#অগ্নিশিখা
পর্ব ০২
লেখক The Story Haven
ভোরের আলো ফোটার আগেই আমি ঢাকা পৌঁছে গেলাম। শহরটা তখনো পুরোপুরি জাগেনি। কুয়াশা আর ধোঁয়ার মিশেলে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা চারিদিকে। ড্রাইভার রহিমকে বললাম ধানমন্ডির সেই পুরোনো গলিতে গাড়ি থামাতে। যেখানে এক সময় আমাদের সেই ছোট্ট বেকারি ‘সুইট ওভেন’ ছিল। এখন সেখানে বিশাল এক শপিং মল। সাইফুলের স্মৃতিগুলো এই ইটের দালানের নিচে চাপা পড়ে গেছে, কিন্তু আমার মনে প্রতিটি মুহূর্ত এখনো জীবন্ত।
আমি গাড়ি থেকে নামলাম না। শুধু জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম। সাইফুল বলত, “শারমিন, যখন খুব বিপদে পড়বে, তখন পেছনে তাকাবে। দেখবে কতটুকু পথ একা হেঁটে এসেছ। তাহলে সামনের পথটা পাড়ি দেওয়ার সাহস পাবে।” আজ আমি একা নই। আজ আমার সাথে আছে তিল তিল করে গড়ে তোলা আমার সম্মান। আরমান সেই সম্মানে হাত দিয়েছে।
সকাল দশটা। ব্যারিস্টার রফিকের চেম্বারে বসলাম আমি। রফিক তার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে কিছু ফাইল দেখছিল। আমাকে দেখে সে গম্ভীর গলায় বলল, “শারমিন, সব প্রস্তুত। আরমান যে টাকাগুলো তোমার পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়েছে, সেগুলো সে মেহরিনের বাবার একটা ভুয়া কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছে। এটা মানি লন্ডারিংয়ের আওতায় পড়ে। আর কক্সবাজারের ফ্ল্যাট? সে যে বায়না দলিল করেছে, সেটা অবৈধ কারণ কোম্পানির সিল এবং এমডির ডিজিটাল কোড সে জাল করেছে।”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “পুলিশের সাথে কথা হয়েছে?”
রফিক মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। ডিবি উত্তরের ডিসির সাথে কথা হয়েছে। তিনি নিজে মামলাটা দেখছেন। তবে তারা চায় বিয়েটা শুরু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। কারণ সেখানে মেহরিনের পরিবারের আরও কিছু রাঘববোয়াল উপস্থিত থাকবে, যাদের আমরা অনেকদিন ধরে খুঁজছি।”
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। দুপুর দুইটা। হোটেলের সেই বিলাসবহুল বলরুমে এখন সাজসাজ রব। মেহরিন নিশ্চয়ই বিউটি পার্লারে বসে তার ‘বিজয়িনীর’ সাজ দিচ্ছে। আর আরমান? সে হয়তো তার বন্ধুদের বলছে কীভাবে সে তার ‘বুড়ি মাকে’ বোকা বানিয়ে সব হাতিয়ে নিয়েছে। বুকটা একবার কেঁপে উঠল। গর্ভধারিণী মাকে নিয়ে কেউ এভাবে ভাবতে পারে? পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করলাম। যে সন্তান মায়ের মাথার ছাদ বিক্রি করে দিতে পারে, সে আর সন্তান থাকে না; সে কেবল একজন অপরাধী।
বিকেল পাঁচটা। আমি হোটেলের একটা প্রাইভেট স্যুটে চেক-ইন করলাম। হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত। আমার ইশারাতেই সব কাজ হচ্ছে। আমি সাদা রঙের একটা মার্জিত জামদানি শাড়ি পরলাম। গলায় সাইফুলের দেওয়া সেই হীরের লকেটটা—যা আমি কখনো খুলি না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলাম। চোখে কোনো জল নেই, আছে এক তীব্র সংকল্প।
সন্ধ্যা সাতটা। নিচতলা থেকে সানাইয়ের সুর ভেসে আসছে। আমি স্যুটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালাম। দামী সব গাড়ির সারি। ঢাকার নামিদামি মানুষরা আসছে। মেহরিন আর আরমানের ‘পাওয়ার কাপল’ ইমেজ আজ পূর্ণতা পাবে—অন্তত তারা এটাই ভাবছে।
ঠিক আটটায় আমার ফোনে একটা মেসেজ এল। রফিকের পাঠানো। ‘অপারেশন শুরু হয়েছে। গেটে ফোর্স পজিশন নিয়েছে।’
আমি নিচে নামলাম। লিফট থেকে বের হয়ে যখন বলরুমের প্রবেশপথে দাঁড়ালাম, দারোয়ান আমাকে চিনতে পারল না। কারণ আমি আজ কোনো নিমন্ত্রিত অতিথি নই। আমি ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলাম।
বিশাল হলরুম। চারদিকে ফুলের সুবাস আর আলোকসজ্জা। মাঝখানে উঁচু একটা মঞ্চে আরমান আর মেহরিন বসে আছে। আরমানকে আজ খুব আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে। মেরুন রঙের শেরওয়ানিতে তাকে হুবহু সাইফুলের মতো লাগছে। কিন্তু ওর ভেতরে সাইফুলের সেই সততা নেই। মেহরিন লাল লেহেঙ্গায় মোড়ানো, হাসিমুখে সবার সাথে সেলফি তুলছে। তার গলায় যে নেকলেসটা জ্বলজ্বল করছে, ওটা আমার লকারের ছিল। আরমান ওটা কখন চু*রি করল?
আমি ভিড়ের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গেলাম। কেউ আমাকে খেয়াল করল না। সবাই ব্যস্ত রাজকীয় আয়োজন নিয়ে। আমি ঠিক মঞ্চের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
হঠাৎ মেহরিনের চোখ আমার ওপর পড়ল। তার হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে আরমানের হাতে একটা চিমটি কাটল। আরমান মাথা ঘুরিয়ে আমাকে দেখল। তার চোখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর এক ধরনের ঘৃণা ফুটে উঠল।
সে মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “আরে মা! তুমি এখানে? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি কক্সবাজারের সমুদ্র দেখেই জীবন কাটিয়ে দেবে। টিকিট কাটার টাকা ছিল তো? নাকি শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে আসতে হলো?”
পুরো হলরুম শান্ত হয়ে গেল। সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে। আরমান ভাবল সে আমাকে জনসমক্ষে অপ*মান করে শেষ করে দেবে।
আমি শান্ত গলায় বললাম, “আরমান, আমি এখানে তোমার বিয়ে দেখতে আসিনি। আমি এসেছি আমার আমানত ফেরত নিতে। আর মেহরিন, আমার গলার যে হারটা তুমি পরে আছ, ওটার আসল মালিক হওয়ার যোগ্যতা তোমার কোনোদিন হবে না।”
মেহরিন চিৎকার করে উঠল, “সিকিউরিটি! এই মহিলাকে বের করে দিন! উনি পা*গল হয়ে গেছেন!”
ঠিক তখনই হলের পেছনের বিশাল দরজাগুলো শব্দ করে খুলে গেল। সাদা পোশাকে নয়, ইউনিফর্ম পরা একদল পুলিশ অফিসার ভেতরে ঢুকল। তাদের নেতৃত্বে ডিবি অফিসার কামরুল হাসান।
আরমান তোতলাতে শুরু করল, “এ… এসব কী? অফিসার, কোনো ভুল হচ্ছে। আজ আমার বিয়ে!”
কামরুল হাসান মঞ্চে উঠে এলেন। তিনি আরমানের সামনে একটা ওয়ারেন্ট বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “জনাব আরমান আহমেদ, জালিয়াতি, জালিয়াতিপূর্ণ দলিল তৈরি এবং আপনার মায়ের অ্যাকাউন্ট থেকে সাত কোটি টাকা অবৈধভাবে সরানোর অভিযোগে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো।”
পুরো হলে যেন একটা বো*মা ফাটল। মেহরিনের বাবা এগিয়ে এলেন। “আপনারা জানেন আমি কে? এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যান!”
অফিসার মুচকি হাসলেন। “অবশ্যই জানি। আপনার মেয়ের নামে যে বিদেশি ফান্ডিং আসত, তার ট্যাক্স ফাঁকি আর মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগেও আমাদের কাছে ফাইল আছে। আপনার পুরো পরিবার আজ আমাদের সাথে যাবে।”
মেহরিন মেঝেতে বসে পড়ল। তার সাজানো জীবন মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গেল। আরমান আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “মা! তুমি এটা করতে পারলে না! আমি তোমার একমাত্র ছেলে!”
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “ছেলে হতে গেলে শুধু র**ক্ত লাগে না আরমান, মানুষের মতো মন লাগে। তুই যখন আমার সই জাল করছিলি, যখন আমাকে ঘরছাড়া করার পরিকল্পনা করছিলি, তখন কি মনে ছিল আমি তোর মা?”
পুলিশ যখন আরমানকে হাতকড়া পরাচ্ছিল, তখন সে আমার পা ধরতে চাইল। আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম। আজ আমার চোখে মমতা নেই।
আমি হলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অতিথিদের দিকে তাকিয়ে উচ্চকণ্ঠে বললাম, “আজকের অনুষ্ঠান এখানেই সমাপ্ত। তবে যারা ‘সুইট ওভেন’ থেকে আজ পর্যন্ত আমার পাশে ছিলেন, তাদের জন্য কাল বিকেলে আমার বাড়িতে দাওয়াত রইল। সেখানে কোনো জালিয়াতি থাকবে না, থাকবে শুধু সততার স্বাদ।”
আমি বলরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে বৃষ্টির ঘ্রাণ। ঠিক যেমন আমাদের বেকারির সেই প্রথম দিনগুলোতে পেতাম। আকাশে তখন মেঘ ডাকছে।
গাড়িতে ওঠার আগে আমি আকাশের দিকে তাকালাম। মনে হলো সাইফুল কোথাও থেকে আমাকে দেখে হাসছেন। আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। একটা আননোন নাম্বার।
আমি রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “শারমিন আহমেদ? আপনি কি জানেন আরমান শুধু একা ছিল না? এই চক্রের পেছনে আরও বড় কেউ আছে, যে আপনার ‘আহমেদ লেগেসি’ ধ্বংস করতে চায়?”
আমার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। লড়াইটা কি তবে কেবল শুরু হলো?
চলবে…
