#ঝুমুর_বিয়ে
#অন্তিম_পর্ব
#মুজাহিদ_শেখ
কবির শেখ আর খোরশেদ আলম এসেছেন প্রলয়দের বাড়ি বিয়ের ডেইট ফিক্সড করবে বলে। তাদের সামনে সাজানো নানা রকম খাবার৷ কবির শেখ সেগুলোর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো। আবিদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তাহলে এ কথায় রইলো বেয়াই বিয়ে সামনের শনিবারেই হবে।’
আবিদ চৌধুরীর হালকা হাসলো। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। খোরশেদ আলম আরও কিছু কথা বললেন অনুষ্ঠান নিয়ে৷ সব কথা শেষে কবির শেখ বললেন,
‘এবার তাহলে উঠি।’
‘না, না, দুপুরের খাবার খেয়ে তারপর যাবেন।’
রান্নাঘর থেকে ঝরণা বেগম আসতে আসতে বললেন। উনার কথার সাথে তাল মিলিয়ে আবিদ চৌধুরীও বললেন,
‘হ্যাঁ হ্যাঁ একদম। না খেয়ে যেতে দিবো না।’
‘আজকে হবে না। সব কিছু তো গুছাতে হবে। বিয়ের পর এসে কব্জি ডুবিয়ে খাবো। আজ নয়।’
কবির শেখ বললেন। কিন্তু তার কথা শুনলেন না আবিদ চৌধুরী। জোর করে আবারও বসালেন তাদের।
‘বিয়ের পরেরটা বিয়ের পর হবে। আজকে তো না খেয়ে যেতে দিবো না আপনায়।’
কবির শেখ আর কোন উপায় না পেয়ে থেকে গেলেন তিনি। খোরশেদ আলম ও রইলেন তার সাথে।
______
মামির সাথে উঠুনে বসে গল্প করছিল ঝুমুর। নীলিমা বেগম উঠুনে বসে চাল ঝাড়ছিলেন। আর ঝুমুর নানা রকম কথা বলছিলেন। হঠাৎই পিছন থেকে এক জোড়া হাত চেপে ধরলো তার চোখ।
চমকে উঠলো ঝুমুর।
‘কে কে?’
‘বল দেখি কে?’
কন্ঠটা তার ভীষণ পরিচিত মনে হলো। ঠোঁট কামড়ে চিন্তা করলো ঝুমুর। অন্ধকার তীর ছুড়ার মতো করে বলল,
‘রুমা আপু?’
সঙ্গে সঙ্গে চোখ ছেড়ে দিলো হাত জোড়া। তার সামনে এসে দাঁড়ালো লম্বা চওড়া একটা মেয়ে। ঝুমুর তাকে দেখে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে,
‘কেমন আছো রুমা আপু?
‘ভালো আছি। তুই কেমন আছিস? আর আমাকে চিনলি কেমন করে?’
রুমার প্রশ্নে দাঁত কেলিয়ে হাসলো ঝুমুর। ভ্রু বাঁকিয়ে বললো, ‘এটাকেই বলে বোনের টান।’
ঝুমুরের কথায় রুমাও হাসলো। নীলিমা বেগমকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলো। নীলিমা বেগম এদিক ওদিক উঁকি দিয়ে বলল,
‘জামাই আসেনি?’
‘এসেছিলো আমাকে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে গেছে রাতে আসবে।’
নিজের বোরকা খুলতে খুলতে শুধায় রুমা। নীলিমা বেগম আবারও কাজে মন দিলেন। রুমা বোরকাটা রাখলো সোফার উপর। সঙ্গে সঙ্গে তেতে উঠলেন নীলিমা বেগম।
‘রুমা তোর কি এই এদিক ওদিক জিনিস ছুঁড়ে রাখার অভ্যাস যাবে না।’
রুমা পাত্তা দিলো না মায়ের সেই ধমক। সে তো ঝুমুরের হাত ধরে বলে,
‘চল তো ঝুমু কতবছর পর তোর সাথে দেখা চল একটু গল্প করি।’
তাকে টেনে রুমে নিয়ে গেলো। নীলিমা বেগম দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। এই মেয়েকে তিনি আজও কথা শুনাতে পারেন না। সবকিছু নিজের মতো করে। নিজে যা বুঝে তাই ঠিক।
_____
বিয়ের আয়োজন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত সবাই। বাড়ি ঘর সাজানোর জন্য তিনদিন আগেই লোক আনানো হয়েছে। খোরশেদ আলমের একটায় কথা একমাত্র ভাগ্নির বিয়ে তিনি ধুমধামে দিবে। কোন কমতি রাখবেন না। যদিও বা কবির শেখ নিজে সব করতে চাইছিলেন। কিন্তু খোরশেদ আলম তার একটা কথাও শুনলেন না। তিনিই সবকিছু করতে থাকলেন।
বাড়িতে মেহামন আসতে শুরু করেছে সেই সাথে কাজ বাড়ছে নীলিমা বেগমের। কাজের হাত থেকে একমিনিটের জন্য নিস্তার পাচ্ছেন না। তার বোন আসায় একটু সুবিধে হয়েছে। তার হাতে হাতে সব কাজ করে দিচ্ছে।
নীলিমা বেগম খাবার টেবিলে সাজাচ্ছেন আর গলা ছেড়ে ডাকছেন।
‘ঝুমুর, রুমা খেতে আয় দ্রুত। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে।’
তার এক ডাকেই কাজ হলো। মুখে ফেসপ্যাক নিয়ে নিচে নামলো তারা। ঝুমুর এগুলো করতে না চাইলেও রুমার জোরাজোরিতে করতে হচ্ছে সব। ঝুমুর এসে খাবার টেবিলে বসতেই নীলিমা বেগম প্লেটে খাবার দিতে দিতে বলল,
‘ঝুমুর আজকে তোর প্রিয় খাবার মুরগীর বাচ্চার ঝোল রান্না করেছি।’
বলতে বলতেই নীলিমা বেগম খাবার তোলে দিলেন ঝুমুর প্লেটে। সে খাবারের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো। সালমা জাহান আসার পর থেকে সে আর কোন দিন প্রিয় খাবারগুলো চোখের দেখাও দেখতে পেতো না খাবে তো দূরের কথা। কথাগুলো ভাবতেই চোখে পানি চলে এলো তার।
_____
‘মুখ সামলে কথা বলো সালমা। আমার মেয়েকে নিয়ে আর একটা বাজে কথাও বলবে না তুমি।’
সালমা জাহানের দিকে আঙুল উঁচু করে ধমকে উঠে বলেন কবির শেখ। সালমা জাহান নাক মুখ কুঁচকে ফেলেন।
‘হ্যাঁ আমরা তো পর। সব দিয়ে দাও তোমার মেয়েকে। এই গহনা কেন তাকে দিতে হবে। এগুলো নিশাকে দিবো বলে রেখেছি।’
সালমা জাহানের এমন ছোটলোকি কথা শুনে কিছুটা হাসলেন কবির শেখ। মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলে,
‘ লজ্জা করে না তোমার সালমা? এগুলো সব গহনা ঝুমুর মায়ের। তোমার বা তোমার মায়ের এগুলোর প্রতি কোন অধিকার নেই।’
সালমা জাহান মানলেন না। তিনি কেড়ে রাখতে চাইলেন সেই গহনা। সঙ্গে সঙ্গে চড় বসালেন তার গালে। এবার ভীষণ ক্ষেপেছেন কবির শেখ। পর পর দুটো থাপ্পড় মারলেন তিনি।
‘আজ আমার মেয়ের বিয়ে তাই এই ঝামেলা বড় করলাম না। বিয়ের পর তোকে এসে বিদায় করবো আমার বাড়ি থেকে।’
কথাগুলো বলে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলেন সেখান থেকে।
______
একটা লাল টুকটুকে বেনারসি গায়ে জড়িয়ে বসে আছে কনের সাজে৷ নিচ থেকে আওয়াজ আসছে বর এসেছে বর এসেছে। সে আওয়াজ ঝুমুরের কানে যেতেই সেও ছুটে গেলো বেলকনিতে। আড়াল থেকে দেখলো প্রলয়কে। পড়নে একটা সুন্দর পাঞ্জাবি। দারুণ মানিয়েছে প্রলয়ের গায়ে। হঠাৎ গলা ঝাড়ার শব্দ কানে যেতেই পিছন ফিরে তাকায় ঝুমুর। রুমাকে কমড়ে হাত ধরে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জায় পড়ে যায় সে। আমতা আমতা করে ইনিয়েবিনিয়ে বলতে চাইলে কিছু।
‘আসলে আমি… আমি আসলে…..’
থামিয়ে দিলো রুমা। দুষ্ট হেসে ঝুমুরকে খুঁচা মেরে বলে,
‘হয়েছে আর আসলে আসলে করতে হবে না। এবার রুমে এসে চুপ করে বস। তোরই তো বর রাতে মন ভরে দেখে নিস। এখন বরের বাড়ির মেহমান তোকে দেখতে আসবে। এসে যদি কনে বারান্দা থেকে বর দেখতে ব্যস্ত…’
আর পুরো কথা শেষ হতে পারলো না। দরজা খুলার শব্দ কানে এলো। ঝুমুর দ্রুত রুমে ঢুকলো। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন তার বাবা কবির শেখ। তাকে দেখে দুজনই লম্বা শ্বাস নিলো।
‘আব্বু আসো।’
কবির শেখ একটা বাক্স নিয়ে ভিতরে ঢুকলো। চোখ দুটো তার অস্বাভাবিক ভাবে লাল। কেঁদেছেন হয়তো। তিনি বিছানায় বসে হাতে ইশারা করে বললেন,
‘এদিকে এসে বস।’
ঝুমুর গিয়ে বসলো। রুমা চলে গেলো সেখান থেকে। বাবা মেয়ের মাঝে তার না থাকাটাই ভালো। কবির শেখ তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বাক্সটা খুলল। দুটো কানের ঝুমকা বের করে দু কানে ধরে দেখলেন।
‘বাহ্ বেশ মানিয়েছে তো আমার মেয়েকে।’
ঝুমুর বুঝলো না বাবা এগুলো কি করছে। তাই প্রশ্ন করলো।
‘কি করছো আব্বু? গয়না কেন দেখাচ্ছো? এগুলো তো মায়ের গয়না।’
‘এগুলো তোর জন্য এনেছি তুই পড়বি। এগুলো তোর।’
এতটুকু বলে বাক্সটা তোলে দিলেন ঝুমুরের কোলে। ঝুমুর নিতে চাইলো না।
‘আব্বু আমি পারবো না..’
পুরো কথা শেষ করার আগেই কেঁদে উঠলেন কবির শেখ। মেয়ের হাত দুটো নিজের দুই চোখে ঠেকিয়ে কঁদে উঠলেন তিনি।
‘আমাকে মাফ করে দিস মা। তোকে আমি সুখে রাখতে পারিনি কখনো। তোর মা মারা যাওয়ার পর থেকে তোকে প্রাণ খুলে হাসার সুযোগ করে দিতে পারিনি।’
ডুকরে কাঁদছেন তিনি। তার সাথে ঝুমুরও কেঁদে উঠলো। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
‘তুমি কেন মাফ চাইছো আব্বু। মাফ চেও না। আমার ভালো লাগে না। শত যাই হোক তুমি আমার আব্বু।’
সেও কাঁদছে। বাবা মেয়ে কাদলো। হঠাৎ কারো আসার শব্দ পেয়ে থেমে গেলেন তিনি। নিজের চোখের পানি মুছে। মুছে দিলেন মেয়ের চোখের পানি।
‘কাঁদছিস কেন বোকা মেয়ে তের না আজকে বিয়ে। মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে তো পরে ছবি ভালো আসবে না।’
বাবার কথায় আবারও হাসলো ঝুমুর। কবির শেখ সযত্নে চুমু খেলেন মেয়ের হাত দুটোয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
______
বিয়ে সম্পন্ন হতেই সবাই দোয়া তুললো নতুন দম্পতির জন্য। এবার এলো সেই মুহূর্ত। এবার যে কনে বিদায়ের পালা। কাঁদছে ঝুমুর। রুমা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। কবির শেখ শক্ত করে ধরলেন প্রলয়ের হাত।
‘আমার মেয়েটাকে একটু সুখে রাইখো বাবা।’
‘চিন্তা করবেন না। আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করবো তাকে সুখে রাখার।’
প্রলয় আশ্বাস দিলো। মনে প্রশান্তি বয়ে গেলো কবির শেখের। গাড়িতে তোলে দিলেন মেয়েকে। শেষবারের মতো মেয়ের কপালে আদরের পরশ ছুঁয়ে দিলেন। সবাই বিদায় নিয়ে উঠে গেলো গাড়িতে। গাড়ি চলতে শুরু করলো। ঝুমুর রলয়ের পাশে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। জানা নেই তার জন্য নতুন জীবনে কি অপেক্ষা করছে। তুবুও এক বুক আশা নিয়ে সে পা রেখেছে এ নতুন জীবনে। সুখ আদৌ হবে কি না তার জানা নেই। সেখানেও কি তাকে সব মানিয়ে নিতে হবে? কিচ্ছু জানে না ঝুমুর। সে শুধু জানে তার একটা নতুন ঠিকানা হয়েছে। একটা নতুন জীবন হয়েছে
তার সব ভাবনার মাঝে হঠাৎ নিজের হাতের ভাঁজে পুরুষালি হাত অনুভব করতেই চমকে তাকায় সেদিকে। প্রলয় তার হাতটা শক্ত করে ধরেছে সবার আড়ালে। সুখ কি তবে ধরা দিলো বলে ঝুমুরের জীবনে?
সমাপ্তি…..
