#অগ্নিশিখা
পর্ব ০১
The Story Haven
আমার ছেলে ফোন করে বলল, “মা, আমি আগামীকাল বিয়ে করছি। আর হ্যাঁ… তোমার সব টাকা আমি তুলে নিয়েছি। আর কক্সবাজারের সী-ফেসিং ফ্ল্যাটটাও বিক্রি করে দিয়েছি।” সে ভেবেছিল এক ফোনেই আমাকে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু আমি তখন বারান্দায় বসে ছিলাম, সামনে অসীম সমুদ্র, ঢেউ আসছে যাচ্ছে, আর আমি… হেসে ফেললাম। কারণ আমার চালাক ছেলে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করে ফেলেছে।
আমার নাম শারমিন আহমেদ। বয়স চৌষট্টি। আমার জীবনে যা কিছু আছে—এক টাকাও আমি কারও দয়া বা ভাগ্যের জোরে পাইনি। আমি আর আমার স্বামী, সাইফুল আহমেদ, শুরু করেছিলাম একেবারে শূন্য থেকে। খুলনার এক গলির মাথায় ছোট্ট একটা বেকারি। দোকানের নাম ছিল “সুইট ওভেন”। সেই দিনগুলো এখনো মনে আছে—বৃষ্টির দিনে দোকানে পানি ঢুকছে, গ্যাস নেই, কেক পুড়ে যাচ্ছে, গ্রাহক ঝগড়া করছে, আর আমরা সারারাত না ঘুমিয়ে কাজ করছি। কিন্তু আমরা হাল ছাড়িনি। একটা দোকান থেকে দুইটা। দুইটা থেকে চারটা। তারপর আমরা ছোট একটা সুপারশপ খুললাম। লোকজন তখন বলত—“মেয়েমানুষ হয়ে এত বড় ব্যবসা করবে?” আমি হাসতাম। কারণ আমি জানতাম, আমি থামবো না।
বারো বছর আগে আমার স্বামী মা*রা গেলেন। সবাই ভাবল আমি ভেঙে পড়ব। কিন্তু আমি ব্যবসাটা বিক্রি করলাম, টাকা ইনভেস্ট করলাম জমি, ফ্ল্যাট, শেয়ার—সবকিছুতে। তারপর ঠিক করলাম—এবার আমি একটু শান্তিতে বাঁচবো। ভ্রমণ করব। নিজের মতো সময় কাটাবো। আর আমার একমাত্র ছেলে—আরমানকে—একটা নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিয়ে যাব। কিন্তু আরমান… সে শর্টকাট ভালোবাসত। সে মেহরিন নামের এক চতুর মেয়ের পাল্লায় পড়ে আজ আমাকে পথে বসানোর স্বপ্ন দেখছে।
ফোনটা রাখার পর আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সমুদ্রের গর্জন শুনলাম। মেহরিন ভেবেছে এই বৃদ্ধাকে বোকা বানানো সহজ। আরমান ভেবেছে মায়ের বিশ্বাস ভাঙলে পুরস্কার পাওয়া যায়। তারা জানে না, শারমিন আহমেদ যখন ব্যবসা শুরু করেছিল, তখন তাকে প্রতিনিয়ত বাঘের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। এই ছোটখাটো শেয়ালদের আমি কীভাবে সামলাতে হয়, তা খুব ভালো করেই জানি।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ধীর পায়ে ভেতরে এসে আমার ব্যক্তিগত ডেস্কের সামনে বসলাম। ল্যাপটপটা খুলে ‘আহমেদ লেগেসি হোল্ডিংস’-এর মূল সার্ভারে লগ-ইন করলাম। আমার স্বামী সাইফুলের একটা কথা খুব মনে পড়ছে আজ— “শারমিন, মানুষ যখন খুব দ্রুত উপরে উঠতে চায়, তখন সে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত আছে কি না তা দেখতে ভুলে যায়।” আরমানও তাই করেছে। সে যে ফ্ল্যাট বিক্রির বায়না করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, সেই ফ্ল্যাট আসলে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে কোনোদিন রেজিস্ট্রিই ছিল না। ওটা কোম্পানির একটি রিসোর্ট প্রপার্টি, যার সোল অথরিটি শুধুমাত্র আমার বায়োমেট্রিক এবং ডিজিটাল সিগনেচারে চলে। আরমান যে কাগজে সই নিয়েছিল, ওটা ছিল একটা সাব-পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি, যা কোম্পানির বোর্ড রেজোলিউশন ছাড়া অর্থহীন।
আমি কল করলাম আমার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত আইনজীবী ও বাল্যবন্ধু ব্যারিস্টার রফিককে।
“রফিক, সময় হয়েছে। অপারেশন ‘ক্লিন সুইপ’ শুরু করো।” ওপাশ থেকে রফিক হাসল। সে জানত এই দিনটা আসবে। সে বলল, “শারমিন, আরমান তো তোমার ছেলে। এখনো ভাবো, শেষ সুযোগ দেবে কি না?”
আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম, “সন্তানকে শাসন করা মায়ের দায়িত্ব। সে যদি অপ*রাধী হয়, তবে বিচার করাও আমার কর্তব্য। ও আমার টাকা চু*রি করেনি রফিক, ও আমার বিশ্বাসকে নিলামে তুলেছে। যারা অন্যায়ভাবে অন্যের হক কেড়ে নিতে চায়, তাদের জন্য ক্ষমা নেই।”
আমি ব্যাংকের ফ্রড ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের প্রধানকেও একটা মেইল করলাম। আমার অ্যাকাউন্ট থেকে যে টাকাগুলো সরানো হয়েছে, সেগুলো সব ট্রেস করা আছে। আরমান ভেবেছে সে টাকাগুলো মেহরিনের অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নিলেই নিরাপদ। কিন্তু সে জানে না, মেহরিনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি মাস দুয়েক আগেই আমার আন্ডারকাভার অডিটরদের নজরদারিতে ছিল।
আমি জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কাল আরমানের বিয়ে। ঢাকার একটা ফাইভ স্টার হোটেলে গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন। মেহরিন নিশ্চয়ই এখন বিয়ের লেহেঙ্গা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছে, সে কত বড় জয়ী! আর আরমান? সে হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে দামী ম*দ খুলে আমার ‘পরাজয়’ সেলিব্রেট করছে।
আমি মনে মনে হাসলাম। কালকের রাতটা হবে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ। তারা যখন বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য তৈরি হবে, যখন চারদিকে সানাই বাজবে আর অতিথিরা হাসিমুখে অভিনন্দন জানাবে—ঠিক তখনই শুরু হবে আসল নাটক।
আরমান ভেবেছিল সে আমাকে এক ফোনে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু আমি এখন যে ঘুঁটি চালছি, তাতে শুধু আরমান না, পুরো মেহরিন সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। আমি ডায়েরিতে একটা লাইন লিখলাম— “শত্রু যখন ঘরের ভেতরে থাকে, তখন তাকে আ*ঘাত করতে হয় তার অহংকারের জায়গায়।”
আমি আমার ড্রাইভারকে ডাকলাম। “রহিম, গাড়ি বের করো। আমরা কাল ভোরেই ঢাকা রওনা হবো। তবে সরাসরি হোটেলে নয়, আমরা যাব ধানমন্ডির আমাদের পুরোনো সেই বেকারির সাইটে। যেখানে আমার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল।”
রহিম অবাক হয়ে তাকাল। সে জানে আজ ম্যাডামের মাথায় কোনো একটা বিশাল পরিকল্পনা ঘুরছে। আমি আয়নার দিকে তাকালাম। চৌষট্টি বছর বয়সেও আমার চোখের তেজ একবিন্দু কমেনি। আরমানকে আমি শূন্য থেকে শুরু করতে শিখিয়েছিলাম, সে শেখেনি। এবার আমি তাকে শেখাব—শূন্যে ফিরে যাওয়া কাকে বলে।
যাওয়ার আগে আমি সেই বিয়ের কার্ডটা আবার হাতে নিলাম। কার্ডের ওপর সোনালি অক্ষরে লেখা— “আরমান ও মেহরিনের শুভ বিবাহ”। আমি একটা কলম দিয়ে ‘শুভ’ শব্দটা কেটে সেখানে লিখলাম ‘বিচার’।
যতক্ষণ পারো উপভোগ করো, বাবা… কারণ তুমি যখন বিয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকবে, প্রথম যারা ঢুকবে তারা অতিথি না… তারা হবে পুলিশের একটা বিশেষ দল এবং দুদকের ইনভেস্টিগেশন অফিসাররা। মেহরিনের আয়ের উৎস আর আরমানের এই জালিয়াতি—সবকিছুর হিসেব কাল বুঝিয়ে দিতে হবে।
চলবে…
