#গোলকধাঁধা
#পর্ব২
#রাউফুন
রাতের খাবারের টেবিলে তখন এক থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।চামচের টুংটাং শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। রঞ্জন খাবার সরিয়ে রেখে ধীর গলায় বলল,
“তোমরা আমার বউকে নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কত নালিশ, দোষ নিয়ে আমার কাছে চলে আসো। আমার বউ কিন্তু কখনোই তোমাদের নিয়ে কিছু বলে না।”
রঞ্জনের কথায় লিলি বেগমের হাতের নলাটা প্লেটে রেখে অগ্নিদৃষ্টিতে রঞ্জনের দিকে তাকালেন। ঠোঁট বেঁকিয়ে এক চরম তাচ্ছিল্যের সাথে তিনি বলে উঠলেন,
“আমাদের নিয়ে কি বলবে? আমরা কি তোর বউয়ের মতো নাকি? দাইয়্যুজ বউ তোর এটা যত তারাতাড়ি মানতে পারবি ততোই ভালো!”
মায়ের মুখ থেকে এমন কুরুচিপূর্ণ কথা শুনে রঞ্জনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে সবাইকে অবাক করে দিয়ে মুখ খুলল লামিয়া। যে লামিয়া সবসময় মায়ের ডান হাত হয়ে ইফশিকে হেনস্তা করার ফন্দি আঁটে, সেই আজ মায়ের মুখের ওপর বলে বসল,
“মা, ভাবিকে নিয়ে তোমার এতো সমস্যা কেন? ভাইয়া তো ঠিকই বলেছে। ভাবি আমাদের সঙ্গে কি এমন করেছে যে তাকে দাইয়্যুজ বলছো?”
রঞ্জনের বাবা রুকন শিকদার খাবারের গ্রাস মুখে নিতে গিয়েও থেমে গেলেন। লিলি বেগম যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে তার নিজের গর্ভের সন্তান তার বিপক্ষে কথা বলছে। রাগে অন্ধ হয়ে তিনি লামিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝপ করে ওর কান টেনে ধরলেন। দাঁতে দাঁত চেপে লিলি বেগম বললেন,
“এই কাল সাপ। তুই আমার মেয়ে হয়ে ঐ মেয়ের হয়ে কথা বলছিস? লজ্জা করে না?”
লামিয়া যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। কানের লতিটা লাল হয়ে গেছে তার। সে মায়ের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে করতে মৃদু আর্তনাদ করে বললো,
“আঃ মা ছাড়ো তো। ব্যথা পাচ্ছি।”
লিলি বেগম যেন আজ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন। তার মনে হচ্ছে ইফশি কোনো জাদুমন্ত্র দিয়ে তার সাজানো সংসার আর সন্তানদের নিজের কব্জায় নিয়ে নিয়েছে। তিনি আরও জোরে কান মুচড়ে দিয়ে বললেন,
“নাহ ছাড়বো না। এই মেয়ে কি এমন জাদু জানে যে তোরা সবাই ওর দলে নাম লেখাচ্ছিস?”
লামিয়া এবার মায়ের হাতটা একরকম ঝটকানি দিয়ে সরিয়ে দিল। ওর চোখেমুখেও এখন বিদ্রোহের ছাপ। সে নিজের কান ডলতে ডলতে ক্ষোভের সাথে বলল,
“মা, এতো দিন আমি বুঝিনি। এখন বুঝতে পারি তুমি যা করো সেসব অন্যায়। ভাবিকে অযথা কথা শোনাও। তাকে কথা শোনানো তোমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকে তোমার জন্য ভাইয়া ভাবিকে মেরেছে। তবু তোমার শান্তি হয়নি?”
লামিয়ার এই অভাবনীয় আচরণে ইফশি আর রঞ্জন যেনো খানিক টা বিস্মিত হলো। ইফশি ডালের বাটিটা রঞ্জনের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল, সেই অবস্থাতেই সে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। দুজন দুজনার দিকে তাকালো। রঞ্জনের চোখের চাউনিতে হাজারটা প্রশ্ন, আর ইফশির চোখে গভীর সংশয়। তারা নিঃশব্দে চোখাচোখি করে কথা বললো। রঞ্জন যেন ইশারায় জিজ্ঞেস করল, “বোঝালো আজ সূর্য কোন দিকে উঠেছে? এমনি সময় তো লামিয়া মায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাকে কথা শোনায়!”
ইফশি পাল্টা ইশারায় বোঝাল সে নিজেও অন্ধকারে আছে। তবে লামিয়ার এই পরিবর্তনের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় রহস্য আছে। ইফশি ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। সে বোধহয় কিছুটা আচ্ করতে পারছে, এটা সম্ভবত সেই ‘ফেইক প্রেগন্যান্সি’র নাটকেরই প্রথম অংক। লামিয়া এখন ইফশিকে নিজের কব্জায় রাখার জন্য তাকে খুশি করতে চাইছে। ইফশি শান্ত গলায় রঞ্জনকে থামানোর চেষ্টা করে বললো,
“থাক খাওয়ার সময় কিছু বলো না রঞ্জন। বাবাকে শান্তিতে খেতে দাও!”
ইফশির এই ভালো মানুষি যেন রুকন শিকদারের বিরক্তির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল। তিনি এতক্ষণ গোগ্রাসে খাচ্ছিলেন, এবার বিরক্ত হয়ে হাত ঝাড়া দিয়ে বললেন,
“তোমার জ্বালায় শান্তিতে খেতে পারি কই? বজ্জাত মেয়ে কোথাকার। মানুষ দেখেছি তোমার মতো এমন ধানি লংকা এক পিসও দেখিনি!”
বাবার এমন অপমানজনক কথা রঞ্জন আর সহ্য করতে পারল না। সে চেয়ার ছেড়ে প্রায় দাঁড়িয়ে পড়ে বলল,
“বাবা! তুমি আমার বউকে এভাবে বলতে পারো না!”
রুকন শিকদার এবার ফেটে পড়লেন। তিনি ছেলেকে শাসনের সুরে বললেন,”লজ্জা করে না তোর? বাপ মায়ের সামনেই বার বার বউ বউ করে মুখে ফ্যানা তুলছিস!”
রঞ্জন যেন আজ জেদ ধরেছে। সে কোনো লুকোচুরি না করে সরাসরি সবার চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,
“নাহ লজ্জা কেন করবে? আমার বউকে আমি বউ বলবো না তো অন্য কেউ বলবে? তোমরাই তো বিয়ে করিয়ে আনিয়েছো। ভুলে গেলে?”
রুকন সাহেব তাচ্ছিল্য করে ঠোঁট বাকিয়ে বললেন,”সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিলো এই মেয়েকে তোর বউ করে আনা!”
রঞ্জনের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। সে ঘর কাঁপিয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়েই বলল,
“আমি তা মনে করি না। আমার জন্য তো সে সেরাই! তোমরাই বলতে, তোমরা আমার জন্য যায় ই করবে সেটাই সেরা। বাকি সব সেরা হলে আমার বউ কেন নয়?”
ছেলের মুখে মুখে তর্ক শুনে রুকন শিকদার তাকে গালি দিয়ে উঠলেন,”বেহায়া! বিয়ে করে লাজ লজ্জা সব বিসর্জন দিয়েছ?।”
রঞ্জন এক মুহূর্ত দেরি না করে পাল্টা জবাব দিল,
“একটু না অনেকটা বেহায়া হতেও রাজি আমি আমার বউয়ের জন্য!”
রুকন শিকদার পরিস্থিতি আর বাড়াতে চাইলেন না। তিনি মুখ গুঁজে খাওয়াই মনোযোগ দিলেন। রঞ্জন এক মুহূর্ত স্থির থেকে নিজের পকেট থেকে একটা খাম বের করে টেবিলে রাখল। তারপর বেশ গর্বের সাথে এবারে বললো,
“ইউএস এ আমার চাকরিটা হয়ে গেছে বাবা!”
এক নিমেষে ডাইনিং রুমের আবহাওয়া বদলে গেল। কলহ-বিবাদ সব যেন উধাও হয়ে গেল মুহূর্তের জন্য। রুকন শিকদারের মুখ চকচক করে উঠলো। তার চোখে এখন টাকার ঝিলিক। তিনি খুশি মনে বললেন, “বাহ, বেশ তো। কবে যাবি? স্যালারি কত হবে রে?”
লিলি আর লামিয়ারও সেইম অবস্থা। দুজনের মুখে যেনো বিদ্যুৎ খেলানো চমক। বিদেশ যাওয়া মানেই কাড়ি কাড়ি টাকা, মান-সম্মান বাড়বে, সবার নজর তাদের দিকে আলাদা ভাবেই পড়বে। সবাই আলাদায় দাম দেবে। লিলি বেগম মনে মনে ভাবলেন, যাক এবার আপদটাকে তিনি নিজের মতো পরিচালনা করবে, চাইলে তার চোখের সামনে থেকে সরাতেও পারবে ছেলে বিদেশ গেলে। ছেলেটা দু হাতে কামাবে, ওকে বিগড়ানো ঠিক হবে না। কিন্তু তাদের এই আনন্দ বিষাদে পরিণত হতে তিন সেকেন্ডও লাগল না।! রঞ্জন শান্ত গলায় বোমাটা ফাটালো,
“ইফশির ভিসা প্রসেসিং শেষ, আমাদের সামনের সপ্তাহে ফ্লাইট!”
পুরো ঘরজুড়ে যেন এক ভৌতিক নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সমস্বরে বলে উঠলো, “কিহ?”
এবারে যেনো লামিয়া, সহ বাকি দুজনের মুখেও আধার নেমে গেলো। রুকন সাহেব হুংকার দিয়ে বললেন,”তোর বউ কেন যাবে বিদেশ? তুই আমাদের অনুমতি নিয়েছিস?”
রঞ্জন নিজের সিদ্ধান্তে অটল। সে কঠিন স্বরে বলল,
“অনুমতি নেওয়ার কি আছে বাবা? আমি সব দিক থেকেই আমার বউয়ের সব সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। আমিই একমাত্র গার্ডিয়ান তার। তাহলে তার বিষয়ে তোমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে যাবো কোন দুঃখে?”
লিলি বেগমের মাথায় যেন বাজ পড়ল। ইফশি বিদেশ চলে গেলে তার ফয়-ফরমায়েশ কে খাটবে? আর ছেলেটা তো পুরোপুরি তার হাতের বাইরে চলে যাবে। তিনি চিৎকার করে বললেন,
“তোর বউ কোথাও যাবে না। শেষ কথা আমার! যদি যায় তাহলে আমি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো আজীবনের জন্য!”
লিলি বেগম যেন কথাটা বলে ক্ষান্ত হলেন। তিনি তার তুরুপের তাসটা খেললেন। কিন্তু এর মধ্যেই লামিয়া অদ্ভুতভাবে চমকে উঠে বললো,
“নাহ ভাবি গেলে আমার কি হবে?”
লিলি বেগম নিজের মেয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। তার মনে হচ্ছে মেয়েটা বুঝি পাগল হয়ে গেছে। তিনি বিরক্তির সাথে বললেন,
“এই তুই আবার ঐ মেয়ের হয়ে কথা বলিস? দেখছিস না কি করছে এই মেয়ে? নির্ঘাত আমার ছেলেটাকে কালো জাদু করেছে। নাহলে আমার সোনার টুকরা ছেলের এই হাল কেন?”
লামিয়া দেখল পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ইফশি যদি বিদেশ চলে যায়, তবে তার গর্ভের বাচ্চার জন্য নাটক আর লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচার রাস্তা সব বন্ধ হয়ে যাবে। তাকে যেকোনো মূল্যে ইফশিকে এই বাড়িতে আটকাতে হবে। সে মরিয়া হয়ে বললো,
“আহ থামো তো তোমরা।”
খানিক থেমে ফের পরিবারের বড়দের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বললো,”তোমাদের একটা খুশির খবর দেওয়ার আছ! ভাবি লজ্জা পাচ্ছিলো তাই আমিই বলছি!”
লিলি বেগম ঝারি দিয়ে বললেন,
“এই তুই ছোটো মানুষ তুই কেন বড়ো দের মাঝে কথা বলছিস?”
লামিয়া অনুনয় করে বলল,”আহা শোনোই না।”
রুকন সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন,”বল!”
লামিয়া এক মুহূর্ত নাটকীয় নীরবতা বজায় রেখে বিস্ফোরক তথ্যটি দিল,”ভাবি, ভাবি তো প্রেগন্যান্ট!”
ইফশি যেন আকাশ থেকে পড়লো মুহুর্তের মধ্যে। ওর হার্টবিট যেন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। তার হাত থেকে পানির গ্লাসটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে হতভম্ব হয়ে রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো,”আমি প্রেগন্যান্ট? কখন থেকে? কিভাবে? আমি কেন জানি না?”
রঞ্জন নিজেও থতমত খেয়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে না এটা কোনো নতুন চাল কি না। সে চাপা স্বরে ইফশির কানে ফিসফিস করে বললো,
“আমি কিভাবে জানবো? তুমি বলবে না আমাকে? আমাকে না বলে লামিয়াকে কেন বলেছো?”
ইফশি দিশেহারা হয়ে নিজের মনেই বিড়বিড়িয়ে বললো,”আমিই তো জানতাম না আমি প্রেগন্যান্ট!”
লামিয়া দূর থেকে ইফশিকে চোখ টিপে ইশারায় বোঝালো। সেই ইশারার মানে পরিষ্কার, “চুপ থাকো ভাবি, আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাও।”
ইফশি বুঝতে পারল, এখন সত্যিটা বললে সব শেষ হয়ে যাবে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আমতাআমতা করে বললো,
“হেহে হ্যাঁ আমি, আমি তো প্রেগন্যান্ট!”
পুরো টেবিলের সবাই কেমন করে তাকিয়ে রইলো ইফশির দিকে। লিলি বেগমের মুখটা তেতো হয়ে গেল, কিন্তু রুকন শিকদারের চেহারা মুহূর্তেই পালটে গেল। খুশিতে ডগমগ হয়ে তিনি প্রথমবার ভালো ভাবে কথা বললেন ইফশির সঙ্গে,
“আরেএ আগে বলবে তো। আমি দাদু হবো এর চাইতে খুশির খবর আর হয় নাকি? শোনো মা, এখন থেকে তোমার যখন যা লাগবে আমাকে সব বলবে আমি এনে দেবো!”
রুকন সাহেবের এই পক্ষপাতিত্ব লিলি বেগমের সহ্য হলো না। তিনি রুকন সাহেব কে খোচা দিয়ে হিংসে মাখা স্বরে বললেন,
“তোমার আবার কি হলো? আমিও মা হয়েছি, আমার বেলায় তো এতো খুশি হওনি! এর বেলায় কেন?”
রুকন শিকদার একগাল হেসে ইফশির দিকে পরম মমতায় তাকালেন। লিলি বেগমের ঈর্ষাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন
“আরে তুমি বুঝবে না। দাদু হওয়ার আনন্দ বাবা হওয়ার চাইতেও অনেক বেশি!”
খাবার টেবিলে এক অদ্ভুত শান্তি ফিরলেও ইফশির ভেতরে অশান্তির আগুন জ্বলছে। সে জানে, এই মিথ্যের জাল তাকে কোথায় নিয়ে যাবে তাই এই মিথ্যাটাকে সে বাড়তে দিতে পারে না। সে আর রঞ্জন একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাদের সেই দৃষ্টিতে হাজারো অনাগত ঝড়ের সংকেত। সে দম নিয়ে বললো,”আমি প্রেগন্যান্ট এই কথাটা আমাকে স্বীকার করতে বলেছে লামিয়া নিজেই। মূলত আমি প্রেগন্যান্ট নয়! কি তাই না লামিয়া?”
#চলবে….
