#মনে_মনে_ব্যাকুলতা || ১||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা
#সূচনাপর্ব
মেয়েটা বোবা বলে তাঁকে এমন ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলে? যার কিনা আগেও একবার বিয়ে হয়েছিল।
বাবা, এটা তুমি ঠিক করলে না। একদমই না, আমি থাকলে এই বিয়ে কখনো হতে দিতাম না। আচ্ছা! এই জন্যই বুঝি আমাকে বুদ্ধি করে বাড়ি থেকে বের করে দিলে। আমাদের তিন ভাইয়ের আদরের বোন সে। আচ্ছা, তার কপাল কি এত খারাপ? যে তাঁকে এমন ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলে তোমরা। বড় ভাই ওসমান আর ছোট্ট ভাই আশিক এখনো জানে এই সব সম্পর্কে? তুমি বুঝতে পারছো, তাঁরা জানলে কী বলবে?
পুরো ঘর শান্ত, স্তব্ধ, নিরব হয়ে গেছে। বাইরে রাতের কালো অন্ধকার। জানালার মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে জয়নাল শেখ। শীতল বাতাসে হালকা করে ঘরের পর্দাগুলো দুলছে। মেজো ছেলে কাফেলের কথায় মাথা ঘুরিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
-“তোমার বোন আগে থেকেই ওই ছেলেটাকে পছন্দ করত। আর যে সব কথা তুমি আজকে আমাকে বলছো, আমি বাবা হয়ে সেই একই কথাগুলো তাঁকে অনেক আগেই বলেছিলাম। সে শেষে আমাকে তার ইশারায় বুঝিয়েছে, বিয়ে করলে সেই এই ছেলেটিকেই করবে, নয়তো সে সারাজীবন বিয়ে করবে না।আমি বাবা হয়ে কি এই ছেলেটি সঙ্গে তাকে বিয়ে দিতাম? সে অনেক জোরাজোরি করছে।
আমি তাঁকে অনেক বুঝিয়েছি, কিন্তু সে আমার কথা মানতে নারাজ। তাঁকে আমি এইও বলেছি যে, তাঁর থেকে ভালো ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবো।”
কাফেল বাবার মুখের দিকে তাকাতেই পারে না। ভীষণ রকমের একটা অস্বস্তি কাজ করে তার মধ্যে। এক অদ্ভুত রকমের খারাপ লাগা কাজ করে। কেন জানি তার, বাবার দিকে তাকালেই মনে হয়, তার বাবার মতো আর অসহায় মানুষ আর দুটো নেই।
কাফেল বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে বলল,
-“বাবা, ছেলেটাকে বলেছো তো, তাকে ঘরজামাই হয়ে এইখানে থাকতে হবে?”
জয়নাল শেখ একটু চুপ করে থেকে বললেন,
-“শুনো, সে কিছুদিন এই বাড়িতে থাকলেও ঘরজামাই হয়ে থাকতে পারবে না। তার ছোট বোন অসুস্থ, তাই সে ততোদিন ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কয়েকটা দিন এখানে থাকবে।তারপর দৌরুতি কে নিয়ে চলে জাবে কোথাও”
কাফেল বাবাকে বলল,
-“কিন্তু বাবা! আমরা আমাদের বোনকে আলাদাভাবে রাখতে চাই না,। হুট করে এমন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলে, যার কোনো কাজ বা রোজগার নেই, আবার ছেলেটা আগের বউকে ডিভোর্স দিয়েছে। কী কারণে আগের বউকে ডিভোর্স দিয়েছিল, তা-ও জানতে চাইলে না একবার। দৌরুতিকে আর ভেঙে পড়তে দিও না, বাবা। আর কোনো বড় আঘাত সে মানতে পারবে না। আচ্ছা, এই বিয়েতে কি দুইজনের মত ছিল?”
প্রশ্নটা করার সঙ্গে সঙ্গেই যেন জয়নাল শেখের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। যেন কিছু একটাতেই আটকে গেলেন তিনি। মেজো ছেলের দিকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
-“তোমার মা অনেক আগে ডেকেছে, কাফেল। তুমি নিচে যাও।”
কাফেল আর কিছু বলল না। বাবা যে খুব ক্লান্ত, তা তার চেহারায় প্রকাশ পাচ্ছে। তাই সে আর প্রশ্ন না করে মায়ের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
———–
লাল টুকটুকে শাড়ি পরে ঝলমলে বাসরঘরে খাটের উপর ফুলের মাঝে বসে আছে দৌরুতি। মেয়েটার চেহারা থেকে এখনো বাচ্চাম মুখটা যায়নি। অনেক নার্ভাস সে। চারদিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিল, সে ঘরটা তার নিজের, তবুও বুকের মধ্যে কেন জানি লাজুক ভয় কাজ করছে। ধুকপুক করে হার্টবিট বাড়ছে। হয়তো ঘরে নতুন মালিকের আগমনের জন্য এমন দশা। তবে সে নতুন মালিককে কী করে স্বাগতম করবে?
একটু পর ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো কেউ। ঘরের সঙ্গে এটাচড বাথরুম।
হ্যাঁ, সে ছেলে। আর ছেলেটার উসকোখুসকো চুল, আর তার চুল দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে। হয়তো চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে এসেছে ছেলেটা।
হাইটে বেশ লম্বা, চওড়া না হলেও দৌরুতির সঙ্গে ভালোই যায়। খারাপ কেউ বলতে পারবে না। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, একরকম বেপরোয়া ভাব আছে চেহারায় তার।
ছেলেটা গলা খাঁকারি দিয়ে দৌরুতির ঘোমটা তুলে পাশে বসে বলল,
-“আমার কিছু কথা ছিল আগে।”
দৌরুতি লাজুক হাসি দিয়ে ছেলেটার মুখের দিকে তাকাল।
ছেলেটা দৌরুতির দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আপনি যখন আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছেন, তার মানে আমার পরিচয় হয়তো আপনার জানা? আমি তৌকির আহমেদ। আমার আপন বলতে শুধু আমার ছোট বোন আছে, সে ছাড়া আমার এই দুনিয়ায় আর কেউ নেই। ছোট বোনের বয়স আট বছর। হয়তো আমার বোনও আর দুনিয়ায় বেশিদিন থাকবে না। আমার বোনের ক্যান্সার লাস্ট স্টেজে আছে। তার সুস্থতার জন্য আপনার বাবার কাছ থেকে অনেক টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। তবে সেই টাকা আমি খুব শীঘ্রই ফিরিয়ে দেবো।
আচ্ছা, শুনুন—
‘সত্যিটা বলি আপনাকে। আমার মনে হয়, বিয়ে যখন হয়েই গেছে, এসব লুকিয়ে আর লাভ নেই। আপনাকে আমার জীবনে জায়গা দিতে একটু সময় লাগবে। আমি বিয়েটা শুধু আমার বোনের কথা ভেবে করেছি। আমার বোনও হয়তো বাঁচবে কি বাঁচবে না, তার গ্যারান্টি নেই। সবকিছু সামাল দিয়ে উঠতে আমার একটু সময় লাগবে। ঠিক ততদিন আমরা আলাদা থেকে একে অপরকে বুঝবো।
আসলে মেয়েদের উপর আর আমি ভরসা করতে পারি না। তাই একটু সময় দেবেন, দয়া করে।
আর হ্যাঁ, আপনার বাবার টাকা আমি খুব শীঘ্রই পরিশোধ করবো।”
কথাগুলো বলেই তৌকির একটু দম ছাড়ল।
দৌরুতি তৌকিরের মুখের দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় তাকে বলল,
-“আমার বাবা আপনাকে টাকার চাপ দিয়ে এই বিয়েতে রাজি করিয়েছে?”
তৌকির দৌরুতির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“হ্যাঁ।”
– “তবে আমার আপনাকে মেনে নিতে একটু সময় চাই।”
দৌরুতি আবার ইশারায় বলল,
-“আপনি এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না?”
তৌকির আবার হ্যাঁ সূচক জবাব দিল।
দৌরুতি ইশারা করে বলল,
-“আমি বোবা বলে ফায়দা তুললেন?”
চোখেমুখে ছিল বিরক্তি আর কান্নার ছাপ।
তৌকির ইশারাটা বুঝে বলল, চোখমুখ কঠিন করে,
-” আরে ফায়দা কথা বলছো? সেটা তোমার বাবা তুলেছে আমার। সে জানত আমার দুর্বলতা কোথায়। সে ঠিক সেই জায়গায় হাত দিয়ে আমাকে রাজি করিয়েছে। শোন, “মেয়ে” আমি আর কাউকে বিশ্বাস করি না। খুব তাড়াতাড়ি তোমার বাবার টাকা আমি দিয়ে দেবো। তারপর তুমি ডিসাইড করবে যে তুমি কার কাছে থাকবে, না আমাকে ডিভোর্স দেবে। মেয়েদের তো আবার এই সব হাতের মোয়া করতেই পারো।”
এই কথাগুলো শুনে দৌরুতির দুনিয়া থেকে উঠে যেতে মন চাইল। তাকে কেউ কি ভালোবাসতে পারত না? সবাই কেন করুণা করে তার উপর? মা তো আগে দূরে ঠেলে দিয়েছে। সে কি এত সস্তা যে তাকে সবার করুণা নিয়ে বাঁচতে হবে?
সে তো জানত তৌকির নিজ ইচ্ছায় এই বিয়েতে রাজি হয়েছে। না, সে মানতে পারছে না। এই সব তার ভেবে ভেতরটা বিশ্রীভাবে ব্যথা করছে। সে তো কঠিন কথাও কষ্টে এসবেরই অভ্যস্ত, তবুও আজ আরও একবার ভেঙে পড়ল যেন।
আচ্ছা, এই ছেলেটি কি তাকে মেনে নেবে? নাকি তার বাবার টাকা পরিশোধ করার পর তাকে আবার ছেড়ে চলে যাবে?
চলবে…….
