#রাগিণীর_অদ্ভুতুড়ে_সংসার!
#অন্তিম_পর্ব
#সিনথিয়া
“ আপনার লাগেনি তো কোথাও?”
লিলির পলকা হাতটা গ্যাব্রিয়েলের শক্তপোক্ত গালের একপাশ ছুঁয়ে রেখেছে তখন। আর্ত চোখজোড়া সম্মুখের জখম ঠোঁটের উপর নিবদ্ধ। লিলি ওর বৃদ্ধা আঙুল ওখানে সামান্য ছোঁয়াতেই মৃদু কেঁপে ওঠে অধরযুগল। শ্বাস নিতে ভুলে বসে গ্যাব্রিয়েল। দম আঁটকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা তখনো বিশ্বাস করতে পারেনি নিজের চোখকে!
আচমকা হাত উঠিয়ে নিজের ঠোঁটের উপর রাখা তর্জনীটা আলতো করে ছোঁয় গ্যাব্রিয়েল। তারপর আলতো করে টেনে আনে বুকের উপর। বা পাশে রেখে কন্ঠ নামিয়ে আওড়ায়,
“ এখানে লেগেছে!”
লিলি চমকায়। ব্যগ্র চোখেই মরিয়া হয় কালো শার্টের আড়ালে আঘাতের নিশানা খুঁজতে।
“ সকালে যখন বের করে দিলে বাসা থেকে আর বললে, আমি যেন কখনো না আাসি তোমার সামনে! তখন থেকেই এখানটা ব্যথায় নীল হয়ে রয়েছে আমার ! তুমি চিহ্ন খুঁজো না রাগিণী! মনের ব্যথার চিহ্ন হয়না।”
সহসা চোখ তুলে তাকায় তরুণী। লিলির জন্য এতোটা প্রেমে নিজেকে মুড়িয়ে রাখা মানুষটাকে দেখে কেন যেন হিংসে হয় ওর।
কপালে ভাঁজ ফেলে কপট রাগ দেখিয়ে বলে ওঠে,
“ তাহলে ঠোঁট কাটলো কী করে? এখানেও আমি ব্যথা দিয়েছি?”
গ্যাব্রিয়েল হেসে ফেলে হঠাৎ। ঘাড় নুইয়ে দাঁতের নিচে ফেলে জখম ঠোঁটটা। সময় নিয়ে আওড়ায়,
“ ব্যথার উপশম তুমি আমার! এমন হাজারটা কাটলেও তোমাকে দোষ দিতে পারবো না কোনোদিন আমি!”
ক্রমশ নরম হয়ে আসে লিলির মুখখানা। অভিমানে চোখ ফেটে কান্না পায় ওর। এতো অসহ্য কেনো ঐ লোক? বারবার ঠেলে সরালেও মাথা নুইয়ে পিছন পিছন চলে আসে!
হাতের উল্টো পিঠে চোখ মোছে লিলি। বিরক্তি নিয়ে তাকায় গ্যাব্রিয়েলের পিছনে। যেখানের ফ্লোরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সাইফ। গাল ফেটে গড়িয়ে পড়া র*ক্তে মাখামাখি হয়ে আছে সে। হুঁশ নেই। তাই দু’জন কনস্টেবল তাকে ওঠানোর চেষ্টা করছে ধরে বেঁধে।
“ আমার হাসবেন্ডকে বাসায় নিয়ে যেতে পারি আমি এখন? ওনার ফার্স্টএইড লাগবে দ্রুত!”
লিলির ইন্সপেক্টরকে করা প্রশ্নে আচমকা ঘাড় তুলে তাকায় গ্যাব্রিয়েল। একমুহূর্তের জন্য বুকের সেই নীল ব্যথাটাও সুখ সুখ লাগে ওর কাছে। কিন্তু লিলির চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করতেই শাণের মতো ধারালো অক্ষিপট ধক করে জ্বলে ওঠে গ্যাব্রিয়েলের। ওর রাগিণী অন্য কোনো পুরুষকে দেখছে, এই ভাবনাটাই যেন ওর চোয়ালের শিরা-উপশিরা ফুলে ফেঁপে ওঠার জন্য যথেষ্ট।
ইন্সপেক্টর সাইফের দিকে ইশারা করে শুধায়,
“ আর ওনাকে ম্যাম?”
“ আমি…চিনি না ওনাকে! আমি শুধু জানতে চাই আমার হাসবেন্ডকে আর কোনো প্রয়োজন আছে কিনা আপনাদের?”
ইন্সপেক্টর সাবলীল মুখে জানায়,
“ না ম্যাম! উনি তো এই বাচ্চাটার জন্য থানায় রিপোর্ট লেখাতে এসেছিলেন। বাচ্চাটার মা ওনার কাছে বাচ্চাটাকে ধরিয়ে দিয়ে সকাল থেকে নিখোঁজ। আমরা রিপোর্ট লিখছিলাম, আর তখনই সাইফ সাহেব আচমকা এসে আপনার হাসবেন্ডকে অকথ্য গালাগালি শুরু করেন। আর তারপর গায়ে হাত তুলতে উদ্যত হলেই মিস্টার গ্যাব্রিয়েল ধরে মচকে দেন ওনার ওটা!”
একজন কনস্টেবল দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে শুধরে দেন ইন্সপেক্টরকে।
“ হাত হবে স্যার!”
“ আমিও হাতই বুঝিয়েছি ইয়্যু ইডিয়ট! “
লিলি প্রলম্বিত শ্বাস ফেললো এক। সাইফের সাথে গ্যাব্রিয়েলের পুরোনো শত্রুতা থাকা সম্ভব নয়। হয়তো মারপিটের মূল কারণ সে নিজেই। এটা লিলির মন বলছে। গ্যাব্রিয়েলকে কোনোভাবে লিলির বাসা থেকে বের হতে দেখেই সাইফ টার্গেট করেছে ওকে৷ তাই বলে থানার মধ্যে মারামারি?
“ পুরো ব্যাপারটা আপনাদের সিসিটিভি ফুটেজে রেকর্ড করা হয়েছে?”
“জ্বি ম্যাম!”
লিলি একবার চোখ ঘুরিয়ে আনলো গ্যাব্রিয়েলের বিস্ময়াহত মুখ থেকে। পরপর ইন্সপেক্টরের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আওড়াল,
“ তাহলে আমি মিস্টার সাইফের এগেইন্সট জিডি করে রেখে যেতে চাই! যে লোক আমার হাসবেন্ডকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়, তাকে তো আর আমি এমনভাবে ছেড়ে রাখতে পারিনা। যদি ভবিষ্যতে আমার হাসবেন্ডের গায়ে সামান্য আঁচড় অবধি আসে, সাইফ নামের লোকটা যেন একচুলও ছাড় না পায় ইন্সপেক্টর !”
_ _ _
রাতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ভেদ করে জ্বলছে সোডিয়াম লাইট। তারই কমলা রঙা আলোয় পা মাড়িয়ে লিলির বাসার দিকে এগিয়ে চলছে একজোড়া মিছেমিছি দম্পতি!
“ আমি তোমার হাসবেন্ড?”
গ্যাব্রিয়েলের প্রশ্নে আড়চোখে ওর দিকে তাকায় লিলি। লোকটার আরক্তিম মুখে চেয়ে বলে ওঠে,
“ একদিন আগ অবধি তো বউ বউ করে মাথা ধরিয়ে দিয়েছিলেন! আর থানায় তো সবাই এটাই জানে যে আমি আপনার বউ! সেই হিসেবে আপনি আপনার হাসবেন্ড! সিম্পল!”
লিলি থামে অল্প। ঠোঁট কামড়ে মাথা নোয়ায় সহসা। চোখে চোখ রাখতে পারেনা আর। পিছনে হাত বেঁধে গ্যাব্রিয়েলের সাথে পা মেলায় শুধু। কিছুপল পার হতেই কন্ঠ চেপে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ সাইফ আপনাকে কী করে চিনলো?”
গ্যাব্রিয়েল এবার আর রাগলো না অত। যে রাগিণী সাইফকে ভুলে শুধু তার হয়ে কথা বলেছে থানায়, তার সাথে সে কী করে রাগ দেখায় সে?
“ অনেক লম্বা কাহিনী!”
একটু থামলো লোকটা। লম্বা শ্বাস নিয়ে বলা শুরু করলো,
“ আমি তোমাকে প্রথম দেখেছি কবে জানো?”
লিলি কপাল গুটিয়ে তাকায় ওর এই প্রশ্নে।
“ কবে?”
“ পাঁচ বছর আগে! ঠিক ঐ জায়গাটাতেই, যেখানে রাগিণীকে হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি চারশো বছর আগে! প্রথম দেখায় আমি সত্যি সত্যি রাগিণীই ভেবেছিলাম তোমাকে। কিন্তু তারপর যখন তোমার সাথে সাইফকে দেখলাম, তখন দুমিনিটও সময় লাগেনি আমার ভুল ভাঙতে। রাগ হচ্ছিল প্রচন্ড। আমি এতো বছর তোমার জন্য অপেক্ষা করলাম, আর তুমি এইটুকু সময় অপেক্ষা করে থাকতে পারলেনা আমার জন্য? তবুও! আটকাতে পারিনি নিজেকে। আড়াল থেকেই নজর রেখেছি তোমার উপর। তুমি কখন কোথায় যাচ্ছো, সবটা জানতাম আমি। কিন্তু তুমি তো তোমার প্রথম প্রেমের প্রতি অন্ধ। আর আমি চাইলেও সাইফ ছেলেটার ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দিয়ে তার প্রতি তোমার এই প্রেম কমাতে পারতাম না। তাই বাধ্য হয়ে ওর ব্যাকগ্রাউন্ড ঘাটতে শুরু করি। আস্তে ধীরে বুঝতে পারি ও একটা ওমেনাইজার। যদিও শুরুতেই সন্দেহ হয়েছিল আমার। কিন্তু প্রমাণ করতে পারছিলাম না কিছুই। তাই ওকে ফলো করা শুরু করি! ওর পিছন পিছন একটা ক্লাবে যাই। নিজেকে ওদেরই একজন হিসেবে প্রেজেন্ট করতে পোল ড্যান্সও করি। হেসো না প্লিজ! আই ওয়াজ হেল্পলেস। কিন্তু ঐ সেক্রিফাইজটুকু সত্যিই কাজে লেগে যায় আমার। সাইফ আর ওর…গার্লফ্রেন্ড যাকে সে তুমি থাকাকালীন ডেট করেছে, তাকে নিয়ে সেই প্রায়ই ওরকম ক্লাবে, বারে যেতো। রুম ভাড়া করে থাকতো। ঐ রাতে ক্লাবে, সাইফের নামে বুক করা প্রাইভেট রুমটাতে একটা পেন ক্যামেরা সেটআপ করে রেখেছিলাম আমি আগে থেকেই! সকাল হতেই প্রমাণ আমার হাতে। এন্ড দ্য রিজন ইয়্যু ব্রোক আপ উইদ হিম, ওয়াজ দ্য ভিডিও আই সেন্ট টু ইয়্যু দ্যাট মর্ণিং! ইজ্যান্ট ইট?”
লিলির মনে আছে ভিডিও টার কথা। অপরিচিত একটা ইমেইল থেকে এসেছিল মাসখানেক আগে, আর ভেঙে চুরমার করে রেখে দিয়েছিল লিলিকে। ও তো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি সাইফ ওকে এভাবে ঠকাবে কোনোদিন!
লিলির চোখ ফেটে ফের জল গড়ানোর আগেই গ্যাব্রিয়েল মাথা নুইয়ে আওড়ায়,
“ বাট স্টিল! ও তোমাকে ঠকিয়েছে রাগিণী! আমার নিজের ওপর রাগ হচ্ছিল সেদিন। বারবার মনে হচ্ছিল তুমি ঠকেছো কারণ আমি তোমাকে খুঁজে পেতে দেরি করেছি বলে! যদি আরেকটু আগে তোমাকে পেতাম তাহলে…”
“ আর এই পুরো ব্যাপারটা সাইফ জানতে পেরেই আপনার উপর চড়াও হয়েছিল আজ?”
“ বলতে পারো!”
“ কিন্তু এসবের পিছনে যে আপনি আছেন, সেটা ও জানলো কী করে?”
“ হয়তো ঐ ক্লাব থেকেই কেউ বলে দিয়েছে আমার ব্যাপারে। এজ আই টোল্ড ইয়্যু, ভ্যাম্পায়ার হলেও আমার সুপারপাওয়ার সবসময় কাজ করে না! নিজেকে ইমভিজিবল করে তো আর ঢুকতে পারিনি ক্লাবে। জানা কথা, ওখান থেকেই খোঁজ পেয়েছে আমার!”
গ্যাব্রিয়েলের পোক্ত কাঁধে মাথা রেখে গভীর ঘুমে থাকা বাচ্চাটার দিকে নজর ফেরায় লিলি। ওর মাকে খুঁজে পাওয়ার আগ অবধি লিলি বাচ্চাটাকে নিজের কাছেই রাখবে বলে ঠিক করেছে। প্রসঙ্গ পাল্টাতে ও হুট করে বলে উঠলো,
“ ওর নাম দিলাম তুরতুর! মিষ্টি না?”
একটু আগেই চোখের পানি ফেলা সেই মেয়েটা
খুশিতে ঝুমঝুম করছে এখন। না চাইতেও হেসে ফেললো গ্যাব্রিয়েল। তাতে আরেকটু ক্ষেপলো লিলি। মুখ ফুলিয়ে শুধাল,
“ হাসছেন কেনো অমন পাগলের মতো?”
“ আমি তো পাগলই। অন্তত তোমার জন্য। তবে তুমি যে আমাকে মেন্টাল এসাইলাম থেকে পালানো পাগল মনে করো, সে আমি জানি!”
গ্যাব্রিয়েল ফের মাথা নুইয়ে ঠোঁট টিপে হাসে। লিলি গলায় ঝাঁঝ এনে জিজ্ঞেস করে,
“ আপনাকে যেটা জিজ্ঞেস করেছি সেটা বলুন। তুরতুর নামটা মিষ্টি কিনা? আরেকবার কথা ঘুরালে, আমি কিন্তু তুরতুরকে নিয়ে একাই চলে যাবো বাসায়!”
গ্যাব্রিয়েল সহসা মাথা তোলে। ব্যথাতুর চোখে তাকায় লিলির দিকে। এই মেয়ে আবার ওকে বাসায় নেবে না বলছে?
“ কিন্তু তুমি যে থানা থেকে বের হওযার সময় বললে, আমি অর্ধেক ভাড়া দিয়ে থাকতে পারবো!”
“ হ্যাঁ পারবেন। বিয়ের পর পারবেন। আপনি আমাকে আপনার ফায়দায় বিয়ে করবেন, আর আমি আমার!”
কথাটা বলেই লিলি দ্রুত এগিয়ে যায় অনেকটা। নির্বিকার মুখে এমন লজ্জা লজ্জা কথাটা বলে ফেললো ও? ইশ!
গ্যাব্রিয়েল বড় বড় কদম ফেলছে পিছন থেকে। লিলির পাশাপাশি চলে আসতে সময় নেয়না সে। হাঁপাতে হাঁপাতে শুধায়,
“ তুমি আমাকে… সত্যি সত্যি বিয়ে করবে লিলি?”
লিলি মেকি বিরক্তি নিয়ে আওড়াল,
“ বিয়ে ছেলেরা করে গর্দভ! মেয়েদের হয়। কিন্তু আপনি যে হারে আমার বাসার সব কাজ নিজের হাতে সামলানোর দায়িত্ব নিয়ে বসে আছেন, তাতে তো মনে হচ্ছে বিয়েটা আমারই আপনাকে করতে হবে!”
গ্যাব্রিয়েল তাতেও খুশি। তুরতুর ততক্ষণে জেগে উঠেছে ঘুম থেকে। মানুষটার কাঁধ থেকে মুখ তুলে এদিক ওদিক খোঁজে কাউকে একটা। তারপর গলার ভারী স্বর টের পেয়েই ঘাড় কাত করে তাকায় পাতানো বাবার দিকে।
“ কিরে তুরতুর ব্যাটা! উঠে পড়েছিস! জিজ্ঞেস করতো রাগিণীকে আজকে রাতেই বিয়েটা সেরে ফেলা যায় কি-না? চারশো বছর অপেক্ষা করেছি! আর কত?”
তুরতুরও ওর ফোকলা মাড়ি বের করে দেয় সঙ্গে সঙ্গে। গ্যাব্রিয়েল ওকে হাওয়ায় ছুড়ে বলের মতো খপ করে ধরে ফেলে। শূন্যে উঠেও খিলখিল করে ওঠে তুরতুর!
লিলির ঠোঁটেও হাসির সয়লাব তখন। ওদের দু’জনের এমন দুষ্টুমি দেখতে দেখতেই মনে গ্যাব্রিয়েলকে বলে ওঠে,
“ থ্যাঙ্ক ইয়্যু মিস্টার ভ্যাম্পায়ার! সাইফের মতো মানুষের আসল রূপ আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার জন্য, রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও তুরতুরের দায়িত্ব নেয়ার জন্য, আমাকে আবার হাসানোর জন্য, সবকিছুর জন্য আপনাকে থ্যাঙ্ক ইয়্যু!”
তুরতুরকে শেষবারের মতো হাওয়ার ছুৃঁড়ে কাঁধে তুলে নিলো গ্যাব্রিয়েল। পরপর লিলির দিকে তাকিয়ে নরম হেসে আওড়ালো,
“ এন্ড, আ’ম মেডলি ইন লাভ উইদ ইয়্যু মিসেস রাগিণী! আই লাভ ইয়্যু, আই লাভ ইয়্যু, আই লাভ ইয়্যু!”
_ _ _ _
দুই বছর পর…
“ শহরে সৃষ্টি হয়েছে এক অদ্ভুত উপদ্রব। বইপড়ুয়াদের বাসায় গভীর রাতে হানা দিচ্ছে এক আগন্তুক। ভাষ্যমতে, সেই আগন্তুককে দেখেই প্রেমে পড়ে যায় তরুণীরা। সূচালো দাঁতের রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখ। থুতনির মাঝ বরাবর কাটা দাগ। বাদুড়ের ডানার মতো আলখাল্লা পরে সে উড়ে উড়ে আসে রাত বিরাতে। তবে কারোর ক্ষতি না করে, তাদেরকে নিজের স্ত্রীর লেখা বই কেনার হুমকি দিয়ে যায়। জানা গেছে, এই আগন্তুক যে লেখিকাকে নিজের বউ বলে সম্মোধন করেছে, সদ্য তার একটি বই বেরিয়েছে এবারের বইমেলায়। বইয়ের নাম রাগিণীর অদ্ভুতুড়ে সংসার!”
লিলি হা হওয়া মুখ নিয়ে রিমোট হাতড়ে টিভিটা বন্ধ করে। এলোমেলো পাখির বাসার মতো চুল তার। পরনে টিশার্ট আর প্লাজো। চোখের নিচে পেন্ডোরা বক্স খুলে বসেছে একগাদা কালি। অতিরিক্ত রাত জাগার ফল। দ্বিতীয় বইয়ের পান্ডুলিপি শুরু করতেই এই হাল তার।
লিলি তো কখনো আসাও করেনি ফেসবুকের বাইরেও কেউ পড়বে ওর লেখা। সেখানে সাহস করেই প্রথম বইটা বের করে লিলি! গ্যাব্রিয়েল ওকে যে নামে ডাকে, সেই নামটাই দেয় বইয়ের নামলিপিতে। রাগিণীর অদ্ভুতুড়ে সংসার।
বই রিলিজ হওয়ার আগের দিন নার্ভাসনেসের কারণে কান্নাও করেছে ও। গ্যাব্রিয়েলের কোলে বসে সেদিন বাচ্চাদের মতো কেঁদে ভাসায় লিলি।
“ আমার বই কেউ কিনে পড়বে না দেখো!”
গ্যাব্রিয়েল লিলিকে কাঁদতে দেখতে পারেনা৷ ও কাঁদলে লোকটা রেগে যায়। রেগে রেগে দু-হাতে ওর গাল মুছিয়ে দেয়। স্ফীত মুখখানা উদোম বুকে ঠেসে ধরে আওড়ায়,
“ কার এতোবড় সাহস, বইমেলায় গিয়ে আমার বউয়ের বই না কিনে চলে আসে? হু? দরকার পড়লে আমি একাই দেখবে সব কিনে নিয়ে আসবো! তারপরও কাঁদে না জান! প্লিজ! এই দেখো তুমি কাঁদলে আমার নিশ্বাস নিতে কেমন কষ্ট হয়, দেখো!”
লিলি কান্না থামায়। গ্যাব্রিয়েলের বুক থেকে মুখ তোলে ভ্রুকুটি করে। নাক মুখ কুঁচকে ভেজা ঠোঁটের উপর থেকে লোমের মতো কিছু একটা সরিয়ে বলে ওঠে,
“ এমনভাবে বুকের সাথে মেশাবেননা তো আর আমায়। আজকেও দুটো ছিঁড়ে চলে এসেছে মুখে।”
বলেই আবার ভ্যাঁ করে উঠলো মেয়েটা। গ্যাব্রিয়েল ওর মুড সুইং এর সাথে পেরে না উঠে বললো,
“ আজকেই সব কেটে ফেলবো রাগিণী!”
“ আর আমার কোনো বই কিনবেন না আপনি!”
“ একটাও কিনবো না!”
“ আজকে রাতে আমরা বাইরে খাবো!”
“ একদম! এখনই টেবিল বুক করছি আমি দাঁড়াও!”
“ আপনাকে আদর করতে ইচ্ছে করছে এখন। আর এখনই করবো! না না করলে বা কাজ আছে বললেই মার খাবেন আমার হাতে!”
ফোঁস করে শ্বাস ফেললো লিলি। ঐদিন লিলির সব কথায় এক বাক্যে রাজি হয়ে যাওয়ার কারণ তারমানে রাত বিরেতে মানুষকে ভয় দেখিয়ে ওর বই কেনানো?
“ গ্যাব্রিয়েললললল!”
লিলির এক চিৎকারেই আলাদিনের জিনির মতো হাজির হয় গ্যাব্রিয়েল। পরনে গ্রে ট্রাউজার। খালি গায়ে শুধু কিচেন এপ্রোন জড়ানো। হাতে খুন্তি! নিশ্চয়ই রান্না করছিল।
গ্যাব্রিয়েল একবার টিভি তো আরেকবার লিলির রাগত মুখটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ ক-কী হয়েছে রাগিণী? রেগে আছো কেনো জান?”
এই লোকটাকে নিয়ে কী করবে লিলি? মেয়েটা ক্লান্ত চোখে তাকায় গ্যাব্রিয়েলের দিকে। সারাদিন বাসায় এতো খাটে মানুষটা, যে লিলি রাগও দেখাতে পারেনা। মায়া হয়! যদি আবার কষ্ট পেয়ে বসে? তবুও নরম গলায় শুধায়,
“ আপনি জনে জনে গিয়ে ভয় দেখিয়ে বেড়ান রাতে আমার বই কেনার জন্য?”
গ্যাব্রিয়েল এই ভয়টাই পাচ্ছিল। কিন্তু রাগিণীর সামনে থাকলে কথা গুলিয়ে ফেলে বেচারা। অগত্যা আত্মপক্ষ সমর্থন করে জানালো,
“ হ্যাঁ! আমি জানি তুমি রাগ করবে, বলবে, মানুষ বই কিনবে আমার লেখা পছন্দ করে, আপনার ভয়ে ভয়ে গিয়ে নয়। কিন্তু আমি যা করেছি তার সম্পূর্ণ দায়ভার আমার। আমি যা করেছি, তোমার ফ্যান হিসেবে করেছি! নিজের পছন্দের লেখিকার বই বেশি সেল হওয়ার জন্য করেছি!”
“ তাই বলে আপনি ভয় দেখাবেন মানুষকে?”
অমনি ফিচেল হাসলো সম্মুখের মুখটা। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কাউচের উপর হাত রেখে ঝুঁকে এলো লিলির উপর। কুন্ঠায় সিটিয়ে গেলো লাজবন্তী। ওর পুরু ঠোঁটে গ্যাব্রিয়েল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে আওড়াল,
“ আমি তোমায় বলেছি না? আমি রান্না করবো, বাসন মাজবো, সাথে আমার বউকে চুল পরিমাণ কষ্ট দেয়া প্রত্যেকের নিশ্বাস নেয়াও একে একে বন্ধ করবো! আর এখানে তো শুধু একটু ভয় দেখিয়েছি, তাও আমার পছন্দের রাইটারের বই কেনার জন্য। যাতে সে আরো লেখার উৎসাহ পায়। কখনো ভেঙে না পড়ে! আর তুমি রিভিউগুলো দেখো! একদম জেনুইন। ওগুলো ওরা নিজে থেকে দিয়েছে। আমার কোনো হাত নেই কিন্তু এতে!”
লিলি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে হুট করেই গলা পেচিয়ে ধরে গ্যাব্রিয়েলের৷ পরপর আচমকাই গভীর এক চুমু খেয়ে বসে পাতলা ওষ্ঠপুটে।
তুরতুর মেট্রেসের উপর বসে গাড়ি নিয়ে খেলছিল। লিলির এমন কাজে উল্টো ঘুরে বসে সহসা। ওর বয়স এখন তিনবছর। আধো আধো বুলিতে অনেক কিছু বলতেও পারে। তবুও যদি এদের লজ্জা হয় একটু!
তবে তুরতুরের সবচেয়ে পছন্দের মানুষ ওর বাবা! গাবু। যদিও গাবু এখনো পুরোপুরি মানুষ হতে পারেনি। কারণ পরিপূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হতে এখনো অনেক দেরি। যেদিন হবে, গাবুও সেদিন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে। আপতত সে আধা ভ্যাম্পায়ার আধা মানুষ রূপেই তার রাগিণীর সব রকমের বিলাসিতা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত।
ওদের অদ্ভুতুড়ে সংসারে নতুন আরেকজন অতিথিও নাকি আসছে। তার নাম যন্ত্রণা। লিলিকে পেটে থাকতেই যন্ত্রণা দিয়ে কাহিল করে ফেলেছে এই ছেলে। পৃথিবীতে ল্যান্ড করার পর কী করবে, তা নিয়ে তুরতুর আর ওর বাবার চিন্তার শেষ নেই। গাবু বলেছে, ওদের এই অদ্ভুত সংসারে এই এক যন্ত্রণাই প্রথম এবং শেষ। আর কোনো যন্ত্রণা আসার চান্স নেই।
তুরতুর মনে মনে দীর্ঘ নীরবতা পালন করে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
“ টোমাডেরও আমার বিস্যাস নেই। রাস্টায় কুতাবাসা ডেকলেও নিয়ে আসতে চাও! আবার বলে কিনা আর যন্তুণা আনবো না! হুহ!”
_ _ _ _
#পরিশিষ্টঃ
বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে লিলি। কোলের উপর ল্যাপটপ নিয়ে পান্ডুলিপি এডিটের কাজ শেষ করেছে মাত্র। একনাগাড়ে ল্যাপটপের ঐ নীল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকায় মাথা, চোখ ব্যথায় টনটন করছে ওর। পা-ও ঝিম ধরে গেছে বসে থাকতে থাকতে। ভাবলো একবার গ্যাব্রিয়েলকে ডাকবে। পাশের রুমে তুরতুরকে ঘুম পারাতে গিয়েছে মানুষটা। অথচ ডাকার আগেই ওর কোল থেকে ল্যাপটপটা সরিয়ে নিলো কেউ একজন।
লিলি চোখ তুলে তাকাতেই চওড়া হাসলো গ্যাব্রিয়েল।
“ পা টিপে দেই?”
লিলি মলিন মুখে নিজের পাশের বালিশটায় হাত দিয়ে ইশারা করে বললো,
“ এখানে আসো! মাথায় হাত বুলিয়ে দাও! তাতেই হবে!”
লিলির ঠিক নেই। স্বামীকে কখনো আপনি ডাকছে তো কখনো তুমি। গ্যাব্রিয়েল হাসলো ঠোঁট কামড়ে। হামাগুড়ি দিয়ে এসে ধপাস করে বসে পড়লো লিলির পাশে। কপালে আঙুল দিয়ে মাসাজ করে দিতেই লিলি বলে উঠলো,
“ তুরতুর ঘুমিয়েছে?”
“ হু!”
“ তাহলে আপনি এলেন কেনো? ও ঘরেই ঘুমিয়ে পড়তেন! আমি রাত জেগে লিখলে আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে না?”
গ্যাব্রিয়েল কপাল থেকে হাত সরিয়ে লিলির বুকের উপর মাথা দিয়ে শুয়ে পড়েলো। হাস্কি স্বরে আওড়াল,
“ না!”
“ কেনো?”
“ তুরতরকে খাওয়ানোর, গোসল করানো, ঘুম পারানোর দায়িত্ব আমার, আর আমাকে ঘুম পাড়ানোর দায়িত্ব আমার বউয়ের! তাই চলে এসেছি!”
গ্যাব্রিয়েল লিলির বুকে বাচ্চাদের মতো মুখ ডোবায়। মেয়েটা না চাইতেও হেসে ফেলে। ঝুঁকে এসে চুমু খায় ঐ কপালে। চুলগুলো এলোমেলো করে দিতে দিতে ভাবে, ওর এই অদ্ভুত সংসারটা অতোটাও মন্দ নয়।
|| সমাপ্ত ||
