#নিষিদ্ধা
#শেষ_পর্ব (পর্ব_১৩)
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
শাপলা টাওয়ারের বাইরে এখন এক অপার্থিব দৃশ্যের দেখা মিলেছে। দীর্ঘ বিশ বছরের জমাটবদ্ধ কালো মেঘ সরে গিয়ে নীলমণি রাজ্যের আকাশে এখন স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ নীল আভা ছড়াচ্ছে। মরে যাওয়া ঝরনাগুলো আবার কলকল শব্দে প্রাণ ফিরে পেয়েছে, আর শুকনো স্ফটিক গাছগুলোতে ফুটেছে হরেক রঙের জাদুকরী ফুল। পুরো রাজ্যের বাতাস এখন বিষাক্ত ধোঁয়ার বদলে এক স্নিগ্ধ সুগন্ধে ম ম করছে।
নিহা আর প্রেরণা টাওয়ারের বাইরে বের হয়ে এলো, হাজার হাজার পরী আর রাজ্যের প্রজারা সেখানে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে এত বছর পর মুক্তির আনন্দ। নিহাকে দেখামাত্রই তারা সমস্বরে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল। প্রজাদের প্রধান, বৃদ্ধ দস্তগির এগিয়ে এলেন। তার সাদা দাড়ি আর কুঁচকানো চামড়ায় আজ আনন্দের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। তিনি নিহার সামনে কুর্নিশ করে বললেন,
“রাজকন্যা নিহা! আমরা জানতাম আপনি ফিরবেন। মালিকার অত্যাচারে আমাদের এই সোনার রাজ্য শ্মশান হয়ে গিয়েছিল। আজ আপনি আমাদের আবার প্রাণ দিলেন।”
নিহা ম্লান হেসে বৃদ্ধের হাত ধরে টেনে তুললেন।
“আপনাদের দোয়াই আজকে আমি এখানে আছি।”
তারপর প্রেরণার হাতটা সবার সামনে উঁচিয়ে ধরে বলল,
“আজ আমি একা আসিনি। আমি ফিরেছি আমার মেয়ের হাত ধরে। আজ আপনারা যে আকাশ দেখছেন, যে মুক্তি অনুভব করছেন তার সবটুকু কৃতিত্ব এই মেয়ের। এই হলো প্রেরণা, নীলমণি রাজ্যের আসল উত্তরাধিকারী। ”
প্রজারা বিস্ময়ে প্রেরণার দিকে তাকিয়ে রইলো। নিহার কথায় প্রেরণাকে সবাই মন থেকে আপন করে নিলো। প্রজারা মাথা নিচু করে তাকে সম্মান জানালো। একজন তরুণী পরী এগিয়ে এসে প্রেরণার হাতে একগুচ্ছ নীল পদ্ম উপহার দিয়ে বলল,
“আমাদের জীবন বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ, রাজকন্যা।”
প্রেরণা হাসল। সে অনুভব করল, এখানকার সবাই কতটা সহজ আর সরল। রাজপ্রাসাদের বিশাল চত্বরে সভা বসলো। সবাই চাইল প্রেরণা রাজকন্যা হিসেবে সিংহাসনে বসুক। সেনাপতি আয়ুষ্মান বললেন,
“প্রেরণা মা, তুমি নীলমণি দণ্ডকে জাগ্রত করেছ। এই রাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী তুমিই এখন আমাদের রানী। তোমার সিংহাসন তোমার অপেক্ষায়।”
প্রেরণা ধীর পায়ে সিংহাসনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একবার ছুঁয়ে দেখল সেই প্রাচীন আসন। তারপর ফিরে তাকালো নিহার দিকে। নিহার চোখে মেয়ের জন্য গর্ব।
প্রেরণা সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনাদের এই ভালোবাসা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওনা। কিন্তু আমি এই সিংহাসনের যোগ্য নই। আমি বড় হয়েছি মানুষের জগতে, আমার ভালোবাসা আর অস্তিত্ব সেখানে। নীলমণি রাজ্যকে ভালোবাসলেও আমার মন পড়ে আছে পৃথিবীতে। আমার বাবা বিশ বছর একাকীত্বের যন্ত্রণায় ভুগেছেন, আমার স্বামী হিমাদ্রী এখনও হাসপাতালের করিডোরে আমার জন্য ছটফট করছে। আমি তাদের কাছে ফিরে যেতে চাই।”
প্রজাদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। প্রেরণা নিহার হাত ধরে বলল,
“মা, তুমিই এই রাজ্যের আসল কাণ্ডারি। বিশ বছর তুমি অনেক কষ্ট সহ্য করেছ। এখন তোমার দায়িত্ব এই রাজ্যকে আবার সাজিয়ে তোলা। তুমি সিংহাসনে বসলে আমি শান্তিতে ফিরতে পারবো।”
নিহা প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও মেয়ের চোখের দৃঢ়তা দেখে রাজি হলেন। প্রজারাও প্রেরণার এই আত্মত্যাগ দেখে মুগ্ধ হলো। আবারও নিহাকে সিংহাসনে বসানো হলো। সিংহাসনে বসামাত্রই নিহার শরীরের জীর্ণতা কেটে গিয়ে এক রাজকীয় জেল্লা ফিরে এলো।
নিহা প্রজাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“প্রেরণা আমাদের সবার। সে যেখানেই থাকুক, এই রাজ্য তার কাছে চিরঋণী থাকবে। আজ থেকে নীলমণি রাজ্যে আর কোনো অন্ধকার থাকবে না। আমি আবারও সবকিছু আগলে রাখবো।”
পুরো রাজ্য জুড়ে এক উৎসবের আমেজ শুরু হলো। প্রজারা নাচ-গানে মেতে উঠল। কিন্তু প্রেরণা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে রইল। সে মনে মনে বলল,
“ ‘মা’কে মুক্ত করেছি বাবা। এবার তাকে নিয়ে তোমার কাছে ফেরার পালা।”
**
ভোরের প্রথম আলো ফুটতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। হাসপাতালের ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন মেহরাব। তার পাশে হিমাদ্রী। গত কয়েক ঘণ্টায় তাদের জীবনে যে ঝড় বয়ে গেছে, তাতে তাদের স্থবির হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তারা দুজনেই এক অমোঘ আকর্ষণে আকাশের ওই বিশেষ নীল তারাটির দিকে চেয়ে আছেন।
হঠাৎ হাসপাতালের চারপাশ এক তীব্র মায়াবী আলোয় ভরে গেলো। ছাদের মাঝখানে ঠিক সেই আলোর স্তম্ভটি আবার নেমে এলো। মেহরাব আর হিমাদ্রী চোখ হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল। আলো যখন একটু কমে এলো, তারা দেখল– স্তম্ভের ভেতর থেকে দুজন নারী ধীর পায়ে বেরিয়ে আসছে।
আগে আগে আসছে প্রেরণা। তার রাজকীয় পোশাক এখন কিছুটা রক্তাক্ত, ডানা দুটো শান্ত হয়ে পিঠের সাথে মিশে আছে। তার পেছনে ধীর পায়ে হেঁটে আসছেন এক নারী। পরনে সাদা তুষারশুভ্র রাজকীয় পোশাক, দীর্ঘ কালো চুল তার কোমর ছাড়িয়ে নিচে নেমে গেছে। বিশ বছর আগের সেই নিহা আজও তেমনই আছে। একটুও বয়সের ছাপ পড়েনি। ওর চোখে যেন হাজার বছরের তৃষ্ণা, প্রিয়জনকে দেখার তৃষ্ণা! মেহরাব যেন পাথর হয়ে গেলো। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। সে কি স্বপ্ন দেখছে? বিশ বছর ধরে যে মানুষটিকে তিনি কেবল কল্পনায় ভেবে এসেছে, সে কি সত্যিই মেহরাবের সামনে?
নিহা কাঁপা কাঁপা পায়ে মেহরাবের সামনে এসে দাঁড়ালো। মেহরাবের চুলে এখন অল্প পাক ধরেছে, কপালে বয়সের ছাপ পড়েছে কিন্তু তার চোখের সেই মুগ্ধতা ঠিক বিশ বছর আগের মতোই আছে। নিহা খুব নিচু স্বরে ডাকল,
“মেহরাব…”
এই একটি শব্দে মেহরাবের দীর্ঘ বিশ বছরের বাঁধভাঙা কান্না বেরিয়ে এলো। সে নিহার দু’হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিলো।
“নিহা! তুমি… তুমি সত্যিই এসেছ? আমি তো ভেবেছিলাম এ জীবনে আর তোমার দেখা পাবো না! সবকিছু শেষ!”
নিহা ম্লান হাসল। তার চোখের জল মেহরাবের হাতের ওপর টুপ করে পড়ল।
“শেষ তো তখন হয় মেহরাব, যখন ভালোবাসা ফুরিয়ে যায়। তোমার ভালোবাসা আমাকে এত বছর ওই অন্ধকার নরকেও বাঁচিয়ে রেখেছিল। আমি জানতাম, একদিন আমাদের সন্তান আমাদের এক করবে। ওই দেখো মেহরাব, আমাদের মেয়ে।”
মেহরাব প্রেরণার দিকে তাকালো। প্রেরণা তখন হিমাদ্রীর পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে। হিমাদ্রী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখছিল এই দৃশ্য।
“ তোমাকে ধন্যবাদ নিহা। আমার সন্তানকে উপহার দেওয়ার জন্য। আমার জীবনে আবার ফিরে আসার জন্য। আমি আর হারাতে দেবোনা তোমাদের। “
নিহা মুচকি হেসে মেহরাবের বুকপকেটে থাকা একটা রুমাল স্পর্শ করলো।
“তুমি আজও এটা ছাড়োনি মেহরাব?”
মেহরাব নিহার কপালে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
“এটা তো কেবল রুমাল ছিল না নিহা, এটা ছিল আমার হৃদপিণ্ড। এটাকে ছাড়লে তো আমি মরেই যেতাম।”
“ এসব বলবে না। আমাদের একসাথে বাঁচার সময় এখন। আমি তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যাবো মেহরাব। আমাকে তো পরী রাজ্যও দেখভাল করতে হবে। তুমি কি যাবে আমার সাথে? “
হঠাৎ পরিস্থিতি নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। প্রেরণা ও হিমাদ্রী মেহরাবের দিকে তাকিয়ে আছে। এখানে মেহরাবের একটা আলাদা পরিচিতি আছে। এসব ছেড়ে, চিরচেনা পৃথিবী ছেড়ে সে কি পরী রাজ্যে যাবে আদৌও!
“ যাবো। তুমি যেখানে থাকবে আমিও সেখানে থাকবো। “
নিহা খুশিতে কান্না করে ফেলল। প্রেরণা ও হিমাদ্রী ইচ্ছে করে অন্য দিকে হাঁটতে লাগলো। মেহরাব নিহাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
সূর্যের প্রথম সোনালী রশ্মি এখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রেরণা এগিয়ে এসে তার বাবা-মায়ের হাত একসাথে ধরে বলল,
“আজ থেকে আর কোনো বিচ্ছিন্নতা নেই। নীলমণি রাজ্য এখন মালিকার অভিশাপমুক্ত। কিন্তু আমার আসল স্বর্গ আপনারা।”
“ তুমিও আমাদের সব প্রেরণা। তবে তোমাকে পৃথিবীতে রেখে যেতে কষ্ট হচ্ছে। “
মায়ের কথায় মুচকি হাসলো সে।
“ সমস্যা নেই। আমার ইচ্ছে করলেই চলে যাবো আপনাদের কাছে। “
নিহা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তারপর হিমাদ্রীর সাথে কথা বলল মেহরাব ও নিহা। প্রেরণাকে আগলে রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলো সে।
হিমাদ্রী প্রেরণার হাতটা আলতো করে ধরলো। তার মনের সব সংশয় কেটে গেছে। সে বুঝেছে, প্রেরণা পরী হোক বা মানবী সে কেবল তার ‘নিষিদ্ধা’ রাজকন্যা, যাকে সে আজীবন আগলে রাখবে।
হাসপাতালের ছাদে এক নতুন ইতিহাসের জন্ম হলো। মেহরাব নিহাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললে,
“ ধন্যবাদ ওপরওয়ালা, আমাকে আবার সবকিছু ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। “
নিহা মেহরাবকে নিয়ে পরী রাজ্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। প্রেরণাও হিমাদ্রীর সাথে নতুন জীবনের উদ্দেশ্য এগিয়ে গেলো।
—সমাপ্ত—
