#রাগিণীর_অদ্ভুতুড়ে_সংসার |০৪|
#সিনথিয়া
লিলির সারাদিন কাটলো ছটফট করে। জানালা দরজার খিল লাগিয়েও আশপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখল সবসময়। বলা তো যায় না, কোত্থেকে আবার উদয় হয় গ্যাব্রিয়েল।
দেখা যাবে যাকে দরজা দিয়ে বের করে স্বস্তির শ্বাস ফেলেছে, ঘাড় ঘুরানোর আগেই সে লিলির বিছানায় হাজির। হয়তো পায়ের উপর পা তুলে পপকর্ণ চিবুচ্ছে নয়তো কালো সানগ্লাসটা নাকের ডগায় নামিয়ে হাই দিচ্ছে লিলিকে। লিলি মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো এসবের জন্য।
তারউপর মাইগ্রেনের উপদ্রব।
কতক্ষণ দু’হাতে কপাল চেপে রেখে উঠে দাঁড়ালো ও। টিকালো নাকের নিচে জমা হওয়া ঘামটুকু মুছে এগিয়ে গেলো রান্নাঘরের দিকে।
পরিপাটি গোছানো সবকিছু। ধবধবে পরিষ্কার ডিশওয়াশার। কোথাও একটা এঁটো বাসন নেই। লিলি বিস্ময় নিয়ে চারিদিকে চোখ বুলায়। ফ্রিজের দরজার সাথে রঙ বেরঙের স্টিকি নোট ঝুলতে দেখে থমকায় ও। সেগুলোর উপরে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা হয়েছে কিছু খুচরো বাক্য। লাল রঙা কাগজটায় লেখা হয়েছে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ ১;
“ বাসায় সিসিটিভি লাগাও। এতোদিন ধরে তোমার উপর নজর রাখলাম; ধরতে পারলে না! এই সেইফটি নিয়ে চলো তুমি? আর অনুমতি ছাড়া তোমার জিনিসপত্র ধরার জন্য আমি একটুও সরি নই! রাগ করলে করো! আমি আমার রাগিণীকে যেমন ভালোবাসি, তার রাগটুকুও তেমন ভালোবাসি!”
ডাস্টি পিঙ্ক কাগজে সতর্কীকরণ ২; “ আগেভাগে আমাকে পারমানেন্ট কুক হিসেবে রেখে দাও রাগিণী! নইলে কিন্তু পরে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও আমাকে পাবে না, বলে দিলাম। হুহ!”
হলুদাভ কাগজটায় সতর্কীকরণ ৩; “ আমাকে বের করে দেবে? দরকার পড়লে আমি ব্যানার টানিয়ে বসে থাকবো তোমার বাড়ির মোড়ের মাথায়, দেখবো তখন তুমি কী করে পাত্তা না দাও আমাকে!”
আর সবার শেষেরটায় লেখা সতর্কীকরণ ৪;
“ তোমার কাবার্ড গুছাতে গিয়েছিলাম দুদিন আগে, তখন একদম ভুলবশত তোমাকে তোমার এক্সের দেয়া একটা জামা ছিড়ে গিয়েছে আমার হাতে টান লেগে। খুব সম্ভববত দামী কোনো ব্রান্ডেরই ছিল জামাটা। দামী কাপড়। আমারই হাতে শক্তি বেশি। ধরতেই ছিড়ে ফিড়ে একাকার। যাই হোক, আমি কোনো একদিন অনেক টাকা কামালে তোমাকে অমন আরো হাজারটা কিনে দেবো! ওটা ছিড়ে গেছে বলে মন খারাপ কোরো না জান।
বিঃদ্রঃ ছেড়া জামাটা ময়লার গাড়িতে ফেলে দেয়া হয়েছে! খুঁজে লাভ নেই! পাবে না!”
লিলি বড়ো বড়ো চোখ করে পড়লো ওসব। গ্যাব্রিয়েল কোন ফাঁকে এগুলো লিখে সেঁটে রেখেছিল এখানে? নিশ্চয়ই যখন ও পুলিশ ডাকতে গিয়েছিল তখন!
ঠিক কত আগে থেকে লিলিকে নজরবন্দী করেছে গ্যাব্রিয়েল? কীভাবে জানলো, কোন জামাটা সাইফ ওকে কিনে দিয়েছে,আর কোনটা নয়?
এরমধ্যেই অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এলো লিলির ফোনে। মাথা ঝেড়ে কলটা ধরতেই কানে বাজলো সেই পুলিশ ইন্সপেক্টরের খড়খড়ে কন্ঠ,
“ আপনাকে কাইন্ডলি একবার থানায় আসতে হবে ম্যাম! আপনার হাজবেন্ড একটা ব্লান্ডার করে ফেলেছে!”
লিলি হকচকায়। ওর তো বিয়েই হয়নি এখনো।
“ আমার হাজবেন্ড?”
“ জ্বি জ্বি! মিস্টার গ্যাব্রিয়েল। উনি থানাতেই আছেন। আমি চিনে ফেলায় আপনাকে ফোন করতে বললো৷ আপনি একটু তাড়াতাড়ি আসলে সুবিধা হতো। রাখছি ম্যাম!”
লিলি আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ইন্সপেক্টর কল কেটেছে।
পুরন্ত অধরপুট ঠিকরে পড়লো দুপাশে লিলির। পাগলের মতো হুহা করে কতক্ষণ হাসলো ও। পরপর নিজেকে শান্ত করতে বড় বড় দম নিলো মেয়েটা। ঘাড় নুইয়ে অন্ধকার করে ফেললো মুখ। জ্বলজ্বলে চোখে বিড়বিড় করে বললো,
“ একবার শুধু থানায় যেয়ে নেই! এবার আপনাকে খু*ন করে তবেই বাসায় ফিরবো আমি গ্যাব্রিয়েলের বাচ্চায়ায়ায়া!”
_ _ _ _
পশ্চিমের আকাশ তখন লিলির ঐ ছোট্ট ফ্ল্যাটটার মতোই গুমোট। ধূসরকালো মেঘে ছেয়ে গেছে এই ব্যস্ত শহরের সুউচ্চ সব দালান। গ্যাব্রিয়েল একনজর বাইরে তাকায়। আলোআঁধারির এই সন্ধ্যায় দুশ্চিন্তার গাঢ় ভাজ পড়ে ওর কপালে। ঠোঁটের কাছটায় আড়াআড়ি করে সদ্য কাটা দাগটা দগদগে তখনো।
অথচ সেদিকে হুশ নেই ওর। ওর সমস্ত ভাবনা শুধু ওর রাগিণীকে নিয়ে। সে যতই উপরে উপরে গ্যাব্রিয়েলকে অপছন্দ করুক রাগিণী, মন তো এটাই বলে, আর যাই হোক, রাগিণী ওর জন্য একটু হলেও চিন্তা করে!
অমনি চোখমুখ কঠিন হয় গ্যাব্রিয়েলের।
থানায় ডেকে মেয়েটাকে হয়রানির মধ্যে ফেললো না তো ও? শিট!
তৎক্ষনাৎ তপ্ত চোখজোড়া তাকায় সেই গোঁফওয়ালা ইন্সপেক্টরটার দিকে।
এই লোকটা ওকে আঁটকে না রাখলে, কখনোই ও লিলিকে টানতো না এসবের মধ্যে।
“ পাপা! পা- পা!”
আচানক আধো আধো বুলিতে একটা ছোট্ট হাত গ্যাব্রিয়েলের শার্টের বোতামে থাবা বসাতেই দৃষ্টি নরম হয় ওর। ইনস্পেকটরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তাকায় কোলে ধরে রাখা বাচ্চাটার দিকে। গ্যাব্রিয়েল তাকাতেই ফোকলা দাঁত বের করে চওড়া হাসে বাচ্চাট। দন্তহীন মাড়ি দৃশ্যমান হলে গ্যাব্রিয়েল হতাশ গলায় শুধায়,
“ আমাকে বাপ না ডেকে নিজের আসল বাপের নাম ঠিকানাটা বললেও তো পারতি! এখন তোর আসল মা-বাপকে কোথায় খুঁজব বল তো? তোকে নিয়েই বা যাবো কোথায়?”
আচমকাই পাশ থেকে ব্যথায় কুইকুই করে উঠলো কেউ একজন।
“ জেলে যাবি তুই! আমার পিছনে লেগেছিলি না? এবার দেখ কেমন জেলের ঘানি টানাই তোকে! লকাবে পঁচে ম রবি তুই ব্লা ডি রা স্কেল!”
গ্যাব্রিয়েল বেশ শান্ত চোখেই কোলে থাকা নাম পরিচয়হীন বাচ্চাটাকে দেখছিল। সকালে পাঁচ মিনিটের কথা বলে যে মহিলা ওর কাছে এই দুধের শিশুটাকে ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, সে গত পাঁচ ঘন্টায়ও আসেনি।
কিন্তু এবার রাগ বাড়ে ওর। চোয়ালের পেশী মটমট করে ফুটিয়ে পাশে ঘাড় ফেরাতেই চোখে পড়ে সাইফকে। লিলির প্রাক্তন!
হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে বসে আছে অন্য একটা চেয়ারে। চোখের নিচে কালসিটে দাগ।
র ক্তে মাখামাখি লম্বাটে মুখ। চোয়াল চেপে ধরে রেখে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে গ্যাব্রিয়েল আর বাচ্চাটাকে।
ইন্সপেক্টর ওদের দুজনের মারমুখী ভঙ্গি ঢোক গিললেন। গ্যাব্রিয়েলের উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে শুধালেন,
“ দেখুন স্যার! আপনি অলরেডি একটা ঝামেলায় ফেঁসে আছেন। বাচ্চাটা কার এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি! এরমধ্যে শুধু শুধু এই লোকটাকে মারতে গেলেন কেনো বলুন তো?”
গ্যাব্রিয়েল নিশ্চুপ। শুধু শব্দ করছে তার কোলে থাকা বছরে দেড়েকের প্রাণটা। থানা থেকে ফরমুলা মিল্ক দেয়া হয়েছিল ক্ষিদে কমাতে। নয়তো কাঁদতে কাঁদতে বেচারা লাল হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে।
ইন্সপেক্টর আবারও কিছু বলতে যাবেন অমনি চিল চিৎকার ছুড়লো সাইফ।
গ্যাব্রিয়েলের দিকে তর্জনী তুলে বললো,
“ আমি বুঝতে পারছিনা, আপনাদের চোখের সামনে আমাকে এতো মার মা রার পরেও এই সাইকো টাকে এখনো বাইরে ছেড়ে রেখেছেন কেনো? কার জন্য অপেক্ষা করছেন আপনারা?”
জবাবটা নিজেই দেয়ার জন্য ধীরস্থির ভাবে মুখ খুললো গ্যাব্রিয়েল। বরফঠান্ডা গলায় দুই শব্দে শুধু আওড়াল,
“ মাই ওয়াইফ!”
সাইফ ক্ষুদ্ধ হয়। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
“ এরমধ্যেই ওয়াইফ? আমার সাথে বিয়ে ভাঙতে না ভাঙতেই তোর সাথে সংসার পেতে ফেলেছে? নাকি আগে থেকেই ডাবল টাইমিং করতো বি* টা! তোকেও রেখেছে সাথে আমাকেও! আর সব দোষ শুধু সাইফের না?”
সাইফ কথাগুলো বলে সারতে পারেনি, তার আগেই থানার দরজায় উপস্থিত হয়েছে লিলি। অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে চেয়ে শুধু শুনেছে সবটা।
গ্যাব্রিয়েল চায়নি আর ঝামেলা বাড়াতে। কিন্তু সাইফের লাগামহীন কথাবার্তায় নিজের রাগ প্রশমন করতে ব্যর্থ হয় ও। বাচ্চাটাকে ইন্সপেক্টরের হাতে ধরিয়ে নির্বিকার কায়দায় উঠে দাঁড়ায় প্রথমে। মুখোমুখি হয় সাইফের। আর তার পরপরই একহাতে শার্টের কলার ধরে সাইফকে শূন্যে তুলে ফেলে গ্যাব্রিয়েল। গলার শির-উপশিরা আক্রোশে ফুলে ফেঁপে ওঠে ওর। সাইফের বা গালে ঘুষিটা বসানোর আগে দাঁতে দাঁত পিষে শুধু বলে,
“ হাত-পা তো ভেঙেছি! রাগিণীর নামে আরেকটা বাজে কথা বলে দেখ! তোর এই মাকাল ফলের মতো মুখটাও এখানেই ভেঙে গুড়িয়ে রেখে দেবে গ্যাব্রিয়েল!”
হামলা আচমকা হওয়ায় গ্যাব্রিয়েলকে থামানোর সুযোগ পায়নি কেউই। তার আগেই সাইফের ফিনফিনে শরীরটা উড়ে গিয়ে পড়েছে অদূরে। ইন্সপেক্টর সমেত তার কোলে থাকা বাচ্চাটাও বিমুগ্ধ নয়নে দেখলো সাইফকে ফরাসে আছড়ে পড়তে।
মুখ হা করে একসাথে বলে উঠলো,
“ ওয়াহ!”
কনস্টেবল দাঁত কেলাতে কেলাতে আওড়াল,
“ কেয়া শট মারা হ্যায় গুরু! মাযা আ গায়া!”
লিলি ততক্ষণে দৃঢ় কদমে এগিয়ে এসেছে ওদের কাছে। গ্যাব্রিয়েল রাগের তোড়ে সব ভুলে বসলেও রাগিণী উপস্থিতি টের পেতে ভুল হলো না ওর। প্রায় বারো ঘন্টা পর তাকে দেখলো গ্যাব্রিয়েল।
অন্য সময় হলে মরে যেতো না ও? আজ না হয় বাচ্চাটার জন্য সয়ে নিয়েছে সবকিছু।
নিজের অবাধ্য চোখগুলো সামলাতে বেগ পেতে হলো গ্যাব্রিয়েলকে। লিলির কাছাকাছি আসতেই ঘাড় নুইয়ে ফেললো ও। চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারলো না কিছুতেই।
হাতদুটো সামনে এনে অপরাধীর মতো দাঁড়াল লিলির সামনে,
“ আ’ম সরি! আ’ম সরি রাগিণী! তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম না খুব এতদূর আসতে বলে?
আমি নিরুপায় ছিলাম রাগিণী! ওরা আমাকে যেতে দিচ্ছিলো না…আর আমি…”
“ শশশ!”
নিকোটিনে পোড়া ঠোঁটে একটা ফিনফিনে তর্জনী উঠে আসতেই কথা বন্ধ হয়ে গেলো গ্যাব্রিয়েলের। নিশ্বাসটাও বোধহয় বন্ধ হলো সঙ্গে সঙ্গে।
বিমূর্ত চোখজোড়া ঠিকড়ে এলো বাইরে। লিলি ওর গালে আলতো হাত ছোঁয়াতেই আশপাশ কেমন ধোঁয়াটে লাগলো গ্যাব্রিয়েলের। বুকে এসে আঘাত করলো ওর রাগিণীর উদ্বিগ্ন সেই স্বর,
“ আপনার লাগেনি তো কোথাও?”
_ _ _ _ _
#চলবে?
