#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৩||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা
ওয়াশরুম থেকে ফিরেই দেখল দৌরুতি প্যাকেট খুলে ফেলেছে, তাকে না বলে। প্লেটে ঢেলে প্যাকেটে রাখা সাদা ভাত ও মাছের ঝোল ঢেলে খাচ্ছে সে। এই ব্যাপারটা দেখে তৌকির একটু অবাকই হলো
“এ কেমন মেয়ে!” না বলেই তার খাবারের প্যাকেট খুলে খাবার খাচ্ছে। সারাদিন রেস্টুরেন্টে কাজ করে ছোট বোনের জন্য দৌড়াদৌড়ি করে খাওয়ার সময় পায়নি, দেখে নিজের জন্য খাবারটুকু নিয়ে এসেছিল সে। খুদাই পেটের মধ্যে কী যেন গুতো মারছে তাকে। না খেয়ে সে একদম থাকতে পারে না, আজ কী করে জানি সারাদিন না খেয়েই ছিল।
ভেবেছিল, গোসল করে এসেই খাবারটুকু খাবে সে।
তার উপর একটু ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-সেদিক দেখলও না মেয়েটা, যে পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কিনা?
ভারি অদ্ভুত! একবার তাকে শুধাতে পারত, খাবারটা কার জন্য আনা হয়েছে?
তৌকির এক হাতের আঙুল দিয়ে নাকের ডগা চুলকাতে চুলকাতে দৌরুতির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-“এটা আমার খাবার। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি আমার। আমি খাওয়ার জন্য এনেছিলাম। আপনি কি এখনো খাবার খাননি?”
দৌরুতি কথাটি শুনে একটু লজ্জা পেল। পাওয়ারই তো কথা—না বলেই কারো জিনিস নিয়ে ফেলেছে, আবার গ্রাসে গ্রাসে খাচ্ছেও সে। প্লেটে আর মাত্র দুই লোকমার মতো ভাত অবশিষ্ট রয়েছে। কী বলা উচিত বুঝে উঠতে পারছে না সে।
ইশারায় সে বলল,
-“হুম, সে খাবার খাইনি। তবে কাল রাতে তুমি, আর এখন আপনি করে কেন বলছ?”
তৌকির দৌরুতির থেকে চোখ সরিয়ে বলল,
-“অতিরিক্ত কিছুই আমার পছন্দ না। না পছন্দ অতিরিক্ত কথা বলা মানুষ।”
দৌরুতি তখনই ইশারায় বুঝিয়ে দিল,
কিন্তু! সে তো কথাই বলতে পারে না।
দুজনের মধ্যে আবার একটু চোখাচোখি হলো। দৌরুতি আবারও ইশারায় বুঝাল, সে কি এই বাকি টুকু খাবার খাবে? বাবার সঙ্গে রাগ করে সে আজ পুরো দিন কিছু খায়নি। তার খাবারটুকু খেয়ে ফেলেছে। সে ভেবেছিল তার জন্য হয়তো খাবার আনা হয়েছে।
সে ভুল ছিল, একটু বেশিই আশা করে ফেলেছে সে।
তৌকির আর কিছু বলল না। হাত ধুয়ে প্লেটে রাখা বাকি দুই লোকমা ভাত খেয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ল তৌকির তার নিজের জায়গায় বিছানায় একপাশে গিয়া ঘুমিয়ে পড়লো।
দৌরুতি তখনও কিন্তু নিজের হাত ধোয়নি। এঁটো হাতে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল সে। একবার তৌকিরকে দেখেও নিল। আগের তৌকির আর এখনকার তৌকিরের মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য হয়ে গেছে। সে যেন নিজের একটা আলাদা জগৎ তৈরি করে ফেলেছে। সেই জগতে তাদের মতো মেয়েদের কোনো জায়গা হয়তো নেই। তবে দৌরুতি হালকা করে একটা হাসি দেয় তার দিকে তাকিয়ে। সে হয়তো তার জায়গা খুঁজে নেবেই ওই জগতেই, যা তৌকির তার মনে কল্পনা করে রেখেছে।
একটা সময়ে তৌকির খুব হাসিখুশি মানুষ ছিল। তৌকিরের সঙ্গে তার প্রথম দেখা ওই রেস্টুরেন্টে, যেখানে সে খাবার সার্ভ করে। এবং একদিন গিয়ে দৌরুতি দেখে একটা মেয়ের সঙ্গে মৃদু হেসে কথা বলছিল। সেটাই ছিল প্রথম দেখা। তৌকিরকে দেখার জন্য দৌরুতি তারপর থেকে প্রতিদিন ওই একই রেস্টুরেন্টে কফি খেতে যেত। আর দৌরুতি তা বইয়ের মধ্যে চোখ রেখে তাকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। এই বিষয়টা বাবা জয়নাল শেখের চোখে পড়তে শুরু করল। তার পর থেকেই যেন দৌরুতির মনে একটু করে হাসির খরা জন্ম নিল।
অনেক দিন ধরেই রেস্টুরেন্টে যাওয়া-আসা চলত তার, তবে কখনো তাদের মধ্যে তেমন কথা হয়নি। একদিন দৌরুতি জানতে পারে, তৌকির বিবাহিত। তা শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আরো একবার বন্দি করে ফেলে চার দেয়ালের মধ্যে। বাইরে যাওয়া-আসা কমিয়ে দেয় সে। বেশ কিছুদিন যেতে না যেতেই দৌরুতি আবার জানতে পারে নতুন খবর—এই যে তৌকির তার বিবাহিত স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছে। এবং তার ছোট একটা বোন আছে, আর সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে।
লুকিয়ে কিছু টাকা সে পাঠিয়েছিল তৌকিরের কাছে, নিজের পরিচয় গোপন করে। তবে তৌকির তা ফিরিয়ে দেয়। কেন দেয়, তা তার জানা ছিল না। এর পর বাকি সবকিছু তার কাছে ঘোলাটে।
হুট করেই একদিন বাবা জয়নাল শেখ দৌরুতিকে ঢেকে পাশে বসিয়ে বলল,
-“তুমি কি ওই রেস্টুরেন্টের ছেলেটাকে ভালোবাসো?”
সেদিন দৌরুতি বেশ লজ্জার সঙ্গে হ্যাঁ বলে, আবার বাবাকে ইশারায় বলেছিল, কিন্তু ছেলেটি তাকে ভালোবাসে না। তার বিষয়ে সে কিছুই হয়তো জানে না।
জয়নাল শেখ মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল,
-“ছেলেটা তোমাকে বিয়ে করতে চায়, দৌরুতি। ছেলেটা তোমাকে পছন্দ করে।”
বাবার মিথ্যা সে এখন সহ্য করতে পারছে না। সব মনে হতেই ভেতরটা অশান্তি লাগছে তার।
হাত ধুয়ে আগের সব ভাবনা থেকে বেরিয়ে তৌকিরের পাশে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল দৌরুতি।বাবা মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব খুব ভালো ছিলো কিন্তু হয়তোবা বস শেষ এখন।
দৌরুতির চোখ বন্ধ হতেই পেছন থেকে চোখ মেলে তাকাল তৌকির। আজকে সারাদিন তাকে রোদের মধ্যে ছোটাছুটি করতে হয়েছে। আগের থেকে ছোট বোনটার অসুস্থতা বেশি হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছে, হাতে আর বেশি সময় নেই তার। আজকে ছোট বোন জেসমিনের বলা একটা কথা তার বারবার মনে হচ্ছিল।
সে বলল,
-“ভাইয়া, নতুন ভাবি আমাকে দেখতে আসল না? আমি সুস্থ হয়ে তার কাছে গিয়ে তাকে চমকে দেবো।”
সে হয়তো জানেই না, এই দুনিয়ার আলো তার জন্য বেশি দিনের নয়। তৌকির ছোট বোনকে কিছুই বলতে পারেনি।
বড় ঘরের মেয়ে কি আর তাকে দেখতে যাবে? এটা ভাবাই নেহাতই বোকামি তার। সে জানে, বউরা স্বামীর বোনকে কী নজরে দেখে। ছোট একটা বাচ্চা যদি জানতে পারত—তার জন্য তার আগের ভাবি তার ভাইকে ছেড়ে চলে গেছে! মানতে পারত? তার জন্য প্রচুর টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে, রোদের মধ্যে টয়টয় করে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়।
এসব ভেবেই বা কী হবে? সব যে তার বৃথা চেষ্টা হয়ে গেছে। তার বোন তো বাঁচবে না। আল্লাহ কি পারতেন না তার হায়াত আর একটু বেশি করে দিতে?
চোখের কোণে জমে থাকা নোনতা পানি গড়িয়ে পড়ল নিচে। সে কখনো কোনো কিছু সহজ করে নিতে পারবে না হয়তো। তার সবকিছুই যে এলোমেলো। গোছানো জীবনটা তার জন্য নয়।
————–
সকালে ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠেছে আজকে দৌরুতি। মুখে তার বেশ হাসি জন্মেছে আজ। নিজের হাতে রান্নাঘরে ঢুকে নাস্তা বানিয়ে ফেলেছে সে। সেই নাস্তাগুলো খাবার টেবিলে একে একে এনে সাজিয়ে রাখছে সে। আলফা বেগমও নিচে চলে আসে নাস্তা করতে, জয়নাল শেখের সঙ্গে কাফেল। সবাই আজকে একসঙ্গে বেরোচ্ছে যার যার মনে। কাফেল বোনকে আজকে আবার মন খুলে হাসতে দেখছে। কিন্তু বিষয়টি কি নিয়ে? কোতুহলী হয়ে কাছে গেলো সে আর
কাফেল বলল,
-“কি রান্না হচ্ছে, ম্যাডাম?”
দৌরুতি কিছু না বলে কাফেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিল। হাসি দেওয়ার সঙ্গে তার দুই গালে টোল পড়ল। সে ইশারায় বলল,
-“যাই রান্না করি না কেন, তা কিন্তু এই বাড়ির কারো জন্য না।”
পাশেই দাঁড়িয়ে বাড়ির কাজের মেয়ে জামিয়া খালা বলল,
“আপা কী জানি রান্না করছে! এগুলো আপনারা খাবেন না, স্যার। সকালের নাস্তা আমরা যা আমাদের বাড়িতে খাই, ডিম ভাজি, সাদা চালের খিচুড়ি, সবার খাওন। আপনারা খাইলে তো মোটা হয়ে যাবেন, তাই অল্প করে রানছে। আমি শিখাইয়া দিতাছি।”
কাফেল চোখ-মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-“আমাদের জন্য নয়, তো কার জন্য রান্না করা হয়েছে?”
দৌরুতি হাতের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল তৌকিরকে। সেই সময় তৌকির ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল।
কাফেল বিরক্ত মুখে আর কিছু না বলে না খেয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
দৌরুতি দৌড়ে গিয়ে তৌকিরের হাত ধরে ইশারায় তাকে তার রান্না করা খাবার খেতে বলল।
তৌকির জবাব না দিয়ে নিরবে দৌরুতির হাত নিজের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সেই সময় দৌরুতির চোখে পানি ছলছল করে উঠল। আরো একবার মন ভেঙে দিলো সে। কিছু একটা তো বলতে পারত সে! এমন কেন করল?
জয়নাল শেখ মেয়ের চোখেমুখের দিকে তাকিয়ে খাবার টেবিলে বসে খাবার দেখে লোভ সামলাতে না পেরে বলল,
-“দৌরুতি, জামাই বাবাজি যখন খায়নি, আমাকে দাও মা, আমি একটু খাই। অনেক মজা হয়েছে মনে হয় রান্না।”
দৌরুতি নিজের রাগ তৌকিরকে দেখাতে না পেরে বাবার মুখের সামনে থেকে সব খাবার উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে ফ্রিজে রেখে দিল।
আর ইশারায় বলল,
-“নিজের বউকে বলো, রান্না করে খাওয়াবে।”
আলফা খানম দৌরুতির এমন আচরণ দেখে বলল,
“এই মেয়ে কি বাহিরের ছেলের জন্য পাগল হয়ে গেছে নাকি? বুঝলাম না, এটা কেমন আচরণ বাবার সঙ্গে তার?”
জয়নাল শেখ আলফা খানমের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,
“আমার মেয়ে পাগল না, তোর চৌদ্দগুষ্টি পাগল! সে স্বামীর সেবা করছে। আর তুই কী করছিস? স্বামীর সঙ্গে সুযোগ পেলেই ঝগড়া করিস!”
আলফা খানম জয়নাল শেখের দিকে তাকিয়ে রইল আর তেরে গেলো বলতে..
চলবে…
