#রাগিণীর_অদ্ভুতুড়ে_সংসার (০৩)
“ আমি একদম লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকবো রাগিণী! তুমি টেরই পাবে না যে তোমার বাসায় তোমার একটা বরও আছে! সত্যি! অন্যদের মতো বউয়ের থেকে সকাল-বিকাল চুমু খাওয়ার জন্য ঘ্যানঘ্যানও করবো না! আর ঐসবও একটু যা করার আমিই করবো, তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না! প্রমিজ!”
ছোট্ট কাঠের খাওয়ার টেবিল। তার একপাশে লিলি। অন্যপাশে মুখোমুখি হয়ে বসা গ্যাব্রিয়েল। তার মেঘমেদুর মুখখানা নোয়ানো। চিবুকের ঐ গাঢ় ভাজটায় যেন হাজার বছর ধরে জমা হয়ে আছে একরাশ মন খারাপ।
লিলি সেসব খেয়াল করলো কিনা কে জানে? তবে শীতল কন্ঠে শুধালো,
“ কীসবও একটু?”
“ ঐ যে আ-আদর টাদর আরকি!”
অমনি বাজখাঁই এক ধমক খেলো গ্যাব্রিয়েল,
“ কীহ্? কী বললেন আপনি? আরেকবার বলুন সাহস থাকলে!”
মাথা খারাপ! গ্যাব্রিয়েল ভ্যাম্পায়ার হতে পারে কিন্তু শখের নারীর সাথে বাকযুদ্ধে জেতার সেই সাহস তার নেই। অতএব, এদফায় সে তালা লাগালো মুখে।
মাথা ঠান্ডা হলে ফোঁস করে শ্বাস ঝাড়ল লিলি। ত্যক্ত স্বরে নিজেই বলতে লাগলো,
“ আপনি ফ্রাইংপ্যান ধোঁয়ার নাম করে ভোর অবধি ঘুরঘুর করলেন আমার বাসায়! এখন আবার এসব বলছেন! আপনার কী এখান থেকে সম্মানের সাথে বেরোনোর কোনো ইচ্ছে নেই? আপনি আসলে কী চাইছেন? আমি লোক ডেকে আপনাকে বের করি? ওহ্! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম! আপনি তো আবার সবাইকে হিপনোটাইজ করে মন বদলে দিতে পারেন! লোক ডাকলে তাদের সাথেও নিশ্চয়ই ওমনই করবেন, ইন্সপেক্টরের সাথে যেমন করেছেন?”
লিলির জলদগম্ভীর প্রশ্নে অবশেষে মুখ তুললো গ্যাব্রিয়েল। ব্যথিত চোখজোড়া রমণীর নির্ঘুম ঐ চোখে রেখেই নামিয়ে ফেললো পরপর। ইদানীং আড়াল থেকে এই মলিন চেহারা আর উসকোখুসকো চুলের লিলিকে দেখলেই ওর বুকে টেনে নিতে ইচ্ছে হয় খুব। মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে ইচ্ছে হয়,
“ আমি না হয় তোমার বসার ঘরেই থাকি? আমার তো ঘুমোতেও হয় না! বিছানায় যাওয়ারও ঝামেলা নেই। শুধু তোমাকে পাহারা দিয়ে রাত কাটাতে তো আমি এক পায়ে রাজি! তোমার ঘরের সব কাজ করে দিতেও রাজি! তবুও কি আমাকে বের করে দেয়া খুব জরুরী রাগিণী?”
গ্যাব্রিয়েলের দৃষ্টি বিবশ হয়। মুখ ফুটে বলতে পারে না ওসব। ওর রাগিণীর রাগ তো আবার নাকের ডগায় কি-না!
লিলি খেঁকিয়ে ওঠে অমনি।
“ কী হলো? স্পিক আপ? কথা নেই মুখে? আচ্ছা! লোকের কথা বাদ দিলাম! একটা অচেনা লোক হুট করে আমার বাসায় থাকবে, আমাকে বিয়ে করতে চাইবে, বউ বউ করে ডাকবে আর আমি আরামসে সেটা হতে দেবো? সরি টু সে মিস্টার গ্যাব্রিয়েল আমি সেটা পারবো না। আমি চাইছি না আপনি আমার বাসায় আর এক মূহূর্তও থাকুন!”
প্রায় সাথে সাথেই ভাবনারা লেজ গুটোয় গ্যাব্রিয়েলের। ছ’ফুট গ্যাব্রিয়েল ছলকে ওঠে ঐ একধমকে। ঘাবড়ানো গলায় আওড়ায়,
“ কে-কেনো?”
“ আমার কোনো আনওয়ান্টেড গেস্টের দরকার নেই!”
“ গেস্ট হিসেবে না হোক, বর হিসেবে রাখো! তোমার যখন যা লাগবে সব ঠুটস্থ করে রাখবো! একটুও অভিযোগ করতে দেবো না!”
“ আমি…আপনাকে…বিয়ে করবো না..!”
লিলি থেমে থেমে আওড়ায়। গ্যাব্রিয়েলও অনুকরণ করে বলে,
“ আমি… তোমাকে… রান্না করে দেবো… রাগিণী! আমি ভালো রান্না করতে পারি! আমাদের বিয়ে হলে তোমাকে আর ম্যাগি খেয়ে থাকতে হবে না! সত্যি বলছি!”
গ্যাব্রিয়েলের গোবেচারা মুখের নাদানটাইপ কথাবার্তা আগুন জ্বালিয়ে দেয় লিলির মাথায়৷ মেয়েটা কটমটিয়ে বলে,
“ আমার কোনো বাবুর্চির দরকার নেই যে আপনি আমার জন্য রান্না করে দেবেন! আমার শান্তির দরকার! যেটা আপনি নষ্ট করছেন!”
“ শান্তিও আসবে! আমাদের বিয়ের পর মেয়ে বাবুর নাম রাখবো শান্তি! কারণ মেয়েবাবু দুষ্টুমি কম করে। আর ছেলের নাম রাখবো যন্ত্রণা! কিন্তু তুমি টেনশন কোরো না রাগিণী। ছেলে তোমাকে যন্ত্রণা করতে আসলেই ধোলাই খাবে আমার হাতে! একদম এক্সক্লুসিভ ধোলাই!”
লিলি রাগতেও ভুলে গেলো যেন। কেমন অসার গলায় আওড়ালো,
“ আমি আপনাকে বিয়ে করবো না! শুধু আপনাকে কেনো? আমি কাউকেই বিয়ে করবো না! আপনি দয়া করে আমার বাসা থেকে বের হোন! আসুন!”
লিলি এটা বলে উঠে দাঁড়াতেই গ্যাব্রিয়েল চেয়ারসমেত পিছিয়ে গেলো কিছুটা। দ্বিধান্বিত চোখজোড়া হন্যে হয়ে খুঁজলো অযুহাত। কী বলা যায়? সত্যিটা? কিন্তু সত্যিটাই বা কতটুকু বিশ্বাস করবে লিলি?
“ তোমার বাসা থেকে বের হয়ে আমি যাবো কোথায়? থাকবো কোথায়?”
“ এই শহরে এমন হাজারটা বাসা পাবেন!”
গ্যাব্রিয়েল রাখঢাক করলো না আর। পরাজিত বীরের ন্যায় বললো,
“ হাজারটা বউ তো আর পাবো না? আর আমি আমার বউকে রেখে কোথাও যাবোও না! শত হোক, বউ তো আমার একজনই!”
লিলি বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে তেড়ে আসতে চাইলো তৎক্ষনাৎ,
“ কী বললেন আপনি?”
গ্যাব্রিয়েল পিঠ বাঁচাতে চেয়ারের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল সহসা। হাত দুটো সামনে এনে লিলিকে ঠান্ডা বানাতে বাতাস করার মতো ওপর-নিচ করতে করতে প্রসঙ্গ বদলালো,
“ ব-বলেছি, ভ্যাম্পায়াররা এমন হুটহাট যেকোনো বাসায় থাকতে পারে না! মানে আমাদের থাকার জন্য ডাকতে হয়, ইনভাইট করতে হয়! তবেই আমরা কারোর বাসায় থাকতে পারি! এটাই বলেছি! তুমি শুধু শুধু রাগছো আমার উপর!”
“ তাহলে আপনি এ বাসায় কী করে আছেন? আমি ডেকেছিলাম আপনাকে?”
“ কে-কেনো? মনে নেই? টিভিতে ভ্যাম্পায়ার্স ডায়রি দেখার সময় নায়ককে দেখে কেমন গালে হাত দিয়ে বলেছিলে, ইশ! আমার যদি এমন একটা ভ্যাম্পায়ার থাকতো! বলেছিলে না বলো?”
“ আপনাকে আমি…”
লিলি টেবিল থেকে স্টিলের ভারী চামচটা তুলে নিলো হাতে। ওটা গ্যাব্রিয়েলের গায়ে ছুড়ে মারার আগেই আত্মপক্ষ সমর্থন করলো বেচারা,
“ বর হিসেবে ভ্যাম্পায়ার চাইবে, আর ভ্যাম্পায়ার চলে এলেই তাকে চেয়ার তুলে ভয় দেখাবে? এমন করে না লক্ষ্মীটি! এমনিতেই আমার পাওয়ার কাজ করছেনা, কেটে ফেটে গেলে যদি না সারে?”
লিলি শুনলো না সেসব। মেয়েটা রাগের বশেই ছুঁড়ে মা-রলো চামচখানা গ্যাব্রিয়েলের দিকে। নিশানা বরাবরই পড়লো ওটা। একেবারে ফর্সা কপালের উপর। ব্যথাতুর শব্দ করে কপাল চেপে ধরলো গ্যাব্রিয়েল।
কপাল কেটে রক্ত গড়াতে দেখেই মেয়েটা আঁতকে উঠলো ভিতর ভিতর। গ্যাব্রিয়েল ধাতস্থ হয়ে রক্তমাখা হাতটা চোখের সামনে এনে ধরতেই লিলি পিছিয়ে গেলো দুকদম। অথচ যার কপাল কাটলো তার ঠোঁটে তখন বিশ্বজয়ের হাসি।
লিলির দিকে তাকিয়ে খানিক গর্ব আর খানিক সংশয় নিয়ে আওড়ালো,
“ নাইস শট রাগিণী! কিন্তু একটা তে অসুবিধে হয়ে গেলো। একটু আগে পর্যন্ত যার উপর রাগ করতে এখন তো তাকে তুমি ভয় পাবে জান!”
মেয়েটা কাঁপা কাঁপা গলায় শুধায়,
“ কে-কেনো? আপনিও কি চামচ ছুড়ে মারবেন আমার দিকে?”
গ্যাব্রিয়েল জিভ কেটে আওড়ায়,
“ আসতাগফিরুল্লাহ! আমি আমার বউকে কোনোদিন মারতে পারি? ভয় পাবে কারণ তোমার মনে যদি আমার জন্য একটুও সফ্ট কর্ণার্স তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে আমার কপালের কাটা জায়গাটা আপনা-আপনিই সেরে যাবে তোমার সামনে! চাইলে দেখতে পারো!”
লিলি পাল্টা কিছু বলার আগে সত্যি সত্যি কাটা জায়গাটা জোড়া লাগতে শুরু করলো গ্যাব্রিয়েলের। লিলি শূন্যচোখে দেখলো সেই দৃশ্য।
তৎক্ষণাত রঙ উড়ে গেলো ওর দোহারা চেহারার৷ ধীরে ধীরে ভয়ের ফ্যাকাশে প্রলেপ পড়লো মুখে। নিজেকেই উন্মাদ মনে হলো এ পর্যায়ে ওর। ত্রাসিত গলায় বিস্ময় নিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা,
“ এটা কী করে সম্ভব? কে আপনি?”
গ্যাব্রিয়েল নরমভাবে তাকালো লিলির দিকে। পরপর দু’পা এগিয়ে এসে মোলায়েম স্বরে আওড়ালো,
“ আমি সাধারণ মানুষ নই রাগিণী! আমি ভ্যাম্পায়ার! তোমার ভ্যাম্পায়ার!”
লিলির দম আঁটকে গেলো শুনে। যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা মস্তিষ্কটা আচমকাই নিথর ভূমিকা পালন করলো ওর। গ্যাব্রিয়েল একটু থেমে আবার বললো,
“ বললাম না ভয় পাবে আমাকে! এই যে আমিটাকে দেখছো, এই আমিটার অস্তিত্ব পুরোটাই একটা ফাঁকা খোলস। আমার না আছে আত্মীয় পরিবার, না নিজের কেউ। সবাই চলে গেছে শুধু…আমিই যেতে পারিনি। চারশো বছর ধুঁকে ধুঁকে একটা অভিশপ্ত জীবন কাটাচ্ছি। ভ্যাম্পায়ারদের জীবন!’
_ _ _ _
কেটেছে ঘন্টা দুয়েক। আপতত লিলি স্বাভাবিক হতে না পারলেও গ্যাব্রিয়েলকে খুব একটা অস্বাভাবিক লাগছে না তার। সে ভ্যাম্পায়ার হোক, বা ভূতপ্রেত; ভীষণ করে লিলির যত্ন নিতে মরিয়া। লিলির ভালো লাগা খারাপ লাগা নিয়ে চিন্তিত। এই যেমন লিলিকে নির্বিকার বসে থাকতে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে কেমন হাঁসফাঁস করছে বেচারা।
লিলি বিরক্ত হলো কিঞ্চিত। চ সূচক শব্দ করে শুধালো,
“ আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেনো সামনে?”
গ্যাব্রিয়েল জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে আওড়ায়,
“ না মানে তাহলে কি পাশে বসবো?”
লিলি সহজভাবেই আওড়ায় এবার,
“ বসুন!”
গ্যাব্রিয়েল আর যাই হোক, সে মানুষ নয়! বিষয়টাতে কদাচিত আগ্রহবোধ করছে লিলি। অনেক কিছু জানতেও ইচ্ছে করছে। তারমধ্যে যেটা সবথেকে বেশি জানার জন্য লিলি উন্মুখ তা হলো,
“ রাগিণীটা কে?”
গ্যাব্রিয়েল লিলির এমন সহজভাবে তাকানোতেও ঘাবড়ায় একপল। দৃষ্টি ঘুরিয়ে অদূরের টিভির উপর ফেলে। ওরা দু’জনই এখন লিলির সেই ছোট্ট লিভিং রুমের সোফাটায় বসা। গ্যাব্রিয়েল গুছিয়ে নেয় কথাগুলো প্রথমে। তারপর বলা শুরু করে,
“ ছাব্বিশ বছর পর্যন্ত আমি বাকিদের মতোই স্বাভাবিক ছিলাম। আমার জীবনেও অনেকে ছিল। মা-বাবা, ভাই, ছোট্ট একটা বোন। আর আমার প্রথম ভালোবাসা। আমার রাগিণী! রাগিণীকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনতাম। একই পাড়ায় দুজনের বাড়ি। সেখান থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। প্রেম থেকে পরিণয়ের সিদ্ধান্ত। সবকিছু ভালোই যাচ্ছিল। আমাদের বিয়ের তারিখ ঠিক হলো। কিন্তু হঠাৎই এলো একটা ভয়ংকর রাত! দ্যাট ব্লা-ডি ফুল ব্লা-ডমুন নাইট। বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সে রাতে আমার আর রাগিণীর। অথচ একটা দূর্ঘটনায় সব শেষ। আমি সবাইকে হারালাম। আমার মা,বাবা, ভাই, বোন, রাগিণী সবাইকে।
শুধু বিস্ময়করভাবে বেঁচে গেলাম আমি। আর তার পরপরই বুঝলাম আমি বেঁচে যায়নি, আমার বড় একটা অংশ আসলে ম রে গেছে। আমার অস্তিত্ব ম রে গেছে।
আমি আর আগের মতো র-ক্ত মাংসের মানুষ নেই!
আমি এখন অন্য কিছু! কেউ হয়তো এই অন্যকিছুকে উপাখ্যান দেয় ড্রাকুলা তো কেউ আবার ভ্যাম্পায়ার। তোমার কাছে এটা অবাস্তব গল্প মনে হতেই পারে, কিন্তু ইয়্যু নো হোয়াট রাগিণী? এই অবাস্তব গল্পের ভিক্টিম তোমার পাশেই বসে আছে এখন।”
লিলি প্রতিত্তোরে কী জবাব দেবে বুঝতে পারলো না। কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে এসব বিশ্বাস করা অসম্ভব। নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সন্দিহান লিলি তবুও কৌতুহল থেকে জিজ্ঞেস করে,
“ আপনি বারবার বলেছেন আমাকে আপনার প্রয়োজন! কিন্তু কেনো?”
গ্যাব্রিয়েল এ পর্যায়ে চোখে চোখ রাখে লিলির। ক্লান্ত কন্ঠে আওড়ায়,
“ শাপে বর কথাটা শুনেছো রাগিণী? আমার বর হলো আমি অনেকটা জীবন পেয়েছি। অনেক কিছু দেখেছি। সাথে খুঁজেছি নিজেকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করার উপায়! ভাগ্যক্রমে পেয়েওছি সেটা।
যদি আমি কোনোদিন আমার রাগিণীকে খুঁজে পাই, আর সে যদি আমায় বিয়ে করতে রাজি হয়; সেই একই রকম পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের রাতে, তাহলেই আমি আবার স্বাভাবিক হতে পারবো। আমার আর একা বেঁচে থাকার এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে না। আর ভ্যাম্পায়ার হলেও বা কী? দেখো; আ’ম টোটালি ইউজলেস! কোনো শক্তি কাজ করে না আমার! দ্যটস হোয়াই আই নিড ইয়্যু রাগিণী! আই রিয়্যালি নিড ইয়্যর হেল্প!”
লিলি রুদ্ধশ্বাসে শুনে যায়। গ্যাব্রিয়েলের কথা থামলে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে ও। ভয়ের তীব্রতায় ফ্যাসফ্যাসে শোনায় কেমন সেটুকু,
“ কিন্তু আমি তো লিলি! অথচ কথায় কথায় কিনা আমাকে নিজের মৃত হবু স্ত্রীর নামে ডাকছেন?”
“ তুমি হয়তো এটাও বিশ্বাস করবে না, কিন্তু তুমিই আমার রাগিণী! তোমার ভাসা ভাসা চোখ, ঐ সরু নাক, ঠোঁটের পাশের আদুরে তিল, পুরো তুমিটাই অবিকল আমার রাগিণীর মতো দেখতে…! তাই তুমি যে আমার রাগিণী নও, এটা আমি মানি না! আর কোনোদিন মানবোও না!”
লিলি দু’হাতে মাথা চেপে ধরে নিজের। কিছুক্ষন পর জিজ্ঞেস করলো,
“ আর আমি যদি বিয়ে না করতে চাই আপনাকে?”
গ্যাব্রিয়েলও এগিয়ে এসে মুখোমুখি ফরাসে বসলো লিলির। কত আগে থেকে সে লিলির সব খবরাখবর রাখে সেটা আড়াল করার আর প্রয়োজন নেই বোধহয়! তারমতে, এই বিয়েতে লিলির ফায়দাটাও দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
“ আমাকে বিয়ে না করার তো কারণ নেই তোমার রাগিণী! আমি ভালো রান্না পারি, কাপড় কাচতে পারি, বাসন মাজতে পারি! ঘর গোছাতে পারি! হ্যাঁ, হয়তো চাকরি বাকরি কিছু করি না! সো হোয়াট? আজকাল এমন সুদর্শন বেকার জামাইও বা কয়জনের মেলে বলো?”
“ আমার কোনো সুদর্শন বেকার জামাইয়ের দরকার নেই!”
“ কিন্তু তোমার প্রাক্তনকে তো দেখানোর দরকার আছে, যে তুমি কতটা সুখে আছো মুভ অন করার পর! হু? কত ভালো বর পেয়েছো! তুমি চাও না, তোমার সামনে যে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে সংসার পাতলো, তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে নিজেও নিজের বরের সাথে সুখে থাকতে? মিথ্যে মিথ্যে অভিনয় করেই না হয় থাকলে! চাও না?”
লিলি তাজ্জব বোনে চেয়ে রয় গ্যাব্রিয়েলের নিরিহ মুখের দিকে। কত অবলীলায় আওড়ালো গ্যাব্রিয়েল কথা গুলো! অথচ লিলি? সে যে বিস্ময়ের জমিনে মুখ থুবড়ে পড়েছে। লিলির প্রাক্তন! মানে সাইফ! কিন্তু তার কথা গ্যাব্রিয়েল জানলো কী করে?
_ _ _ _ _ _ _
বাসস্ট্যান্ডের রঙচটা বেঞ্চের উপর পা ঝুলিয়ে সিগারেটে সুখটান দিলো গ্যাব্রিয়েল। সকালের কমলা রোদটা মাথার উপর চড়েছে সবে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভ্যাপসা গরম।
“ দিলো তো বের করে? এখন কী করবি?”
গ্যাব্রিয়েল তীর্যক চোখে উপরে তাকালো। বেঞ্চের ছাউনির সাথে উল্টো হয়ে ঝুলছে একটা বাদুড়। অমন শাণের মতো ধারালো চোখজোড়া নিজের দিকে তাকাতে দেখে বাদুড়টা বলে উঠলো,
“ আমাকে চোখ রাঙিয়ে লাভ আছে? যাকে ভয় দেখানোর কথা তার সামনেই তো মিউমিউ করিস!”
গ্যাব্রিয়েল ম রণ শ্বাস ফেললো এবার। সিগারেটটা আঙুলের ফাঁকে রেখে গা এলিয়ে দিলো পিছনে। পরনের কিচেন এপ্রনটা এখন ফরমাল শার্ট-প্যান্টে বদলেছে। ওগুলোও ওর সাথেই বাসার বাইরে ছুড়ে ফেলেছিল তার রাগিণী! আহ্!
“ ভয় দেখালেই বুঝি আমায় বাসায় রেখে জামাই আদর করতো? হাসালি তুই! আমি শুধু ভাবছি রাগিণী রেগে গেলো কেনো?”
বাদুড়টা কড়া সুরে বললো,
“ তুই ওর এক্সের ব্যাপারে সব খোঁজ খবর রাখবি, আর ও শুনে আনন্দে হাততালি দেবে? গর্দভ! ভালো তো এখনো এটা জানেনি যে চিটিংবাজটার ধরা খাওয়ার পেছনেও তোর হাত ছিলো!”
গ্যাব্রিয়েল ভ্রুকুটি করে অমনি।
“ জানলেও বা কি? আমি যা করেছি সবটা রাগিণীর সেইফটির জন্য করেছি!”
“হ্যাঁ! আর মানুষকে হিপনোটাইজ করে ওর বিক্রি না হওয়া বই কেনানো, বাড়িয়ালাকে ভয় দেখিয়ে ওর জন্য ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দেয়া, সব তোর সেফটি ইন্সুইরেন্সের মধ্যে ছিল তাই না? তুই তো ঐ মেয়ের জন্য ইন্সুইরেন্স কোম্পানী খুলে বসতি পারলে!”
“ আলবাত!”
“ বদলে কী পেলি? ঘাড়ধাক্কা! হাহ!”
গ্যাব্রিয়েল আশ্লেষে হাসে। এতটুকু যে পেয়েছে এই বা কম কি?
“ এখন কী করবি?”
বাদুড়ের প্রশ্নে হাসি থামায় গ্যাব্রিয়েল। সোজা হয়ে বসে ভাবুক স্বরে আওড়ায়,
“ রাগিণীকে বোঝাতে হবে যে আমি হার্মফুল নই! আমি অত্যন্ত সুইট একটা ছেলে! বিয়ে করে বর বানানোর জন্য একদম পার্ফেক্ট!”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ! বারবনিতাদের সাথে পোল ডান্স করা, মানুষকে হিপনোটাইজ করা আমার কত সুইট ছেলেরে! যতসব ভন্ড এসে জুটেছে আমার কপালে! ছিহ!”
গ্যাব্রিয়েল সরু চোখে তাকালো বাদুড়টার দিকে। খেঁকিয়ে বললো,
“ তাহলে এই ভন্ডের পিছন পিছন ঘুরছিস কেনো? তোকে তো আর বের করে দেয়নি! ঝুলে থাকতি ওর বাসার কার্নিশে!”
বাদুড়টা নির্বিকার। মুখ উঁচিয়ে ভাব নিয়ে আওড়ালো,
“ আমার একটা লয়্যালিটি আছে না? শত হোক! আমি তোর বন্ধু মানুষ! এইটুকু স্যাক্রিফাইজ তো করতেই হতো!”
গ্যাব্রিয়েল তিতিবিরক্ত মুখে ভেঙিয়ে ওঠে বাদুড়টাকে,
“ এইটুকু স্যাক্রিফাইজ তো করতেই হতো! হুহ! লাগবে না তোর মতো বন্ধু আমার! যে বন্ধু চরিত্র নিয়ে খোটা দেয়, অমন বন্ধু লাগবে না আমার!”
গ্যাব্রিয়েল বলে থামতে না থামতেই ওর পাশে এসে বসলো একজন ভদ্রমহিলা। মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে চুপ হয়ে গেলো গ্যাব্রিয়েল। যতই হোক, এরা তো আর বাদুড়কে কথা বলতে দেখবে না। শুধু দেখবে গ্যাব্রিয়েল পাগলরে মতো একা একা বকবক করছে!
“ আমার বাচ্চাটাকে একটু দেখবেন পাঁচ মিনিটের জন্য! আমি একটা জরুরি কাজ সেরেই চলে আসবো! কাজটা আমার জন্য ভীষণ জরুরি! নইলে আমি এভাবে আপনাকে বলতাম না! প্লিজ!”
নারীকন্ঠ কানে যেতেই গ্যাব্রিয়েল ঘাড় ঘোরালো। ওর রাগিণীর বয়সী একটা মেয়ে। কোলে সফেদ তোয়ালেতে জড়ানো এক-দেড় বছরের একটা বাচ্চা। গোল গোল চোখ। আলুঢালু মুখ করে হাত পা ছুড়ছে। কিন্তু একজন মা অপরিচিত একটা লোককে বিশ্বাস করে নিজের বাচ্চাকে তার কাছে দিয়ে যেতে চাইছে, বিষয়টা অদ্ভুত লাগলো গ্যাব্রিয়েলের।
ও আর দোনোমোনো করারও সুযোগ পেলো না। তার আগেই বাচ্চাটাকে গ্যাব্রিয়েলের কোলে ধরিয়ে দিয়েই চলে গেলো মেয়েটা। বাচ্চাটা তখনও ডাগর ডাগর চোখ মেলে গ্যাব্রিয়েলকে দেখছে। কী নিষ্পাপ একটা মুখ। গ্যাব্রিয়েল বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আলতো হাসলো। থাক না! কী আর এমন হবে? পাঁচ মিনিটেরই তো ব্যাপার!
_ _ _ _ _
#চলবে?
#সিনথিয়া
