#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#সূচনা_পর্ব
রাশিয়ার প্রাণকেন্দ্র মস্কো। এটি এমন এক শহর, যা ইতিহাস আর আধুনিকতার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। বিশাল স্কাইস্ক্র্যাপার থেকে শুরু করে, শতবর্ষী ইতিহাসিক ভবন ও গির্জা, সবকিছু মিলিয়ে শহরটি যেন একটি জীবন্ত জাদুঘর। শীতকালে, মস্কোর রাস্তাঘাটে হালকা তুষার পড়ে, রাস্তার পাথরগুলো বরফের আবরণে সোনালি ও রূপালি আলো ছড়ায়।
শহরের ক্রেমলিন—যা কেবল রাশিয়ার নয়, সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসের প্রতীক। যেটি দূর থেকেই চকচক করে। শহরের প্রতিটি কোণে দেখা যায় রঙিন কাথেড্রাল, গম্বুজ আর শীর্ষগুলো লাল, সবুজ ও সোনার মিশ্রণে জ্বলজ্বল করছে। মস্কো নদী শহরের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়, নদীর পাড়ে ছোট ছোট কফি শপ ও বোটিং স্পটে ঘুরে বেড়ানোর দারুণ সুযোগ রয়েছে। এই শহরের রাস্তা ভরা ট্রাম, বাস, এবং মেট্রোর রেল স্টেশন। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মেট্রো স্টেশনগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই মস্কোতেই। প্রতিটি স্টেশন যেন একটি আলাদা শিল্পকর্ম, যেখানে মার্বেল, মোজাইক আর ভাস্কর্য বাসানো হয়েছে। মস্কোর মানুষজনও ভিন্ন রকম—তাদের পোশাক ও স্বভাব শহরের আবহের সঙ্গে মিলে যায়। শীতকালে লম্বা কোট, উষ্ণ স্কার্ফ, ঘন মোজা আর চামড়ার বুট পরা মানুষ রাস্তায় হেঁটে যায়, আর শহরের হালকা আলো ও তুষার তাদের রূপকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
মস্কো শুধু ইতিহাস আর আধুনিকতার মিলনস্থল নয়, বরং উদ্ভাবন ও গবেষণার কেন্দ্রও। শহরের বিভিন্ন ইনোভেশন ল্যাব ও গবেষণা ইনস্টিটিউট নতুন প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও রোবোটিক্সের ক্ষেত্রে বিশ্বকে এগিয়ে নিতে বিশেষ অবদান রেখেছে।
এই শহরের হৃদয়ে, নোভা ইনোভেশন ল্যাব দাঁড়িয়ে আছে। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে বিজ্ঞান আর উদ্ভাবনের মেলবন্ধন ঘটে। ল্যাবের কাচের দেয়ালের ভেতরে রোদ্দুর ঢুকছে, আর বিভিন্ন যন্ত্রপাতির শব্দ এক অদ্ভুত সুর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। এখানেই কাজ করছে নীশ রোজারিও।
নীশকে যেন মস্কোর এই রহস্যময় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে তৈরি করা হয়েছে। ছেলেটি দেখতে একদম প্রিন্সদের মতো। ফর্সা কোমল ত্বক, নীলভ চোখ, নাক লম্বা, ঠোঁট সুষম এবং কোমলভাবে বাঁকা। উচ্চতা 6’4”, চুল গাঢ় বাদামী, যা হালকা বাতাসে ঢেউ খেলছে। কাঁধ চওড়া, গা সুগঠিত, আর বাহুতে ফুলের থাকা পেশীর রেখা তার প্রতিটি কাজের মধ্যে শক্তি এবং দক্ষতা ফুটিয়ে তুলছে। নীশের পরনে আজ হোয়াইট শার্ট, যা তার গায়ের সঙ্গে পুরোপুরি ফিট হয়ে আছে। শার্টের হাতা সামান্য ভাঁজ করা, যা তার কব্জি এবং শক্তিশালী হাতে পেশীর রেখা ফুটিয়ে তুলেছে। শার্টের ওপর নীশ পরেছে ফিটেড হোয়াইট ল্যাবকোট। তার ল্যাবকোটের নিচে পরে থাকা ফুল হাতার শার্ট ল্যাবকোটের ভিতরে ঢেকে আছে। সে নিচে পরেছে হালকা গ্রে ট্রাউজার।
এই ল্যাবে নীশ কাজ করছে এক অত্যন্ত গোপন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট একটি রোবট বানানোর। প্রজেকটিতে তার সহপাঠী রোদ মিশরা এবং রোশান সের্গেইভ থাকলেও নীশ ঠিক করেছে, সে একাই এটি সম্পূর্ণ করবে। প্রফেসর ডক্টর আলেকজান্ডার ভ্লাদিমিরোভিচ, যিনি নীশকে বিশেষভাবে পছন্দ করেন। তিনি নীশের এককথায় এই পুরো প্রজেক্টের দায়িত্ব নীশের ওপর দিয়েছেন। ল্যাবের নিরিবিলি পরিবেশে, নীশের চোখে উদ্যম, হাতে দৃঢ়তা, এবং মনে প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে তাকে একটি নির্ভীক, কিন্তু রহস্যময় ব্যক্তি বানিয়ে তুলেছে। বাইরে শহরের তুষারঝরা রাস্তা দিয়ে মানুষ যাচ্ছিল, অথচ এই ল্যাবে নীশ এক অদৃশ্য যুদ্ধের সঙ্গে করছে লড়াই করছে, তার প্রতিভা, ধৈর্য এবং একাকীত্বের সঙ্গে।
হঠাৎ ল্যাবের বড় দরজা ধাক করে খুলল। শীতের হালকা কুয়াশা দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকে এলো, আর ল্যাবের ভেতরে প্রবেশ করলেন ডক্টর আলেকজান্ডার ভ্লাদিমিরোভিচ। প্রফেসরের সঙ্গে প্রবেশ করলেন নীশের দুই সহপাঠী—রোদ মিশরা এবং রোশান সের্গেইভ।
রোদ দেখতে একদম মডেলদের মতো। উচ্চতা প্রায় ৫’৮’’, দেহের গঠন প্রোপোরশনেট, কোমর স্লিম ওয়েস্ট, আর কোমল পেশী—সব মিলিয়ে একটি প্রফেশনাল মডেলের মতো দেখতে সে। চোখ দুটো বড়, উজ্জ্বল, বাদামী। আইব্রাউজ নিটলি শেপড, নাক সরু, ঠোঁট উপরের ঠোঁট সামান্য স্লাইটলি থিন আপার লিপ আর নিচের ঠোঁট ফুলার লোয়ার লিপ, চুল ডার্ক ব্রাউন আর মিডিয়াম লেংথ। ত্বক মসৃণ আর ফর্সা। রোদের পোশাক রাশিয়ান মডেলদের মতো মার্জিত এবং ফিটেড, কিন্তু ল্যাবের নিয়ম ও নিরাপত্তা মানা হয়েছে। সে পরেছে হালকা ফিটেড ব্লেজার স্টাইলের ল্যাবকোট, যা কোমর থেকে হালকা সিলুয়েট ধরে রেখেছে। ল্যাবকোটের নিচে পরেছে সাদা স্লিম-ফিট ট্রাউজার। রোদের চোখে মৃদু উজ্জ্বলতা আর মনোযোগ।
সে ল্যাবের যন্ত্রপাতির দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“নীশ, আজও তুমি একা ব্যস্ত নাকি?”
রোশানের চোখে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। সে ধীরে ধীরে নীশের দিকে তাকাল। সে যেন আসলে এখানে কাজ করতে না, বরং নীশকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে।
নীশ তখনও মনোযোগ হারায়নি। তার হাতের পরীক্ষা চলমান। সে ধীরে শক্ত কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, আমি প্রজেক্টের একটা অংশ শেষ করছি। তবে তোমরা যদি সাহায্য করতে চাও…”
কথা শেষ করল না নীশ। তার আগেই রোশান হঠাৎ এগিয়ে এলো।
রোশান দেখতে এককথায় সুদর্শন পুরুষ। তার উচ্চতা নীশের সমান। চোখ বড়, ব্রাইট ব্রাউন। আইব্রাউজ পরিপাটি, হালকা বাঁকা। নাক সরু। ঠোঁট পাতলা, চুল গাঢ় বাদামি। স্কিন মসৃণ, ফর্সা, হালকা দীপ্তি। সুঠাম দেহ। রোশানের পরনেও ফিটেড ল্যাবকোট। সে নীশের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি সাহায্য করতে পারি, নীশ। তুমি একা কাজ করলে অনেক সময় লেগে যেতে পারে।”
রোদ রোশানের কথা শুনে হালকা হেসে ল্যাবের পাশের ডেস্কের দিকে এগোল, যেন নীশকে বিরক্ত করতে চায় না সে।
নীশ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রোশানকে দেখল। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল,
“আমি ঠিক আছি। এই প্রজেক্টটি আমার একার কাজ। আমি চাই এটি নিজের প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ হোক। তোমরা শুধু পর্যবেক্ষণ করো, আর প্রয়োজন হলে পরামর্শ দাও। যদিও তোমার পরামর্শের আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আর তাছাড়া, আমার কাজ প্রায় শেষের দিকে। ইভেন্টের এখনো তিনমাস বাকি। আমি আশা রাখছি, আগামী সাতদিনের মধ্যে আমার প্রজেক্ট কম্পলিট হয়ে যাবে।”
রোশান হালকা অস্বস্তিতে পিছিয়ে গেল। তার চোখে সেই অদ্ভুত দ্বন্দ্ব আর ঈর্ষা আরও গভীর হল। তার রোদের প্রতি ভালোবাসা আর নীশের প্রতি ঈর্ষার তাকে ভেতর ভেতর ক্ষীপ্ত করে তুলল।
রোদ নীশের পাশে এসে ডেস্কের উপরে কিছু সরঞ্জাম সাজাতে লাগল। প্রফেসর ডক্টর আলেকজান্ডার ভ্লাদিমিরোভিচ এতোক্ষণ ল্যাবের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। তার চোখে সন্তুষ্টি। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই তিন জনের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা থাকলেও নীশ তার একাকী প্রচেষ্টায় প্রজেক্টকে এগিয়ে নেবেন।
আলেকজান্ডার ধীরে ধীরে নীশের ডেস্কের কাছে এগোলেন। তিনি ল্যাবের ভেতরের শান্ত পরিবেশে তার ভয়েস কমিয়ে বললেন,
“নীশ! কেমন চলছে তোমার প্রজেক্ট?”
নীশ তার যন্ত্রপাতির দিকে চোখ রেখে উত্তর দিল,
“প্রফেসর, সব ঠিকঠাক চলছে। এখনও কিছু পরীক্ষা বাকি আছে, কিন্তু আমি আশা করি আজকের মধ্যেই প্রাথমিক প্রোটোটাইপ শেষ করতে পারব।”
প্রফেসর এক পাশে দাঁড়িয়ে নীরবভাবে নীশকে পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, নীশের চোখে দৃঢ়তা, মনোযোগ আর এক অদ্ভুত উদ্যম—যা সাধারণ ছাত্রে খুবই বিরল। হালকা হাসির সঙ্গে তিনি বললেন,
“আমি জানি, তুমি একা কাজ করতে পছন্দ করো। তবে মনে রেখো, তোমার পাশে আমরা আছি। যদি কিছু প্রয়োজন হয়, দ্বিধা করো না।”
নীশ কনিষ্ঠভাবে মাথা নাড়াল, তবে তার ভয়েসে নির্ভীকতা স্পষ্ট ছিল,
“প্রফেসর, আমি চাই প্রজেক্টটি আমার নিজস্ব প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ হোক। আমার জন্য এই প্রক্রিয়াটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রফেসরের চোখে সন্তুষ্টি ফুটল। তিনি জানতেন, এই স্বাধীনতা নীশের সৃজনশীলতা এবং দক্ষতা আরও বাড়াবে। তিনি ধীরে একটি নোটবুক বের করে নীশের পাশে বসে বললেন,
“ঠিক আছে, তবে আমি কয়েকটা পরামর্শ দিতে চাই। রোবটের সেন্সর সিস্টেমে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন করলে এটি আরও কার্যকর হবে। দেখো, এখানে…”
প্রফেসর নোটবুক খুলে নীশকে নতুন ডায়াগ্রাম দেখালেন। নীশ মনোযোগ দিয়ে দেখল, কিন্তু মুখে কোনো চটজলদি প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তার চোখে ভাবনা স্পষ্ট—কিভাবে এই পরিবর্তনটি প্রয়োগ করবে, কিভাবে নিজের প্রয়াসে এটি নিখুঁত করবে।
রোদ হালকা হেসে বলল,
“নীশ, তুমি সত্যিই অদ্ভুত। সবকিছু একা করতে চাও, অথচ আমরা সবাই সাহায্য করতে চাই।”
নীশ ধীরে এক ছোট্ট হাসি দিয়ে বলল,
“আমি জানি, রোদ। কিন্তু এই প্রজেক্টটি আমার জন্য শুধু একটি পরীক্ষার নাম নয়, এটি আমার ক্ষমতা, ধৈর্য আর অধ্যাবসায়ের এক পরীক্ষা। তাই আমি চাই নিজের মতো করে শেষ করতে।”
প্রফেসর শান্তভাবে দাঁড়ালেন, হাতে নোটবুক ধরে বললেন,
“তুমি ঠিক বলেছো, নীশ। স্বাধীনতা, মনোযোগ আর ধৈর্য—এগুলোই সঠিক উদ্ভাবনের মূল। আমি কেবল তত্ত্বাবধান করব, কিন্তু সৃজনশীলতা তোমারই।”
নীশ চুপ করে শুনল। হঠাৎ প্রফেসর ডক্টর আলেকজান্ডার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“নীশ! আজ তো তোমার ক্লাস আছে?”
নীশ মাথা না তুলে যন্ত্রপাতির বোতাম ঘুরাতে ঘুরাতে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ প্রফেসর!”
প্রফেসর ধীরে একটু এগিয়ে এসে তাকালেন নীশের দিকে। ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে বললেন,
“নীশ, তুমি চাইলে কিন্তু ওটাকেই তোমার প্যাশন হিসেবে নিতে পারতে। মনে আছে? তোমাকে যে প্রস্তাব দিয়েছিল ওরা—সপ্তাহে মাত্র দু’দিন সায়েন্সের ক্লাস করানোর জন্য? ওই কলেজের পাঁচজন প্রফেসরের সমান এমাউন্ট অফার করেছিল কেবল তোমাকে একা, জাস্ট দু’দিন পড়ানোর জন্য।”
রোদ আলতো হেসে বলল,
“সত্যি নীশ! এত বড় অফার তুমি না করে দিয়েছো, ভাবলেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়।”
নীশ তখন ধীর ভঙ্গিতে যন্ত্রের একটি তার জোড়া লাগাচ্ছিল। কোনো অহংকার বা গর্ব নয়, এক শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,
“টাকার জন্য পড়ানো আমার উদ্দেশ্য নয়, রোদ। যারা সত্যিই শিখতে চায়, তাদের কাছে আমার জ্ঞান পৌঁছানোই আমার দায়িত্ব। তাই আমি ফ্রিতে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জ্ঞান বিক্রি করার জিনিস নয়।”
প্রফেসর স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে নীশের দিকে তাকালেন। তার কণ্ঠে গর্ব আর স্নেহ মিশ্রিত,
“নীশ! তুমি জানো তো, সবাই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আজকের যুগে সবাই টাকার পেছনে ছুটে যায়। কিন্তু তুমি অন্য রকম। তোমার ভেতরেই আমি প্রকৃত বিজ্ঞানীর হৃদয় দেখি।”
নীশ এবার হালকা হাসল। তার হাসি নীরব অথচ উজ্জ্বল সেই হাসি যেন ল্যাবের ভেতরের শীতল বাতাসকে মুহূর্তে উষ্ণ করে তুলল।
রোদ আস্তে করে ফিসফিস করে বলল,
“হয়তো এজন্যই সবাই তোমাকে আলাদা চোখে দেখে, নীশ।”
প্রফেসর হঠাৎ চারপাশে তাকালেন। তার দৃষ্টি থামল রোশান আর রোদের ওপর।
“রোশান, রোদ! তোমাদেরও তো আজ ক্লাস আছে। যাবে কখন?”
রোদ একটু চমকে উঠে হাতের গ্লাভস ঠিক করে নিল। তারপর হালকা হেসে বলল,
“জি প্রফেসর! আজ দুপুরে লেকচার আছে। তবে ভাবছিলাম, নীশকে কিছুক্ষণ হেল্প করি।”
প্রফেসরের চোখে মৃদু তীক্ষ্ণতা ভেসে উঠল। তিনি ধীর স্বরে উত্তর দিলেন,
“নীশের কাজ নীশ নিজেই সামলে নিতে পারে। তোমাদের দায়িত্ব তোমাদের ক্লাস। ছাত্রদের সামনে দেরি করে যাওয়া ভালো নয়।”
রোশান এদিকে গম্ভীর মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। প্রশ্নটা শুনে সামান্য মাথা নুইয়ে বলল,
“আমারও আজ দুপুরের সেশন আছে, প্রফেসর।”
নীশ তখন হালকা হাসল, কিন্তু তার চোখ তোলা হলো না তার। যন্ত্রের বোতাম ঘোরাতে ঘোরাতে শান্ত গলায় বলল,
“রোদ! চিন্তা করো না। তোমার কাজ আছে, সেদিকে মন দাও। আমি আমারটা সামলে নিতে পারব।”
রোদ এবার হালকা বিরক্ত স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার সব কথাতেই যেন “আমি একাই পারব” ট্যাগ থাকে, নীশ।”
প্রফেসর এবার গম্ভীরভাবে বললেন,
“রোদ, রোশান! তোমরা দু’জনেই প্রতিভাবান। কিন্তু দায়িত্বশীলতা প্রতিভার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কলেজে যাও। শিক্ষার্থীরা তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”
রোশান আর রোদ চুপচাপ একে অপরের দিকে তাকাল। দুজনের মনেই ভিন্ন অনুভূতি। রোদ মনে মনে বিরক্ত হলেও প্রফেসরের আদেশ মানল।
রোশানের ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি। সে চেয়ার ঠেলে সামান্য সামনে ঝুঁকে বলল,
“আপনি এখানে নিয়ে এলেন তাই। নয়ত এই নীশের অ্যাটিটিউড দেখতে আমি এখানে আসতাম না।”
নীশ মুখ শক্ত করে বসে আছে। তার চোখে বিরক্তি।
প্রফেসর হাতের ফাইলটা টেবিলে রেখে কড়া স্বরে বললেন,
“এনাফ! তোমরা সবাই এখন বড় হয়েছো, একে অপরকে ছোট করার বয়স তোমাদের নয়। শিক্ষার জায়গা যেন অশিক্ষার আসর না হয়।”
রোশান হালকা হেসে মাথা নিচু করল, কিন্তু তার চোখের কোণে জেদ। সে বিরক্ত মুখে চেয়ার ঠেলে উঠে গেল। দরজা ধাক্কা মেরে বের হয়ে যাওয়ার পর ল্যাবরুম নিস্তব্ধ হয়ে রইল।
নীশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইল। তারপর ধীরে প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“বাদ দিন, প্রফেসর। আমরা এই ল্যাবের মতো জায়গায় কিংবা আপনার সামনে এখনো হয়তো আপনার স্টুডেন্ট। কিন্তু এর বাহিরে আমাদের লাইফস্টাইল তো আলাদা। রোশান! এখানে চুপচাপ থাকে। কিন্তু বাহিরে? সেখানে ওর অন্য রূপ।”
নীশ একটু থামল। শ্বাস নিয়ে আবার বলল,
“আমি জানি, ও আমাকে অবজ্ঞা করে। আর সেটা ওর অভ্যাস হয়ে গেছে।”
প্রফেসর নীশের কথা মন দিয়ে শুনলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, যেন ভেবে নিচ্ছেন কোনটা বলা উচিত। তারপর ধীরে বললেন,
“নীশ, তোমরা এখন বড় হয়েছো। জীবনের শুরুতে দাঁড়িয়ে আছো। এই বয়সে প্রতিযোগিতা, মনোমালিন্য—এসব হবেই। কিন্তু মনে রেখো, মানুষের আসল পরিচয় লুকানো যায় না। যে ভেতরে যেমন, বাহিরেও একদিন সেটা প্রকাশ পায়।”
নীশ নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রফেসর আবারও বললেন,
“তুমি তোমার কাজ করে যাও। তোমার দায়িত্ব, তোমার স্বপ্ন—ওগুলিই তোমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে। রোশান হয়তো এখন বুঝবে না, কিন্তু সময় তাকে শিখিয়ে দেবে।”
নীশ ধীরে মাথা নেড়ে ছোট্ট করে বলল,
“জি, প্রফেসর!”
প্রফেসর মৃদু হেসে চলে গেলেন। নীশ আবারও নিজের কাজে মন দিল।
রোশান ল্যাবরুম থেকে বের হয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল। কপালের ভাঁজে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল সে প্রচন্ড বিরক্ত।
নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল,
“এই নীশ! যেন পৃথিবীর সব জ্ঞান শুধু ও-ই রাখে। প্রফেসরও ওকে নিয়ে এত মাতামাতি করেন যে, অন্য কাউকে চোখেই পড়েন না।”
হঠাৎ রোদ এগিয়ে এল। হাতে ফাইল, মুখে কৌতূহলের ছাপ।
‘“এত রেগে আছো কেন?”
রোশান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ওকে আমি একটুও সহ্য করতে পারি না। সবসময় এমন একটা অ্যাটিটিউড, আর প্রফেসরও যেন শুধু নীশকেই দেখতে পান।”
রোদ একটু হেসে মাথা নাড়ল,
“আরে, তুমি নীশকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে নিচ্ছো বলেই এমন লাগছে। সত্যি বলতে, ওর পরিশ্রম, ডেডিকেশন—এগুলো কিন্তু আলাদা মান দেয়।”
রোশান তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে রোদের দিকে তাকাল। রোদ বাঁকা হেসে চলে গেল।
•
মস্কোর সবচেয়ে বড় কলেজ—মস্কো ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স কলেজ।
কলেজের গেটে ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়। হঠাৎ এক শব্দে সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল। চকচকে কালো রোলস রয়েস এসে দাঁড়াল ঠিক সামনেই।
গাড়ির চকচকে ব্ল্যাক বডি আর ভারী ইঞ্জিনের শব্দে যেন পুরো পরিবেশ থমকে গেল। মেয়েরা তাকিয়ে রইল।
ড্রাইভার দ্রুত নেমে এসে গাড়ির দরজা খুলে দিল। ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল নীশ রোজারিও। ব্ল্যাক শার্ট, হাতার ভাঁজ গুটানো, বুকের কাছে দুটো বোতাম খোলা—সেখানে দৃশ্যমান শক্ত-পেশিবহুল ফর্সা বুক। ব্ল্যাক প্যান্ট, ব্ল্যাক জুতো, ডান হাতে ব্ল্যাক ঘড়ি, আঙুলে দুটি ব্ল্যাক ফিঙ্গার রিং, চোখে ব্ল্যাক সানগ্লাস।
তার উপস্থিতিতে মেয়েদের চোখ বিস্ফোরিত। কেউ কানে কানে বলল,
“ওইটা কি নীশ স্যার? এত চার্মিং বয় উনি। একঘন্টা আগেই রোশান স্যার ঢুকল। তাকে দেখেই নেশা কাটাতে পারছিনা। এখন আবার নীশ স্যার এলেন। উফফ! মরেই যাব।”
ছেলেদের চোখে হালকা ঈর্ষার ছাপ। কলেজের গেট যেন মুহূর্তেই এক ফিল্ম সেটে রূপ নিল।
নীশ সানগ্লাসের ভেতর থেকে চারপাশে একবার তাকাল। ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে গেল—যেন সে জানে, সব চোখ এখন তার দিকেই নিবদ্ধ।
সকলের চোখকে উপেক্ষা করে নীশ কলেজ ভবনের ভেতরে ঢুকতেই করিডোরে ইতিমধ্যেই ভিড় জমে গেছে। ছেলেরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করছে, মেয়েরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছিল রোদ। নীশকে দেখে তার ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেল। রোদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
“তুমি যখন এভাবে এন্ট্রি নাও, নীশ। তখন এই কলেজের সব স্পটলাইট তোমার দিকেই ঘুরে যায়।”
নীশ কেবল হালকা ভ্রু তুলে তাকাল, কোনো উত্তর দিল না।
এমন সময় অন্য প্রান্ত থেকে রোশান এগিয়ে এলো। তার মুখ গম্ভীর, চোখে ঈর্ষার ঝিলিক। চারপাশে সবাই নীশকে ঘিরে রাখায় যেন আগুন জ্বলছিল তার ভেতরে।
সে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
“হিরোইজম দেখিয়ে লাভ নেই, নীশ। এটা কলেজ, ফ্যাশন শো না।”
রোদ হেসে বলল,
“কথা ঠিকই, রোশান। কিন্তু সত্যি বলতে কী, ও যেখানেই দাঁড়ায়, সেটাই শো হয়ে যায়। কিন্তু তুমি এতো জেলাস কেন? মেয়েরা তো তোমাকে দেখতেও ছাড়েনা।”
রোশান বিরক্ত হয়ে দাঁত চেপে নীশের দিকে তাকাল। কিন্তু নীশ তখনও নির্বিকার, কালো সানগ্লাসের আড়াল থেকে কারো দিকেই চোখ তুলল না।
উপস্থিত সকল ছেলেরা রোদের দিকে তাকিয়ে। তার মার্জিত লুক, স্লিম ফিগার আর আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ—ছেলেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
রোশান কিছুটা বিরক্তি অনুভব করল। সে চারপাশে তাকাল, মেয়েদের মুগ্ধতা আর ছেলেদের উচ্ছ্বাসের মাঝখানে নিজের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করল।
নীশ নির্বিকার। সানগ্লাসের আড়ালে চোখে কৌতূহল বা বিরক্তি—কিছুই প্রকাশ পেল না।
রোদ হালকা হাসি দিয়ে চারপাশের দৃষ্টি উপেক্ষা করে নিজের পথে এগোল।
•
আজ যেন সব মেয়েরা আগেভাগে ক্লাসে এসে ভদ্র হয়ে বসে আছে। সকলে ক্রমাগত নিজের চুল, মেকআপ, লিপস্টিক ঠিক আছে কিনা, আয়না বা ফোনের স্ক্রিনে পরীক্ষা করছে। কারণ কলেজের আজ দুটি চামিং বয় উপস্থিত—কিন্তু তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হল নীশ রোজারিও, মোস্ট চামিং বয়। যিনি এখন তাদের ক্লাস নিতে আসবেন।
হঠাৎ নীশ ক্লাসরুমে প্রবেশ করল। সে ধীরে ধীরে নিজের ডেস্কের দিকে এগোল। চোখে কোনো অনুভূতি প্রকাশ নেই। ক্লাসরুমের প্রতিটি ছাত্রছাত্রী—ছেলে-মেয়ে সবাই চুপচাপ, নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে।
নীশ টেবিলে দাঁড়াল। সে সানগ্লাসের আড়াল থেকে চারপাশ লক্ষ্য করল। তারপর ধীরে ধীরে সানগ্লাস সরাল। উপস্থিত মেয়েরা তার নীল চোখ দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
নীশ সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বলল,
“আজ আমরা শুরু করব নতুন থিওরি নিয়ে। দয়া করে সবাই মনোযোগী হন।”
ক্লাসরুমে হালকা ফিসফিস শুরু হলেও, কেউ চোখ সরাতে পারছে না। মেয়েরা গোপনে নিজের চুল ও লিপস্টিক পরীক্ষা করল, কেউ কেউ আগ্রহের সাথে নোটবই খুলল।
নীশ হাতে মার্কার নিয়ে বোর্ডের দিকে এগোলো। তার উপস্থিতিতে চারপাশে শান্তি বিরাজ করল।
নীশ আবারও বলল,
“যদি কেউ প্রশ্ন থাকে, নির্ভয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমরা একসাথে বিষয়গুলো সহজে বুঝব।”
সবাই নিঃশব্দে তার কথায় মনোযোগ দিল।
নীশ বোর্ডের কাছে পৌঁছে একটি সূত্র লিখতে শুরু করল। তার হাতের প্রতিটি নড়াচড়ায় স্পষ্ট দক্ষতা ফুটে উঠছে।
ক্লাসরুমের প্রতিটি চোখ তার দিকে। কেউ নোটবই খুঁটিয়ে নোট নিচ্ছে, কেউ মনে মনে সূত্রগুলো মুখস্থ করার চেষ্টা করছে।
মেয়েরা চুপচাপ বসে আছে, কখনো চোখ উপরে তুলে নীল চোখের দিকে তাকাচ্ছে, আবার নিজের চুল ঠিক করছে।
নীশ বলল,
“চলুন এবার আমরা একটি উদাহরণ দেখি। সূত্রটি বোঝার জন্য প্রত্যেকের নজর রাখতে হবে। কেউ পিছিয়ে থাকবেন না এবং প্রশ্ন করতে দ্বিধা করবে না।”
একজন ছাত্র স্নিগ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“স্যার, সূত্রটা কেন এমনভাবে প্রযোজ্য?”
নীশ ধীরে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখো, সূত্রটি প্রতিটি ধাপে কার্যকর হয় কারণ আমরা মৌলিক নীতি অনুসরণ করেছি। ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও সহজ হয়।”
প্রশ্নটির উত্তর দেয়ার সময় তার ভঙ্গি এত প্রফেশনাল এবং প্রভাবশালী যে পুরো ক্লাসরুম এক মুহূর্তে নিঃশব্দ হয়ে গেল। কেউ কেউ নোটবইতে আরও সতর্কভাবে নোট নিচ্ছে, কেউ চোখ সরাতে পারছে না।
টানা একঘণ্টার ক্লাস শেষ হলো। নীশ বোর্ড থেকে সরে দাঁড়াল, মার্কার রেখে তার ডেস্কের কাছে এগোল। পুরো একঘণ্টায় নীশের চোখ একটি ছাত্রীকেও দেখল না। সে নিখুঁত মনোযোগে কেবল বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করল।
মেয়েরা চুপচাপ বসে আছে। নীশ ধীরে ধীরে সানগ্লাস আবার পড়ে বোর্ডের দিকে আরও একবার নজর দিয়ে ক্লাসরুম ত্যাগ করল।
চলবে..?
