#গোলকধাঁধা
#পর্ব১
#রাউফুন
“আমার ক্লাস নাইনে পড়া ননদ প্রেগন্যান্ট এই কথা পাড়াপ্রতিবেশি জানলে কি হবে ভাবতে পারছিস?”
কথাটা শুনেই কিয়ারা বিষম খেলো। সে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা যেন কয়েক শতাব্দীর চেয়েও দীর্ঘ মনে হলো। কিয়ারা স্তব্ধ গলায় প্রশ্ন করল,”হায় আল্লাহ কি বলিস? এতো বড়ো কান্ড ঘটে গেছে? তোর শাশুড়ী তো কড়া ধাচের মানুষ। তবুও এতো কড়াকড়ির মাঝে এমন কিছু করলো? বড়ো শেয়ানা মেয়ে তো। অন্যের মেয়েকে যা নয় তা বলে এদিকে নিজের মেয়ের ই ঠিক নেই? ছিঃ তোর ননদ?”
রেস্টুরেন্টের ভেতর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হিমশীতল হাওয়া থাকা সত্ত্বেও ইফশির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। উল্টোদিকে বসে থাকা কিয়ারা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছে ইফশির দিকে। ক্যাফেটেরিয়ার আবছা আলো আর কফিশপের মৃদু গুঞ্জন ছাপিয়ে ইফশির কন্ঠস্বর যেন এক অশুভ মেঘের মতো মূর্ত হয়ে উঠল। ইফশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধরা গলায় বলল, “শেয়ানাই বটে। ভাবি হিসেবে আমার তো দায়িত্ব থেকেই যায়?”
“তো এখানে তোর কি করার আছে ইফশি? বাসায় বলে দে। পরে আবার এর দায় কিন্তু তোকে নিতে হবে। বলবে তুই সব জেনে শুনেও কেন বলিস নি! তুই হিংসে করেছিস, ইচ্ছে করে তোর ননদের ক্ষতি করেছিস!”
ইফশি অসহায়ের মতো মাথা নিচু করল। টেবিলের ওপর রাখা ন্যাপকিনটা সে বারবার মুচড়ে চলেছে। বিমর্ষ মনে ইফশি বলতে শুরু করল,
“আমার কিছুই করার নেই। বাচ্চার বয়স তিন মাস। এখন এবোর্ট করানো যাবে না। আবার নিজেকে শেষ করে দেবে এমন হুমকিও দিয়েছে। দেখ, আমার ননদের বয়স কম, এখন লোক জানাজানি হওয়া মানে বুঝিস? তাই ফেইক প্রেগন্যান্সির রিপোর্ট বানিয়েছে আমার ননদ তার বয়ফ্রেন্ড এর সঙ্গে মিলে। ওটাকে আমার বাচ্চা বানাবে৷ বাড়িতে বলবে আমি প্রেগন্যান্ট! যখন ওর বাচ্চা হবে সেটা আমাকে দেবে। বাড়িতে জানবে ওটা আমার ই বাচ্চা।”
কিয়ারা যেন এবার বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এই টুকু মেয়ের পেটে পেটে এতো বুদ্ধি? শেয়ানা না হলে কি আর এই বয়সে এসব করে? সে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলো,”তো বাসায় যদি টের পায়? তারপর? কি হবে?”
ইফশি শুন্য দৃষ্টিতে জানালার ওপাশের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহল ওর কানে পৌঁছাচ্ছে না। সে যান্ত্রিক গলায় বলল,”সে-সব মেয়ের ভাবা। ও বাসায় বলবে, ও হোস্টেলে থাকবে। ওর আলাদা কোচিং আর প্রাইভেট পড়তে হলে হোস্টেলে থেকে পড়া শেষ করতে হবে। নাহলে ও ভালো রেজাল্ট করতে পারবে না।”
কিয়ারা এবার সত্যিই চিন্তিত হয়ে উঠল। একটা মিথ্যে ঢাকতে গিয়ে কত বড় একটা বিপদের পথে পা বাড়াতে যাচ্ছে ইফশি, তা ভেবে সে আতঙ্কিত। সে কপালে হাত দিয়ে বলল,
“কিন্তু এরপর কি হবে ভাবছিস? তোর যখন পেট না দেখা যাবে? তুই তো আর সত্যিই প্রেগন্যান্ট না!”
ইফশি ম্লান হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে শুধু একরাশ তিক্ততা। সে উত্তর দিল,
“আমাকে ফেইক বেইবি বাম্প কিনে দিবে ননদ।”
কিয়ারা সোজা হয়ে বসল। ওর চোখেমুখে বিস্ময় আর ঘৃণা দানা বাঁধছে। নবম শ্রেণিতে পড়া একটা কিশোরী এত ভয়ংকর পরিকল্পনা কী করে সাজাতে পারে, তা ভেবে ও শিহরিত। সে বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে বলল,
“আল্লাহ বলিস কি? এইটুকু মেয়ে এমন ধুরন্ধর? এতো চিকন বুদ্ধি রাখে ক্যামনে? আমি নিশ্চিত এর পেছনে এই মেয়ের বয়ফ্রেন্ডের হাত আছে। ঐ ছেলেই সব করাচ্ছে।”
ইফশি মাথা চেপে ধরল। ওর ভেতরে এক তীব্র যন্ত্রণা দানা বাঁধছে। যেন সারা জগতের ভার ওর একার কাঁধের ওপর চেপে বসেছে। সে বিমর্ষচিত্তে বলল,”জানি না। এখন আমার মাথা ব্যথা করছে কিয়ারা!”
কিয়ারা রাগ আর সহমর্মিতা মেশানো গলায় বলল,
“তুই কেন এসবে রাজি হলি? ঐ মেয়ের তো মরে যাওয়াই উচিত। মান সম্মান খুইয়েছে এই মেয়ে।”
ইফশি সামাজিক মর্যাদা আর একটা জীবনের অপমৃত্যুর ভয়ে সে আজ খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করছে। বলল,
“রাজি না হয়ে উপায় আছে? মেয়ে তো মরতে গেছিলো! এখন আমি রাজি না হলে মরে যাবে। আমি ঐ অনাগত বাচ্চার কথা চিন্তা করেই আরও এমন বেকায়দায় পড়েছি।”
কিয়ারা দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকল। সে জানে ইফশি বড় বেশি আবেগী, বড় বেশি মায়াবতী। কিন্তু এই সর্বনাশা মায়ার পরিণাম কী হতে পারে, তা ভেবে সে গভীর উদ্বেগে ডুবে গেল। সে বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর গলায় বলল,
“আচ্ছা, বাসায় যা। এটা নিয়ে আর কথা না বলায় ভালো। কিভাবে কি ম্যানেজ করবি ভেবে চিনতে আগাস। আমি তিন টে পার্সেলেরও দাম দিয়ে দিয়েছি।”
“এটার কিন্তু দরকার ছিলো না। আমার কাছে টাকা ছিলো।”
“তো? থাকলেই তোকে দিতে দেবো আমি? বেশি কথা বলিস না। বাসায় যা।”
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসা মাত্রই রোদের তপ্ত তাপ ইফশির চোখেমুখে বিঁধতে লাগল। মাথার ওপর গনগনে সূর্য যেন ওর জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে উপহাস করছে। ইফশি রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে রিকশা নিলো। রিকশার চাকায় ঘুরতে থাকা ধুলিকণাগুলোর মতো ওর চিন্তাগুলোও বিশৃঙ্খল।
বাসার সদর দরজায় চাবি ঘুরাতেই একরাশ ভ্যাপসা গরম আর গুমোট পরিবেশ ওকে অভ্যর্থনা জানালো। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই শাশুড়ী লিলি বেগমের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর তীরের মতো ওর দিকে ধেয়ে এলো। লিলি বেগম সোফায় বসে হাতপাখা নাড়ছিলেন, ইফশিকে দেখেই তিনি চোখমুখ কুঁচকে বললেন,
“এখন তোমার আসার সময় হলো? আমরা দুপুরে খাবো না? সবাই না খেয়ে আছি। তোমার শ্বশুর, তোমার ননদ। তুমি নিজে তো রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে এসেছো মনে হয়। আমাদের কথা একবারও ভাবলে না?”
ইফশির পা যেন আর চলছে না। শরীর আর মনের ক্লান্তিতে সে ভেঙে পড়ছে। লিলি বেগমের এই নিত্যনৈমিত্তিক অপবাদ এখন ওর সয়ে গেছে। সে নিঃশব্দে ব্যাগ থেকে তিন প্যাকেট খাবার বের করে টিপয়ের ওপর রাখল। খাবারের প্যাকেটের সুঘ্রাণে ঘরটা ভরে উঠলেও ইফশির মনটা তখন বিষাদে আচ্ছন্ন। সে মরা গলায় বললো,
“আমি খুব টায়ার্ড মা। আপনারা খেয়ে নিন। এখন আমার রান্না করতে ইচ্ছে করছে না!”
নিজের রুমে ঢুকেই ইফশি ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। ফ্যানটা ফুল স্পিডে ছেড়ে দিয়েও ওর শরীরের অস্থিরতা কমছে না। ওর মাথায় কেবল একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। ইফশি এখনো বুঝতে পারছে না৷ ননদ বাসায় কিছু বলেছে কি না। হইতো তার স্বামী এলে বলবে।
জানালার কার্নিশে একটা চড়াই পাখি ডাকাডাকি করছে। বিকেলের ম্লান আলো সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। ইফশি ভাবল, এক কিশোরীর ভুল আর জেদের জন্য তাকে এভাবে মিথ্যের বোঝা বইতে হবে?
সন্ধ্যায় রঞ্জন যখন বাড়ি ফিরলো তখন ইফশি শুয়ে আছে। সারা বিকেলের বিষণ্নতা আর রাতের রান্নার ঝামেলা চুকিয়ে সে যখন বিছানায় গা এলিয়েছে, তখন তার শরীর যেন পাথরের মতো ভারী মনে হচ্ছে। রাতের রান্না সেরে ক্লান্তিতে সবেই শুয়েছে সে। রঞ্জন ঘরে ঢুকেই গুমোট ভাব অনুভব করল। সে গলার টাই ঢিলে করতে করতে বিরক্ত গলায় বললো,
“ভোর সন্ধ্যায় এমন শুয়ে আছো কেন? ওদিকে মাকে দেখলাম রান্না ঘরে বকবক করছেন। গরমে কাহিল তিনি। কাজ না করো, মাকে একটু সাহায্য করে দাও অন্তত।”
ইফশি তড়াক করে উঠে বসল। এই লোকটা কি কখনোই ওর ক্লান্তি দেখবে না? সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মা কি করছে রান্না ঘরে?”
রঞ্জন ঝোলা ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেলে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে শুরু করল। রঞ্জনের গলার স্বর ক্রমশ চড়ছে। সে উত্তর দিল,
“আমি জানি না। অফিস থেকে এসেই তো দেখি মা রান্না ঘরে। কখনো কিছু বলি তোমাকে? রোজ রোজ তোমার নামে এতো এতো নালিশ করে, তোমার সব ভুলের কথা বলে তুমি তবু শুধরাও না কেন? মায়ের সব কথা মেনে চললেই হয়!”
ইফশি নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। শাশুড়ির এই মিথ্যাচারের কোনো সীমা নেই। সে নিজের হাত দুটো রঞ্জনের সামনে মেলে ধরে আক্ষেপের স্বরে বললো,
“আমি সবেই রান্না শেষ করেছি। দেখো এখনো গায়ের ঘাম শুকাইনি।”
রঞ্জন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ওর চোখে যেন অবিশ্বাসের ছায়া। সে নির্দয়ভাবে বলল,
“মিথ্যা বলো না ইফশি। আমি জানি আমার মা ই রান্না করে। তুমি বসে বসে শুধুই শরীর বাড়াচ্ছো।”
ইফশির বুকটা ধক করে উঠল। যে মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভরসা করে, তার কাছ থেকে এমন কথা শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। চোখের জল কোনোমতে আটকে রেখে সে বলল,
“রঞ্জন তুমি এভাবে বলতে পারলে?”
“এতো সাহস আমার সঙ্গে তর্ক করছিস? বেয়াদব মেয়ে!”
রঞ্জন হঠাৎই দরজার দিকে তাকাল। ইফশির মন খারাপ দেখে কানে ধরে সরি বললো। চোখ কোণা করে ইশারায় দরজার দিকে দেখালো। ইফশি দেখল দরজার ওপাশে একটা ছায়া । লিলি বেগম আড়ি পেতে শুনছেন সব। রঞ্জন পরিস্থিতি সামাল দিতে এক অদ্ভুত কৌশল নিল। সে নিজের হাতের তালু দিয়ে নিজের গাল আর ওপরের ঠোঁটে জোরালো শব্দে একটা চড় বসাল। এমন এক শব্দ হলো যেন মনে হলো সে ইফশিকেই মেরেছে। তারপর কৃত্রিম রাগে চিৎকার করে বললো,
“একদম মিথ্যা বলবে না ইফশি। তুমি কি বলতে চাইছো মা মিথ্যা বলছে? আমার মায়ের বয়স হয়েছে, এই বয়সে কি কেউ মিথ্যা বলে?”
ইফশি প্রথমে চমকে গিয়েছিল, কিন্তু রঞ্জনের চোখের ইশারা দেখে সে বুঝে ফেলল পুরো ব্যাপারটাই একটা অভিনয়। দরজার ওপাশের দর্শককে সন্তুষ্ট করার জন্য এই নিষ্ঠুর নাটকের অবতারণা। ইফশি ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে বললো,
“তুমি আমাকে মারলে?”
রঞ্জন আরও গম্ভীর হয়ে বলল,”তর্ক করবে না। তর্ক করলে আরও মার খাবে।”
ইফশিও যেন এই নাটকের দক্ষ এক অভিনেত্রী হয়ে উঠল। সে বুকফাটা কান্নার সুর নকল করে বলল,”মারো, মেরে ফেলো আমাকে। সারা জীবন তো শুধু ওদের কথায় বিশ্বাস করলে আমাকে বিশ্বাস করেছো কখনো?”
দরজার ওপাশের ছায়াটা এবার সরে গেল। সম্ভবত লিলি বেগম তার কাঙ্ক্ষিত বিজয় নিয়ে প্রস্থান করেছেন। রঞ্জন সঙ্গে সঙ্গে ইফশির পাশে এসে বসল। তার গম্ভীর মুখটা মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল। রঞ্জন বিস্মিত হয়ে ফিসফিস করে বললো,”এই আমি কি তোমাকে বিশ্বাস করিনা?”
ইফশি হেসে রঞ্জনের চোখের দিকে তাকাল। সংসারের শান্তি বজায় রাখতে এই অদ্ভুত লুকোচুরি আর কতদিন চলবে? সে মৃদু গলায় পালটা প্রশ্ন করল,
“আপনার অভিনয়ের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছি বুঝেন না?”
রঞ্জন ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল। তারপর বাচ্চাদের মতো আবেগঘন চোখে ইফশির দিকে চেয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“হোল্ড মি জান!”
ইফশি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সমস্ত সংশয়, ক্লান্তি আর গোপন সত্যের ভার রঞ্জনের বুকের মাঝে সঁপে দিল। ইফশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রঞ্জনের শরীরের ঘ্রাণ নিলো। এই ঘ্রাণটা যেন পৃথিবীর সব ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর। সারাদিনের ঝড়ঝাপটার পর এই আশ্রয়ে এসে সে যেন আবার প্রাণ ফিরে পেল। ইফশি মনে মনে ভাবল, এই বুকটাই কেন এতো শান্তি?
বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুরু হয়েছে। রাতের অন্ধকার আরও ঘন হচ্ছে। একটা মিথ্যে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে সামনে, কিন্তু এই আলিঙ্গনের উষ্ণতায় ইফশি যেন সব ভুলে থাকতে চাইল। সব মিথ্যার মাঝে এই মানুষটাই যে তার একমাত্র ধ্রুবক। কিন্তু সামনে যে আরও বড় ঝড় আসছে, সে কিভাবে সামলাবে সবকিছু?
#চলবে…
