#রাগিণীর_অদ্ভুতুড়ে_সংসার!
#সিনথিয়া
০১
“ এমনভাবে কেউ কামড় বসায় বউয়ের ঘাড়ে? মনে হচ্ছে কতদিনের হাভাতে। ভাত খায়নি, তাই ওভাবে হামলে পড়েছে গলার উপর! ছিহঃ! ভ্যাম্পায়াররাও ওদের থেকে ভালো এ্যাক্টিং পারবে। গ্যাব্রিয়েল এই মুভি দেখবে না রাগিণী। এটা চেঞ্জ করা হোক!”
লিলি জমে গেলো সোফার সাথে। চোখের পাতা পড়লো না। নড়তে পারলো না বসা হতে।
ওর স্পষ্ট মনে আছে ও দরজা লক করে মুভি দেখতে বসে ছিল। কারণ একা একাই থাকতে হয় লিলিকে। ফ্রাঞ্চ কোয়ার্টারের এই বাসাটাও ভাড়া নিয়েছে গত এক সপ্তাহ হলো। এরমধ্যে একটা কাকপক্ষী অবধি চোখে পড়েনি ওর। তাহলে পাশে এটা কে?
“ আয় হায়! নায়কের তো বডিই নেই। আশ্চর্য! অথচ জিম করলাম না চারশো বছর! এখনো গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আমার বডি দেখলে সাথে সাথে তুমি আমাকে মেয়ের বাবা বানাতে চাইবে!”
ঘাড় ঘুরিয়ে চারশো বছর বয়সী মেয়ের বাবাকে
দেখার আর সাহস হলো না লিলির। তার আগেই বিশাল এক চিৎকার বেরিয়ে এলো কন্ঠস্বর ফুঁড়ে। বসে থেকেই হুঁশ খোয়ালো ও। চোখের পলকে ঢোলে পড়লো পিছনের দিকে।
লিলিথের জ্ঞান ফিরলো ঘন্টা খানেক পর। সোফার হাতলে মাথা ঠেকানো। লম্বালম্বি পা রাখা। কতক্ষণ বেহুশ ছিল কে জানে?
“ রাগিণী? চোখ খোলো বউ! হঠাৎ জ্ঞান হারালে কী করে? মাথা ঘুরলো নাকি? নাকি স্বামীকে এতো বছর পর দেখে খুশিতে অজ্ঞান হয়ে গেলে? রাগিণী?”
কী ভীষণ উদ্বেগ ঢেলে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে লিলিকে। ঐ ভরাট কন্ঠ কর্ণগোচর হতেই মাথাটা হালকা কাত করে পাশে তাকালো লিলি।
দেখলো সোফার সাথেই মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে ছাব্বিশ সাতাশ বছরের এক ভদ্রলোক। বেশভূষা পুরোনো আমলের ব্রিটিশ জমিদারদের মতো। কবজির কাছে কারুকাজ করা সিল্কের সাদা শার্ট। প্যান্টটাও ফরমাল। তবে কালো। গলার কাছে কালো বো টাই। জোড়া ভ্রু। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল। গালে দাঁড়ি না থাকায় থুতনির মধ্যখানের ঐ গাঢ় ভাজটা, আয়েশ করে চোখে পড়ার মতো।
আর লিলি? পরনে ছেঁড়া ট্রাউজার। গায়ে রংচটা সবুজ একটা টিশার্ট। মাথায় আধখেলা পোনিটেল। দু’দিন যাবত চিরুনি না পরায় চুল কম, চড়ুই পাখির বাসা বেশি মনে হচ্ছে। গল্প লিখতে লিখতে চোখগুলো পান্ডার চোখের মতো হয়েছে সেই কবে। সেই লিলির জন্যই কি-না এতো সুদর্শন একজন পুরুষ নিজেকে ওর স্বামী দাবি করছে? নাহ! ঠিক ওর নয়! রাগিণীর!
লিলি আঁটকে রাখা শ্বাসটুকু ছাড়ে এতক্ষণে। কিন্তু এই রাগিণীটাই বা কে? আর এ লোকের কথাবার্তাও বা এতো অসংলগ্ন কেনো? তার বাসায় ঢুকলোও বা কী করে? জানালা ভেঙে?
লিলি আশ্বস্ত হয়েও যেন হতে পারেনা। সংশয় যায়না মন থেকে। ও কোনোমতে উঠে বসে। ক্লান্ত গলায় বলে,
“ দেখুন ভাই! আমার বাসা থেকে চুরি বা ডাকাতি করে নেয়ার মতো কিছুই নেই! আমি স্টুডেন্ট মানুষ। টুকটাক লেখালেখি করি! তবে আপনি যদি ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে স্মৃতি হারানোর ভান করেন, তাহলে ভুল করছেন। না আমি কোনো রাগিণীকে চিনি, আর না আমার চারশো বছরের পুরোনো কোনো হাজবেন্ড আছে। আমি লিলি! আপনি যদি আমার কোনো ক্ষতি না করেন, তাহলে আমিও আপনাকে খুব সম্মানের সাথে বাসা থেকে বের হতে দেবো! কোনো থানাপুলিশ করবো না! শুনেছেন আপনি?”
গ্যাব্রিয়েল ভ্রুকুটি করে তাকায়। নিজের দিকে তর্জনী ঠেকিয়ে শুধায়,
“ আমাকে দেখে তোমার চোর মনে হচ্ছে?”
চোখ পিটপিট করে লিলি । গ্যাব্রিয়েলের অবিশ্বাস্য চেহারাটা দেখে কিছু একটা ঠাওর হতেই প্রায় মনে মনে বলে ওঠে,
“ তারমানে এ নির্ঘাত মেন্টাল এ্যাসাইলাম থেকে পালিয়েছে। মানসিক রোগী। শি-ট লিলি! শি-ট! এই পাগল তোর বাসায় ঢুকলো কী করে?”
গ্যাব্রিয়েল হতাশ আননে মাথা নোয়ায়। আজ ও একটু দেখতে ভয়ংকর নয় বলে মানুষ ওকে পাগল ভাবছে?
প্রলম্বিত শ্বাসটুকু ঠিকড়ে বেরোয় বুক থেকে। লিলির দিকে তাকিয়ে প্রগাঢ় গলায় আওড়ায়,
“ আমি পাগল নই, যে মেন্টাল এ্যাসাইলাম থেকে পালাবো রাগিণী!”
লিলি হকচকায়। থমকায় ওর শ্বাসপ্রশ্বাস। রুদ্ধ গলার আওয়াজ ফ্যাসফ্যাসে শোনায় কেমন। ও তো জোরে বলেনি, তাহলে লোকটা শুনলো কী করে?
গ্যাব্রিয়েল নির্বিকার উঠে দাঁড়ায়। ছয় ফুটের মতো লম্বাদেহী মানুষটাকে দেখে লিলি সরে যায় সোফার হাতলের দিক। পা উঠিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে। স-ন্ত্রস্ত চোখে সতর্ক দৃষ্টি রাখে গ্যাব্রিয়েলের উপর। তাতেই আলতো হাসে ঐ লোক।
জবাবের সুরে আওড়ায়,
“ তুমি মুখে বলোনি, কিন্তু মনে মনে তো বলেছো! আর আমি আমার রাগিণীর মন পড়তে পারবো না, এ হতে পারে? এটাকে তুমি ভ্যাম্পায়ার হওয়ার ফায়দা বলো বা আমার প্রেমিকসত্তার কারিশমা। যেটাই ভাবো না কেনো? শুধু আমার সামনে মনে মনে কথা চেপে রেখে তোমার নিস্তার নেই রাগিণী! ”
লিলি ঘাবড়ায় একপল। ভ্যাম্পায়ার? এই পাগলটার কী মনে হয়? লিলি এসব মিথ্যে বিশ্বাস করে? কোনো ক্ষতি করতে চাইলে লিলির কাছেও শুকনো মরিচের গুড়ো, পেপার স্প্রে আর টিভির রিমোট আছে! হাহ!
কাঁপতে কাঁপতে থাকা গলায় একবার শেষ চেষ্টা করে মেয়েটা,
“ বাজে কথা। আপনি নিশ্চয়ই আন্দাজে ঢিল মা-রছেন! ভালো মানুষের মতো বেরোন আমার বাসা থেকে বলছি। নইলে কিন্তু….সত্যি সত্যি পুলিশ ডাকবো আমি! আর কোনো দয়া দেখাবো না আপনার উপর!”
গ্যাব্রিয়েল যেন গায়েই মাখলোনা লিলির হুমকিটুকু। সে নির্দ্বিধায় পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঠোঁট উল্টালো। কাঁধ উঁচিয়ে বললো,
“ চাইলে পরীক্ষা করে দেখো! আন্দাজে ঠিল মা-রার হলে, এই যে এইমাত্র তুমি আমার মাথায় রিমোট ছুড়ে মা-রবে, চোখে মরিচের গুড়ো ডলে দেবে বলে ভাবছো, এটা কী বলতে পারতাম? কিন্তু আমার উপর তো এগুলো কাজ করবে না জান। তুমি রসুন দিয়েও সেলফ ডিফেন্স ট্রাই করতে পারো! রসুনটা আমাদের কুপোকাত করতে বেশি এফেক্টিভ! তবে আমার ক্ষেত্রে নয়!”
লিলির একহারা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় অমনি। ঢিলে হয় আঁটসাঁট গতর। কেমন অসার চোখে তাকায় সামনে। এই লোকটাই পাগল নাকি ও নিজেই পাগল হয়ে যাচ্ছে?
সূক্ষ্ম হাসিটা আড়াআড়ি গেড়ে বসে গ্যাব্রিয়েলের ঠোঁটে। মুখোমুখি বসে আলাপ করা প্রয়োজন এখন। কিন্তু তারজন্য তো চেয়ার লাগবে। এই ঘরে একটা মাত্র সোফা। তাতে তো রাগিণী নিজেই বসে আছে। ওর বউ না চাইলে তো ও আর তার পাশে গিয়ে বসে তাকে ভয় পাইয়ে দিতে পারে না!
গ্যাব্রিয়েল ডানে-বামে তাকায়। অদূরে রাখা কাঠের চেয়ারটা চোখে পড়তেই ঠোঁটের হাসিটুকু বিস্তৃত হয়। হাত বাড়িয়ে তর্জনী তোলে চেয়ার বরাবর।
অতঃপর চেয়ারটার দিকে আঙুল বাকিয়ে ইশারা করে কাছে আসার জন্য।
লিলি বোকা বোকা চোখে দেখছে সবটা। এক মিনিট, দুমিনিট!
চেয়ার আর নড়েনা। নড়বে কী করে? চেয়ার কি মানুষ নাকি? যে আঙুলের ইশারায় কাছে চলে আসবে?
গ্যাব্রিয়েলের কপালে ভাঁজ পড়তে শুরু করে অমনি। দৃষ্টি অপ্রস্তুত হয়। যখন বুঝতে পারে ওর শক্তি কাজ করছে না, তখনই চোখ খিঁচে মুষ্টিবদ্ধ করে হাতখানা। বিড়বিড় করে আওড়ায়, “ড্যাম ইট!”
লিলি তখনও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে। আহারে! কী পরিমাণে পাগল হলে একটা লোক চেয়ার না ধরে সেটাকে নিজের কাছে আনার চেষ্টা করতে পারে।
সটান চোখ খুলে, লিলির দিকে তাকায় গ্যাব্রিয়েল। কেমন অগোছালো স্বরে আওড়ায়,
“ আই সয়্যার আমি পাগল না রাগিনী! ইট জাস্ট… আমার ‘পাওয়ার’ কাজ করছে না। আমি ভেবেছিলাম হয়তো তোমার সামনে আসলেই আমি আমার পুরোনো ভ্যাম্পায়ার শক্তি ফিরে পাবো! বাট আই গেস, আই ওয়াজ রং!”
একটু থেমে আবেশিত চোখে দেখে লিলির পান্ডুর হওয়া মুখটা। কেমন কাতর স্বরে বলে ওঠে,
“ তুমি জানো না, হাউ ব্যাডলি এন্ড ডেস্পারেটলি আই নিড ইয়্যু! প্লিজ! প্লিজ! আমাদের বিয়েটা এবার হতে দাও! দয়া করো!”
লিলি কেমন ভূতগ্রস্তের মতো শুধায়,
“ বদলে আমি কী পাবো?”
গ্যাব্রিয়েল সময় নেয়না মোটেও। সে মরিয়া হয়ে এক শ্বাসে বলে যায়,
“ বদলে আমি তোমার সব কাজ করে দেবো রাগিণী! তোমার বডিগার্ডের মতো সারাক্ষণ তোমাকে প্রটেক্ট করবো! তোমাকে কোনো বিপদ ছুঁতে পারবে না! পাক্কা প্রমিজ!”
_ _ _ _ _
চলবে?
