স্বামী কি তার পাগল হয়ে গেল নাকি?
তৌকির আর দেরি না করে ঘরের দিকে চলে গেল। দৌরুতিও তার পেছন পেছন যেতে শুরু করলো।
ঘরে প্রবেশ করেই দেখলো,
তৌকির ওয়াশরুমে চলে গেছে। তা দেখে দৌরুতি খাটের পাশে আলগোছে বসলো। নিজের ঘরের সবকিছু যেন তার হজম হচ্ছে না আজ। যা পাবে বলে কল্পনা করেনি, তাই হয়তো হতে চলছে তার সঙ্গে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই তৌকির ওয়াশরুম থেকে মাথার কোঁকড়ানো চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসলো। আর বললো,
-“আমার জন্য কি রান্না করা হয়েছে? সকালে ব্যস্ত থাকায় কিছু খেয়ে যেতে পারিনি। কিছু রান্না করেছো?”
দৌরুতি তো কিছুই আর রান্না করেনি তা মনে হতেই ঘর থেকে ছুটে বেরোতে যাবে, ঠিক তখনই তৌকির তার হাত ধরে টেনে এনে খাটের পাশে বসিয়ে বললো,
-“আচ্ছা, এত ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। আমার কিছু কথা ছিল তোমাকে বলার।”
দৌরুতি কৌতূহলী হয়ে তৌকিরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তৌকির আর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। সে বলতে শুরু করল ,
-“আমার বোন জেসমিন তোমাকে দেখতে চায়। যদিও আমি মনে করি, তোমার মতো বড় ঘরের মেয়ে ওই সস্তা হাসপাতালে নাও যেতে পারো। তবে আমার খুব করে অনুরোধ থাকবে, একবার যেন কাল আমার সঙ্গে যাও, আমার বোনকে দেখতে।”
দৌরুতি ইশারা করে বললো,
-“সে এমন করে কেন বলছে? তার বোন মানে তো দৌরুতির বোন। সে অবশ্যই দেখতে যাবে।”
তৌকির আর কিছু বললো না। আবার আগের মতো মাথা নিচু করে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়লো।
দৌরুতি তাকে একবার ইশারা করে বললো,
-“সে খাবার খাবে না?”
তৌকির দৌরুতির মতো করেই হাতের ইশারায়ই বুঝে তাকেও ইশারা করে পাশে শুতে বললো।
দৌরুতি গিয়ে তার পাশে শুয়ে পড়লো। এর মধ্যে কোলবালিশ রাখা ছিল। তৌকির কোলবালিশ সরিয়ে রেখে দৌরুতিকে আরো একবার কাছে টেনে নিল।
আর মনে মনে তৌকির বললো,
সবকিছুর একটা সমাপ্তি দরকার আছে। এখন নয় অভিনয়, কাল নয়, সত্যি। এছাড়া উপায় নেই আমি দেখছি না।
চলবে……
