#স্বপ্ন_ভংগ
(শেষ পর্ব)
বাসায় এসে পৌঁছালে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেংগে পড়েন। আমিও কাঁদছিলাম, তবে আমার কান্না ছিল অনেকদিন পর মায়ের বুকে আসতে পেরে আর প্রকৃত ভালবাসার ছোঁয়া পেয়ে। স্বামী হারানোর বেদনা তেমন ছিলনা। রবিনও কাঁদছে তার স্টাডী রুমে টেবিলে মাথা রেখে। আমি গিয়ে বললাম, এই বোকা কাঁদছিস কেন? এতদিন পর আমাকে পেয়েছিস, তুইতো হাসবি।
কত বড় হয়ে গেছে রবিন। সেই ক্লাস এইটের বছর ওকে রেখে আমেরিকা গেলাম। সে এখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। কি সুন্দর গোঁফ গজিয়েছে তার।
দীর্ঘ জার্ণির কারনে আমি ছিলাম ভীষন ক্লান্ত। দুপুরে খেয়ে আমি রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। কি অদ্ভূত, আমার রুমটা আগের মতই ছবির মত করে গোছানো। সেজন্যই বুঝি মা বাবার কাছে ফেরা এত মধুর। নিদারুন ক্লান্তি স্বত্তেও ঘুম আসছিল না। মা এসে আমার পাশে শুয়ে আবার কাঁদতে শুরু করলেন। আমি এবার না বলা কথা গুলো তাঁকে বললাম। আমার শশুর বাড়ির লোকদের আচরণ, ফাহাদের লেখাপড়া, তার উবার চালানো, মদ্যপান এসব। আমার প্রথম তিন বছর বেসমেন্টের অন্ধকার ঘরে বসবাস, ফাহাদের বাবা হওয়ার অক্ষমতার কথা। মা কিছুক্ষণ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রইলেন। তারপর আবার কান্না শুরু করলেন। আমার মাথায় আর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, এসব কথা তুই আমাদের জানাসনি কেন মা?
যে অসহায়ত্ব নিয়ে একদিন অজানায় গিয়েছিলাম, অনেক বছর পর সেই অসহায়ত্ব আমার কেটে যেতে লাগল। আমেরিকার স্বপ্নপুরীর জীবন কোনদিন নিজের মনে হয়নি, অনেক বছর পর নিজের মাতৃভুমি আর পরিবার আমার ফাঁকা বুক ভরিয়ে দিল।
কয়েক দিনে আমি মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে ওঠলাম। তবে পুরনো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করলাম না। মায়ের সাথে শপিংএ গেলাম। রবিন ওর ইউনিভার্সিটি দেখাতে নিয়ে গেল। একা একাও ঘুরতে বের হতাম।
আমি দেশে আসার সপ্তাহ কয়েক পর পাশের ফ্ল্যাটের আন্টি একদিন সন্ধার পর বাসায় এলেন। আমি দেশে থাকতে এর আগে তাঁকে বাসায় আসতে দেখিনি। কিছুক্ষণ গল্প করার পর মা এসে বললেন আন্টি আমাকে ডাকছেন। আমি খানিকটা অবাক এবং বিরক্ত হলাম। তিনি যদি আমার প্রবাস জীবন অথবা বিধবা হওয়া সম্পর্কে কথা বলেন তা হবে আমার জন্য বিব্রতকর। যেতে ইচ্ছে না করলেও যেতে হল, নিতান্ত ভদ্রতা রক্ষার জন্যই।
আমাকে দেখেই তিনি হেসে বললেন, মা কেমন আছ?
‘ভাল আছি’ বলে আমি তাঁর পাশের ছোফায় বসলাম। আমিও জানতে চাইলাম তিনি কেমন আছেন। তাঁর পাশে বসা এক যুবক।
তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন, এ হল রাকিব, আমার ভাইপো, ইঞ্জিনিয়ার। ওরা ইন্দিরা রোডে থাকে।
আমি আশ্চর্য হলাম। তাঁর সাথেই আমার পরিচয় নেই, তিনি আবার ভাইপোর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। তবে তিনি আমার ব্যক্তিগত কোন কথা তুললেননা বলে আমি কিছুটা স্বস্থি পেলাম। তিনি আমার বিধবা হওয়ার বিষয়টা জানেন কিনা বুঝতে পারছিনা। জানতেও পারেন, মা হয়তো বলেছেন। পরে মায়ের কাছে জেনেছি আন্টি জানেন। তার মানে এই বিল্ডিং আর আশেপাশের অনেকেই জানে। জানুক, জানলে কি যায় আসে।
রাকিব মনে হয় ইদানিং ফুপুর বাসায় ঘন ঘন আসে। গত কয়েকদিনে আমার সাথে দুবার দেখা হয়েছে। প্রথমদিন দুপুরের কিছু পরে আমি থার্ড ফ্লোরে লিফটের কাছে দাঁড়িয়ে দেখলাম ওটা গ্রাউন্ড থেকে উপরে আসছে। আমি নিচের বাটনটা চাপলাম। থার্ড ফ্লোরে এসে লিফটের ডোর খুলতে দেখলাম রাকিব বের হল।
আমাকে দেখেই বলল, কেমন আছেন?
আমি ‘ভাল আছি’ বলেই লিফটে ঢুকে গেলাম।
কয়েকদিন পর বিল্ডিং এর গেইটে দেখা। দেখলাম একটু দ্রুত হেঁটে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। এদিন সহজে ছাড়া পেলাম না। ড্রাইভার গাড়ি বের করতে দেরী করছে।
একদিন পড়ন্ত বিকেলে ক্রিসেন্ট লেকের পাশে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। ফাল্গুনের মাঝামাঝি, এসময় রাস্তার দুপাশে আগুন ধরা কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি দেখতে ভাল লাগে। অনেক বছর পরে গেছি। হঠাৎ দেখি একগাল হেসে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে রাকিব।
সে বলল, কেমন লাগছে? গরম না খুব? আমেরিকার তুলনায় অনেক কষ্ট তাইনা?
আমেরিকার কথা শুনতে আমার কাছে সুখকর লাগেনা।
আমি বললাম, আমার দেশের সাথে অন্য দেশের তুলনা হয়না।
রাকিব সাথে সাথেই বলে, ঠিক বলেছেন। সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।
সন্ধ্যা পর্যন্ত সে আমার সাথে থাকল। আইসক্রিম খাওয়ালো।
আরেকদিন দেখা হল আমাদের বিল্ডিংএর ছাদে। এখান থেকে ইষ্টার্ণ রোডের দক্ষিণের উঁচু উঁচু গাছে ভরা পার্কটা দেখা যায়। আমি মাঝে মাঝে ছাদে ওঠে এই সবুজ ছায়াবিথীর দিকে চেয়ে থাকি। দেখি রাকিব ছাদে ওঠে এসেছে। সেকি আমাকে ফলো করে নাকি বুঝতে পারলাম না।
সেদিনও অনেক কথা হয় তার সাথে। সে জানায় আমাদের দেশের ছেলে মেয়েরা বিদেশে যায় এটা তার পছন্দনা। মানুষজন বেশি বটে, কিন্তু এত শান্তির দেশ কি পৃথিবীতে আর আছে? আর থাকলই বা, আমার কাছে নিজের দেশই শান্তির।
ওর কথাগুলো শুনতে ভালই লাগে। দেশের প্রতি মমতা আরো গাঢ় হয়।
আমি দেখলাম, ফাহাদের কথা, আমার বিধবা হওয়ার কথা সে জানে। সে এজন্য আক্ষেপ প্রকাশ করে। আমি গভীর ভাবে রাকিবের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি। আমার মনে হয় সে আন্তরিক ভাবেই কথাগুলো বলছে।
জ্যামাইকা থেকে বাংলাদেশী কম্যুনিটির সাজ্জাদ ভাই আর আসমা আপার দোকানের দিবা মাঝে মাঝে ফোন করে। সাজ্জাদ ভাই একজন প্রাণখোলা পরোপকারী মানুষ। ফাহাদের মৃত্যূর পর আমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত অনেক বাংলাদেশী আমাকে হেল্প করেছে। তবে সাজ্জাদ ভাই এদের মাঝে একদম অন্যরকম। তিনি যেন জ্যামাইকার সব বাংলাদেশীর অভিভাবক। সেদিন ফোনে তিনি আমার সবকিছু শুনে আর আমেরিকার প্রতি আমার মনোভাব জেনে ভীষন অবাক হয়ে যান।
তিনি বলেন, কি বলছ তুমি? তুমিতো কারো সাথে মিশ নাই। সেজন্য জাননা। বাংলাদেশ থেকেও এখানে আমরা অনেক বেশি সামাজিক। উইকএন্ডে বিভিন্ন ফ্যামিলীর মাঝে যোগাযোগ হয়। বিয়ে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে নিজেদের মাঝে দাওয়াত হয়। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়, পিকনিক হয়। এমন আরো অনেক কিছু। কি যে বল তুমি! আরে তুমি হচ্ছ আমেরিকার সিটিজেন। এখানে বুড়ো মানুষ যারা কাজ করতে পারেনা তাদেরকে সরকার ভাতা দেয়। তুমি ভাবছ কিভাবে চলবা কোথায় থাকবা। তুমি সোজা চলে আস, আমি তোমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করব।
দিবাও বলে, আপা, আমি পোস্ট গ্র্যাড স্টুডেন্ট। এদেশে একা থাকি, নিজের খরচ নিজে চালাই।
রাকিব আমার ফোন নম্বর চেয়ে নিয়েছে। দিতে মন চায়নি, কিন্তু মুখের ওপর মানাও করতে পারিনি।
এখন রাতের বেলা সে মাঝে মাঝে ফোন দেয়। তার কথা লম্বা হতে থাকে যতক্ষণ আমি কোন কারন বা ব্যস্ততার কথা না বলি।
আমার অনুমান সত্য প্রমানীত করে রাকিব একদিন কফি শপে কফি খেতে খেতে আমাকে প্রেম নিবেদন করে।
আমি বলি, আপনি একজন অবিবাহিত ইঞ্জিনিয়ার, ভাল জব করেন। আর আমি পাঁচ বছর ঘর সংসার করা বিধবা মেয়ে। আপনি যে কথাটা বললেন, তা কি ঠিক হল?
রাকিব বলল, তোমার সব কিছুইতো আমি জানি। কিন্তু আমি তোমাকে ভালবাসি। বিয়ে করতে চাই।
রাকিবকে সরাসরি হ্যাঁ বা না কিছু না বলে আমি সেদিন চলে আসি। রাতেই মাকে আমি জানাই। দেখা গেল মা আগেই জানেন। পাশের বাসার আন্টি অলরেডী মাকে প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে।
আমি বললাম, মা এসব কি? এর কোন মানে হয়?
মা বলেন, কেনরে মা, তোর তো সারা জীবন পরেই রয়েছে, বিয়ে করতে হবেনা?
‘তাই বলে পাঁচ বছরের বিধবার সাথে অবিবাহিত ছেলের?’
‘তোর বয়স কত হয়েছে? সাতাশ। তোর সাথের কজন মেয়ের বিয়ে হয়েছে বল? আর ছেলের বয়সতো বত্রিশ।’
‘রাকিব না হয় বলছে। ওর ফুপুও বলছে। ওর বাবা মা?’
‘সবাই। তোকে ওদের খুব পছন্দ হয়েছে।’
‘সবাই এক সাথে পাগল হয়ে গেল?’
মা আমার দিকে হতাশ হয়ে চেয়ে থাকেন।
আমি দেখলাম আমি ছাড়া সবাই এ বিয়ের পক্ষে। ছোট ভাই রবিনও। সে আসলে আমাকে দেশে দেখতে চায়। নিজেও বিদেশে যেতে চায়না, আমাকেও যেতে দিতে চায়না।
একদিন রাকিবের সাথেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমি ইন্দিরা রোডে ওদের বাসায় গিয়ে ওঠি। শশুর শাশুড়ির রুমের পাশের এক নম্বর চাইল্ড বেডটা আমাদের জন্য বরাদ্দ হয়। এতে এটাচড বাথ রয়েছে। বাসাটা ভালই। দেবর সাকিব ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। দুই ভাইয়ের মাঝে বোন রয়েছে, শায়লা, ও স্বামীর সাথে রাজশাহী থাকে। এ পরিবারের সবাই আমাকে অনেক আদর যত্ন করে। কি খাই না খাই সেদিকে সবার সজাগ দৃষ্টি। শাশুড়িতো আমাকে রান্না ঘরে যেতেই দিতে চাননা। আমি জোর করেই তাঁকে কিছু সাহায্য সহযোগীতা করি। রাকিব অফিস থেকে সোজা বাসায় চলে আসে। আমাকে সময় দেয়। আমরা লুডু খেলি। টিভি দেখি। একসাথে বাইরে ঘুরতে যাই। রেস্টুরেন্টে খেতে যাই। বিয়ের পর পর হানিমুনে কক্সবাজার, টেকনাফ ঘুরে এসেছি।
মাস চারেক পর এক ছুটির বিকেলে রাকিব বলে, তোমারতো আমেরিকান পাসপোর্ট আছে?
‘আছেতো। কেন?’
‘না এমনি। তুমি ইচ্ছে করলে আমেরিকা যেতে পারবেনা?
‘কেন পারবনা? আমি সে দেশের সিটিজেন না?’
সে এখন মাঝে মাঝে নিজের দেশের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে। চারদিকে নোংরা, রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম, দূষিত পরিবেশ এসব। ওর এমন কথার মাঝে আমি অন্য রকম গন্ধ পাই। আমার ভেতর সন্দেহ ঘনীভূত হতে থাকে।
একদিন সে আমাকে বলে, এই তুমি আমার জন্য আমেরিকার ইমিগ্র্যান্ট ভিসার এপ্লাই কর।
আমি টের পাচ্ছিলাম একদিন না একদিন রাকিব এই কথাটা বলবে।
আমি বললাম, আমিতো আমেরিকা যাব না।
রাকিব বলে, আমিও যাবনা। এপ্লাই করা থাকল।
আমি বললাম, শুধু এপ্লাই করলে হবেনা। ভিসা নিয়ে আমেরিকা ঢুকতে হবে। এরপর গ্রীনকার্ড। এরও কয়েক বছর পর পাসপোর্ট। শুধু শুধু এপ্লাই করে লাভ কি?
‘আমার আমেরিকার ভেতর ঢুকতে পারলেই হয়, বাকিটা পরে দেখা যাবে।’
আমি রাকিবের দিকে চেয়ে থাকি, সে আমেরিকা যেতে কতটা উদগ্রীব আমি অবাক হয়ে তা লক্ষ্য করি। তার মুখ ফসকে আসল কথাটা বেরিয়ে এসেছে।
আমি সরাসরি বলে দেই, আমি এপ্লাই করতে পারবনা।
রাকিব বলে, তোমার অসুবিধা কি? তোমারতো আর টাকা পয়সা খরচ হবেনা। খরচ যা হবে আমি করব।
আমার প্রচন্ড রাগ হয়। আমি বলি, তোমার ভেতরে যে এই চিন্তা ছিল তাতো আগে বুঝতে দাওনি। তুমি এত লোভী?
রাকিবও আমার ওপর রেগে যায়, সে বলে, আমাকে লোভী বলছ কেন? আমি কি যৌতুক নিয়েছি তোমার বাবার কাছ থেকে?
‘তুমিতো আরো খারাপ কাজ করেছ। অভিনয় করে আমেরিকা যাবার প্রবল ইচ্ছেটা আমার কাছে গোপন করেছ।’
‘বুঝেছি, আমি লোভী, খারাপ লোক। আর পাঁচ বছর অন্যের ঘর করা বিধবাকে বিয়ে করলাম, একাজটাও বোধ হয় খারাপ হয়েছে।’
ওর কথাগুলো শুনে আমার শরীর রি রি করে ওঠল। রাকিব কত নিচ প্রকৃতির আমার বুঝতে বাকি থাকেনা। ফাহাদের কথা খুব মনে হয়। কিছুটা কর্ম বিমুখ আর মদ্যপান ছাড়া ওরতো আর কোন দোষ ছিল না। পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনে একটাও কটু কথা আমাকে বলেনি।
রাকিবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি ওর রুম থেকে খালি হাতে বেরিয়ে আসি। আমি ভালই বুঝতে পারি পুরো ব্যাপারটা রাকিবের পরিবারের পূর্ব পরিকল্পিত। আর মূল পরিকল্পনাকারী হলেন পাশের বাসার আন্টি।
আমি শাশুড়ির রুমে ঢুকে গায়ে যা গয়না ছিল তাঁর বিছানায় রেখে বেরিয়ে এসে চলে যাই আমার বোকা বাবা মায়ের কাছে।
হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরের আন্তির্জাতিক বহির্গমন গেটে ঢুকার আগে বাবা, মা আর রবিনকে বলে যাই, কাগজপত্র আমি সাথে নিয়ে গেলাম, আমেরিকা পৌঁছে আমি তোমাদের জন্য এপ্লাই করব।
গেইট অতিক্রম করে ঘুরে তাকিয়ে দেখি, পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে আপন তিনজন মানুষ এক সাথে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, ওরা কাঁদছে।
abul waset shahin
