#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#শেষ_পর্ব
কলমে অনিন্দিতা
অফিসার তাকিয়ে আছে মিতুলের দিকে।
“দাদু?”—বিড়বিড় করে বলল সে।
মিতুল ব্যাগ খুলতে লাগল। হাত চেপে ধরল অর্ণব। পিঙ্কিও চোখের ইশারায় থামাতে চাইছে। কিন্তু মিতুল শুনল না। হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলো ডায়েরিটা তুলে দিল অফিসারের হাতে।
অফিসার অবাক চোখে সেটা নিল। মিতুলের দিকে একবার তাকিয়ে ডায়েরি পড়তে শুরু করল। অর্ণব আর পিঙ্কি খুব রেগে যাচ্ছে —ওদের হাবভাবে মিতুল বুঝতে পারছে। কিন্তু মিতুল নিশ্চিত, এটা না করলে বিষয়টা আরও জটিল হয়ে যেত।কোনোদিনও শেষ হতো না গল্পটা। আর ওদের কলকাতায় ফিরতেও লেট্ হয়ে যেত।
আসার সময় মিতুল রাস্তায় দুই দিকে দেখেছিল—যদি কোনো মন্দির পায়, হারটা দান করে দেবে। এর ভার আর বইতে পারছে না কিন্তু তেমন কোনো মন্দির চোখে পড়েনি মিতুলের । তাই ঠিক করেই নিয়েছে, থানাতেই দিয়ে যাবে হারটা ।সেটা যদি অফিসার নিয়েও নেয় মিতুলের কিছু যায় আসে না। ও জানবে ও আইনের হাতে তুলে দিয়েছে।হারটা ওকে ভীষণ অস্থির করে তুলছিল।
“এত বড় ডায়েরি এখন পড়ার সময় নেই”—অফিসার একটু বিরক্ত মুখে বলল।
মিতুল অসহায় মুখে দেখছে ভদ্রলোককে । সেটা বুঝেই অফিসার বললেন –
“উপর উপর পড়ে আমার যা মনে হলো, রানিকে তোমার দাদু কিছু দিতে বলেছে। আর সেটা দিতেই তোমরা এসেছ, তাই তো?”
মিতুল মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলতেই তিনি বললেন,
“বাড়ি ফিরে যাও। যেটা নিয়ে এসেছ, সেটা নিয়েই ফিরে যাও।”
পিঙ্কি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“সেটাই তো বুঝিয়ে বলছি, চল ফিরে যাই!”
মিতুল বিড়বিড় করে বলল,
“পিঙ্কি দি, ফিরব বলেই তো এটা দিতে এসেছি…এটা আমাদের কাছে থাকলে আমাদের আর ফেরা হবে না ”
বলেই ব্যাগে হাত দিতে যাবে, অর্ণব তৎক্ষণাৎ বলল,
“স্যার, আজ বিকেলের ট্রেনেই আমরা মালদা টাউন ফিরে যাব। তার আগে একবার কি রানি ভিলায় যাওয়ার অনুমতি পাব? একবারই… বুঝতেই পারছেন, দাদুর শেষ ইচ্ছে ছিল। মেয়েটা খুব কষ্ট পাচ্ছে।”মিতুলকে ইঙ্গিত করে বললো ।
মিতুল ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। পিঙ্কি তাড়াতাড়ি বোনের মাথায় মাথায় হাত রাখলো। অর্ণব একটু স্বস্তি পেল—এত দামী হার পুলিশকে দিয়ে চলে যাওয়া বোকামি। তার উপর এটা কোনো বড় থানা নয়—না রিসিভিং দেবে , না কিছু! তাই শুধু মিতুলকে থামাতেই এই আবদারটা করল অর্ণব।
“কি করবে রানি ভিলায় গিয়ে?”—অফিসার জিজ্ঞেস করলেন।অর্ণব বলল,
“কিছু না, একটু ঘুরিয়ে নিয়ে যাব মেয়েটাকে। আর তো কখনো আসা হবে না এইদিকে ।”
অফিসার একটু থেমে বললেন,
“ওটা কিন্তু খুব ভয়ঙ্কর জায়গা। প্রোমোটাররা কিনেছে, কিন্তু কিছু করতে পারেনি। বাড়ি, বাগান, পিছনের পুকুর মিলে প্রায় কোটি টাকার প্রপার্টি। সেখানে নাকি একটা ভয়ঙ্কর ছায়া—ভূত না প্রেত—ঘুরে বেড়ায়। তোমরা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে, ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে গেলে!”
মিতুল একটু ভেবে বলল,
“তাও যাব। প্লিজ, আমাদের অ্যাড্রেসটা দিন।”
অফিসার ডায়েরিটা মিতুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,“আচ্ছা, ব্যবস্থা করছি। একা যেতে হবে না। গাড়ি দেব, সঙ্গে একজন লোকও থাকবে। ভয় পেলে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসবে।”
অর্ণব ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে দাঁড়াল। হ্যান্ডশেক করে বেরিয়ে যেতেই অফিসার “রানি ভিলা” ফাইলটার ওপর বড় করে লিখে দিল—CLOSED।এরপর ছুড়ে ফেলে দিলো পুরোনো খাতার আলমারির দিকে।
গাড়িটা একটা পড়ো , জীর্ণ বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। জং ধরা লোহার গেট, তাতে তালা নেই মানে অবাধ বিচরণ চোর গুন্ডা দের।অর্ণব একটু একটু ধাক্কা দিতেই ক্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল। সামনে দোতলা বাড়ি। গাড়ি বারান্দা সেখানে ঝুলের মশারি টানানো মনে হচ্ছে।চারদিকে মাকড়সা, আরশোলা-টিকটিকির রাজত্ব।
অর্ণব, পিঙ্কি আর মিতুল পরপর ঢুকলো।দরজা দিয়ে ঢোকার সময় পাশের নেমপ্লেটে চোখ পড়ল মিতুলের —“রানি ভিলা”—আবছা হলেও বোঝা যাচ্ছে ।সামনে এক চিলতে উঠোন—আগাছা, ঝোপে ভরা।
“পরিবেশটা বেশ থ্রিলিং তাই না বল? “- পিঙ্কি বলতেই অর্ণব হেসে বলল,
“ভাবতেই পারিনি জীবনে কোনো দিন এমন একটা অদ্ভুত বাড়িতে আসব!”দুজনে জোরে জোরে কথা বলছে।
অর্ণব বলল,“সবাই বলে এখানে নাকি এই বাড়ির রানি সাহেবা ভূত সেজে আসে! কোথায় সে? আমি তো দেখতে চাই!”পিঙ্কিও হেসে সায় দিল।
কিন্তু মিতুলের কিছুই ভালো লাগছে না। আজই ফিরে যাবে—কিন্তু কিছুই সমাধান হলো না। হারটা এখন ওর কাছে আছে ।ফোন বের করল মিতুল। কয়েকটা ছবি তুলবে ভেবেছিল। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ খুলতেই দেখে—“দাদু typing…”
আবার সেই “দাদু typing”!এটা দিয়েই তো গল্পটা শুরু হয়েছিল।
স্থির হয়ে গেল মিতুল।পিঙ্কি আর অর্ণব বাড়ির পেছনে চলে গেছে হাঁটতে হাঁটতে । মিতুল মোবাইল দেখতে পেয়ে পিছিয়ে পড়েছে ।দাদু টাইপিং করছে দেখে মিতুল লিখল—
“কি বলবে দাদু? ও দাদু! তোমার কমলা বেঁচে নেই… আমি হারটা তাকে দিতে পারলাম না…”মিতুলের এতো কথার কোনো উত্তর নেই।।
স্ক্রিন জুড়ে শুধু—typing…
হঠাৎ—
“মা… তুমি এসেছ মা! ও মা! তোমার মেয়েকে ওরা মেরে ফেলেছে! তোমার মেয়ে শুধু একটা সীতাহার চেয়েছিল মা গো!”
মিতুল তাকিয়ে দেখল—একটা সাদা শাড়ি পরা মহিলা । ছেঁড়া, নোংরা কাপড়। ভয়ংকর অবস্থা।এই কী রানির ভূত! অফিসার বলেছিল!।
ভয়ে মিতুল চিৎকার করে ডাকতে গেল—গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না।মেয়েটা আরও গায়ের কাছে এসে বললো —
“মা, তুমি এলে না কেন? তুমি তো আমাকে বাঁচাতে পারতে! ভয় পেয়ো না মা… ওরা এবার আমাকে মারতে পারেনি… আমি পালিয়ে গেছি…”
ধীরে ধীরে সব বলল সে—ওর কাজের মেয়ে কমলা আর তার স্বামীর আক্রমণ, ওদের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচা, বছরের পর বছর বাইরে স্টেশনে থাকা , শেষমেশ ফিরে এসে দেখলো তালাবন্ধ ঘর কিন্তু ফিরে যায়নি রাণী ওর মহল ছেড়ে! আর এখন উঠোন-বারান্দায় জুড়েই বেঁচে আছে ও।
“খুব কষ্ট হয় মা… শীতে কাঁপি, বৃষ্টিতে ভিজি… আমাকে নিয়ে যাবে তোমার সাথে?”মিতুলের চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। কথা বলতে পারছে না।
ঠিক তখন—
“এই এই কে রে তুই! মা বলছিস কাকে? পালা !”
অর্ণব দৌড়ে এল। মেয়েটা আরও তেড়ে এগিয়ে এল অর্ণবের দিকে ।এভাবেই বোধহয় ও অচেনা লোককে তাড়া করে আত্মরক্ষার জন্য ।
পিঙ্কি বলল,
“বলেছিল না পুলিশ—কেউ এলে রানির ভূত ভয় দেখায়!”অর্ণব ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে মারতে গেল—“বোকা পেয়েছিস? ভূত নাকি! মানুষ ঠকাচ্ছিস?”একটা বাড়ি মারতেই মেয়েটা কেঁদে উঠল—
“মা গো…”মিতুল ছুটে এসে সামনে দাঁড়াল মেয়েটার —
“অর্ণব দা, মেরো না!”অর্ণব বলল,
“দেখ পিঙ্কি, তোর বোন কেমন মা সেজেছে!”
মিতুল বড় বড় চোখে বলল,
“‘মা’ ডাকটাই এমন… শুনলেই আগলে রাখতে ইচ্ছে করে…”
তারপর মেয়েটার দিকে ফিরে মিতুল বললো —
“তুমি রানি? তুমি মারা যাওনি?”
মেয়েটা মাথা নাড়ল—“না… আমি বেঁচে আছি। আমি জানতাম ও আসবে… অপেক্ষা করছিলাম। ও বলেছিল—আগের জন্মে দিতে না পারা হারটা আমাকে এই জন্মে দেবে…”
মিতুলের বুক কেঁপে উঠল।
ব্যাগে হাত দিতেই ঠান্ডা স্পর্শ—সীতাহার।
কিন্তু দেবে? ও রাখতে পারবে ?সব এসে লুটেপুটে নেবে !”ইমোশন দেখিয়ে লাভ নেই মিতুল
খিদে পেটে এই হার কি কোনো সুখ দেবে রানিকে?অর্ণব বললো।
ওদিকে গাড়ির ড্রাইভার তাড়া দিচ্ছে।
পিঙ্কি বলল,“মিতুল, চল! দেরি হলে হোটেলে ফিরে গুছিয়ে বেরোতে দেরী হয়ে যাবে তাতে ট্রেন মিস করব!”
রানি কাঁদতে কাঁদতে বলল,“মা, যেও না…”অর্ণব বলল,
“তোর কোন জন্মের মা রে ও!”
রানি স্থির চোখে বলল—“পূর্বজন্মে…”
শব্দটা শুনে মিতুলের বুক কেঁপে উঠল।
ওর দিকে তাকিয়েই ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসলো মিতুল । ইচ্ছে করছে দৌড়ে গিয়ে রানিকে জড়িয়ে ধরে।
হয়তো দাদু আগের জন্মে তার স্বামী ছিল… আর সে—রানির মা!
গাড়ি অনেক দূর চলে এসেছে।মিতুল আবার ফোন বের করল।দেখল—“দাদু typing…”কিন্তু কোনো কথা নেই ।
“মিতুল, কলকাতায় গিয়ে হারটা বিক্রি করে দে। যা টাকা পাবি, এসে এই পাগলিটার একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিস…”অর্ণব বলল,
“হ্যাঁ রে, বেচারি কোনো জন্মেই সুখ পেল না।”রাণী বলতেই মিতুলের চোখ ভিজে গেল, বললো
“তোমরা থাকবে তো আমার সাথে?”
পিঙ্কি আর অর্ণব মিতুলের হাত ধরে বলল—
“আছি।”
একটু শান্তি পেল মিতুল।
দেখল—
দাদুর typing থেমে গেছে।শান্তি পেল বোধহয় দাদু।
মিতুল ধীরে বলল—
“দাদু, আমি খুব তাড়াতাড়ি আসব… তোমার রানিকে উদ্ধার করতে। ততদিন তুমি ওকে একটু দেখে রেখো…”
শেষ হয়েও শেষ হলো না যেন। ভালো থাকুক রাণী কথা রাখুক মিতুল।
সমাপ্ত।
