#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||২||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা
ভালোবাসা তো জোর করে হয় না। বাবা তাঁকে বলতে পারতো যে ছেলেটা তোমাকে বিয়ে করতে রাজি নয়, দৌরুতি। সে মেনে নিতো। বাবা তার কাছে কেনো মিথ্যা বললো? এতো বড় মিথ্যা যে বলছে, ছেলেটা তাকে খুব পছন্দ করেছে, ছেলেটা খুব ভালোবাসে, মিথ্যা, সব মিথ্যা মনে হচ্ছে এখন তার কাছে। আজ সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে টাকা দিয়ে সম্পর্কও কেনা যায়, তার সাথে অভিনয় করা মিথ্যা ভালোবাসাও।
দৌরুতি তৌকিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে লালচে ভাব হয়ে আছে, বোঝা যাচ্ছে আর একটু কিছু হলেই হয়তো কেঁদে ফেলবে সে। খুব কষ্টে নিজের চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করছে। তৌকির দৌরুতিকে বললো,
-“যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। এই ভারি পোশাক ছেড়ে পাতলা সালোয়ার-কামিজ পড়ে এসো। দুইজন মিলে নামাজ পড়ে নেই একসঙ্গে। বাদবাকি কথা পরে হবে।”
দৌরুতি চুপচাপ উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসলো। তারপর দুইজন মিলে নামাজ আদায় করে নিলো এক সঙ্গে।আর কিছু না বলে শুয়ে পড়লো। এর মধ্যে কিছুটা দূরত্ব মেইনটেইন করা হয়েছে। মাঝে একটা কোলবালিশ রাখা হয়েছে।
রাতে আর তেমন দুজনের মধ্যে কথা বলা বা কিছুই হয়নি। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আর তৌকির কে দেখেনি দৌরুতি। চোখের পাতা মেলতেই দেখলো বিছানা শূন্য হয়ে পড়ে আছে। সে ছাড়া ঘরে আর কেউ নেই।
তারপর ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে চলে আসে সে। সবাই নাস্তা করে চলে গেছে, সবাই বলতে। এই বাড়িতে কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কখনো একসঙ্গে খাবারও খায় না। দৌরুতি রুটিতে জ্যাম-জেলি ভরাতে ভরাতে খেতে থাকে। একটু পর দৌরুতির বাবা জয়নাল শেখ নিচে নেমে আসেন। দৌরুতি তাঁর বাবার দিকে ফিরেও তাকায়নি, নিজ মনে খাবার খেতে থাকে সে।
মেয়ের এমন ব্যবহার এর মানেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন জয়নাল শেখ। তাই আস্তে করে মেয়ের পাশে বসে তাঁর মাথায় আলতো করে হাত দিতে যান তিনি, হয়তো ভালোবাসা, স্নেহ, ভরসার খাতিরে। বাবা জয়নাল শেখ দৌরুতির মাথায় হাত দিতেই দৌরুতি তা এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দেয়। খুব রাগে অভিমানে বাবার চেহারার দিকে সে ফিরেও চায় না। রাগের কারণ অবশ্য জানা জয়নাল শেখের। জয়নাল শেখ মেয়েকে বললো,
-“আমাকে মাফ করো মা, আমি মিথ্যে বলছি। তবে ছেলেটা তো অন্য কাউকে আর ভালোবাসে না। তোমাকে সে একদিন মেনে নেবেই।”
দৌরুতি এবার তার বাবার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইশারায় বললো,
-“টাকা দিয়ে ভালোবাসা কিনে দিলে তুমি আমায়? যে ভালোবাসা কখনো মন থেকেই হবে না। আমি বুঝে গেছি, আমার মতো বাকপ্রতিবন্ধীকে কেউ মন থেকে ভালোবাসবে না।”
জয়নাল শেখের কলিজা যেন পেটে চৌচির হবার দশা। আসলেই কী জবাব দেবে সে! সত্যিই তো, ছেলেটাকে মেন্টাল টর্চার করে বিয়েতে রাজি করেছে। সে তো এই বিয়েতে রাজি ছিলই না। এর থেকে তারা নয় দূরেই থাকতো। সে হয়তো আরো মেয়ের কষ্ট বাড়িয়ে দিলো।
জয়নাল শেখ মেয়ের কথার জবাব দিতে পারলেন না কোনো, শুধু এক নাগাড়ে মাফ চাইলেন। তবে তিনি ভরসা দিলেন, একদিন সবকিছু ঠিক হবে, দৌরুতিই আর তুমি হবে সবার থেকে বেশি সুখী আমার মা।
কিন্তু দৌরুতি মানলো না। খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল, কান্না লুকিয়ে।
একটু পর দৌরুতিকে তাঁর মা ঘুরে একবার দেখে নিয়ে বললো,
-“এইভাবে দৌড়ে গেলো কেনো ও, জয়নাল?”
দৌরুতি ঘরে যাবে ঠিক সেই সময়ে দৌরুতির মা আলফা খানম নেমে আসলেন। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পছন্দ করেন তিনি। খুব মডার্ন বলাও যাবে না। মহিলা হয়ে আলফা খানম পুরো শেখ পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। সেই থেকে অফিস সামলাতে সামলাতে সন্তান ও সংসার মাথা থেকেই নামিয়ে দেন তিনি। জয়নাল শেখ বাইরে সামলে এসে আবার তার আদরের মেয়ে দৌরুতিকে সামলাতেন।
জয়নাল শেখের দুই ছেলে ও ছেলের বউ বাইরে কানাডায় থাকেন। মেজো ছেলে কাফেল আর ছোট মেয়ে দৌরুতি, বাড়ির বেশিরভাগ সদস্য কানাডায় অবস্থান করেন।
দৌরুতির বোবা হওয়ার পিছনে অবশ্য কারণ আছে। আলফা খানম তিন সন্তান জন্ম দেওয়ার পর নিজের ক্যারিয়ার, অর্থাৎ ব্যবসা ও অফিসে মনোযোগী হয়ে পড়েন। তাঁর বেশ কিছু মাস পর জানতে পারেন তিনি আবার প্রেগন্যান্ট। কিন্তু তিনি এই বাচ্চাটা আর নিতে চাইছিলেন না। তাই অনেক অপারেশন পিল খাওয়ার পরেও দৌরুতিকে ফেলতে পারেননি তিনি। আল্লাহ যাকে পৃথিবীর আলো দেখাবেন, তাকে কে আটকাতে পারে পৃথিবীতে আসতে?
এই সব কাজে বেশ ঝগড়া ও অশান্তি সৃষ্টি হয় জয়নাল শেখ ও আলফা খানমের মধ্যে। কোনো কিছুতেই কিছু হয় না। অবশেষে পৃথিবীর মুখ দেখে দৌরুতি। তবে অতিরিক্ত বাচ্চা ফেলে দেওয়ার পিল খাওয়ায় দৌরুতি মধ্যে একটি কমতি নিয়ে জন্মায়, আর সেটা হলো
—সে কখনো কথা বলতে পারবে না। তবে তার দৃষ্টি খুব পোক্ত। একবার যা দেখে তা আর দ্বিতীয়বার দেখতে হয় না, খুব ভালো করে মনে থাকে তার।
আর আলফা খানম এর চার নম্বর বাচ্চার প্রতি তেমন টান নেই বললেই চলে । জয়নাল শেখ বাবা হয়ে মায়ের দায়িত্ব পালন করে গেছে দৌরুতির জন্য।
আলফা খানমের কথার কোনো জবাব দেন না জয়নাল শেখ। সেও মুখ বন্ধ করে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আলফা খানম বেশ বিরক্ত হলেন বাপ-মেয়ের এমন আচরণে। তাই নিজেও আর কিছু না বলে কাউকে ফোন করতে করতে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে।
————–
ঘরে ঢুকেই বন্দি খাঁচার ভিতরে রাখা সেই টিয়া পাখির দিকে তাকিয়ে রইল দৌরুতি। বাবা জয়নাল শেখ এক সময়ে বলেছিলো পাখিটাকে বন্দি করে রেখো না, উড়িয়ে দাও, দৌরুতি তখন তার ইশারায় বুঝিয়েছিল, সেও তো একটা বন্দি পাখি। সে কখন মন খুলে উড়াল দেবে?
আরো এই ইশারায়ই বললো,
-“যেদিন তার নিজের মনে হবে যে মন খুলে হাসতে পারছে, নিজেকে মুক্ত পাখির মতো মনে হচ্ছে—ঠিক সেদিন এই পাখিকে নিজ হাতে মুক্ত করে দেবে সে।”
টিয়া পাখির একটা নামও দিয়েছে দৌরুতি। তার নাম হলো “ইতি”। পাখিটা কথাও বলে, মানুষের বলা শব্দগুলো নকল করে বলতে পারে। দৌরুতির আবার কথা বলা পাখি বেশ পছন্দ তাঁর।
ইতির কাছে যেতেই ইতি ডেকে উঠলো,
-“দৌতি দৌতি, শোনো চুপি কথা শোনো।”
দৌরুতি পাখির কাছাকাছি চলে গেলো। বোবা মানুষেরও মনে মনে কথা থাকে। তাদেরও কল্পনা থাকে, আর থাকে মনের শব্দ বুনন। চোখ দুটো দিয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটা পাখির দিকে। আর মনে মনে বললো,
– “আমি কেনো তোর মতো একটু কথা বলতে পারি না, ইতি? একটু কথা বলতে পারলে হয়তো সবাই মূল্য দিতো আমায়।”
সারাদিন আর ঘর থেকে বের হলো না দৌরুতি। চুপচাপ নিজের ঘরে বসে জানালা দিয়ে বাইরে থাকা রঙ্গনা ফুলের গাছটা দেখতে থাকলো সে। এই করেই পুরো দিন শেষ, রাত নেমে আসলো।
রাতে খাবার খাওয়ার জন্য বাড়ির সবাই দরজায় এসে ডাকলেও মেয়েটা দরজা খুললো না।
গভীর রাতে না খেয়ে শুয়ে ছিলো সে।না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো দৌরুতি, মেয়েটা নিজেকে ছোট থেকেই একা রাখতে থাকে যখনি মন খারাপ হয় নিজেকে ঘর বন্দি করে ফেলে সে।
সারাদিন কেটে যাবার পর ঠিক রাত বারোটার দিকে, গম্ভীর কণ্ঠে কেউ একজন ডাক দিলো,
-“এই যে দৌরুতি, দরজাটা খুলুন?”
দৌরুতির এক রাতের মধ্যে চেনা হয়ে গেছে কণ্ঠটা কার।
দরজা খুলতেই তৌকির ঘরে প্রবেশ করলো। হাতে কিছু একটা ছিল—প্যাকেটের মতো। তা খাটে রেখে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে গেলো সে।
চলবে…….
