#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৭ + ৮||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা
দৌরুতি বাড়ি থেকে আসার পথে তৌকিরকে ইশারায় একবার বলেছিল যে, সে যেন প্রাইভেট কারে করে যায় বাড়ির গাড়িতে। কিন্তু তৌকির দৌরুতিকে মুখের উপর মানা করে দেয় আর বলে, সে যদি তার সঙ্গে যায়, তো তার সাথে সে যেখানে করে নিয়ে যাবে ঠিক সেখানেই চড়ে যেতে হবে তাকে। দৌরুতি আর কিছু বলে না। দৌরুতি তারপর থেকে পুরো রাস্তায় একদমই চুপ হয়ে যায়। এবং চুপচাপ কোনো কথা ছাড়াই চলে সে।
তারপর একটা রিকশা করে সোজা হাসপাতাল চলে যায় তারা। জেসমিন যে কেবিনে ভর্তি আছে সেই রুমে চলে যায় দুইজনেই। দৌরুতি তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে।
কেবিনে গিয়ে যা দেখে তা দেখার জন্য দুইজনেই প্রস্তুত ছিল না। জেসমিনের মুখে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। পাশেই সজিব দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ হয়ে। সজিবের চোখ লাল হয়ে গেছে। তৌকিরের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল যেন। সে আস্তে আস্তে জেসমিনের কাছে গিয়ে তার মুখ থেকে সাদা কাপড় সরিয়ে দিল। সজিব তৌকিরকে তার পেছন থেকে বলল,
– “আজকে দুপুর এগারোটা থেকে ধরে বারোটা পর্যন্ত তোকে অনেক ফোন করছি। ফোন বন্ধ দেখাচ্ছিল বারবার। জেসমিন দুপুর বারোটার দিকে ইন্তেকাল করেছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। নিজের দুই হাত দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে নেয় সে। মেয়েটাকে যে বোনের মতো ভালোবেসেছিল সে, সে ভাবতেই পারছে না এতো অল্প বয়সে দুনিয়া ছাড়বে সে।
তৌকিরের চোখ নোনা পানিতে ভরে গেছে। সজিব যে তাকে এত কথা বলল, সেই কথা গুলো যেনো তার কান অব্দি গেল না। সবকিছু থমকে দাঁড়িয়ে গেছে যেন তার কাছে। দরজায় দৌরুতি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কল্পনাও করতে পারেনি হঠাৎ করেই এত খারাপ সময়ের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। দৌরুতির কণ্ঠ থেকে আওয়াজ না আসলেও চোখ দিয়ে অনবরত টুপটুপ করে পানি পড়ছে।
একটু পর কিছু ডাক্তার এসে সজিবকে কী যেন বলল, সেই দিকে দৌরুতি ও তৌকিরের মধ্যে কারোরই খেয়াল নেই।
তৌকিরের কানে কোনো প্রকার আওয়াজ যাচ্ছে না। একটা কথাই বারবার বাজতে শুরু করে, জেসমিন ইন্তেকাল করেছে। ছোট বোনের হাত শক্ত করে ধরতেই গুটিকয়েক লোক এসে তাকে নিয়ে গেল। মনে হলো এই বুঝি পাখি উড়াল দিল আপন ঘরে। ধপাস করে নিচে বসে পড়ল তৌকির। শরীরের সব শক্তি যেন হারিয়ে গেছে তার। তা দেখে দৌরুতি ছুটে গেল তৌকিরের কাছে। সেও তার সঙ্গে নিচে বসে পড়ল তৌকিরের পাশে, তৌকিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে। তৌকির দৌরুতিকে আর সরিয়ে দিল না। দৌরুতিকে ধরেই সে গলা ছেড়ে কান্না করতে করতে বলল,
-“আমি আমার বোনকে শত চেষ্টা করেও ধরে রাখতে পারলাম না। আমার বোনের ভাগ্য খুব খারাপ, সে সবার কাছে বোঝা হয়ে থেকেই গেল। আমি তার শেষ কথাটুকুও রাখতে পারলাম না।”
দৌরুতিও নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলতে থাকল। তৌকিরকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে।
ওই দিকে সজিব জেসমিনের মৃত লাশের সঙ্গেই বেরিয়ে গেল। তাকে তো দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের মধ্যে কেউ এটা আশা করেনি যে জেসমিন তাদের রেখে এত তাড়াতাড়ি পরপারে পাড়ি জমাবে।
————–
দুপুর শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামতেই জানাজার ব্যবস্থা করা হলো। অনেক সময়ের পরেও যখন কেউ বাড়িতে ফিরছিল না, ঠিক তখনই জয়নাল শেখ তৌকিরকে ফোন করে। আর সেই ফোন সজিব কানে ধরে সবকিছু খুলে বলাতেই কাফেলসহ জয়নাল শেখ চলে আসে এবং কাটিয়া ধরে। সজিব ও তৌকির সামনের কাটিয়া ধরে নিয়ে যায়, পেছনে দুই বাপ-ছেলে ছিলো।
কবর দেওয়ার পরে তারা বাড়িতে কোনো মতে ফিরে আসে। আল্লাহ কখন কাকে ডেকে নেবে এটার সঠিক সময় হয়তো কেউ জানে না। একদিন সবাইকে দুনিয়া ছাড়তে হবে, তাও আবার একা একা।
বাড়িতে ফিরেই তৌকির দৌরুতিকে বলে দেয়, -“একদিনের জন্য যেন সে তাকে একা ছেড়ে দেয়।”
তারপর তৌকির ঘরে ঢুকেই নিজের কিছু জামাকাপড় গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তা সবকিছু দৌরুতি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল, কিন্তু কিছু বলতে পারছিল না। তৌকির বাইরে যেতেই দেখল, সজিব রিকশা নিয়ে বসে আছে। রিকশায় দুইজন চেপে কোথাও চলে যায়।
জানালার মুখ থেকে ফিরতেই আলফা খানমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। দৌরুতি ভ্রু কুঁচকে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কেন সে এইখানে হঠাৎ করে?
কখনো তো তিনি ভাবতেনই না যে উপরের ঘরে তার একটা বোবা মেয়ে বসবাস করে।
আলফা খানম মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
-“এমন করে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছো যেন মা তোমার শত্রু। ব্যাপার কী বলো তো?”
দৌরুতি কিছু ইশারায় বলল না। পাখির খাঁচার কাছে গিয়ে ইতিকে কিছু দানা খেতে দিল।
তা দেখে আলফা খানম নিজ থেকেই বলল শুরু করলো,
-“তোমার গরিব স্বামী তো ঘর ছেড়ে চলে গেল। আমার ভয় করছে এই ভেবে যে তোমাকে বস্তুর মতো ব্যবহার করে না ফেলে রেখে চলে যায়। মা হয়তো একটু বেশিই চিন্তা করি তোমার জন্য।”
দৌরুতি এবার খুব বিরক্ত অনুভব করল তার মায়ের কথা শুনে। আজ পর্যন্ত যে মা কখনো এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেনি, “তুমি ঠিক আছো?” আর আজ নাকি তার জন্য চিন্তা করছে! খুব হাস্যকর লাগল কথাটি তার কাছে।
মায়ের কাছে গিয়ে ইশারায়ই বলল,
– “সে যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায়, এই দৌরুতি কখনো তার হাত ছাড়বে না। খুব শক্ত করে ধরবে তার হাত। আর কখনো কেউ তাদের আলাদা করবে না। কেবল তো শুরু হয়েছে। এটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হবার নয়। পাঁচ-দশটা নাতি-নাতনি দিয়ে তাকে অবাক করে দেবে তারা।”
আলফা খানম মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে বাঁকা হাসি হেসে চলে গেল। যাওয়ার পথে অবশ্য বলে গেল,
– “এই রাস্তার ছেলে গুলো আবার রাস্তায় ফিরে যাবে। তাদের কাছে টাকা সব। ওরা টাকার পেছনে ছুটে চলা মেশিন, তোমার মায়ের মতো। দেখবে, তোমাকেও একদিন ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে, এটা তোমার মায়ের গ্যারান্টি দেয়া কথা।”
“আর হ্যাঁ, সব সময় যে বাবার কথা শুনেই চলতে হবে এমন কিন্তু না। মাঝে মধ্যে মায়ের কথাও তোমার শোনা উচিত। মা কিন্তু তোমার খারাপ চায় না, দৌরুতি।”
দৌরুতি মায়ের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। সে মন থেকে বিশ্বাস করে তৌকির তার বিবাহিত স্বামী। এই কয়দিনে তার প্রতি বিন্দু পরিমাণ হলেও মায়া জন্মেছে। সে আরো বিশ্বাস করে, একদিন দৌরুতি তৌকিরকে তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে নিজের করে নেবে।
একটু পর কাফেল ঘরে চলে আসে আর দৌরুতিকে বলে,
– “তৌকির কি যেনো ওই ছেলেট, তোর স্বামী যাই হোক ওর বন্ধুর বাড়িতে আছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে চলে আসবে। আর হ্যাঁ, ছেলেটা তোকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে বলেছে। সে আমাকে বলল, সে শুকনা বউ একদমই পছন্দ করে না।”
কথাগুলো বলেই দৌরুতির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো কাফেল। দেখল বোনের চোখ লাল হয়ে আছে। চোখভর্তি পানি জমে গেছে। তা দেখে কাফেল নিজের মতো করে বলল,
-“আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবি দৌরু? আমার বুকে ব্যথা করছে, একটু ধর।”
দৌরুতি বুঝতে পারল কাফেল তার মনের কথা নকল করেই বলছে। তাই সে ভাইকে ঝাঁপটে ধরে কেঁদে দিল। কাফেল জানে, মায়ের সঙ্গে কথা বললেই তার মন খারাপ হয়ে ওঠে। মা তার সঙ্গে মন খারাপ করে দেওয়ার মতোই কথা বলে চলে যায়। তাঁর শক্ত বোন শুধু তার মায়ের কথা শুনে ভেঙ্গে পড়ে।
একটু পর কাফেলের বুক থেকে মাথা তুলে দৌরুতি ইশারা করে বলল,
-“একটু আগে যে কথাগুলো সে বলল, ওইগুলো কি আসলে সত্যি? তৌকির এমনটা বলেছে তাকে?”
কাফেল শুধু হ্যাঁ বলল।
চলবে…….
#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৮||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা
এই দুই তিন দিনের মধ্যে কাফেল জয়নাল শেখকে অনেক বার বুঝিয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করেছে। তাঁকে যেন যেতে দেওয়া হয় কানাডায়। জয়নাল শেখ উল্টো তাঁর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। আর এইও বলে দিয়েছে, ফালতু সবের জন্য তার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই।
কাফেলে তার বাবা জয়নাল শেখের উপর বেশ বিরক্ত হয়। কিন্তু মুখের উপর কিছুই বলতে পারে না সে। হয়তো বললে ছোট ভাইয়ের মতো একেবারের মতো ঘরছাড়া হতে হবে। দৌরুতিকেও কিছু বলতে পারে না সে। মেয়েটা মনমরা হয়ে ঘরের মধ্যে থাকে সবসময়। বাইরে কম বের হয়। কারো সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলে না।
তাই আর কাফেল এই সব নিয়ে বোনকে কিছু বলতে পারে না। যদিও কাফেলের খুব বিশ্বাস যে দৌরুতি পারবে বাবাকে রাজি করাতে, কিন্তু মেয়েটা নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখে দিয়েছে।
বাড়ির কাজের লোক প্রতিদিন তিন বেলা ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে আসে দৌরুতিকে। কিন্তু কোনো সময়ই খাবার প্লেটে পড়ে থাকে, যেমন দেয় ঠিক তেমনই। মন চাইলে খাই নয়তো না। শরীর এর দেখভাল করতেও সে যেনো ভুলে গেছে।
——–
জানালা খোলা দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করেছে। সকালের মিষ্টি আলো সোজা এসে দৌরুতির চোখে পড়লো। আজ দিয়ে চার দিন হয়ে গেছে তৌকির আসেনি বাড়িতে। প্রতিদিন প্রতি ঘণ্টা মিনিটের মতো দরজা তাঁর জন্য খুলে রেখে দিয়ে তাকিয়ে থাকে কখন আসবে সে। এখন তো আশাও ছেড়ে দিয়েছে।
মনে মনে অনেক কথা বুনে ফেলেছে সে। এই যেমন, সে ভাবে ও মনে মনে বলে,
-“তৌকির সাহেব, হয়তো আপনি জানেন না।
এই ঘরের চারটা দেয়াল আমার ছোটকালের সঙ্গী। আপনি চলে গেলে ভয় পাবো না। ভয় পাওয়া শব্দটা আমার জন্য মৃত। তবে নিজেকে খুব কঠিন করে একা করে ফেলবো। আবার ফিরে যাবো বন্দি স্তরে।”
আপনাকে হারানোর ভয় আমি পাই না, তবে নিজেকে খুব একা আর দুর্বল মনে হয়। আমি সবার কাছে মনে হয় তামাশার পাত্রী হয়ে যাচ্ছি।”
এই সব ভাবতে চোখের কোণে জল জমতে শুরু করলো তার।
নিজের মনে মনে এমন হাজারো কথা বলতে থাকে সে। আজও জানালার পাশে চেয়ারে বসে বাইরে বকুল ফুলের গাছটার দিকে তাকিয়ে রইল। আর তার চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়লো সে। কিন্তু হঠাৎ করে বাইরে থেকে প্রচুর চেঁচামেচির আওয়াজ আসতেই দৌরুতি সেই দিকে ছুটলো।
উপরের ঘর থেকে নিচে নেমে আসতেই দেখলো, আলফা খানম ও তৌকির একে অপরের সঙ্গে রাগারাগি করছে। ভীষণ রকমের ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বাবা জয়নাল শেখ। সবে সকাল সাতটা বাজে তখন।
আলফা খানম বেশ লজ্জাজনক কথা বলছে তৌকিরকে। এই যেমন,
-“এটা কি বাপ-দাদার হোটেল রুম পেয়েছো? যখন ইচ্ছা আসবে, আবার দুই তিন দিনের জন্য হারিয়ে থাকবে! এই সব যত চোরদের তো কোনো গ্যারান্টি নেই। কখন কী আবার চুরি করে নিয়ে বাড়ি থেকে ভাগবে! প্রথমে তো বোনের নাম দিয়ে প্রচুর পরিমাণে অর্থ খরচ করিয়েছে। এখন আবার নাটকীয় কথা শুনাচ্ছে। রোজগার করে সব টাকা পরিশোধ করবে! তোমাদের মতো ছেলেদের খুব ভালো করে জানা আছে আমার। বাপ-দাদার আমলেও তো মনে হয় এত টাকা দেখেনি চোখ দিয়ে। আবার লাফ দিয়ে করলো কী, বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করে ফেললো। কত চালাক এই ছেলেটা! মনে মনে যে তোমাদের মতো ছেলেরা কত ফন্দি আঁটে, তা আমি খুব ভালো করে জানি।”
কথাগুলো শুনে তৌকিরের মাথা নিচু হয়ে গেল। সে বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই এই মহিলা তাঁকে একের পর এক অপমান করছে। কিন্তু তাঁর কাছে এই কথাগুলো শোনা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সত্যি তো, সে কি বেইমানি করে ফেললো না? নিজের বোনকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আরো একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিল সে। আর সে কখনো ভেবেই দেখলো না, আদৌ মেয়েটাকে কি তার অন্তরে স্থান দিতে পেরেছে কি না।
এগুলো ভাবতেই তার মুখের শব্দগুলো হারাতে শুরু করলো। শান্ত কণ্ঠে মাথা নিচু করে বললো,
-“আমাকে মাফ করবেন। কিন্তু আমার এসবের কিছুর লোভ নেই। আমি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। আর রইলো টাকা, হয়তো সব টাকা একবারে দেওয়া আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তবে আস্তে আস্তে দিয়ে দিবো। আমাকে একটু সময় দিবেন।”
দৌরুতি মায়ের সামনে দাঁড়াতেই আলফা খানম চুপ হয়ে গেলেন। দৌরুতি তৌকিরের মাথা উঁচু করে তুলে তাঁর মায়ের হাত খামচে ধরে ইশারায় বললো,
-“এই বাড়িটা আমারও। এখানে আমার সমান অধিকার আছে। তবুও আমিও আমার স্বামীর সঙ্গে এই বাড়ি ছাড়তে চাই।”
রাস্তায় বাস করা মানুষদের সঙ্গে থাকা যায়, কিন্তু কোনো অহংকারী মানুষের মধ্যে এবং তাদের সঙ্গে নয়, তা দৌরুতির নখের আঁচড়ের ভাষাই বলে দিচ্ছিল।
ওই দিকে জয়নাল শেখ বারবার তাদের ঝগড়ার মধ্যে সতর্ক করার পরেও যখন আলফা খানম একের পর এক অপমান করছে তৌকিরকে, ঠিক তখনই কান বরাবর একটা থাপ্পড় মেরে বসলো তিনি। থাপ্পড় গালে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে রইল।
জয়নাল শেখ খুব বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁর চেহারা দেখলেই খুব ভালো করে বোঝা যায়, তিনি ক্লান্ত হয়ে গেছেন। আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ছাড়াছাড়ি, ফিরে আসা, আলাদা হওয়ার ভিড়ে অনেক কিছুই সহ্য করলেও আজ কিছুই সহ্য করতে পারলেন না তিনি।
তৌকিরের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-“দেখো ছেলে, নিজে এবং বউকে সুখে রাখতে চাইলে তোমাকে এই বাড়ি ছাড়তে হবে। বাড়িতে অর্থের সুখ থাকলেও মনের সুখ কখনো খুঁজে পাবে না তুমি। তাই বলছি, চলে যাও। আর হ্যাঁ, অবশ্যই নিজের বউকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। সে কিন্তু এই বাড়ির মেয়ে আর নয়। যেই দিন তাকে কবুল বলেছো, সেই দিন থেকে ও তোমার হয়ে গেছে। তাই আমি বাবা হিসেবে তার কাছে পর। আমার সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই। যদি কোনো সম্পর্ক থেকে থাকে, তা হলো –দৌরুতি শেখ থেকে দৌরুতি মেহেত হয়ে গেছে। তৌকির আহমেদের বিবাহিত স্ত্রী, দৌরুতি মেহেত।”
“বাকি কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে আমি নেই, বাবা। খুব ভালো হবে এখনই যদি কিছু চিন্তা করো তুমি।”
তৌকির বেশ কিছুক্ষণ দম নিয়ে দৌরুতির দিকে তাকালো। দৌরুতি তার পাশে গিয়ে শক্ত করে তার হাত ধরে নিল। তা দেখে আলফা খানম বুঝে গেলেন, তার মেয়ে এই ছেলেটার সঙ্গে বাড়ি ছাড়তে চাইছে।
নিজের রাগকে সামলাতে না পেরে জোর করে তৌকিরের হাতের মুঠো থেকে দৌরুতির হাত ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে জয়নাল শেখ আবারও পথ আটকালেন আর বললেন,
-“মাথা খারাপ হয়ে গেছে, আলফা? দৌরুতিকে ছেড়ে দাও। সে ওই ছেলেটার সঙ্গেই যাবে বাড়ি থেকে। তুমিই তো চাইতে না যে ছেলেটা থাকুক।”
ঠিক তখনই আলফা খানমের চোখেমুখে কিছু একটা হারানোর ভয় জেঁকে বসলো যেন। তৌকিরের কাছে গিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে বললো,
-“দেখো ছেলে, যত ইচ্ছা এই বাড়ির টাকা-পয়সা শেষ করো। আর কখনো কোনো দিন কিছু বলবো না আমি। কিন্তু আমার মেয়েকে আমার কাছ থেকে দূরে সরানোর কথা মাথায়ও এনো না, ঠিক আছে?”
কথা শেষ করেই একটা পাগলাটে হাসি দিয়ে বসলো। তারপর দৌরুতির কাছে গিয়ে তাঁর চোখমুখে হাত দিয়ে অদ্ভুত কণ্ঠে বললো,
– “আমি এবার থেকে আর তোমাকে ঘরে বন্দি করে রাখবো না, মা। কিন্তু তুমি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবো না।”
তৌকির আর দৌরুতি একে অপরের মুখোমুখি তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আরো কী বললো আলফা খানম, তা তাদের কান পর্যন্ত গেল না। তৌকির আলফা খানমের চোখের সামনে দৌরুতির হাত শক্ত করে ধরে নিয়ে গেল রজারের দিকে।
পেছন থেকে আলফা খানম ছুটতেই যাবে তাদের ধরতে, কিন্তু জয়নাল শেখের হাতের মুঠোয় তাঁর হাত বেঁধে পড়েছে।
চলবে…..
