#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#অষ্টম_পর্ব
কলমে অনিন্দিতা
অ্যালার্মের তীক্ষ্ণ শব্দে ঘুম ভাঙতেই চমকে উঠে বসল মিতুল। ঘুমচোখে চারিদিকে দেখছে ঘরটার ! বড্ড অচেনা! কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝতে পারল না—অঙ্ক পড়া থাকে রবিবার সকালে। তাই অ্যালার্ম টা দেওয়াই ছিল।কিন্ত ও তো বাড়িতে নেই ।মাথা ঝিমঝিম করছে, চোখ ঝাপসা। তারপর ধীরে ধীরে চারপাশটা স্পষ্ট হতেই বুকটা ধক করে উঠল মিতুলের।
ঘরে কেউ নেই। হোটেলের এই ঘরে ও একা! কোথায় গেল পিঙ্কি আর অর্ণব! ঘড়িতে সাড়ে ছটা সবে! বলেছিল দশটা নাগাদ বেরোবে! সেই মতোই পিঙ্কি বলেছিল একটু বেশিক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া যাবে!
আসলে একদিনে যা খাটনি গেছে! মানসিকভাবে ক্লান্ত সবাই । এই যে সুবীর! লোকটাকে দেখে একটুও ভালো লাগেনি মিতুলের !
দাদুর মতো সম্ভ্রান্ত একজন কী করে এই লোকটার সান্নিধ্যে আসতে পারে, ভেবেই পাচ্ছে না মিতুল! কত বড় পোস্টে কাজ করত দাদু! মারা যাওয়ার পর ক্লাবে, স্কুলে কত স্মরণসভা হলো! পরীক্ষা চলা সত্ত্বেও সব জায়গায় পরিবারের পক্ষ থেকে মিতুল আর ওর মা গেছে। দাদুর সম্পর্কে ভালো ভালো কথা শুনে মনটা গর্বে ভরে গেছে মিতুলের! কিন্তু এখানে এসে নিজেরই কেমন যেন লজ্জা লাগছে, পিঙ্কি দি তো তাও নিজের লোক, কিন্তু অর্ণব! অর্ণব দা তো বলেই ফেলল, “দাদুর জীবনটা বেশ রঙিন ছিল!”
শুধু এইটুকুই বলেছিল, কিন্তু নিতে পারেনি মিতুল! দাদু খুব প্রিয় মিতুলের। বড় পিসি, মেজো পিসিকে ও দেখতে পারে না! কারণ ওরা দাদুকে দেখতে পারে না! কিন্তু কারণ কী! কত খুঁজেছে মিতুল, যদি একটা ডায়েরি পাওয়া যায়! যদিও দাদুর ডায়েরি লেখার অভ্যেস ছিল কীনা জানা নেই ! যদি থাকে এই ভাবনা থেকেই আলমারি খুঁজে একটা ডায়েরি পাওয়া গেছেও, কিন্তু তাতে কিছু লেখা নেই! থাকলেও হাবিজাবি! কিছু হিসাবে, বাজারের ফর্দ! কোথা থেকে কিছু একটা ইঙ্গিত তো দরকার!নাহলে এগোবে কী করে মিতুল!
শুয়ে থেকে থেকে উঠে পড়ল মিতুল! একা অচেনা জায়গায় থাকতে ভয় লাগছে! যদিও পিঙ্কি বাইরে থেকে লক করে গেছে! খাট থেকে নেমে পড়ল মিতুল! একি! ঘরটা এরকম অগোছালো! দাদুর জিনিসপত্র- যেগুলো সন্দেহ হয়েছে, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে মিতুল। সঙ্গে সেই শেষের কবিতা, দাদুর লেখা চিঠি, সেই ফাঁকা ডায়েরি, সব মেঝেতে ছড়ানো, সঙ্গে মিতুলের পেনটাও ! ওটা তো ব্যাগে ছিল না! ওটা তো প্যান্টের পকেটে রেখেছিল মিতুল! কে ঘাঁটাঘাঁটি করল এইসব! পিঙ্কি দিদি? অর্ণব দা?
আচ্ছা, অন্য কেউ আসেনি তো! সীতাহারটা নিতে! বুকটা কেঁপে উঠলো।তাড়াতাড়ি মিতুল নিচু হয়ে বসে খাটের তলা থেকে বের করল ট্রলিটা! হাতব্যাগ থেকে চাবি বের করে এনে ঘুরিয়ে খুলল সবুজ রঙের ট্রলি, বুকটা ধকধক করছে, যদি হারটা না থাকে! কিন্তু ট্রলিটা খুলতেই বেরিয়ে এলো সেই হার! নিশ্চিন্ত হলো মিতুল! আবার ট্রলিতে তালা দিয়ে গুছিয়ে রাখল!
তাহলে! ঘরের এই অবস্থা কে করল! এবার বেশ ভয় লাগছে মিতুলের। তাড়াতাড়ি মোবাইলটা খাটের ওপর থেকে এনে ফোন করল! একবার রিং হতেই ফোনটা ধরে ফেলল পিঙ্কি!
“হ্যালো? বল মিতুল”—পিঙ্কি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল। মিতুল কাঁপা গলায় বলল, “তোরা কোথায়?” ওপাশ থেকে আদুরে গলায় পিঙ্কি বলল—“আরেহ! আমরা সামনের পার্কে আছি, একটু হাঁটতে এসেছিলাম সকাল সকাল!ঘুম ভেঙে গেল তাই জায়গাটা একটু ঘুরে দেখেছি ”
মিতুল থমকে গেল, বিড়বিড় করে বলল—“আমাকে না বলে?”
পিঙ্কি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—“তুই এমন ঘুমাচ্ছিলি যে ডাকিনি।মায়া হচ্ছিলো। সদ্য পরীক্ষার ধকল গেল! তাও দু’বার ডেকেছি, কোনো রেসপন্স নেই। ভাবলাম ঘুমোতে দিই। যাই হোক, আমরা পনেরো মিনিটে ফিরছি। তুই স্নান করে রেডি হয়ে যা।সাড়ে আটটার মধ্যে বেরোব।”
মিতুল একটু থেমে খুব আস্তে বলল—“এত সকালে? রানী ভিলা…?”ওপাশে এক মুহূর্ত চুপ… তারপর পিঙ্কি বলল—“না… আগে থানায় যাবো।”
“তুই কি দাদুর ডায়েরি না জিনিসপত্র বের করেছিলি?”—মিতুল আস্তে করে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু পিঙ্কি ঠিক ততটাই জোরে বলল, “না না, সকাল সকাল ঐসব নিয়ে কী করব! তবে হ্যাঁ, থানায় যাওয়ার আগে ঐগুলো লাগবে! গুছিয়ে নে!”—বলেই ফোনটা কেটে দিল পিঙ্কি!
ফোনটা কেটে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল মিতুল। রাগ হচ্ছিল, একবার তো ডাকতে পারত মিতুলকে! ও না হয় যেত ওদের সঙ্গে, কিন্তু তারপরই মনে হলো—দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা এতদূর এসেছে শুধু মিতুলের জন্য, এত কিছু সামলাচ্ছে, এটুকু সময় তো ওদের একার প্রাপ্য।
হঠাৎই দীপায়নের মুখটা ভেসে উঠল মিতুলের মনে। কিন্তু প্রশ্রয় দিল না! এখন এই সব ভাবার সময় না। জোর করে ভাবনাটা সরিয়ে দিল মিতুল।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে দাদুর ডায়েরিটার দিকে এগোল। ওটা মেঝেতে পড়ে আছে। হাত বাড়িয়ে তুলে নিতে গিয়ে একবার আলগোছে খুলে দেখল! কিছু লেখা পড়ল চোখে! তাড়াতাড়ি খুলল ডায়েরিটা! লেখা পাতাটা খুলতেই মিতুলের চোখ বড় হয়ে গেল।
এই ডায়েরিতে লেখা! কে লিখল, কখন লিখল! এই ডায়েরিটা পেয়ে থেকে না হলেও পঞ্চাশ বার উল্টেপাল্টে দেখেছে। কোনোদিনও সেরকম কিছু লেখাই ছিল না! তাহলে? শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে মিতুলের। পা যেন সরছে না। থপ করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। চিৎকার করতে চাইছে, কিন্তু আওয়াজ বেরোচ্ছে না। খালি গোঙাচ্ছে। ডায়েরিটা হাত থেকে ফেলে দিল।
অসহায়ের মতো বসে আছে মাথা নিচু করে মিতুল। হঠাৎ নাকে একটা গন্ধ এলো! ল্যাভেন্ডার আতর! দাদুর গন্ধ। দাদু!- বিড়বিড় করে উঠল মিতুল। মাথা তুলল। তার মানে দাদু এতসব করেছে। দাদু বলে ডেকে উঠল মিতুল। গন্ধটা আরও তীব্র হলো!
কিন্তু দাদু তো মৃত! মৃত মানুষের কোনো গন্ধ হয় না! কিন্তু দাদুর গন্ধ আছে। দাদুর প্রিয় ল্যাভেন্ডারের গন্ধ। তার মানে দাদু জীবিত। সে হোক আত্মা। কিন্তু দাদুর উপস্থিতি বুঝতে পারে মিতুল। এবার সাহস পেল ও! তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা তুলে নিল। পড়তে হবে! দাদু লিখেছে এইগুলো মিতুলের জন্য!
আজ অবধি দাদু কখনো বিপদে ফেলেনি মিতুলকে। উল্টো বিপদে পড়লে সাহায্য করেছে বারবার। আজও সাহায্য করবে জেনেই ডায়েরিটা তুলে নিল মিতুল। পাতার পর পাতা লেখা! পড়তে শুরু করল মিতুল—
“আমি অবনী বসু। রানীগঞ্জের কোল ইন্ডিয়াতে চাকরি করতাম। তবে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য পরিবার নিয়ে দুর্গাপুরে থাকতাম।
সেখানেই আমার সহকর্মী ছিল রুদ্রপ্রতাপ। ওর বাড়ি রায়গঞ্জে, কিন্তু আমার মতোই দুর্গাপুরে থাকত। একবার ওর সঙ্গে ওদের বাড়ি রানীগঞ্জে গিয়েছিলাম ঘুরতে। বেশ কয়েক দিন ছিলাম, কোনো কারণ নেই। শুধু ছুটি কাটাতেই গিয়েছিলাম।
সেখানেই প্রথম দেখি ওর বোন—রানীকে । বয়স অনেকটা ছোট আমার থেকে বা ওর দাদার থেকে। আমরা তখন বত্রিশ কী তেত্রিশ হব! আর রানী মাত্র পনের। কিন্তু স্বভাব দেখে মনে হতো আরও ছোট! সারাদিন আমরা পিছনে পিছনে ঘুরত। অদ্ভুত সব কথা বলত—বলত, আমি নাকি ওর আগের জন্মের স্বামী!
রুদ্রপ্রতাপ মানে আমার বন্ধু, রানীর দাদা আর ওদের বাড়ির লোকজন খুব লজ্জা পেত। বলত, রাণী নাকী ছোটবেলা থেকেই অসুস্থ, একটু মানসিক সমস্যা আছে। কিন্তু আমার ওকে বেশ লাগত!
একদিন দুপুরে ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ রাণী ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল—
‘কেন খুন করেছিলে আমাকে?’
আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। উঠে বসলাম।
রাণী আবার বলল—
‘একটা হারই তো চেয়েছিলাম… সীতাহার… সুন্দর নকশা করা… তুমি তো দিতে পারতে! মেরে ফেললে আমাকে!’
সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম—
‘তুমি কোথায় থাকতে? তোমার নাম কী?’
রাণী একটু থেমে বলল—
‘আমরা ফাতালপুরে থাকতাম… মনে নেই? আমার নামটা কী ছিল সেটা এখন মনে পড়ছে না… কিন্তু তুমি দাও না সীতাহারটা…’
এর মধ্যেই রুদ্রপ্রতাপ ঘরে ঢুকে পড়ে। ভীষণ রেগে গিয়ে রানীকে টেনে হিঁচড়ে বের করে দেয়। তারপর লজ্জা আর রাগে বলে—
‘এসব পাগলামি ওর। এই জন্যই আমার বিয়ে হচ্ছে না। কারও সঙ্গে পরিচয় করাতেও লজ্জা লাগে!’ সত্যি তো তখন আমরা দুই মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে ভরা সংসার, অথচ রুদ্রর তখনও বিয়ে হয়নি!
তাও রুদ্র রাণী সম্পর্কে যা-ই বাজে বলুক… আমার কেমন যেন মায়া পড়ে গেল মেয়েটার ওপর। তারপর থেকে মাঝেমধ্যেই যেতাম ওদের বাড়ি। ছ মাসে একবার অন্তত যেতামই। কী এক অদ্ভুত টান… কী এক অজানা মায়া।
এরপর একসময় রুদ্রর বাবা মারা গেলেন। রুদ্রও মা আর পাগল বোনের দায়িত্ব নিতে হবে বলে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। এমনকি আমার সঙ্গেও আর যোগাযোগ রাখেনি। কলকাতায় ট্রান্সফার নিয়ে চলে আসে। কিন্তু রুদ্রর মা আর রানীর দায়িত্ব যেন আমার ওপরই এসে পড়ল।
আমি দিনের পর দিন ওদের বাড়িতে কাটাতে লাগলাম। কিসের টান জানি না। বয়স তখন অনেকটাই।ছেলে-মেয়েরা বেশ বড় বড়। কামিনী, ছেলে-মেয়েরা কেমন ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। কেউ আমার সঙ্গে ঠিক করে কথা বলত না। অফিসেও কামাই হতো! শুধু সরকারি চাকরি বলে ওটা চলে যায়নি। তবুও আমি তাদের প্রতি অবহেলা করিনি। খবর পেলাম, কামিনী অসুস্থ। তখন বাধ্য হয়ে ফিরে এলাম।
কমলার ভরসায় ওদের রেখে এলাম।
কমলা নামটা দেখে থমকাল মিতুল। এই সেই নাম, কমলা। কিন্তু দাদু যে বলেছিল কমলাই রাণী । ওই দাদুর পূর্বজন্মের স্ত্রী। হিসেব মিলছে না। একদম না। যদি ওই কমলা হয়, তাহলে রাণী কে!
দাদু এই কথাগুলো লিখল কখন! ভালো করে দেখল লেখাটা। কাঁপা কাঁপা হাতে সরল ভাষায় লিখেছে দাদু। অথচ এই দাদুরই কত দক্ষ ছিল বাংলায়। মিতুল শুনেছে ঠাম্মাকে সাহিত্যের নেশা দাদুই ধরিয়েছে।
চিঠি দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই! অনেক জায়গায় ভুল! বাক্য গঠনে সমস্যা। এটা আদৌ দাদু লিখেছে!
দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল মিতুল। এটা তো দাদু নয়, এটা আত্মা। মানুষ মরে গেলে আর শ্বাস থাকে না। গুণগুলো সেক্ষেত্রে নাও থাকতে পারে। ব্যাখ্যাটা এভাবে সাজাতে পেরে ভালো লাগছে এখন।
আবার পড়তে শুরু করল মিতুল।
চলবে।
