#গোলকধাঁধা
#পর্ব৪ (শেষ পর্ব)
#রাউফুন
বাইরের ঝোড়ো হাওয়া যেন রুকন শিকদারের অট্টালিকার প্রতিটি দেয়ালে আছড়ে পড়ছে। লিমনের ওয়াশরুমের ভেতর থেকে ভেসে আসা ঝাপটা পানির শব্দ আর লামিয়ার চাপা কান্নার হাহাকার যেন এই বাড়ির দীর্ঘদিনের জমে থাকা মিথ্যের পরিণতির সুর। ইফশি নিজের ঘরে বিছানার এক কোণে বসে জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। রঞ্জন তার পাশে এসে বসল, হাত রাখল ইফশির কাঁধে। ইফশি বুঝতে পারছে, লড়াইটা শেষ হয়েছে, কিন্তু ক্ষতগুলো শুকাতে অনেক সময় লাগবে।
লিমনের জীবনের গল্পটা ইফশি আজ জেনেছে, রঞ্জনের মাধ্যমে। লিমন কোনো ধুরন্ধর অপরাধী নয়, বরং একটি ভাঙা পরিবারের প্রতিনিধি। একটা ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে সে। অর্ধেকটা সময় সে মা, আর অর্ধেক সময় বাবার সঙ্গে থাকে৷ তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ তাকে কেবল ছন্নছাড়া করেনি, বরং মানুষের সম্পর্কের ওপর তার বিশ্বাসটাও ভেঙে দিয়েছিল। সে যখন লামিয়াকে ভালোবেসেছিল, তখন সে চেয়েছিল লামিয়ার মাঝেই নিজের সেই হারানো ‘ঘর’ খুঁজে পেতে। সে জানত না, যাকে সে নিজের জীবনের ধ্রুবতারা ভেবেছে, সে আসলে কেবল টাকার মোহে অন্ধ এক মানবী। লামিয়া লিমনের সেই নিষ্পাপ ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করেনি, আর তাতেই লিমনের ভেতরের সেই কোমল মানুষটা নিষ্ঠুরতায় রূপ নিয়েছিল। বয়সন্ধির এই ভুল তাকে আজীবন বহন করতে হবে৷ জীবনের প্রতিটি মূহুর্তে তাকে আফসোস করেই কাটাতে হবে ভুল মানুষকে ভালোবেসে। সে নিজের মতো নিজের সন্তানকে বড়ো হতে দেবে না। সে যেভাবে ছন্নছাড়া ভাবে বড়ো হয়েছে সেভাবে তার সন্তানকে বড়ো হতে দেবে না। তার সন্তান বাবা মাকে পাবে, সে যেমন পাইনি এরকম সে নিজ সন্তানের সঙ্গে হতে দেবে না। নিজের জীবন সেক্রিফাইজ করে হলেও সে তার সন্তানকে আগলে রাখবে।
ইফশি রঞ্জনের দিকে ফিরে তাকাল। সে নিচু স্বরে বলল, “রঞ্জন, মানুষ যখন ভালোবাসার অভাব বোধ করে, তখন সে হয়তো ভালোবাসার অভিনয় করা মানুষগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেয়। লিমনের জেদটা তো আসলে নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াই ছিল।”
রঞ্জন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “কিন্তু এই লড়াইয়ে সবাই হেরেছে, ইফশি। লামিয়াও, লিমনও।”
ইতিমধ্যে রঞ্জন আর ইফশির ইউএসএ যাওয়ার সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত। সামনের সপ্তাহেই তাদের ফ্লাইট। এই বাড়িতে তাদের আর কোনো পিছুটান নেই, কেবল আছে একরাশ তিক্ত স্মৃতি। রুকন শিকদার আর লিলি বেগম এখন এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় ডুবে আছেন। যে অহংকার আর মিথ্যে দিয়ে তারা সংসার সাজিয়েছিলেন, আজ তা ধুলোয় মিশে গেছে। লামিয়া এখন লিমনের স্ত্রী, কিন্তু তাদের দাম্পত্য জীবনের ওপর ঝুলে আছে অবিশ্বাসের এক বিশাল কালো ছায়া।
পরদিন সকালে ড্রয়িং রুমে সবাই জড়ো হলো। লিমন শান্ত হয়ে সোফায় বসে ছিল। সে লামিয়ার দিকে তাকাল না, শুধু বলল, “আমরা কালই এই বাড়ি ছাড়ছি। আমি নিজের মতো করে সব ম্যানেজ করব।”
লিলি বেগম লামিয়ার কাছে গিয়ে মাথায় হাত রাখতে চাইলেন, কিন্তু লামিয়া ঝট করে সরে গেল। সে আজ বুঝেছে, মা তাকে ভালোবাসেননি, ভালোবাসলে তাকে ঠিকঠাক শিক্ষা দিতো। মিথ্যা আর অহংকারে মোড়ানো একজন মেয়ে বানাতো না। সন্তানদের ভালো মন্দ বাবা মায়ের উপর নির্ভর করে, বাবা মা সন্তানকে যেভাবে গড়ে তুলবে সেভাবেই গড়ে উঠবে তারা। সঠিক প্যারেন্টিং না জানলে সন্তান বিপথে যাবেই। লামিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, “মা, সবকিছুর জন্য তুমিও দায়ী। আমাকে মিথ্যে বলতে শিখিয়েছিলে তুমিই, আমার আজকের এই অবস্থার জন্য তুমিও দায়ী, তুমি আমাকে ভালো মন্দ বোঝার মতো করে তৈরি করোনি৷ তোমার মতো মা দের জন্য ভেতর থেকে কেবল ধিক্কার ছিটকে আসছে, আমি চলে যাবো আর আসবো না এই বাড়িতে।”
লিলি বেগম যেন পাথর হয়ে গেলেন। তার শরীরের প্রতিটি কোষ আজ লজ্জিত। রুকন সাহেব অনেকক্ষণ চুপ থেকে রঞ্জনের দিকে তাকালেন। রঞ্জনের চোখ আজ সজল, কিন্তু সেখানে কোনো ঘৃণা নেই, আছে মুক্তি পাওয়ার তৃপ্তি। রুকন সাহেব বললেন, “তোরা যাচ্ছিস, যা। এই অভিশপ্ত বাড়ি থেকে তোরা মুক্তি পাস, এটাই ভালো।”
ইফশি ব্যাগ গোছানোর সময় দেখল, ড্রয়ারের কোণায় পড়ে আছে সেই ফেইক প্রেগন্যান্সির রিপোর্টের কাগজগুলো। সে সেগুলো ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল। সে জানত, এই কাগজগুলোই ছিল তাদের গোলকধাঁধার কেন্দ্রবিন্দু।
ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এল। রঞ্জন আর ইফশি যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল লিমন আর লামিয়া। লিমনের চোখে এখন আর আগের মতো দাহ্য ঘৃণা নেই, আছে এক ধরনের শূন্যতা। সে ইফশির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। ইফশি মৃদু হাসল। সে জানে, এই বাচ্চাটা হয়তো তাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা নতুন মেরুকরণ তৈরি করবে। লিমন তার সন্তানকে নিজের পরিচয়ে বড় করবে, লামিয়ার জীবনের সব বিলাসিতার স্বপ্ন আজ লিমনের দরিদ্র সংসারের বাস্তবতায় এসে ধাক্কা খাচ্ছে। এটাই হয়তো তার কর্মফল।
এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছাড়ল। ইফশি জানালার কাঁচ দিয়ে তাকিয়ে দেখল, সেই পরিচিত দেশের সবটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। রঞ্জন তার হাতটা শক্ত করে ধরল। ইফশি চোখ বন্ধ করল। সে ভাবল, মানুষের জীবনটাও যেন এক গোলকধাঁধা। আমরা এক জায়গায় হারিয়ে যাই, আবার নতুন পথে বেরিয়ে পড়ার জন্য। ইফশি আর রঞ্জন এখন নতুন দিগন্তে পাড়ি দিচ্ছে। পেছনে ফেলে এল এমন এক পরিবার, যারা মিথ্যের অট্টালিকা বানিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মিথ্যেই তাদের ধ্বংসের কারণ হলো।
রঞ্জন বিড়বিড় করে বলল,”তাদের ছাড়া, আমরা কি শান্তিতে থাকতে পারব, ইফশি?”
ইফশি রঞ্জনের কাঁধে মাথা রাখল। আকাশের বিশালতার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “শান্তি তো বাইরে নেই, রঞ্জন। শান্তি থাকে নিজের ভেতরে, যদি সেখানে মিথ্যের কোনো জায়গা না থাকে। আমরা আজ মুক্ত। এটাই আমাদের শান্তি।”
প্লেন যখন মাটি থেকে উপরে উঠতে শুরু করল, ঢাকা শহরটা ছোট হতে হতে এক টুকরো তারার মতো মনে হলো। নিচে পড়ে রইল লামিয়া আর লিমনের ভাঙা সংসার, লিলি বেগমের অনুশোচনা আর রুকন শিকদারের নিস্তব্ধতা। ইফশি আকাশের নীলিমার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গোলকধাঁধার পথ শেষ হয়েছে, শুরু হয়েছে এক নতুন জীবনের ইশারা।
ইফশির মনের ভার যেন হালকা হয়ে গেছে। সে জানে, অতীতে সে কী ছিল আর আজ কী হয়েছে। সে আর সেই আগের নরম মনের ইফশি নেই, যে কেবল অন্যের কথায় চলত। সে আজ শিখিয়েছে, মিথ্যের পাহাড়ের চেয়ে সত্যের ছোট এক টুকরো পাথরও অনেক বেশি মজবুত।
দূরের আকাশে সূর্যটা উদয় হচ্ছে। নতুন আলোর তেজ ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। ইফশি রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। এই আলিঙ্গনে আজ কোনো অভিনয় নেই, কোনো নাটক নেই। আছে কেবল ভালোবাসা, যাতে কোনো গোলকধাঁধা নেই।
ইফশির মনে হলো তার বুকের ভেতর থেকে একটা পাথর নেমে গেল। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তেই তার মনে পড়ে গেল ড্রয়িং রুমের সেই শেষ দৃশ্যটি। যে বাড়িতে সে তিলে তিলে অপমান সয়েছিল, আজ সেই বাড়িটি ধুলোয় মিশে যাচ্ছে, এটা কোনো আনন্দ নয়, বরং এক দীর্ঘ নীরবতার আখ্যান। রঞ্জন যখন এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে তার ল্যাপটপটা ব্যাগ থেকে বের করল, তার চোখে মুখে এক ক্লান্তির ছাপ। সে ইফশির দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু এই হাসিতে সেই আগের মতো স্বচ্ছলতা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত সতর্কতার ছাপ।
রঞ্জন বিড়বিড় করে বলল, “ইফশি, আমরা কি সত্যিই সব ফেলে এলাম? আমার মা-বাবা… তাদের ক্ষমা করা কি অসম্ভব?”
ইফশি জানালার বাইরে তুষারপাতের অপেক্ষায় থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ধীর স্বরে উত্তর দিল, “ক্ষমা পাওয়ার মতো মানসিক পরিস্থিতি তাদের কখনোই ছিল না, রঞ্জন। তারা কেবল ক্ষমতা আর দম্ভ চিনেছিল। আমরা যদি আজ না বের হতাম, তবে এই গোলকধাঁধায় আমরাও একদিন নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতাম।”
ইতিমধ্যে ঢাকা শহরে লিমনের সংসারে এক ভিন্ন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। লিমন এখন আদ তার বাবা মায়ের কাছে থাকে না। সে নিজেই একটা সবজির ব্যবসা শুরু করেছে তার জমানো টাকা দিয়ে। এক কামড়ার ছোট ঘর ভাড়া নিয়েছে। লামিয়া আজ কোনো দামি পোশাক পরেনি, সে এক সাধারণ সুতির শাড়ি পরে রান্নাঘরের ধোঁয়াটে পরিবেশে বসে আছে। লিমন দেখল, তার মায়ের সাথে বাবার সেই বিচ্ছেদের দিনগুলোর প্রতিচ্ছবি যেন লামিয়ার চোখে ভেসে উঠছে। লিমন বুঝতে পারল, সে যা চেয়েছিল,প্রতিশোধ, তা সে পেয়েছে, কিন্তু সেই প্রতিশোধের আগুনে সে নিজেও দগ্ধ হচ্ছে।
লিমন আলমারি খুলে একটা পুরনো ডায়েরি বের করল। সেটা তার বাবার ডায়েরি, যেটা সে বিচ্ছেদের পর চুরি করে এনেছিল। সেখানে তার বাবা লিখেছিলেন, ‘মানুষ যখন অন্যকে ছোট করে সুখী হতে চায়, সে আসলে নিজের ভেতরের শূন্যতাকেই বড় করে তোলে।’
লিমন ডায়েরিটা বন্ধ করে লামিয়ার দিকে তাকাল। সে আজ আর চিৎকার করবে না। সে লামিয়াকে ডেকে শান্ত স্বরে বলল, “লামিয়া, আমরা কি শুরু থেকে শুরু করতে পারি? শুধু এই বাচ্চার কথা ভেবে? আমি তোমার টাকা চাই না, আর তুমি আমার দারিদ্র্যের দিকে তাকিয়ে কষ্ট পেয়ো না। আমি জানি না, তোমাকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারবো কি না। কিন্তু আমি চাই না আমার সন্তান আমার মতোই বাবা মা ছাড়া বড়ো হোক, একটা অসুস্থ পরিবেশ পাক। আমি চাই সে একটা সুন্দর, সুস্থ পরিবার পাক। তুমি পারবে মানিয়ে নিতে?”
লামিয়া চমকে উঠল। সে লিমনের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর ঘৃণা নেই, আছে এক ধরনের অসহায় আত্মসমর্পন। লিমনের এই পরিবর্তন লামিয়াকে যেন নতুন করে ভাবালো। সে তো চেয়েছিল দামী দামী গিফট, চেয়েছিল মানুষের চোখের মণি হয়ে থাকতে। কিন্তু আজ, এই জরাজীর্ণ ঘরে বসে সে বুঝতে পারছে, সত্যিকারের দামি জিনিসগুলো কোনো শপিং মলে পাওয়া যায় না। সে নিচু গলায় বলল, “লিমন, আমি খুব ভুল করেছি। ইফশি ভাবি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল। তুমি আমার স্বামী, এখন তুমি আমাকে যেভাবে রাখবে সেভাবেই থাকবো। আমি আমাদের সন্তানকেও ভালো ভাবে বড়ো করবো। আমার মায়ের মতো ভুল আমি করবো না। আমাকে ক্ষমা করে দিও, আমি লোভে অন্ধ ছিলাম। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি আমি কতো বড়ো ভুল করেছি!”
ইফশির তার ফোনটা বারবার কাঁপছে। ওপাশ থেকে লিলি বেগমের ফোন। ইফশি রঞ্জনকে না জানিয়েই ফোনটা ধরল। ওপাশ থেকে লিলি বেগমের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনি ভেঙে পড়া গলায় বললেন, “ইফশি, তোমরা সবাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলে? তোমাকে ছাড়া এ বাড়িটা একদম শূন্য মনে হচ্ছে। আমি জানি আমি অন্যায় করেছি, তোমার ওপর দিয়ে যে অত্যাচার চালিয়েছি, তার কোনো মাফ হয় না। কিন্তু আমি কি একটু ক্ষমা পেতে পারি?”
ইফশি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। সে জানত, এই ক্ষমা চাওয়াটা পরিস্থিতির শিকার, মনের ভেতর থেকে নয়। তবুও সে শান্ত স্বরে বলল, “মা, ক্ষমা তো আমি আগেই করে দিয়েছি। কিন্তু ক্ষমা মানেই যে আবারও সেই একই জায়গায় ফিরে যাওয়া, তা কিন্তু নয়। আপনারা নিজেদের খেয়াল রাখবেন। আমরা নির্দিষ্ট একটা এমাউন্ট পাঠিয়ে দেবো। আমি আসার আগে একজন কে ঠিক করে এসেছি। সেই আপনাদের দেখা শোনা করবে। ভালো থাকবেন মা।”
ইফশি ফোনটা রেখে দিল। সে রঞ্জনের কাঁধে মাথা রাখল। রঞ্জন জানত ইফশি কার সাথে কথা বলছে। সে ইফশির হাতটা ধরল। রুমের জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখা গেল সূর্যটা পুরো আকাশ রাঙিয়ে দিয়েছে। নতুন দিনের আলো। ইফশি চোখ বন্ধ করল। সে মনে মনে ভাবল, আপস এন্ড ডাউন তো জীবনেরই অংশ। কখনও আমরা ভুল করি, কখনও মানুষ আমাদের ভুল পথে ঠেলে দেয়। কিন্তু আসল মুক্তি হলো, সেই গোলকধাঁধার দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসার সাহস দেখানো।
ইফশি রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলল, “রঞ্জন, জানো? আমার মনে হয় আমরা শুধু বাড়ি ছাড়িনি, আমরা আমাদের পুরোনো সত্তাটাকেও ছেড়ে এসেছি। সেই ইফশি আর রঞ্জন, যারা সবসময় অন্যের কথায় চলত, তারা আজ মৃত। আমরা আজ নতুন।”
রঞ্জন হাসল। সে বলল, “নতুন জীবনের শুরুটা তাহলে এভাবেই হোক। কোনো মিথ্যে ছাড়া, কোনো নাটক ছাড়া।”
দূরে আমেরিকার নীল আকাশটা যেন তাকে হাতছানি দিচ্ছে। ইফশি জানে, এই গোলকধাঁধায় আর কোনোদিন সে পা রাখবে না। সে তার নিজের ভাগ্য নিজেই গড়েছে, আর সেটা কোনো মিথ্যের ওপর নয়, বরং স্বচ্ছ কাঁচের মতো সত্যের ওপর। লামিয়া আর লিমনের গল্পটা হয়তো তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কিন্তু ইফশি তার গল্পের সমাপ্তি টেনেছে নিজের শর্তে।
রাত নামল। আমেরিকার এই শহরে রাত মানেই একরাশ কোলাহল। ইফশি তাদের অ্যাপার্টমেন্টের জানালার সামনে দাঁড়াল। অনেক দূরে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে তার বাবা-মা, ভাই, শাশুড়ি, সবাই আছে। কিন্তু তারা এখন আর ইফশির জীবনের নিয়ন্তা নয়। ইফশি ডায়েরির শেষ পাতায় লিখে রাখল, “মিথ্যে দিয়ে গড়া ঘর একদিন ভাঙবেই, কিন্তু সত্য দিয়ে গড়া ক্ষতগুলোই আমাদের মানুষ হিসেবে পূর্ণতা দেয়।”
রঞ্জন তার পাশে এসে দাঁড়াল, তার হাতে এক কাপ গরম কফি। ইফশি কফিটা হাতে নিয়ে উষ্ণতা অনুভব করল। বাইরের কনকনে ঠান্ডায় এই সামান্য উষ্ণতাই যেন জীবনের সব আনন্দ। তারা আজ একে অপরের সাথে, আজীবনের জন্য থাকবে, এই তো শান্তি।
ইফশি আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু হাসি দিল। সে জানে, শান্তি বাইরের চাকচিক্যে নেই, শান্তি আছে নিজের বিবেকের আয়নায়। আজ তার বিবেক পরিষ্কার।
#সমাপ্ত।
