#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৪||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা
এটা কি ধরনের ভাষা জয়নাল? বস্তিদের বাড়িতে তুলে এনে দেখি তোমার ভাষাও বস্তিদের মতো হয়ে গেছে। আর মেয়েটাকে কী করে এই অভদ্র ছেলেটার সঙ্গেই ডুবিয়ে দিলে তুমি? ভুলে যাবে না তুমি, দৌরুতি কিন্তু আমারও মেয়ে।
আলফা খানম যখন “আমার মেয়ে” বললো,
তখন যেন আরও রাগ উঠে গেল জয়নাল শেখের মাথায়। কী করে সে বলতে পারলো যে দৌরুতি তার মেয়ে! আজ পর্যন্ত তো তার ভালো-মন্দের দেখভাল সে কখনোই করেনি। শুধু দৌরুতি না, বাকি আরও তিন ছেলে সন্তানের ও তার এমন অবহেলার শিকার হতে হয়েছে।
জয়নাল শেখ এক সময় আলফা বেগমকে খুব ভালোবাসতেন। তখন তার এমন আচরণ চোখে পড়তো না। নিজের কাছেও বাস্ত মনে হতো তাকে। সে সব দেখে জয়নাল শেখ, পুরুষ মানুষ হয়েও, মহিলাদের মতো করে বাচ্চাদের আগলে রাখতেন। আস্তে আস্তে যেন এই ধরনের আচরণ বাড়তে শুরু করলো। টাকা-পয়সা, সুখ পেলেও বাড়িতে যেন শান্তি নামক সুখ উঠে গেছে। এখন নামের স্বামী-স্ত্রী তারা বলা যায়। সমাজের চোখে টিকে থাকা এক মিথ্যা সম্পর্ক তাদের। ছেলে-মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তারা এই সম্পর্ক রাখছে।
নয়তো কবেই সব শেষ হয়ে যেত।
জয়নাল শেখ রক্তিম চোখে আলফা খানমের দিকে তাকিয়ে রইল।
তা দেখে আলফা খানম আর কিছু না বলে উঠে নিজের কাজের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।
বাড়ির কাজের মেয়েটা জয়নাল শেখের কাছে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
-“বাবু মশাই, পাতিলে পান্তা ভাত রাখছি, খাইবেন?
আনবো? দৌরুতি মুনির রান্না দেখে রান্না করতে ভুলে গেছি গা, আনুম ভাত?”
জয়নাল শেখ আরও রেগে চেঁচিয়ে উঠে বললো,
-“জামিয়া, সরে যা বলছি!”
জামিয়া খালা বলল,
-“বাপুরে বাপুরে, খারাপ কী কয়লাম!”
মনে মনে বিড়বিড় করে আরও বললো,
-“ঘরের বউয়ের উপর কথা কয়তে পারে না, আমার লগে চেঁচামেচি করে! মাইয়াডার বিয়ে দেয় খালি। এই বাসায় আমি আর কাম করতে কখনো আমুনা, পা ধরলেও আমুনা!”
———————
পিক পিক আওয়াজ হচ্ছে। বেডে মেয়েটা, তার শরীরে স্যালাইন চলছে, হাতে ক্যানোলা লাগানো। চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে মেয়েটার।
পাশেই তসবিহ হাতে এক যুবক নামাজ পড়ছেন, জায়নামাজ সরিয়ে রেখে মেয়েটার কপালে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে বললো,
-“এই যে ছোট বোন জেসমিন, তুমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে তোমার নতুন ভাবিকে দেখতে যেতে পারবে। মাশাআল্লাহ, আল্লাহ তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি ভালো করে দিবেন।”
কথা বলা শেষ হতেই কেউ দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে বললো,
-“সজিব, মাফ কর, আজ একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে। কী আর বলবো বল, আজ রেস্টুরেন্টে অনেক কাজ ছিল। ওরা তাড়াতাড়ি আসতে দিল না আমায়।”
ঠিক তখনই কথায় আওয়াজ শুনে পিছন ফিরে সজিব তৌকিরের দিকে তাকিয়ে বললো,
-“আল্লাহ আল্লাহ! এসব কী বলছিস? আমরা না বন্ধু! আর জেসমিন তো আমারও বোন হয়, তাই না? যদিও আমারও কাজ আছে, তাই বলে এমন বলবি? তা তোরা আগে, না আমার কাজ আগে, বল তো?”
তৌকির সজিবের কাছে গেলো আর জেসমিনের দিকে একটু তাকালো। জেসমিন তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে দিলো।
সজিব ও তখন কাছে গিয়ে দোয়া পড়ে তৌকিরের মাথায় ফুঁ দিল।
তৌকির তখন বললো,
-“আজ একটু বেশিই জেসমিনের চেহারা ফ্যাকাশে লাগছে। ডাক্তার কি এসেছিল?”
সজিব তৌকিরের দিকে তাকিয়ে বললো,
-“হ্যাঁ, দেখে গেছে। আর তুই জানিসই তো,আর নতুন কিছু ডাক্তারদের মুখে শোনতে পারবি না। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, তুই ওর সাথে কথা বলে আয়। তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল।”
বলেই সজিব বাইরে চলে গেল।
তৌকির জেসমিনের পাশে গিয়ে বসলো, তারপর তার হাত ধরে কপালে আরেক হাত দিয়ে বুলিয়ে দিল।
জেসমিন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললো,
-“ভাই, তুমি বলেছিলে আমি ভালো হয়ে ভাবিকে দেখতে যাবো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি যেতে পারবো না। আমি চাই ভাবিকে দেখতে। তাকে আমার কাছে আসতে বলো। আমি দেখা করবো। রাতে আমার অনেক শরীর যন্ত্রণা করে ভাই, মাথা ব্যথা করে। কিছু একটা আমাকে ডাকতে আসে বারবার। আমি তাকে ফিরিয়ে দেই। স্বপ্নে দেখি আমি সাদা রঙের একটা জামা পরে প্রচণ্ড হাওয়ার মাঝে মিলিয়ে যাচ্ছি। তুমি কাঁদছো, তোমার চোখে পানি। আমি হাত দিয়ে তোমার গাল স্পর্শ করতেই মা-বাবা এসে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো না ভাই। মা-বাবার সাথে গেলে তুমি একা হয়ে যাবে।”
তৌকির জেসমিনের কথার কী উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। কণ্ঠনালিতে কথারা ব্যথা দিচ্ছে। প্রতিটি শব্দ গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে।
তৌকির তখন চোখ নিচু করে বললো,
-“কাল তোমার ভাবি আসবে তোমাকে দেখতে। আর হ্যাঁ, কখনো এমন কথা বলবে না। এতটুকু মেয়ের মুখে এমন কথা মানায় না। কিছু হবে না তোমার।”
বলেই আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না সে, বেরিয়ে গেল।
বাইরে সজিব দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনের চোখাচোখি হতেই তারা একসাথে হাঁটতে শুরু করলো।
সজিব সময় নিয়ে বললো,
-“কিরে, মন খারাপ করে আছিস কেন? আজকে কি আবার ভাবিকে দেখতে চেয়েছিল জেসমিন?”
তৌকির শুধু “হুম” বললো।
সজিব আবার বললো,
-“তাহলে নিয়ে আসছিস না কেনো একবার দেখা করাতে? শুন, বিয়ে যখন করেছিস, তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দে। দূরে সরে রাখিস না।”
তৌকির তারপর বললো,
-“তুই সব জানার পরেও বলছিস! তুই তো জানিস আমার সাথে কী কী ঘটেছে। এত বড় ঘরের মেয়ে কি আমার মতো ছেলের সঙ্গে মিশতে পারবে? আমি তো তার নখেরও যোগ্য না। আমি তাকে হয়তো আমার জীবনে স্থান দিতে পারবো না।
আবার আমি ভয় করছি,এই স্ত্রীই না আবার অস্ত্র হয়ে আমার শরীর ভেদ করে দেয়! আমি আর বউ, অর্ধাঙ্গিনী,এই সবকিছুতে বিশ্বাস করতে পারি না।”
সজিব বললো,
-“আচ্ছা, তুই মেয়েটাকে কতদিন ধরে চিনিস? হতে তো পারে, মেয়েটা যেমন ভাবছিস তেমন না। আর বিয়ের পর তুই তাকে কতটা সময় দিয়েছিস? দেখ, সব মেয়ে একরকম না। যদি সব মেয়ে খারাপ হতো, তাহলে আমরা কখনো ভালো মা বোন পেতাম না, ভালো স্ত্রীও না। তুই ভাব, তোর ভাবি কেমন? মানে আমার স্ত্রী সে তো কখনো এমন করেনি।
কখনো কারো নফসে সমস্যা থাকে। সবাই খারাপ না, আবার সবাই ভালোও না। তুই কখনো কারো কাছে সমান হতে পারবি না। তাই বলছি, মেয়েটাকে একটু সময় দিয়ে দেখ।”
তৌকির আর কিছু না বলে দু’জনে মিলে বাইরে চলে গেল।
———–
কাফেল হাসিমুখে দৌরুতির ঘরে ঢুকে দেখলো, দৌরুতি ইতিকে খাঁচার মধ্যে খাবার দিচ্ছে। খাবার দিয়ে পিছন ফিরতেই সে কাফেলের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বললো,
-“সে এখানে কেন এসেছে?”
কাফেল হেসে বললো,
-“চল, আজ দুইজন মিলে মুভি দেখি।”
দৌরুতি ইশারায় বললো,
-“রাত অনেক হয়েছে, এই সময়ে না।”
কাফেল আবার হেসে দিয়ে বললো,
-“এই সময়েই তো বেশি মজা! মনে আছে ছোটবেলার কথা? চার ভাইবোন মিলে ভুতের মুভি দেখতাম। তুই কত ভয় পেতি! চোখ বন্ধ করে আবার আঙুলের ফাঁক দিয়ে সব দেখতিস! শেষ পর্যন্ত কি হয় তার অপেক্ষায়।”
দৌরুতি মৃদু হেসে ইশারায় বললো,
-“হঠাৎ এই সখ জাগলো কেন? কারো প্রেমে পড়লি নাকি? আগে তো বোনের কথা এতো মনে পড়তো না।”
দৌরুতি কাফেল এর এমন আচরণ এর মানে বুঝতো।
সে খুব খুশি হলে টুপ করে দৌরুতির কাছে এসে এই আবদার টুকু করতো সে। আজো ব্যাতিক্রম নয়।
কাফেল দৌরুতির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,
-“ধরে নে তেমন কিছু। এখন নিচে চল।”
বলেই দৌরুতির হাত টেনে নিচে নিয়ে গেল।
চলবে……..
