#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৭
রাত তখন আনুমানিক সাড়ে বারোটা। পুরো শহরটা যেন এক গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন, কিন্তু বনি আমিনের ফ্ল্যাটটার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা বিরাজ করছে। বনি আজও অতিরিক্ত মদ্যপান করে বিছানায় পড়ে আছে, তার নাক ডাকার শব্দ ড্রয়িংরুম পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। ইরার কাছে এই শব্দটা আজ ভয়ের নয়, বরং সুযোগের।
ইরা আলমারি থেকে তার দামী গয়নার বাক্সটা বের করল না। সে ওগুলো স্পর্শও করতে চায় না; কারণ ওই প্রতিটি গয়নার গায়ে লেগে আছে বনির লালসা আর নির্যাতনের ঘাম। সে শুধু একটা সাধারণ কালো বোরখা আর তার সেই পুরনো নীল রুমালটা সাথে নিল। আয়নায় নিজের ফোলা গাল আর কালশিটে পড়া চোখের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। এই মুখটা সে আর কোনোদিন এই আয়নায় দেখতে চায় না।
ইরা ধীরপায়ে রান্নাঘরের পেছনের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার শ্বশুর আফজাল সাহেব যে চাবিটা রেখে গিয়েছিলেন, সেটা হাতে নিতেই ইরার হাত কেঁপে উঠল। সে জানত, এই চাবিটা কেবল একটা দরজার নয়, এটা তার জীবনের নতুন এক দিগন্তের।
পেছনের গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় সে দেখল আফজাল সাহেব বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কোনো কথা বললেন না, শুধু অন্ধকারের ভেতর থেকেই নিজের ডান হাতটা একটু তুললেন। যেন এক নীরব আর্শীবাদ।
রাস্তায় বেরোতেই এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস ইরার মুখে লাগল। অনেকদিন পর তার মনে হলো সে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে পারছে। কিন্তু ভয় তাকে ছেড়ে যায়নি। প্রতিটা গলির মোড়ে মনে হচ্ছিল বনির পুলিশ বাহিনী বুঝি তাকে ঘিরে ধরবে।
ঠিক মোড়ের মাথায় একটা কালো গ্লাসওয়ালা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ইরা কাছে যেতেই গাড়ির হেডলাইটটা দুবার জ্বলে উঠল। ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এল আরিফ।
আরিফকে দেখে ইরার সবটুকু বাঁধ ভেঙে গেল। সে আরিফের সামনে গিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল। আরিফ কোনো কথা না বলে শুধু ইরার কাঁধে হাত রাখল। সেই স্পর্শে কোনো পশুত্ব ছিল না, ছিল এক পাহাড় সমান নিরাপত্তা।
আরিফ শান্ত গলায় বলল, “ইরা, গাড়িতে ওঠো। আমাদের হাতে সময় খুব কম।”
তানিয়ার প্রতিক্রিয়া ও আরিফের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
গাড়ি চলতে শুরু করলে আরিফ একসময় পকেট থেকে তার ফোনটা বের করল। তানিয়া গত এক ঘণ্টায় তাকে পঞ্চাশবার ফোন করেছে। আরিফ ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে তানিয়ার কর্কশ গলা ভেসে এল “আরিফ! তুমি এই মাঝরাতে কোথায়? আমি জানি তুমি ওই মেহেরিনের কাছে গেছ। তুমি যদি এই মুহূর্তে ফিরে না আসো, তবে আমি বাবার ক্ষমতা ব্যবহার করে তোমার চাকরি খেয়ে দেব!”
আরিফ একটা শীতল হাসি হাসল। সে ধীরস্থিরভাবে বলল, “তানিয়া, তোমার বাবার ক্ষমতা আর তোমার লোভ দুটোকেই আমি আজ থেকে মুক্তি দিলাম। আমি জানি আমি কী করছি। কাল সকালে আমার ডিভোর্স লেটার তোমার হাতে পৌঁছে যাবে। চাকরি যদি যায় যাক, কিন্তু অন্তত একজন মানুষ হিসেবে আমি বাঁচতে চাই।”
আরিফ ফোনটা কেটে জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিল। তানিয়ার মতো লোভী নারীদের দাপট তার কাছে আজ তুচ্ছ।
গাড়ি হাইওয়ে দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটছে। ইরা জানালার বাইরে অন্ধকার দেখছে। সে জানে, এই পালানোই শেষ নয়। কাল সকালে যখন বনি জানবে ইরা পালিয়েছে, তখন সে তার পুরো পুলিশ ফোর্স নামিয়ে দেবে। বনির ইজ্জতে আঘাত মানে সে পাগ-লা কু-ত্তার মতো আচরণ করবে।
ইরা ফিসফিস করে বলল, “আরিফ, আপনি বিপদে পড়বেন। ও আপনাকে ছেড়ে দেবে না।”
আরিফ স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে হাত রেখে বলল, “ইরা, আমি বিসিএস দিয়েছি মানুষের সেবা করার জন্য, বনি আমিনের মতো পশুদের ভয়ে কুঁকড়ে থাকার জন্য নয়। আমার কাছে ওর সব অপকর্মের ফাইল আছে। ও যদি ক্ষমতার জোর দেখায়, তবে আমি দেখাব আইনের জোর। আর সমাজ? সমাজ আমাদের নিয়ে যা খুশি বলুক, তাতে আমার আর কিছু যায় আসে না।”
বাস্তবতা হলো, সমাজ কোনোদিন এই বিচ্ছেদকে ভালো চোখে দেখবে না। লোকে বলবে “অফিসারের বউ হয়েও কেন পালাল? নিশ্চয়ই চরিত্র খারাপ!” কেউ বলবে “আরিফ নিজের ঘর ভেঙে অন্যের বউ উদ্ধার করতে গেছে, কী জঘন্য!”
কিন্তু সেই সমাজের কেউ কি আজ রাতে ইরার কব্জির ব্যথাটা মালিশ করে দেবে? কেউ কি তানিয়ার মানসিকভাবে করা আরিফের ক্ষতগুলো সারিয়ে দেবে? কেউ দেবে না।
আরিফ আর ইরা আজ ঠিক করেছে, তারা কোনো রাজপ্রাসাদে থাকবে না। তারা থাকবে একটা ছোট ঘরে, যেখানে হয়তো এসি থাকবে না, দামী ফার্নিচার থাকবে না; কিন্তু থাকবে একে অপরের প্রতি সম্মান।
ভোরের আলোটা ফুটতে শুরু করেছে। দূরে দিগন্তে দেখা যাচ্ছে এক নতুন সূর্য। ইরা তার সেই নীল রুমালটা দিয়ে চোখের পানি মুছল। সে আর মিসেস বনি আমিন নয়, সে এখন কেবলই মেহেরিন ইরা যে দীর্ঘ ন*রকবাস শেষে একটুখানি আকাশের মুখ দেখেছে।
বনি আমিনের পাথরের রাজপ্রাসাদটা পেছনে পড়ে রইল। সেখানে এখন কেবল আভিজাত্যের কঙ্কাল পড়ে আছে, কোনো প্রাণ নেই।
সকাল আটটা। বনি আমিনের ফ্ল্যাটে তখন লঙ্কাকাণ্ড চলছে। নেশার ঘোর কেটে যাওয়ার পর বনি যখন দেখল বিছানা খালি এবং পেছনের দরজা খোলা, তখন তার ভেতরের পশুটা গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠল। সে ড্রয়িংরুমের কাঁচের টেবিলটা এক লাথিতে গুঁড়িয়ে দিল।
রেখা বেগম থরথর করে কাঁপছেন। বনি তার মায়ের দিকে র-ক্তবর্ণ চোখে তাকিয়ে গর্জে উঠল, “তোমার আদরের পুত্রবধূ পালিয়েছে মা! আর পালিয়েছে কার সাথে জানো? ওই ভিখারি আরিফের সাথে। আমি ওকে ছাড়ব না। ওর বিসিএস ক্যাডার গিরি আমি ঘুচিয়ে দেব।”
বনি তৎক্ষণাৎ তার অফিসের কনস্টেবল আর সোর্সদের ফোন করল। তার কন্ঠে তখন খু-নের নেশা। সে শুধু স্বামী হিসেবে নয়, একজন ক্ষমতাধর অফিসার হিসেবে ইজ্জত হারানোর অপমানে জ্বলছে। তার কাছে ইরা কোনো মানুষ নয়, বরং তার ইগো বা অহংকারের প্রতীক।
অন্যদিকে, আরিফ আর ইরা এখন আরিফের এক বিশ্বস্ত বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু আরিফ জানে, বনি চুপ করে বসে থাকবে না।
ঠিক তাই হলো। দুপুর নাগাদ আরিফের ফোনে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কল এল।
“আরিফ, তোমার বিরুদ্ধে বনি আমিন সাহেব অপহরণের মামলা করেছেন। তোমার নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু করার চাপ আসছে। তুমি কি পা-গল হয়ে গেছ? একটা মেয়ের জন্য নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট করছ কেন?”
আরিফ শান্ত গলায় উত্তর দিল, “স্যার, মেয়েটি আমার স্ত্রী নয় ঠিকই, কিন্তু ও একজন নি-র্যাতিতা। আমি ওকে অপহরণ করিনি, উদ্ধার করেছি। আমার কাছে ওর শরীরের জখমের মেডিকেল রিপোর্ট আর বনির ম-ারধরের ভিডিও ফুটেজ আছে। আমি আইনি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।”
তানিয়া দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বনির সাথে যোগাযোগ করল। দুই স্বার্থান্বেষী মানুষ এক হয়ে গেল। তানিয়া বনিকে ফোনে বলল, “বনি ভাই, আরিফকে এমন শিক্ষা দিন যেন ও আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। আমি ডিভোর্স ফাইল করছি ঠিকই, কিন্তু ওর সবটুকু কেড়ে নিয়ে তবেই শান্ত হব।”
বাস্তবতা হলো, যখন ক্ষমতা আর লোভ হাত মেলায়, তখন ন্যায়বিচার পাওয়া পাহাড় টপকানোর মতো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বনি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইরার বাবাকে থানায় তুলে নিয়ে গেল।
ইরা যখন ফোনে খবর পেল যে তার বৃদ্ধ বাবাকে থানায় আটকে রাখা হয়েছে, সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে আরিফকে বলল, “আরিফ, আমি ফিরে যাই। আমার বাবার কিছু হলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। ও আমাকে মে-রে ফেলুক, তাও ভালো।”
আরিফ ইরার হাত শক্ত করে ধরল। “না ইরা, এবার ফিরে যাওয়া মানেই নিশ্চিত মৃ-ত্যু। বনি তোমাকে জ্যান্ত কবর দেবে। তুমি ধৈর্য ধরো। আমাদের হাতেও তুরুপের তাস আছে।”
ইতোমধ্যে সোশাল মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়েছে “ক্যাডার অফিসারের প্রেমিকা উদ্ধার, অন্য অফিসারের ঘর ভাঙার গল্প।” লোকে কমেন্ট বক্সে রসিয়ে রসিয়ে কথা বলছে। কেউ ইরার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, কেউ আরিফকে ঘর ভাঙানি বলছে। বাস্তব সমাজ এমনই; তারা কারণ খোঁজে না, তারা শুধু রসালো গল্প খোঁজে।
ইরার মা ফোনে হাহাকার করছেন, “ইরা, তুই আমাদের মুখ পুড়িয়েছিস। পাড়ার লোকে ছি ছি করছে। তুই কেন ম-রতে গেলি না? ম-রে গেলেই তো আমাদের মান থাকতো!”
মায়ের এই কথাগুলো ইরার বুকে বনির লাথির চেয়েও বেশি বাজল। নিজের মা-ও যখন জীবনের চেয়ে মান কে বড় করে দেখেন, তখন একাকীত্বটা পাহাড়ের মতো ভারি মনে হয়।
আরিফ বসে নেই। সে বনির বিরুদ্ধে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স এবং ক্ষমতার অপব্যবহার-এর একটি পাল্টা মামলা ফাইল করার প্রস্তুতি নিল। সে জানে, বনি তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার চেষ্টা করবে, তাকে সামাজিকভাবে হেয় করবে। কিন্তু আরিফ আজ সেই বেকার যুবকটি নয় যে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে।
সে ইরাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ইরা, এই সমাজ আমাদের দিকে পাথর ছুড়বে। বনি আমাদের র-ক্ত চাইবে। কিন্তু তুমি যদি আমার পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়াও, তবে এই পাথরের রাজপ্রাসাদ আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেব। তুমি কি লড়বে আমার সাথে?”
ইরা চোখের পানি মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
চলবে…
