#স্বপ্ন_ভংগ
প্রথম পর্ব
Abdul waset shahin
আমি শিপ্রা, বয়স একুশ। ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। ফার্স্ট ইয়ার শেষ করে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠতে পারিনি। এমন সময় বাবা আমার বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়ে তিনি জোর করে দেননি। আমি স্বেচ্ছায়ই, বলা চলে সানন্দে বিয়েতে রাজি হয়েছি। ফাহাদ সুদর্শন ছেলে। আমেরিকার নাগরিক। শুধু সে নয় তার মা বাবা, ভাই বোন সবাই। বাবার ব্যবসা সূত্রে পরিচিত এক আংকেল এই সম্বন্ধ এনেছেন। আমার কাছে মা যেদিন বিষয়টা বললেন, আমি জানতে চেয়েছি ছেলের লেখাপড়া কতটুকু আর সে ওখানে কি কাজ করে। মা মোবাইলে ফাহাদের ছবি দেখিয়েছেন। ছবি দেখে পছন্দ না হওয়ার কারন নেই। জানলাম, ছেলের জন্ম বাংলাদেশে, তবে আমেরিকা গিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেছে। এখন জব করে।
বাবা ওদের সাথে কয়েকদিন ফোনে কথাবার্তা বলেছেন। আমার গ্রীন সিগনাল পেয়ে বাবা ফাহাদের বাবাকে জানিয়ে দিলেন।
তিন সপ্তাহের মধ্যেই ফাহাদরা সপরিবারে ঢাকা চলে এল। দশ দিনের মাথায় বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ে হল খুব সাদাসিধে ভাবে। এর এক সপ্তাহের ভেতর ফাহাদ ছাড়া বাকি সবাই ফিরে গেল আমেরিকা।
বাবার অনুরোধে ফাহাদ আমাদের বাসায় এসে ওঠল।
আমি কোন হেজি পেজি দরিদ্র ফ্যামিলীর মেয়ে নই। আমার বাবা মোটামুটি বড় ব্যবসায়ী। আমি নিজেও দেখতে বেশ সুন্দর, অসাধারণের কাছাকাছি। কিন্তু বাস্তবের চেয়ে আমার মাঝে আবেগের প্রাধান্য বেশি। যৌবনের শুরুর মানসিক পরিবর্তন এর এই সময়টায় একজন সুদর্শন যুবকের প্রতি স্বাভাবিক যে আকর্ষন তা আমি নিয়ন্ত্রন করতে পারিনি। তাই হুট করে এই বিয়েটায় আমি সহজেই রাজি হতে পেরেছিলাম। তেমন একটা খোঁজ খবর না করে বাবাও বিয়েটা দিয়ে দিলেন। আমরা বাপ মেয়ে দুজনেই বেশ অস্থিরমতি বটে। তবে বিয়ের আগে ফাহাদ তার আমেরিকান পাসপোর্ট দেখিয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত এ দেশটার প্রতি আমারও যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল।
বিয়ের দুমাস পর ফাহাদ চলে গেল। ওর দেশে থাকার এ সময়টা আমাদের বেশ ভাল কেটেছে। আমরা হানিমুনে থাইল্যান্ড গিয়ে দশদিন থেকে এসেছি।
সেখানে ফাহাদ একদিন বলল, তুমি কখনো ড্রিংক করেছ?
আমি অবাক হয়ে বললাম, না না ছি ছি কি বল?
ফাহাদ বলে, ছি ছির কিছু নেই। পৃথিবীর বহু মানুষ ড্রিংক করে।
আমি বললাম, তুমি কর?
‘আমি করিনা, তবে আজ মনে অনেক আনন্দতো, সেজন্য একটু গলাটা ভেজাতে ইচ্ছে করছে।
‘আনন্দ হলে মদ খেতে হয়?’
‘হ্যাঁ, সব আমেরিকানরা তাই করে।’
আমি আর কিছু বলতে পারিনা। ফাহাদ আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে আমার সামনে বসেই নিতান্ত অপছন্দের এ কাজটা সম্পন্ন করে। এতদিন ওকে আমার অনেক ভাল লেগেছে, কিন্তু তার এই মদ্যপানটায় আমার ভেতর সংশয়ের কাঁটা বিঁধে গেল।
সে আমেরিকা গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই আমাকে ফোন দেয়। আমরা কথা বলি। ফাহাদ বেশি কথা বলেনা, পাঁচ সাত মিনিট মত হবে। এর জন্যই আমি অপেক্ষা করে থাকি। তবে মাঝে মাঝে কয়েকদিন ফোন করতে না পারলে সে অনেক দু:খ প্রকাশ করে। ওর ভেতর ভালবাসার কমতি দেখা যায়না। প্রতি মাসেই আমার একাউন্টে টাকা পাঠায়। যদিও তা খুব সামান্য, তবুও পাঠায়।
ফাহাদ চলে যাওয়ার এক বছর পর ভিসা পেলে আমি একরাতে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে টার্কিস এয়ারলাইন্সের প্লেনে চড়ে বসি। আমাকে বিদায় দিতে এসে মা বাবা কাঁদছিলেন, বেশি কাঁদছিল ছোট ভাই রবিন। সে ছিল বিদেশে আমার বিয়ের ঘোর বিরোধী।
জন এফ কেনেডী এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করে ফাহাদ। দারুন চকচকে সুন্দর একটা জীপ গাড়ি চালিয়ে এসেছে ও। গাড়িতে ফাহাদের পাশের সিটে বসতেই সুন্দর একটা ফুলের তোড়া আমার হাতে দেয় ফাহাদ। আমি আশা করেছিলাম শশুর শাশুড়ি দেবর ননদরা আসবে। কিন্তু ফাহাদ একাই এসেছে। মনে খটকা লাগলেও ফাহাদকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। ও আমাকে নিয়ে ওদের ব্রঙ্কসের বাসায় যায়। এখানেও বৌকে বরনের কোন আয়োজন নেই। বাসাটাও বেশি বড়না। ডুপ্লেক্স, তবে ছোট। আমাকে নিয়ে যেই রুমটায় গেল ও সেটাও ছোট একটা রুম। কোন এটাচড বাথরুম নেই। বাসায় দুইটা বাথরুম। একটা ফুল আরেকটা হাফ। দুটোই দোতলায়। ফুল বাথরুম হল আমাদের দেশের মত, গোসলের ব্যবস্থা সহ। আর হাফ বাথরুমে আছে কমোড আর বেসিন।
রুমে ঢুকে হতাশ হলাম, প্রায় অগোছালো রুম। নতুন বউ আসবে, কিন্তু কেউ এতে হাত লাগিয়েছে বলে মনে হয়না। সবার সাথে দেখা হয়েছে, কুশল বিনিময় হয়েছে। কিন্তু কারো কোন উচ্ছাস নেই। মনে হয় বাপের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম, দুদিন পর ফিরে এসেছি। আমি সবার জন্যই কিছু কাপড় চোপড় উপহার সামগ্রী নিয়ে গিয়েছি। বের করে সবাইকে দিলাম। সবাই নিল, কিন্তু খুশি হয়ে কোন কিছু বলা টলা নেই।
পাঁচ ছয়দিন হয়ে গেল, দেখলাম ফাহাদ বাইরে টাইরে যায়না। সারাদিন বাসায় থাকে। আমি একদিন ওকে জিজ্ঞেস করলাম, অফিসে যাওনা যে?
ফাহাদ বলল, এখানে অফিসে যাওয়া বলেনা, কাজে যাওয়া বলে।
আমি বললাম, ও আচ্ছা।
ফাহাদ বলল, আমার স্বাধীন কাজ, ইচ্ছে হলে যাই, আবার মন না চাইলে যাইনা।
আমি অবাক হয়ে যাই। যে প্রবল স্বপ্ন আর ঘোরে ফাহাদকে বিয়ে করেছি তা ফিকে হতে শুরু করেছে। ভেতরে অস্বস্থির ব্যাথা জমতে শুরু করেছে।
সপ্তম দিনে ফাহাদ বলে, চল, আমরাতো এখানে থাকবনা। জ্যামাইকাতে আমার বাসা আছে সেখানে যাব।
ফাহাদ আমাকে জ্যামাইকার একটা চারতলা দালানের বেসমেন্টে নিয়ে তোলে। অন্ধকার এ বাসাটায় সারাদিন লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। একটা ড্রয়িং কাম ডাইনিংএর সাথে ছোট একটা বাথরুম। একটা বেডরুম আর একটা স্টোরের মত আছে। ঢুকতেই, ড্রয়িং রুমের সাথে ওপরের দিকে ছোট দুটা কাচের জানালার মত। আমাদের দেশে একে সানলাইট বলে। এ দুটো সানলাইট দিয়ে দিনের বেলা সামান্য আলো আসে। ঘর থেকে বাইরের কিছুই দেখা যায়না। টয়লেটে ফ্ল্যাশ করলে পানি নিচে না গিয়ে ওপরের দিকে ওঠে আসে। সেই পানি নামতে অনেক সময় লাগে। ঘেন্নায় নাড়িভুঁড়ি উলটে আসতে চায়। আমার বুক ফেটে কান্না আসে। আমাদের মহাখালী ডিওএইচএসের সাতাশশো বর্গফুটের চমৎকার এপার্টমেন্টের কথা মনে হয়।
কিছুদিন পর নিতান্ত বিস্ময়ের সাথে জানতে পারলাম ফাহাদ হাইস্কুল পাস, এখানে বলে হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েট। তার কোন ধরা বাঁধা জব নেই। সে উবার চালায়। সুন্দর জীপ গাড়িটা ওর নিজের। সে দিনের বেলা উবার চালায় না, রাতে চালায়। সে বলে রাতে রাস্তায় ট্রাফিক কম থাকে, ফলে আয় বেশি হয়। ফাহাদ মূলত: জেএফকে থেকে ট্রিপ দিতে পছন্দ করে। তবে সে মাসে দশ বারো দিনের বেশি স্বাভাবিক আয় করতে করেনা।
প্রায়দিনই সে মাঝরাতে অথবা শেষরাতে বাসায় ফিরে আসে। তখন ফাহাদকে বেশ ক্লান্ত লাগে, ওর মুখ থেকে বিদঘুঁটে গন্ধ বের হয়। আমি বুঝতে পারি সে ড্রিংক করে এসেছে। সে আমার সাথে কথা বলেনা, ড্রেস চেঞ্জ না করেই বেডে গা ছেড়ে দেয়। সে ঘুমায় দীর্ঘ সময় মরার মত। অন্যান্ন উবার ড্রাইভাররা যেখানে মাসে সাত থেকে দশ হাজার ডলার আয় করে তার আয় সেখানে সর্বোচ্চ চার হাজার ডলার। সে কোথায় কি করে, কতক্ষণ উবার চালায় সে খবর আমি জানিনা, জানতে চাইওনি তার কাছে। দিনের পর দিন যায়, আমার সাথে কথাবার্তা গল্পগুজব তেমন হয়না। তবে সে আমার সাথে কখনো সামান্য দুর্ব্যবহারও করেনা।
ফাহাদের বিষয়ে এসব কোন কিছুই আমি মা বাবাকে জানাইনি। তার নিজস্ব পেশা কিংবা লেখাপড়ার সঠিক খবর জানলে তাঁরা দু:খ পাবেন।
আমি এদেশে এসেছি পাঁচ বছর পেরিয়েছে। এর মাঝে ও আমাকে নিউ ইয়র্কের কিছু দর্শনীয় জায়গা ঘুরে দেখিয়েছে। আটলান্টিকের পাড়ে নিয়ে গেছে, কানেক্টিকাট নদীর পাড়ে একটা পার্কে নিয়ে গেছে। ম্যানহাটন ঘুরে দেখিয়েছে, স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখিয়েছে। বাফেলোতে দিয়ে নায়েগারা ফলস দেখিয়েছে, ব্রিজ পেরিয়ে কানাডার পাশ থেকেও দেখিয়েছে। গত পাঁচ বছরে দিন পনের আমরা একসাথে বাইরে ঘুরতে বেরিয়েছি।
সংসারের বাজারটা আমি নিজে করি। আধামাইল হেঁটে গেলে জ্যামাইকার মেইন রাস্তায় অনেক বাংলাদেশী, পাকিস্তানী আর ভারতীয় গ্রোসারী শপ আছে। আমি বেশির ভাগই ঢাকার মেয়ে আসমার দোকানে যাই। তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। তিনি কাজ নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। আলাপ সালাপ তেমন পছন্দ করেন না। মহিলার বয়স চল্লিশের মত হবে। দেখিতে মোটামুটি সুন্দরী। শুনেছি তিনি স্বামীর সাথে থাকেননা, আলাদা থাকেন, নিজে উপার্জন করেন।
বাসায় আমার সময় কাটেনা। বছর দুই হয় ফাহাদ দোতলায় একটা বাসা নিয়েছে। ফলে এখন আর নিজেকে আগের মত বন্দী মনে হয়না। যা কাজকর্ম তা সেরে সারাদিন আমার প্রচুর অবসর। ফাহাদের জন্য প্রতীক্ষায় কোন লাভ নেই। সে এলে সটান বেডে যায়। দুপুর দুইটা তিনটায় ডাকাডাকি করলে কোনদিন ওঠে, গোসল করে চারটা খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। সন্ধার পর ওঠে খেয়ে আবার বেরিয়ে যায় গাড়ি নিয়ে। মাসে পনের দিনে মন চাইলে কখনো আমার সাথে সামান্য গল্প করে। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে। পাঁচ বছরেও আমাদের কোন সন্তান হয়নি। আমার নিজেরও খুব হতাশ লাগে। ফোন করলেই মা জিজ্ঞেস করেন। এতে আমার আরো বিরক্ত লাগে। আমার চাপাচাপিতে শেষে ফাহাদ মেডিক্যাল চেকআপে রাজি হয়। দেখা যায় ফাহাদের নিজের সমস্যা রয়েছে। ওর বাবা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তারপরও হাসপাতাল থেকে কিছু টিপস আর ওসুধ দেয়া হয়েছে।
আমাদের মাঝে কোন বন্ধন তৈরি হচ্ছেনা, শুধু একসাথে বাস করা হচ্ছে। আর আমেরিকা নামক স্বপ্নের দেশে গোলক ধাঁধায় আমি ঘুর পাক খাচ্ছি। তবে আমার কাছে আছে আমেরিকার একটা পাসপোর্ট।
আমাকে সেই পাসপোর্টের মালিক বানিয়ে দিয়ে ফাহাদ হঠাৎ মারা গেল। রাত তিনটায় নিজের গাড়ির নিয়ন্ত্রন হারিয়ে রাজপথে মৃত্যূ হল তার।
ছেলেকে দাফন করে ফাহাদের পরিবার দায়িত্ব শেষ করে। সদ্য বিধবা হওয়া পুত্রবধূর কোন খোঁজই তারা রাখেনা। তবে বাংলাদেশী কম্যুনিটি আমার পাশে দাঁড়ায়। তারা আমাকে আশ্বস্থ করে। তারা বলে আমেরিকান পাসপোর্ট থাকলে নাকি আর কিছুই লাগেনা। তবে আমি হাঁপিয়ে ওঠেছিলাম। গত পাঁচ বছরে নানা কারনে এ দেশের প্রতি আমার মোহভংগ হয়েছে।
একদিন এমিরেটসের রাত দশটার ফ্লাইটে আমি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। মনে মনে বললাম, গুডবাই আমেরিকা।
চলবে।
