#রাগিণীর_অদ্ভুতুড়ে_সংসার!
#সিনথিয়া
০২.
“ এতো রাতে আপনার ফ্ল্যাটে এক পাগল ঢুকে পড়লো অথচ আপনার কোনো ক্ষতি করলো না? আপনি আবার তাকে বাসায় তালা মেরে রেখে পুলিশ ডেকে আনলেন? আর সে-ও চুপচাপ বসে রইলো?”
মোটা মতোন গোঁফওয়ালা সাব ইনস্পেকটর। আঁড়চোখে লিলির দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের সুরে প্রশ্নটা করতেই ফিক করে হাসির আওয়াজ এলো পাশ থেকে।
পাশে দাঁড়ানো কনস্টেবল লোক দুটো মুখ টিপে হাসছে।
লিলি অবশ্য গায়ে মাখেনি সেসব। তার সতর্ক চোখ নিজের তালাবদ্ধ গেটের দিকে। আদোতেও ভ্যাম্পায়ার বলতে কিছু আছে কি না লিলি জানে না! পুলিশদের বলেওনি ওসব। শুধু জানে ঐ পাগল লোকটা এখনো লিলির ফ্ল্যাটে! যে লিলির মন পড়তে জানে। পুলিশ দিয়ে তাকে ধরিয়ে দেয়ার বিষয়টা মাথায় নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আসা বোকামি হয়ে গেলো না তো?
ফ্ল্যাটের ভিতর থেকে টুংটাং আওয়াজ আসছে। বেসিনের কল ছেড়ে রেখে থালাবাটি ধোয়ার আওয়াজ। কনস্টেবল ইনস্পেকটরের কানে কানে এসে বললো,
“ স্যার! আমার তো মনে হয় এই ভদ্রমহিলা নিজেই মানসিকভাবে সুস্থ নয়! আপনিও কিনা ওনার কথামতো পাগল ধরতে চলে এলেন? পরে যদি কেস অন্যকিছু হয়?”
সাব ইন্সপেক্টর গম্ভীর স্বরে আওড়ালেন,
“ কথা মতো আসিনি! উনি এফআইআর করিয়েছেন থানায়, এজন্য আসতে হয়েছে। এখন পজিশন নিয়ে দাঁড়াও! ভিতরে যেই থাকুক, দরজা খোলার সাথে সাথে দুদিক দিয়ে জাপ্টে ধরবে। পাগল মানুষ; কামড়ে দিলে আবার ইনজেকশন নেয়া লাগতে পারে!”
কনস্টেবল দু’জন ইন্সপেক্টরের কথামতো পজিশন নিয়ে দাঁড়ালো।
লিলি তাদের সামনে। কিছুটা বিভ্রান্ত হাতে
চাবি নিয়ে দরজার তালা খুলবে না কিনা ভাবছে। অবশেষে মনস্থির করে দরজার নব ঘোরাতেই ভিতর থেকে আসা পানির ট্যাপের শব্দ থেমে গেলো হঠাৎ।
লিলি চোখ তুলে তাকাতেই সম্মুখে এসে হাজির হলো সেই লোক। উন্মুক্ত শরীরের সামনেটায় লিলির কিচেন এ্যাপ্রন জড়ানো। তাতে হাত মুছতে মুছতেই চমৎকার ভাবে হাসলো গ্যাব্রিয়েল।
যেন লিলির সাথে তার বহুদিনের সংসার। বউ রেগে গিয়ে পুলিশ ডেকে আনতেই পারে, এ আর এমন কি? গ্যাব্রিয়েলকে দেখে মনে হচ্ছে তার চেয়ে খুশি মানুষ দ্বিতীয়টি কেউ নেই দুনিয়ায়।
কিছুক্ষণ লিলিকে মন ভরে দেখে পরক্ষণেই গ্যাব্রিয়েলের চোখ চলে গেলো পুলিশ তিনজনের উপর। খাদে নামানো গভীর গলায় লিলিকে জিজ্ঞেস করলো,
“ এরা আমাদের গেস্ট?”
লিলি চমকালো হঠাৎ! গ্যাব্রিয়েলের উদাম শরীর থেকে ঠিকঠাক চোখ সরাতে হিমশিম খেলো মেয়েটা। অমনি পিছনের পুলিশ কনস্টেবল বলে উঠলো,
“ আজ্ঞে না! আমরা আপনাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছি! ম্যাডাম আপনার নামে থানায় কমপ্লেন করেছে!”
গ্যাব্রিয়েলের ভাবাবেগে কিঞ্চিত পরিবর্তনও ঘটলোনা। উল্টে আন্তরিকভাবে হাসলো মানুষটা। লিলিকে একটু সাইড করে পুলিশ তিনজনের কাছে গিয়ে বললো,
“ আপনাদের মধ্যে ইনস্পেকটর কে?”
বেঁটে খাটো লোকটা তার স্থুলকায় শরীর নিয়ে এগিয়ে এলো গ্যাব্রিয়েলের সামনে। উচ্চতায় ছ’ফুটের সমান গ্যাব্রিয়েলের দিকে তাকাতে গিয়ে ঘাড় হেলে পড়লো পিছনে।
“ আমি ইন্সপেক্টর!”
গ্যাব্রিয়েল ভণিতা ছাড়া জবাবে বললো,
“ আর আমি মিস লিলির উডবি হাজবেন্ড। আমি কি জানতে পারি আমার ওয়াইফ আমার নামে ঠিক কী কী অভিযোগ করেছে?”
ইনস্পেকটর ঘাবড়ে গেলেন হঠাৎ। অবশ্য অবিশ্বাসও করতে পারলেননা কথাটা। এতো সুপুরুষ একজন মানুষ, আর যাই হোক, পাগল হতে পারে না! নিশ্চয়ই কপোত কপোতির মনমালিন্য ঘটিত ব্যাপার স্যাপার! ধ্যাত! মাঝখান দিয়ে ওনাদের রাতের ঘুমটা নষ্ট! এদের কাছ থেকে আজ কঠিন জরিমাণা আদায় করবেন তিনি। পুলিশদের হয়রানি করানো? ফা-জিলের দল!
কিন্তু গ্যাব্রিয়েলের চোখে চোখ রেখে ইন্সপেক্টর কথা বলতে গিয়েই থমকালেন পরপর। সম্মুখের রহস্যময় কালো মণিজোড়া যেন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে ওনার কথাগুলো। হিপনোটাইজ করছে ওনাকে।
হুট করেই রুক্ষতা মিইয়ে এলো ইনস্পেক্টরের কন্ঠের। গদগদ হয়ে বললো,
“ আপনি ওনার উডবি হাজবেন্ড? আগে বলবেন তো স্যার! উই আর এক্সট্রিমলি সরি!”
গ্যাব্রিয়েল সন্তুষ্ট হতে পারলো না এতে।
সে ভ্রুক্ষেপ করে শুধালো,
“ আমার নামে কী কমপ্লেন করেছে আমার ওয়াইফ? আমি সেটা জানতে চাচ্ছি!”
এটুকু বলে লিলির হতভম্ব মুখের দিকে ঘাড় ফেরালো গ্যাব্রিয়েল। কাতর চোখে বললো,
“ আমাকে না জানালে আমি নিজেকে শোধরাবো কী করে রাগিণী? ওনারা তো আর সবসময় আসতে পারবে না তাই না?”
ইন্সপেক্টর থতমত খেলেন। গ্যাব্রিয়েল ওনার দিকে ফের তাকালো। ইন্সপেক্টর ঐ ব্যাধের মতো উজ্জ্বল হওয়া চোখদুটো দেখে গুলিয়ে ফেললেন সবটা। মিনমিন করে বললেন,
“ ম্যাডাম থানায় গিয়ে আপনাকে…”
“ পাগল বলেছি! আর এখনো বলছি! আর আপনারা ওনাকে এ্যারেস্ট না করে এসব বানানো কথা কেনো বিশ্বাস করছেন? এ্যারেস্ট করছেন না কেনো ওনাকে? উনি আমার কেউ হয়না! মিথ্যে বলছে লোকটা!”
আচমকাই ক্রুদ্ধস্বরে ফেটে পড়লো লিলি। গ্যাব্রিয়েলের দিকে রক্তচক্ষুসমেত তাকিয়ে উগড়ে দিল কথাগুলো।
ইন্সপেক্টর তখনও হিপনোটাইজড। কেমন ঘোরগ্রস্তের মতো বললো,
“ সমস্যা নেই ম্যাডাম! আমার ওয়াইফও আমাকে রেগে গেলে গন্ডার ডাকে। কিন্তু তাই বলে স্বামীর নামে থানায় গিয়ে কমপ্লেন করে আসাটা একটু বাড়াবাড়ি। আজ তাহলে আমরা আসি? আশা করছি আপনারা নিজেদের মধ্যে সবটা মিটমাট করে নিতে পারবেন?”
ইনস্পেকটর যেতে উদ্যত হতেই কনস্টেবল দু’জন হতবিহ্বল চোখে এর ওর দিকে তাকালো। পরপর ইনস্পেকটরের পিছন পিছন হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে গেলো বিল্ডিংয়ের বাইরে।
সিঁড়ির ঘরে এখন শুধু দু’জন দাঁড়িয়ে। রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকা লিলি আর বেজার মুখো গ্যাব্রিয়েল। মিনিটখানেকের এই নীরবতা প্রথমে ভাঙলো সে-ই,
“ রাগিণী! মাথা ঠান্ডা করো লক্ষীটি! আগে ঘরে ঢুকে বসো, আমি তোমাকে পানি এনে দিচ্ছি! তারপর না-হয় ভুল বোঝাবুঝিটুকু মেটানো যাবে?”
লিলি তপ্ত গলায় হিসহিসিয়ে আওড়ালো,
“ কী করেছেন আপনি ইন্সপেক্টরের সাথে?”
গ্যাব্রিয়েল যেন আকাশ থেকে পড়লো প্রশ্ন শুনে,
“ আমি? আমি তো শুধু সত্যিটা বললাম!”
লিলি রাগত মুখেই ডান চোখের ভ্রু উঁচালো। বুকে হাত বেঁধে সটান হয়ে শুধালো,
“ আর কী সেই সত্যিটা?”
গ্যাব্রিয়েলের ঢোক গিলে পিছিয়ে গেলো দু’কদম। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের দিকে তর্জনী তুলে বললো,
“ দেখো? কোথাও একটু ময়লা পাবে না! বেসিনে এঁটো থালাবাসন পাবে না। লন্ড্রি ব্যাগে কাপড় পাবেনা। সব পরিষ্কার করেছি বসে বসে! তারপরও আমার দিকে তুমি ওভাবে তাকাবে? তোমার একটুও মায়া লাগে না আমার দিকে ওভাবে তাকাতে?”
লিলি কাঠকাঠ গলায় থেমে থেমে জিজ্ঞেস করলো,
“ আমি…জানতে চাইছি…সত্যিটা…কী? কীসের জন্য আপনি আমার পিছনে পড়েছেন?”
গ্যাব্রিয়েলও এদফায় ভয় পেয়ে গেলো লিলিকে। সন্ত্রস্ত অথচ দৃঢ় গলায় আওড়ালো,
“ সত্যিটা হলো আ’ম ইন লাভ উইথ ইয়্যু রাগিণী। সে তুমি আমাকে মানো আর না মানো, আমাদের বিয়ে হবেই! তোমাকে বিয়ে না করা অবধি তোমার পিছু ছাড়বো না আমি!”
গ্যাব্রিয়েল চোখ নামিয়ে ফেলে সহসা। কথাগুলো বলে অন্ধকার মুখেই পা চালায় লিলির রান্নাঘরের পানে। মন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেনো যে শুধু তার রাগিণীর উপরেই খাটে না কে জানে? নইলে এতোক্ষণে একটা টোনাটুনির সংসার হয়ে যেতো না ওদের?
লিলি ভ্রুকুটি করে তাকায় সেদিকে। ঝাঁঝালো গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন? আপনাকে আমি অনুমতি দিয়েছি আমার ঘরে থাকার?”
গ্যাব্রিয়েল বিষন্ন মুখে ঘাড় ফেরায়। ওর রাগিণী ওকে এ বাসায় থাকতে দেবে না শুনে গলাটা কেঁপে ওঠে কেমন।
“ ফ্রাইংপ্যানটা ধোঁয়া বাকি! ওটা ধুয়েই চলে যাবো! আর জ্বালাবো না তোমাকে!”
_ _ _ _ _ _
চলবে?
