#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৮
থানার সেই সেঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরটায় বসে আছেন ইরার বাবা, মোতাহার সাহেব। তাঁর চোখেমুখে আজ এক ধরণের নিঃস্বতা। যে জামাইয়ের পদমর্যাদা নিয়ে তিনি গর্ব করতেন, আজ সেই জামাইয়ের ইশারাতেই তাঁকে হাজতে বসে থাকতে হচ্ছে। বনি সামনে দাঁড়িয়ে চুরুট ফুঁকছে। ধোঁয়ার কুন্ডলী মোতাহার সাহেবের মুখে ছেড়ে দিয়ে বনি কর্কশ গলায় বলল, “চিনতে পারছেন তো আমাকে? আপনার সেই আদর্শ জামাই। আপনার মেয়ে তো আমার ইজ্জত ধুলোয় মিশিয়ে পালিয়েছে। এখন আপনি যদি জেলের ভাত খেতে না চান, তবে ইরাকে ফোন করে বলুন ও যেন এই মুহূর্তে আমার কাছে ফিরে আসে।”
মোতাহার সাহেব মাথা নিচু করে রইলেন। তাঁর কানে তখন বাজছিল বিয়ের রাতে ইরার সেই কথাগুলো “বাবা, আমি আরিফকে ছাড়া বাঁচব না।” সেদিন তিনি শোনেননি, আজ নিজের ভুলটা হাড়ের মজ্জায় টের পাচ্ছেন। তিনি ধরা গলায় বললেন, “বনি, ও আর ফিরবে না। আর আমি ফিরতে বলবও না। তুমি আমাকে মে-রে ফেললেও না।”
বনি দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তবে পচুন এই নরকে।”
আরিফ জানত বনি মোতাহার সাহেবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। তাই সে বসে থাকেনি। সে তার বন্ধু মহলে থাকা সংবাদকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করল। বনির অফিসের ভেতরেই এমন কিছু লোক ছিল যারা বনির অত্যাচার আর দুর্নীতির শিকার। তারা আরিফকে কিছু গোপন ফাইল আর ভিডিও সরবরাহ করল। শুধু প্রেম দিয়ে এই যুদ্ধ জেতা যাবে না। এখানে দরকার কৌশল। সে সোশাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বার্তা রিলিজ করল। সেখানে ইরা নিজে এসে কথা বলল।
ইরা ভিডিওতে নিজের গালের সেই কালশিটে দাগ আর কব্জির জখম দেখিয়ে বলল
“আপনারা আমাকে ‘ঘর পালানো মেয়ে’ বলছেন, কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছেন কোন নরক থেকে আমি পালিয়েছি? আমি দামী শাড়ি চেয়েছিলাম না, আমি চেয়েছিলাম একটু নিরাপত্তা। বনি আমিন সাহেবের কাছে স্ত্রী মানে হলো মা-র খাওয়ার বস্তু। আজ আমার বৃদ্ধ বাবাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে। আমি কি বিচার পাব না?”
মুহূর্তের মধ্যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেল। বাস্তবতা হলো, এই যুগে সোশাল মিডিয়ার শক্তি অনেক সময় আদালতের চেয়েও দ্রুত কাজ করে। সাধারণ মানুষ যারা এতক্ষণ ইরাকে গালি দিচ্ছিল, তারা এবার বনির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠল।
তানিয়া যখন দেখল আরিফ এভাবে সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে, সে আরও মরিয়া হয়ে উঠল। সে আরিফের ডিপার্টমেন্টের বড় কর্মকর্তাদের কান ভাঙাতে শুরু করল। কিন্তু আরিফ আগেই তার পদত্যাগপত্র (Resignation letter) তৈরি করে রেখেছিল। সে জানে, এই চাকরিতে থেকে সে হয়তো নিরপেক্ষভাবে লড়তে পারবে না।
আরিফ তানিয়াকে ফোন করে বলল, “তানিয়া, তুমি যত পারো ষড়যন্ত্র করো। কিন্তু মনে রেখো, তোমার বাবার অবৈধ ব্যবসার যে ফাইলগুলো আমার হাতে আছে, সেগুলো যদি আমি ওপেন করি তবে তোমাদের আভিজাত্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তাই বলছি, সম্মান থাকতে সরে দাঁড়াও।”
তানিয়া প্রথমবারের মতো আরিফের কন্ঠে এক ধরণের শীতল আতঙ্ক অনুভব করল। আরিফ এখন আর সেই নরম মনের প্রেমিক ছেলেটি নেই; সে এখন এক আহত বাঘ।
ইরা আর আরিফ এখন এক ছোট শহরে একটা সাধারণ ভাড়াবাড়িতে আছে। রাতে যখন লোডশেডিং হয়, তখন মোমবাতির আলোয় তারা একে অপরের দিকে তাকায়। বনির সেই এসি রুমের চেয়ে এই ঘামঝরা ঘরটা ইরার কাছে অনেক বেশি আপন।
ইরা একদিন আরিফকে জিজ্ঞেস করল, “আরিফ, আপনার এত বড় ক্যারিয়ার, এত সম্মান সব তো আমার জন্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। আপনার কি আফসোস হয় না?”
আরিফ হাসল। সেই মায়াবী হাসি যা দেখে ইরা এক সময় সব ভুলত। আরিফ বলল, “ইরা, ক্যাডার অফিসার হওয়াটা একটা পেশা মাত্র, ওটা আমার পরিচয় নয়। আমার পরিচয় আমি একজন মানুষ। আর মানুষের প্রধান ধর্ম হলো অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। আমি যদি তোমাকে ওই নরকে ফেলে রেখে নিজের এসিরুমে বসে থাকতাম, তবে নিজেকে সারাজীবন ঘৃণা করতাম। এই অভাবের সংসারে যদি তুমি আমার পাশে থাকো, তবেই আমি সার্থক।”
ভাইরাল ভিডিও আর জনরোষের চাপে বনির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাধ্য হয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেন। মোতাহার সাহেবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো পুলিশ। বনিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। কিন্তু বনি দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে তার কালো টাকার জোরে গুণ্ডা লেলিয়ে দিল আরিফ আর ইরাকে খুঁজে বের করার জন্য।
শয়তান যখন কোণঠাসা হয়, তখন সে আরও বেশি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। বনি এখন ঠিক করেছে, সে কাউকে বাঁচতে দেবে না।
সেদিন রাতে আরিফের বাসার সামনে কয়েকটা অপরিচিত লোক ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেল। অন্ধকার গলিতে কারো পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইরা জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল ছায়ামূর্তিগুলো ক্রমশ কাছে আসছে।
রাত একটা। জানালার পর্দা সরিয়ে ইরা যখন দেখল চার-পাঁচজন লোক চাদর মুড়ি দিয়ে তাদের বাড়ির সামনে পায়চারি করছে, তখন তার গায়ের র-ক্ত হিম হয়ে এল। বনি যে এত দ্রুত তাদের খুঁজে বের করবে, সেটা সে ভাবেনি। বনির ক্ষমতা কেবল তার পদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, তার টাকার জোরে কেনা এক বিশাল অপরাধী চক্রও তার হাতের মুঠোয়।
ইরা ফিসফিস করে আরিফকে ডাকল, “আরিফ! ওরা এসে গেছে। বনির লোকরা আমাদের চারপাশ দিয়ে ঘিরে ফেলেছে।”
আরিফ দ্রুত ড্রয়ার থেকে তার লাইসেন্স করা পিস্তলটা বের করল। সে জানত এমন একটা দিন আসবে। ক্যাডার সার্ভিসে থাকার সময় সে অনেক বিপদ দেখেছে, কিন্তু আজ লড়াইটা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার। আরিফ শান্ত গলায় বলল, “ইরা, তুমি পেছনের রুমে যাও। দরজা ভেতর থেকে লক করে দাও। পরিস্থিতি যাই হোক, আমি না ডাকা পর্যন্ত বের হবে না।”
বাইরে থেকে দরজায় প্রচণ্ড আঘাত এল। ওরা কোনো কথা বলছে না, শুধু লোহার রড দিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। আরিফ জানালার কাছে গিয়ে একটা সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি ছুড়ল। গুলির শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল, কিন্তু লোকগুলো পিছু হটল না। তারা জানে বনি আমিন তাদের বড় অংকের টাকা দিয়েছে হয় আরিফকে শেষ করতে হবে, না হয় ইরাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আরিফের ফোনে একটা কল এল। বনির নাম্বার। আরিফ ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে বনির পৈশাচিক হাসি শোনা গেল
“আরিফ সাহেব, ক্যাডারগিরি তো অনেক দেখালেন। এবার একটু মাটির স্বাদ নিন। আমার জিনিস চুরি করার সাহস দেখিয়েছেন, এখন তার মাশুল দিন। আমার লোকরা আপনাদের ওখানে পৌঁছে গেছে। যদি বেঁচে থাকতে চান, তবে মেহেরিনকে গেটের বাইরে পাঠিয়ে দিন।”
আরিফ চোয়াল শক্ত করে বলল, “বনি, তুমি একটা কাপুরুষ। নিজের বউকে মা-রধর করে যে পুরুষত্বের বড়াই করো, আজ সেই দম্ভ আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেব। তোমার পতন শুরু হয়ে গেছে, তুমি শুধু সময়টা গুনে যাও।”
অন্যদিকে, তানিয়া তখন বনির সাথে লাউডস্পিকারে সব শুনছিল। সে ভাবছিল আরিফ আর ইরা শেষ হয়ে গেলে তার সব কাটা দূর হবে। কিন্তু তানিয়া জানত না, আরিফ আগেই তার বাবার দুর্নীতির সব প্রমাণ একটি বিদেশি নিউজ পোর্টালে পাঠিয়ে দিয়েছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তানিয়ার বাবার ফোন এল। তিনি ওপার থেকে চিৎকার করে বললেন, “তানিয়া! সর্বনাশ হয়ে গেছে। আরিফ আমাদের সব ফাইল ফাঁস করে দিয়েছে। র্যাব আমাদের বাসায় হানা দিয়েছে। তুই এই মুহূর্তে দেশ ছাড়ার ব্যবস্থা কর!”
তানিয়ার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। যে টাকার অহংকারে সে আরিফকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, সেই টাকাই আজ তার গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরিফের বাসার সামনে এখন হাতাহাতি শুরু হয়ে গেছে। আরিফ তার সামরিক প্রশিক্ষণের সবটুকু দিয়ে লড়াই করছে। কিন্তু চার-পাঁচজনের সাথে একা পেরে ওঠা কঠিন। ঠিক যখন একজন আরিফের মাথায় রড দিয়ে আঘাত করতে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ পাড়ার লোকজন জেগে উঠল।
আসলে আরিফ গত কয়েকদিন ধরেই পাড়ার
যুবকদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। তাদের বিপদ দেখে এলাকার সাধারণ মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে বেরিয়ে এল। তারা দেখল এক ক্যাডার অফিসার আর তাঁর স্ত্রীকে গুন্ডারা আক্রমণ করছে। সাধারণ মানুষের শক্তির সামনে বনির ভাড়াটে গুন্ডারা টিকতে পারল না। তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু এলাকাবাসীর হাতে ধরা পড়ে গেল।
পরদিন সকালে খবরের কাগজের শিরোনাম হলো “সাবেক সরকারি কর্মকর্তার ভাড়াটে বাহিনী নিয়ে তান্ডব: ধরা পড়ল অপরাধীরা।” বনি আমিনের দুর্নীতির পাহাড় একে একে ধসে পড়তে শুরু করল। ক্ষমতার দম্ভে সে এতটাই অন্ধ ছিল যে বুঝতে পারেনি আইন সবার উপরে।
বনিকে যখন হাতকড়া পরানো হলো, তখন তার চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না, ছিল কেবল ঘৃণা। সে যখন প্রিজন ভ্যানে উঠল, তখন দেখল দূর থেকে ইরা আর আরিফ তার দিকে তাকিয়ে আছে। ইরার চোখে আজ পানি নেই, আছে এক পরম প্রশান্তি।
বনি জেল খেটে একদিন বের হবে ঠিকই, কিন্তু ইরার ওপর সে আর কোনোদিন অধিকার খাটাতে পারবে না। তানিয়া তার বাবার সাথে পালিয়ে যাওয়ার পথে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। লোভ আর হিংসার যে প্রাসাদ তারা গড়েছিল, তা আজ শ্মশান।
আরিফ আর ইরা এখন এক মফস্বল শহরের ছোট একটা বাড়িতে থাকে। আরিফ বিসিএস ছেড়ে দিয়ে একটা এনজিওতে কাজ করছে। বেতন আগের চেয়ে অনেক কম, কিন্তু সম্মান আর মায়া অনেক বেশি।
রাতে ইরা যখন আরিফের জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসে, তখন আরিফ জানালার দিকে তাকিয়ে বলে, “ইরা, এই পাথরের রাজপ্রাসাদগুলো আমাদের মতো মানুষদের জন্য নয়। আমাদের জন্য এই মাটির ঘরটাই স্বর্গ।”
ইরা মৃদু হেসে আরিফের কাঁধে মাথা রাখল। সে আজ বুঝেছে, সুখ দামী গয়নায় থাকে না, থাকে মনের শান্তিতে। মধ্যবিত্তের সেই মরা মরা জীবনটাই আজ তাদের কাছে সবচেয়ে রঙিন।
(সমাপ্ত)
