#ঝুমুর_বিয়ে
পর্ব ১
#মুজাহিদ_শেখ
পাত্রপক্ষের সামনেই হঠাৎ ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়ল ঝুমুরের সাজানো নীরবতা। সৎ মা সালমা জাহানের হাতের সজোরে চড়টা যখন ঝুমুরের নরম গালে গিয়ে আছড়ে পড়ল, তখন চারপাশের বাতাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। অপমানে আর ব্যথায় ঝুমুরের চোখজোড়া টলমল করে উঠল নোনা জলে। সে করুণ ও ব্যথাতুর দৃষ্টিতে তাকাল সালমা জাহানের দিকে। তার চোখে ছিল একরাশ অব্যক্ত প্রশ্ন।
সালমা জাহান যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। ঝুমুরের সেই অসহায় মায়াবী চেহারা মন গলাতে পারলো না। বরং রাগটা যেন আরও রি রি করে বাড়লো। দাঁত কটমট করতে লাগলেন। ঝুমুরের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে দাঁত কটমট করে তিনি গর্জে উঠলেন,
‘তোর সাহস তো কম নয় রে ছুঁড়ি! তুই কোন অধিকারে আমার মেয়ের নেকলেস পরেছিস? পরের জিনিসের ওপর এত লোভ কেন তোর?’
অপমানে আর লজ্জায় ঝুমুর চোখের পাতা বুজে ফেলল। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল তপ্ত অশ্রুকণা। ঝুমুরের বাবা কবির শেখ তখন যেন মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিলেন। আগত মেহমানদের সামনে নিজের এই অসহায়ত্ব ঢাকতে তিনি এক কৃত্রিম হাসি টেনে স্ত্রীর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন। ধমকের স্বরে বললেন,
‘সালমা! কী হচ্ছে এসব? শান্ত হও!’
কিন্তু সালমা জাহান আজ যেন সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। স্বামীর দিকে তপ্ত দৃষ্টি হেনে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘বাবা নামের কলঙ্ক তুমি! সব ভালো ঘর খুঁজে আনছো এই অলক্ষুণে মেয়ের জন্য? আর আমার নিজের মেয়ের কপালে কী জুটবে শুনি?’
কবির শেখের কানে দিয়ে যেন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। লজ্জায় তার মুখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ঝুমুর তখন পাথরের মূর্তির মতো মাথা নিচু করে নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দিচ্ছে। কবির শেখ পরিস্থিতি সামলাতে আবারও উচ্চস্বরে বললেন,
‘আহ্ সালমা! নিশাও আমার মেয়ে। সময় হলে তাকেও ধুমধাম করে বিয়ে দেব। এখন মেহমানদের সামনে এসব বন্ধ করো!’
‘সে আমি বুঝেই গেছি তুমি কী করবে!’ কথাটি বলেই এক ঝটকায় ঝুমুরকে সরিয়ে দিয়ে ঘর থেকে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলেন সালমা জাহান।
পাত্রপক্ষ এতক্ষণ পাথরের মতো বসে এই দৃশ্য দেখছিল। এবার তারা গলা ঝাড়ল। এক অস্বস্তিকর স্তব্ধতা ভেঙে পাত্রের বাবা আবিদ চৌধুরী দাঁড়িয়ে বললেন,
‘আজ তাহলে আমরা আসি কবির সাহেব।’
কবির শেখের বুকটা ধক করে উঠল। হাতজোড় করে অসহায় চোখে তাকালেন তিনি। পাত্র প্রলয়ও সাথে এসেছে। সে একবার আড়চোখে ঝুমুরের কান্নাভেজা মুখটার দিকে তাকাল। কবির শেখ আর্তস্বরে মেয়েকে বললেন,
‘তুই ভেতরে যা মা…’
অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষবার বাবার দিকে তাকিয়ে মাথা নত করে প্রকোষ্ঠে চলে গেল ঝুমুর। এবার কবির শেখ আবেগের আতিশয্যে আবিদ চৌধুরীর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন
‘আমার মেয়েটার অবস্থা তো দেখলেনই। আমি যে কতটা নিরুপায়… আপনাদের সিদ্ধান্তটা যদি এখনই জানাতেন…’
কথাটা শেষ করতে দিলেন না আবিদ চৌধুরী। কবির শেখের অসহায়ত্ব তাকে ছুঁয়ে গেছে। তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘আগামী শুক্রবার দাওয়াত রইল আমার বাড়িতে। সেখানেই বসে বিয়ের তারিখটা চূড়ান্ত করব।’
মুহূর্তেই যেন অন্ধকার ঘরে আলো জ্বলে উঠল। কবির শেখের চোখে কৃতজ্ঞতার জল চিকচিক করে উঠল। মেহমানরা বিদায় নিতেই কবির শেখ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। কিন্তু শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না। একটি ধাতব বাটি সজোরে তার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল। সামনে তাকাতেই দেখলেন রাগে কাঁপছেন সালমা।
কবির শেখ এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। গর্জে উঠলেন, ‘কী সমস্যা তোমার? একটা ভালো জায়গায় বিয়ে হচ্ছে, সেটাতেও তোমার জ্বালা?’
সালমা জাহান হিংসেয় অন্ধ হয়ে বললেন, ‘হবে না জ্বালা? এত বড় ঘরে ঝুমুরের বিয়ে হবে কেন? ও সব সুখে থাকলে আমার নিশা কী পাবে? ওকে আমি সুখী হতে দেব না!’
কবির শেখ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ঘৃণা আর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলেন নিজ স্ত্রীর দিকে। কোনো কথা না বলে ধীরপায়ে তিনি সেখান থেকে সরে গেলেন।
অন্যদিকে, বাড়িতে ফিরে মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন আবিদ চৌধুরীর স্ত্রী ঝরণা বেগম। স্বামীর সিদ্ধান্তে তিনি ঘোরতর অসন্তুষ্ট। গুমরা মুখে বললেন, ‘এমন অদ্ভুত পরিবার থেকে আমি বউ আনতে পারব না। জামাই গেলে যেখানে আপ্যায়ন জোটে না, সেখানে আমার ছেলে কেন যাবে?’
আবিদ চৌধুরী স্ত্রীর পাশে বসে নরম গলায় বললেন, ‘আমরা প্রলয়ের জন্য তো ঘর খুঁজছি না বেগম, আমরা খুঁজছি জীবনসঙ্গিনী। মেয়েটা কেমন দেখলে তো? ওই নরকের ভেতর থেকে এমন একটা পদ্মফুল তুলে আনা কি আমাদের দায়িত্ব নয়?’
ঝরণা বেগম নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। আর কোন কথা বাড়ালেন না তিনি। আবিদ চৌধুরী ভুল কিছু বলেননি। তিনি খুঁজ নিয়েছেন। মেয়েটা সত্যিই অনেক ভালো। প্রলয়ের জন্য একদম যোগ্য।
এদিকে প্রলয়ের মন মানছে না। সে বারবার ভাবছে সেই মুখটার কথা যা অশ্রুতে ভেজা ছিল। ছোট বোন মাহার সাহায্যে অনেক কষ্টে ঝুমুরের ফোন নম্বর জোগাড় করল সে। শত চিন্তা করে ভাবল, একটা বার অন্তত কথা বলা দরকার।
কল হতেই ফোনের ওপাশে কর্কশ এক নারী কণ্ঠ ভেসে এল
‘হ্যালো, কে?’
প্রলয় কিছুটা থমকাল। এটা তো ঝুমুরের কণ্ঠ নয়। সে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘ঝুমুর কোথায়?’
ওপাশ থেকে বিদ্রূপের হাসি ভেসে এল। কণ্ঠটি ছিল নিশার। সে তেরিয়া হয়ে বলল, ‘সে তো কাজ করছে। তা আগে বলুন আপনি কে? ঝুমুরের গোপন প্রেমিক? বাবাকে তো বলতেই হচ্ছে তার সাধের মেয়ে আড়ালে কী করছে!’
টাস করে কলটা কেটে গেল। প্রলয়ের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তবে কি সে ঝুমুরকে আরও বিপদে ফেলে দিল? কল দেওয়াটা কি ঠিক হলো? সে অস্থির হয়ে ডাকল, ‘মাহা, শুনে যা!’
মাহা দৌড়ে এল ভাইয়ের রুমে। প্রলয় সবটা খুলে বলতেই মাহার চেহারায়ও দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। এক অজানা আশঙ্কায় দুজনের বুক কেঁপে উঠল। ঝুমুরের ওপর আজ রাতে আর কী তুফান বয়ে যাবে?
প্রলয়ের কণ্ঠে অপরাধবোধ আর উৎকণ্ঠা খেলা করছে। সে অস্থিরভাবে রুমের এপাশ-ওপাশ পায়চারি করতে করতে মাহার দিকে তাকাল। তার দুশ্চিন্তা এখন আকাশচুম্বী।
‘এখন কী করব মাহা? কলটা দিয়ে মনে হয় বড় ভুল করে ফেললাম। ওই মেয়েটা যেভাবে কথা বলল, তাতে ঝুমুরের ওপর দিয়ে কোনো ঝড় বয়ে যাবে না তো?’
ভাইয়ের অস্থিরতা দেখে মাহা বিষণ্ণ মনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পরিস্থিতি যে তাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। কোনো কূলকিনারা না পেয়ে সে ধীরস্বরে বলল,
‘ভাইয়া, আমার মনে হয় সবটা বাবাকে জানানো উচিত। বাবার ব্যক্তিত্ব আর প্রজ্ঞা ছাড়া এই জটিলতা সামলানো সম্ভব নয়।’
প্রলয় এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। মাহার কথায় যুক্তি আছে। আবিদ চৌধুরী শুধু তার বাবাই নন, তিনি একজন বিচক্ষণ মানুষও বটে। ঝুমুরের পরিবারের এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে তাকে রক্ষা করতে হলে বাবার হস্তক্ষেপ এখন অনিবার্য।
প্রলয় লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে সায় দিল, ‘হ্যাঁ, বাবাকেই জানা।
চলবে??
