#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
কলমে অনিন্দিতা
ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজে। সারা বাড়ি চুপচাপ। শুধু মিতুল একা বসে পড়ে চলেছে। আর না পড়ে কীই বা করবে! ঠিক আর পাঁচদিন বাকী পরীক্ষার।ক্লাস ইলেভেনের শেষ পরীক্ষা। এরপর ক্লাস টুয়েলভ।
এমনিতেই আজ পাঁচদিন কোনো বইয়ের সাথে যোগাযোগ নেই। হবেই বা কী করে বাড়ি ভর্তি লোক, হই চই। উৎসব চলছে যেন! একজন মানুষ না থাকাতে যে এতো আনন্দ হয় আগে জানতো না মিতুল।
পিসিরা, কাকারা, জেঠুরা সবাই মিলে হই হই রই রই কান্ড।উৎসব দাদুর শ্রাদ্ধ। দিন পনের আগে এই ঘরের খাটেই শুয়ে থাকতো লোকটা। বিরাশি বছর বয়স কিন্তু কেউ বুঝতে পারবে না।শুধু শেষের দিকের সিরিব্রাল টা একদম শুয়ে দিয়েছিল মানুষটাকে! দুমাসে কাবু করে দিয়েছে। নাহলে এমনটা ছিল নাকী চন্দ্র বাবু!
মর্নিং ওয়াক, যোগ ব্যায়াম, সুন্দর খাওয়া দাওয়া একদম জেন্টেলম্যান যাকে বলে। আধুনিকতাকে সুন্দর রপ্ত করতে জানতো মিতুলের দাদু। ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ সবেতেই পারদর্শী। মিতুলের একমাত্র ছাত্র। মিতুলই তো প্রোফাইল টা খুলে দিলো চন্দ্রশেখর বড়াল।ফেসবুক হোয়াটস্যাপ সবেতেই একটাই বন্ধু মিতুল।
হোয়াটস্যাপ মেসেজ করতে শিখে সারাক্ষন মিতুল কে মেজেজ করে যাচ্ছে। রাতে খেতে বসে মেসেজ করছে খেতে আয়! কী করছিস ” হঠাৎ পড়তে বসে মেসেজ ” ঘুমিয়ে পড়!”মাঝে মাঝে রাগ হতো মিতুলের। সারাক্ষন দিদিভাই দিদিভাই! আর কী কোনো কাজ নেই মিতুলের!
কিন্তু আজ দিন পনের হলো আর সেই ডাক নেই। কেউ ডাকবে না দিদিভাই বলে।আর কেউ মেসেজ করবে না।পড়তে পড়তেও কেঁদে ফেললো মিতুল। পড়ছে ঠিকই কিন্তু মন যেন ওঁর কাছে নেই আজ।
বাইরের উঠোনে এখনও প্যান্ডেল বাধা! ওখানেই কাল অতিথি রা এসে জমিয়ে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত মেখে খেয়েছে।কাকা স্পনসর করেছে ইলিশের। আমেরিকায় চাকরি করে মিতুলের কাকা। জেঠু ব্যাঙ্গালোরে থাকে। মিতুলের বাবাই শুধু যা ছা পোষা মানুষ। একটা দোকান ছাড়া আর সেরকম কিছু করতে পারেনি।যেটা করতে পেরেছে দাদুকে শেষ দিন অবধি রাখতে পেরেছে।
পড়ে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু মনটা বড্ডো অস্থির করছে ! উঠে পড়লো মিতুল চেয়ার ছেড়ে ! কিচ্ছু ভালো লাগছে না ! এতদিন এই খাটটাতেই দাদু শুয়ে থাকতো আর মিতুল পাশের টেবিলে বসে পড়তো ! সেরিব্রাল হওয়ার পর কথা গুলো অস্পষ্ট হলেও ইশারায় অনেক কিছু বলতে চাইতো ! মিতুল পড়ার চাপে আর সেইদিকে নজর দিতে পারেনি ! দেয় ও নি ! কীকরে বুঝবে দাদু আর থাকবে না !
বাইরের উঠোনে এখনো প্যান্ডেল করা আছে। আজ দুপুরেও এখানে বসে হাসি ঠাট্টা চলেছে। মা কাম্মা, জেম্মা, সেজ পিসি!
” দেখো মেজো বৌদি মায়ের ওই সীতা হারটা আবার সরিয়ে ফেল না! মানছি তুমিই একমাত্র বাবা মাকে শেষ অবধি দেখেছো। তার জন্য তোমার পাওনা বাবা দিয়েছে । এই বাড়িটা বাবা তোমাকে দিয়েছে। ”
সেজো পিসির কথাটা শেষ না হতে দিয়েই বম্মা বললো ” আমরা ছেড়ে দিয়েছি বলেই তো বাবুন বাড়িটা পেল! তোমার দাদা তো বলেই দিয়েছে লাগবে না আমার ওই বাড়ি।টাকাও লাগবে না!”
” তোমার আরও লাগবে বড়ো বৌদি, বরের অমন ব্যবসা , ছেলের চাকরি, অমন বাংলো টাইপ বাড়ি! এই ঢুকামরার একতলা বাড়ি নিয়ে করবে কী!” – সেজো পিসি বলেছিলো বম্মাকে! বড্ড ঠোঁটকাটা এই সেজো পিসির।
হই হুল্লোড় তার মাঝেই এমন মশলাদার আলোচনা। মিতুল বারবার ভাবছে এই বোধহয় ঝগড়া লাগলো। কিন্তু না বুদ্ধিমান ছেলে মেয়েরা বাবার শ্রাদ্ধে আর যাই করুক ঝগড়া করে না।
মিতুল চারদিক তাকিয়ে দেখলো। গিলে খেতে আসছে যেন বাড়িটা। বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে দেখেছিলো মিতুল সবার কেমন নিজের ঘর আছে। মিতুলেরও বড্ড শখ হতো একটা নিজের ঘরের। কেউ মুখ ফুটে না বললেও মিতুল জানতো দাদুর অবর্তমানে এই ঘরটা ওর!
আর হলোও তো তাই! দাদুর খাট দাদুর আলমারি দাদুর ঘর সবটাই এখন মিতুলের। মা তো বললো দাদুর আলমারিটা কাল পরিষ্কার করে দেবে। পুরোনো জামাকাপড় দিয়ে দেবে আর সেখানে দখল করবে মিতুলের সব কিছু।মিতুল বুঝেছে ওঁর মায়ের এতো তাড়া কেন আলমারি গোছানোর! ওই সীতাহার। এই কদিনে বম্মা, পিসিরা কতবার এসে এই ঘরটা গুছিয়েছে!
ঠাম্মার নাকী সবচেয়ে দামী আর ভারী গয়না ছিল ওই সীতাহার! বাড়ি, জমি, বাকী সব গয়না সব কিছু সুম্দর ভাগ হয়েছে শুধু হদিশ পাওয়া যায়নি ওই হারটার।যদিও আজ বিকেলে সবাই বাড়ি ফিরে গেছে! জেঠু কাকা সব শ্বশুরবাড়ি গেছে ওখান থেকে ফিরে যাবে সব!
ওরা ছিল তাই বুঝতে পারেনি মিতুল।কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না কিছু। কিচ্ছু না! খুব দেখতে ইচ্ছে করছে দাদুকে। দাদুর ছবিটা ঠাকুর ঘরে রেখেছে ঠাম্মার ঠিক পাশে। কী করবে মিতুল একবার কী দেখবে খুলে ঠাকুর ঘরটা!পাশেই ঘরেই বাবা মা ঘুমোচ্ছে পাছে উঠে যায়!
। মিতুল বেসিন থেকে চোখে মুখে জল দিয়ে এসে বসলো পড়তে! কিন্তু মন কই! ফোনটা হাত বাড়িয়ে নিয়েই ফেসবুক টা অন করলো। এদিক ওদিক স্ক্রল করছে, উদ্দেশ্যহীন ভাবে!হঠাৎ হাতটা আটকে গেল!
বুক টা ঢিপঢিপ করছে। কী দেখছে এটা ও!
চন্দ্রশেখর বড়াল অনলাইন! সবুজ আলো জ্বলছে পাশে। দাদুর ফোনটা কী তাহলে বুকাই নিয়ে নিলো! ছোট পিসির ছেলে এই বুকাই। দাদুর ফোনটা পকেটে নিয়ে ঘুরছিলো। নেওয়ার তাল বুঝেই লুকিয়ে সরিয়ে ফেলেছিলো মিতুল।
দুদন্ড ভেবে নিয়ে তাড়াতাড়ি ওর বইয়ের তাক থেকে বের করে আনলো ফোনটা! সেদিন বুকাইয়ের পকেট থেকে ফোনটা লুকিয়ে এখানেই ঢুকিয়ে রেখেছিল।এখানেই আছে। হাত দিয়ে চাপ দিতেই খুলে গেল। কিন্তু চার্জ নেই।
হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছে মিতুলের।বুকাই কী কোনোভাবে দাদুর একাউন্ট ইউজ করছে,! এক্ষুনি ওকে হোয়াটস্যাপ করতে হবে। হোয়াটস্যাপ খুলতেই দেখলো দাদুর ছবিটা দেখবে বলে খুলতেই স্ক্রিন জুড়ে ভেসে আসলো
দাদু টাইপিং….
