#ফর্মুলা_শেষ_থেকে_শুরুর ( শেষ পর্ব )
#ঈপ্সিতা_মিত্র
(৫)
“তুই আর কোনো জায়গা পেলি না ! লাস্ট এ এই পার্ক টা ! তুই জানিস যে এখানেই আমি আর নাতাশা উইক এন্ডস এ আসতাম | একবার বলিস সব কিছু ভুলে যেতে, আর তারপর তুইই আবার সব কিছু মনে করাচ্ছিস |” সেইদিন গ্রিন ভিউ পার্কের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রৌনক এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলো নীড়কে | আসলে শনি রবিবারের অনেক সন্ধ্যা ও এই পার্কটাতে কাটিয়েছে নাতাশার সঙ্গে | ওই লেকের সামনের চার নাম্বার বেঞ্চটাই ছিল ওদের বসার জায়গা | এখানে এসে যেন সবটা স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠছে চোখের সামনে বার বার ! কিছুতেই বুঝতে পারছে না যে নীড় ওকে এত জোড় করে আজ এই পার্কটাতেই কেন নিয়ে এলো ! প্রশ্নটা মনে আসতেই নীড় বলে উঠলো ,—– . “বোটিং করার জন্য এসেছি এখানে আমরা |”
রৌনক প্রথমে কথাটা শুনে যেন ঠিক নিতে পারলো না ! দু সেকেন্ড সময় নিয়ে একটু ভেবে বললো ,—- ” সিরিয়াসলি ? তুই আমাকে এই পার্ক এ বোটিং করার জন্য নিয়ে এসেছিস ! তুই কি পাগোল !”
নীড়ের এবার এক কথায় উত্তর ,—– ” হ্যাঁ, হতেও পারি | যারা চেনে তারা বেশি ভালো করে বলতে পারবে |”
না , এবার আর ধৈর্য রাখতে পারলো না রৌনক | বেশ উত্তেজিত হয়েই বললো ,—“তুই থামবি ! আমি সাঁতার জানি না | আর এত তাড়াতাড়ি মরারও শখ হয়নি আমার | যদি বোটিং করতে গিয়ে পরে যাই ! তুই বাড়ি চল এক্ষুনি |”
নীড় এবার অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভাবে দৃঢ় গলায় বললো ,
—- “বাড়ি যাওয়ার জন্য তো আসিনি | বোটিং করার জন্যই এসেছি এখানে | আর সেটা করেই যাব ,ব্যাস |.”
এরপর আর এক মিনিটও টাইম ওয়েস্ট না করে নীড় টিকিট কাটতে চলে গেল | আর তারপর অত্যন্ত জোড় জবরদস্তির পর অবশেষে রৌনক কে বোট এ উঠতে হলো, প্রাণ হাতে নিয়ে | আসলে ওর ছোটবেলা থেকেই জলে ভয় লাগত !. আর আজ লেকের মাঝখানে এসে শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছিল,– ‘পড়ে না যাই !” এরপর কোনো মতে কুড়ি মিনিট বোটিং করে প্রায় চিৎকার , চেঁচামিচি , ঝামেলা করার পর রৌনক বোট থেকে নামলো | আর নীড়ের মুখে ঝিলিক দিয়ে উঠলো জয়ের হাসি |
কিন্তু রাস্তায়ও এখন রৌনকের মুখ ভার | ওই ভয়ংকর বোটিং এর কথা কিছুতেই ভুলতে পারছে না ও | এর মধ্যে নীড় বলে উঠলো ,
—-“কি হলো কি ? এত গম্ভীর ?”
“তো কি হাসব ! তুই জানিস যে জলে আমার কতটা ভয় লাগে ! তারপর জোড় করে বোটিং করালি, কোনো মানে হয় ! সত্যি যদি পড়ে টরে যেতাম ?আমি আজকের এই বোটিং এর এক্সপিরিয়েন্স এই জীবনে কখনো ভুলবো না |” কথাটা এক নিঃশ্বাসে বলে রৌনক এবার থামলো একটু দম নেয়ার জন্য | কিন্তু এর মধ্যে খেয়াল করলো নীড়ের মুখে হাসি | এবার ওর পারদ আরো চড়লো | তাই বেশ রেগেই বললো ,
—- “তুই হাসছিস ?বোটিং করতে গিয়ে অলমোস্ট আমার হার্ট এটার্ক হয়ে যাচ্ছিল ! আর তোর এটা মজা লাগছে ? ”
নীড় এবার হাসি মুখেই উত্তর দিলো , “সেটাই তো আমি চাইছিলাম |”
“কি ! আমার হার্ট এটাক ?”——— রৌনক চোখ গুলো বড়ো বড়ো করে জিজ্ঞেস করলো |
নীড় এবারও শান্ত গলায় উত্তর দিলো , —- “না | এই যে তোমার এই বোটিং এর ভয়ংকর অভিজ্ঞতা , এটাই আমি চাইছিলাম | মানে এরপর তুমি যখনই ওই পার্ক এ যাবে তখন শুধু এই ভয়ঙ্কর ইনসিডেন্টটার কথাই মনে পরবে |.তোমার ব্যর্থ প্রেম কাহিনী না | যদি পুরনো জায়গায় গিয়ে নতুন স্মৃতি তৈরী করো তাহলেই তো পুরনো স্মৃতি গুলো মন থেকে মুছবে | বুঝলেন এবার কিছু ?”
কথাটা শুনে রৌনক দু মিনিট চুপ | সত্যিই তো ! এতক্ষণ ধরে এক সেকেন্ড এর জন্যও ওর ওই সব প্রেম টেমের কথা মনেই আসেনি একবারও ! বরং শুধু ওই বোটিং আর ওর চেঁচানোর কথাই মাথায় ঘুরছিল | নীড় একদম ঠিক বলেছে | না , এরপর আর এই মেয়ের ওপর রেগে থাকা যায় না | বরং নিজের ওই তারস্বরে চিৎকারের কথা ভেবে গম্ভীর মুখটায় এখন একটা হাসি আপনাআপনিই চলে এলো রৌনকের |
(৬)
এরপর কিছুদিন বাদে সেদিন ভবানীপুরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রৌনক বেশ গম্ভীর ভাবে একটা কথাই ভাবছিলো , নীড়ের কথা শুনে আজ সানিদের বাড়ি যাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে ! হয়তো ওকে দেখেই মুখের ওপর দরজাটা দিয়ে দেবে | আসলে একটা সময়ের যতই ভালো বন্ধু হোক , কিন্তু এই নাতাশার জন্য ও সানিকে কম অপমান তো করেনি ! সেসব কি সানি এতো সহজে ভুলে যাবে ? ভাবনা গুলো আসতেই রৌনকের মুখটা অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিলো | তখনই পাশ থেকে নীড় বলে উঠলো , “এত ভেবো না | তোমরা সেই স্কুলের বন্ধু | একটা ঝগড়া সব শেষ করে দেয় না |”
রৌনক কথাটা শুনে দু সেকেন্ড ভেবে নিরাশ মুখেই বললো , “তুই বুঝছিস না ! বেকার বেকার কি ঝামেলাটাই না করেছিলাম আমি ! সব ওই নাতাশার জন্য হলো | কোন গ্রহের দোষে যে ও আমার লাইফে এসেছিল ! আমাকে সানি বলল যে নাতাশা কে একটা ছেলের সাথে ভিক্টোরিয়ার সামনে দেখেছে হাত ধরে ঘুরতে | আর আমি এত গাধা ! বিশ্বাস করলাম না | উল্টে ওকেই কি মুখ করে দিলাম |” —- কথাটা শেষ করেই একটা দীর্ঘ্য নিঃশ্বাস চলে এলো রৌনকের |
এবার নীড় একটু থেমে কিছু কথা সাজিয়ে বললো , —— “আচ্ছা, ভুল তো মানুষ মাত্রেই হয় না কি ! আসল কথা হলো নিজের ভুলটা বোঝা ,সেটাকে ঠিক করে নেয়া | আর সরি বললে কেউ কখনো ছোট হয় না | ”
না, এরপর আর রৌনক সেদিন কিছু বলেনি | নীড়ের কথাটা একদম ঠিক | আগে যা যা ভুল করেছে এখনই সময় সবগুলোকে ঠিক করে নেয়া | পুরোনো দামি মানুষগুলো , যাদের ও নিজের দোষে হারিয়েছে , তাদেরকে ফিরে পাওয়া | তাই সেদিন সানি দরজা খুলেই রৌনক ওকে জড়িয়ে ধরেছিলো | তারপর নিজের ভুলটা একসেপ্ট করে সরিও বলেছিলো | প্রায় ছ মাস বাদে সেই দিন সানীর সাথে আর ও একদম আগের মতন গল্প করেছিল , আড্ডা দিয়েছিলো | আজ এসবের পর মনে হচ্ছে রৌনক এতদিন ভুলই ভেবেছিল | মুখের পর দরজা তো দেয়নি মোটেও সানি | হ্যাঁ, একটু রাগ ছিল | কিন্তু একটা সরিই যথেষ্ট ছিল সবটা ঠিক করে দেয়ার জন্য |
আজকাল ওর সত্যি নিজেকে খুব স্টুপিড মনে হয় ! এই এক সেকেন্ড এর একটা সরির জন্য ও এত ভয় পাচ্ছিল এতদিন ধরে ! এত কিছু ভাবছিল ! যাই হোক অবশেষে প্রবলেম তো সলভ হয়ে গেল, এই অনেক | সত্যি , মাঝে মাঝে মনে হয় নীড় কি ম্যাজিক জানে ! ও আসার পর থেকে সব একটা একটা করে ঠিক হয়ে যাচ্ছে রৌনকের লাইফে | ছন্নছাড়া এলোমেলো জীবনটা যেন নীড় খুব যত্ন করে গুছিয়ে দিচ্ছে ওর |
(৭)
এরপর এখন বেশ কয়েক দিন ধরে নীড়ের কথাই মনে হয় রৌনকের | সত্যি , ভুল তো মানুষ মাত্রই হয় | সেই ভুলটাকে বুঝে যদি সব কিছু ঠিক করার একটা চেষ্টা করা হয় , তাহলে হয়তো হারিয়ে যাওয়া মানুষটা ফিরে আসে জীবনে | আচ্ছা , সরি বললে কি নীড়ের সাথেও সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে ! আবার আগের মতন | হ্যাঁ, বিশাল বড় ভুল করেছে রৌনক একটা সময়ে | ও ঠকিয়েছিলো নীড়কে | টাইমপাসই করেছিল আসলে ছ বছর ধরে | কিন্তু নীড় তো ওকে ভালবেসেছিল | ওর ফিলিংস গুলো তো সত্যি ছিল | আর আজ তো রৌনক বোঝে ভালোবাসা ব্যাপারটা কত টা দামী | তাহলে একটা ভুল কে ভুলে যাওয়া যায় না ! নিজে কে ই বার বার প্রশ্ন গুলো করে রৌনক | তবে উত্তর তো শুধু নীড়ই দিতে পারবে | আসলে রৌনক নাতাশাকে ভুলতে পেরেছে শুধু নীড়ের জন্য | আর এখন তো মনে হয় নাতাশা আর ওর মধ্যে বিশেষ কিছু ছিলোই না কখনো ! হয়ত শুধু একটা এট্রাকসন কাজ করত , ব্যাস | বেশ অনেক দিন হলো, এখন তো আর ভুলেও নাতাশার কথা মনে হয় না রৌনকের | সামনাসামনি দেখা হলে রাগ, দুঃখ, অভিমান কিছুই ফিল হয় না আর |যেমন একদিন তো নাতাশা নিজে থেকে কথা বলতে এসেছিল ! রৌনক জাস্ট হ্যাঁ হুঁ করে কাটিয়ে দিয়েছে | একটা পুরো সেন্টেন্সও খরচা করতে ইচ্ছে করেনি ওই মেয়ের জন্য আর | তার মানে তো এটাই দাঁড়ায় যে নাতাশার জন্য এখন ওর মনে কিছুই নেই আর | তাহলে কি নীড়ের জন্য ফিল করতে শুরু করেছে ও ! আর এতগুলো দিন লাগলো একটা মেয়ের ইম্পর্টেন্স বুঝতে ! সত্যিই, নিজেকে একটা ইডিয়ট বলে মনে হয় ওর !
এসব ভাবনার ভিড়েই দিনগুলো কেটে যাচ্ছে ঝড়ের মতন | এর মধ্যে শহরে বইমেলা এসে হাজির | পোস্টারটা দেখেই সেদিন রৌনকের চোখে নীড়ের মুখটা ভেসে উঠেছিল হঠাৎ | নীড়ের তো সব সময়ই বই খুব পছন্দের | তাই বইমেলায় যাওয়ার কথাটাও রৌনকই তুলেছিল নীড়ের সামনে | এটা শুনে নীড় তো অবাক ! রৌনক তো কখনো বই ছুঁয়েও দেখে না | ওর গিফ্ট করা প্রথম বইটা কোথায় হারিয়ে ফেলেছিলো ! তখন ওদের ক্লাস টুয়েলভ | সেই ছেলের আজ হঠাৎ হলো কি ! বেশ অবাক হয়েই প্রশ্নটা করে ফেলেছিলো নীড় যে হঠাৎ বইয়ের প্রতি এতো ইন্টারেস্ট কবে থেকে শুরু হলো রৌনকের | সেই দিন রৌনক হেসে কাটিয়ে দিয়েছিলো প্রশ্নটা | মুখে আর কিছু বলেনি | তবে মনে মনে উত্তর দিয়েছিলো যে , “সত্যি অনেক দেরী হয়ে গেছে সবটা বুঝতে | কিন্তু এরপর আর কখনো এই ভুলটা হবে না | আর ইন্টারেস্ট হারাবে না রৌনক | এখন যদি একবার নীড় গিফ্ট করে বই , সারা জীবন যত্ন করে রেখে দেবে ওর কাছে | কিছুতেই আর হাতছাড়া করবে না | ”
(৮)
অবশেষে দু মাস বাদে রৌনক মনে মনে ডিসাইড করেই নিলো যে ও নীড়কে ভালোবাসে | আর একটা সরিই হয়ত দরকার সবটা আগের মতন ঠিকঠাক করার জন্য ! তাই ও সরি বলবে | সেই রকমটা ভেবেই নীড়দের ফ্ল্যাট এ গিয়েছিলো সেইদিন | এখানে আসার পথেও অনেক কিছু মনে পরছে আজ | ওদের স্কুল লাইফ, কলেজ এ পড়ার সময় কফি শপে গল্প করা, দূর্গা পুজোয় একসাথে ঠাকুর দেখতে যাওয়া , কত কি ! যেই গুলো ওদের ব্রেক আপ এর পরে ওর কখনো আর মনেই পরেনি, সেই ছ টা বছর আজ ওর চোখের সামনে যেন কেমন ভেসে উঠছে, বার বার | এই স্মৃতি গুলোর কথা ভেবেই নীড়ের ঘরের দরজাটা খুলল ও | কিন্তু হঠাৎ একটু অবাক হয়ে গেল ! খাটের ওপর একটা ছেলে বসে, চশমা পরা , ফর্সা | বেশ ভালো দেখতে | কিছু ছবির এলবাম দেখছে | এই ছেলেটা আবার কে ! একে তো আগে কখনো দেখেনি ! নীড়ের কোনো বন্ধু ? প্রশ্নগুলো এক মুহূর্তে মনের মধ্যে এসে ভিড় করলো , আর তখনই পাশ থেকে নীড় এসে বলল, “আরে রৌনক তুমি ! এসো এসো বসো |” আর তখনি চশমা পরা ছেলেটা এলবাম থেকে চোখ তুলে ওকে দেখল , —-“আর এ, এ ই কি সেই রৌনক ! ঠিক ধরেছি তো ?”
নীড় প্রশ্নটা শুনে হেসেই উত্তর দিল, ” হ্যাঁ , একদম ঠিক ধরেছ | এ ই সেই রৌনক |”
এবার রৌনক আর নিজের মনের প্রশ্নটা চেপে রাখতে পারল না, তাই ছেলেটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,—–
“কিন্তু আমি আপনাকে চিনি না ! আপনি ?”
প্রশ্নটা করে রৌনক নীড়ের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলো যে নীড়ের চোখে এখন একটু লজ্জা , আর মুখে আলতো হাসি | তারপর দু সেকেন্ড সময় নিয়ে নীড়ই ছেলেটার হয়ে উত্তর দিলো , ——- “ওর ব্যাঙ্গালোর থেকে আসার অপেক্ষায় ছিলাম এত দিন | ভেবেছিলাম সামনাসামনি আলাপ করিয়ে দেব | ও সৌগত | নেক্সট মন্থ এ ওর আর আমার এনগেজমেন্ট |”
হঠাত যেন কথাটা কানে খুব লাগলো রৌনকের | এনগেজমেন্ট ! নীড়ের এই ছেলেটার সাথে ! ও মজা করছে না তো ! নীড় তো স্কুলে পড়ার সময় থেকে ওকেই ভালোবাসতো | তাহলে কি করে ! একটা অদ্ভুত রাগ হচ্ছিল ওর | ভীষণ খারাপ লাগছিল | মনে হচ্ছিলো সবটা যেন কেমন শেষ হয়ে যাচ্ছে | এই অয়োময় অধিকারবোধটা যেন আরও বেড়ে গেল রৌনকের | তাই নীড়ের হাতটা সৌগতর সামনেই শক্ত করে ধরে ওকে ফ্ল্যাট থেকে বাইরে এপার্টমেন্টের গার্ডেনে নিয়ে এলো | কিন্তু এর মধ্যে নীড়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে | তাই বেশ রেগেই জিজ্ঞেস করলো ,
— “কি হয়েছে রৌনক ? এই ভাবে বিহেভ করছ কেন ? সৌগত কি ভাববে !”
না, আর রাগ চেপে রাখা সম্ভব না রৌনকেরও | তাই ও বেশ জোড় দিয়েই বললো , “ভাববে আবার কি ! ভাবার আছে টা কি ? আমি আমার গার্লফ্রেন্ড এর হাত ধরে বাইরে নিয়ে এসেছি , ব্যাস |.”
নীড় কথাটা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লো , “কি ? গার্লফ্রেন্ড ! তোমার ! তুমি জানো কি বলছ ?”
রৌনক এবার আরোও জোড় দিয়ে উত্তর দিলো , ” হ্যাঁ , জানি কি বলছি | আর এটাই ঠিক | মানছি আমি ভুল করেছি |কিন্তু আজ সব ঠিক করব |তিন বছর কেটে গেছে তো কি হয়েছে ? আমাদের সেই স্কুল থেকে রিলেশন ! আর তুই ও আমার জন্য ফিল করিস | আমি সেটা জানি | নইলে আমার জন্য এত দিন ধরে এত কিছু করলি কেন ?”
না , এইসব শুনে নীড়ের পক্ষে আর চুপ থাকা সম্ভব না | তাই বেশ দৃঢ় গলায় বললো , —– “যা করেছি সেটা আমি তোমাকে বন্ধু ভাবি বলে করেছি | আর কিছু না | ”
রৌনকের এটা শুনে এক ধাক্কায় পারদ চড়ে গেছে , তাই একটু চেঁচিয়েই বললো , “বন্ধু ! রিয়ালি ! আমরা কখনো বন্ধু ছিলামই না | এটা তুই ও জানিস |” নীড়ের এবার এক কথায় উত্তর , ——- “কেন ? যেদিন ব্রেক আপ করেছিলে সেদিন তো এটাই বলেছিলে যে আমাদের মধ্যে না কি বিশেষ কিছুই ছিল না ৬ বছরের বন্ধুত্ব ছাড়া ! ”
রৌনক এবার একটু নরম গলায় বললো , “ভুল বলেছিলাম | হয়েছে | তুই কি ওই একটা কথা ধরেই বসে থাকবি ?”
নীড় এবার ভীষণ দৃঢ় গলায় উত্তর দিলো , —- “আমি বসে নেই রৌনক | আই হ্যাভ মুভড অন উইথ সৌগত , এন্ড আই লাভ হিম …”
ব্যাস | এই একটা লাইন এ ই যেন রৌনকের সব জোড় শেষ হয়ে গেল হঠাৎ ! আর কিছুই বলার নেই এখন ওর | ভেতরটা যেন হঠাৎ কেউ টুকরো টুকরো করে দিলো রৌনকের | কিন্তু এসবের পর নীড় আর চুপ থাকলো না | কিছু কথা ভেবে আবার বলতে শুরু করলো , ——–
” হ্যাঁ , এটা ঠিক যে একটা সময় ছিল যখন আমি তোমার জন্য ফিল করেছিলাম | তারপর তুমি যখন ৬ বছর বাদে চলে গেলে, খুব কেঁদেছিলাম | কিন্তু সৌগত আসার পর বুঝলাম যে রিলেশনশিপ কাকে বলে ! সৌগত আমার সাথে উত্তমকুমারের সিনেমা দেখে বসে বসে, আমার দেয়া গল্পের বই ও কখনো হারিয়ে ফেলে না | ওর অফিস এর হাজারটা কাজ , হাজারটা মিটিং এর মধ্যেও আমাকে ফোন করতে কখনো ভুলে যায় না ! আমার সব ভালো লাগা , খারাপ লাগাগুলো এখন আর শুধু আমার একার নেই , সৌগত সেগুলোকে নিজেরে করে নিয়েছে | একচুয়ালি ও আসার পর আমি বুঝেছি যে আমার আর তোমার মধ্যে যেটা ছিল সেটা কখনো রিলেশন বলা যায় না কারণ সেখানে শুধু আমি ছিলাম | তুমি কোনোদিনও চাইলেই না | আসলে আমি তো তোমার কাছে থ্যাংকফুল | তুমি যদি আমাকে ঐভাবে ধাক্কা না দিতে তাহলে আমি বুঝতেই পারতাম না যে নিজের কাছে ইম্পর্টেন্ট হওয়া কাকে বলে ! এটা বুঝতাম না যে নিজেকে খুশি রাখার দায়িত্বটা শুধু নিজেরই , অন্য কারোর না | আর সব থেকে বড় কথা, তুমি যদি আমাকে না ছাড়তে তাহলে আমি আমার লাইফ এ সৌগতকে পেতাম না | আর কোথাও না কোথাও এই সবের জন্যই আমি এতদিন তোমাকে হেল্প করেছি | আমি সত্যিই মন থেকে চাই যে তুমি ভালো থাক |কিন্তু এই সবের মধ্যে তুমি যে আমার জন্য ফিল করতে শুরু করবে সেটা ভাবিনি |”
নীড়ের কথাগুলো শুনে রৌনক আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না | ওর যেন শরীরের শক্তিটা হঠাৎ কমে এসেছে | তাই টোলে বসে পড়ল পাশের বেঞ্চটা তে | কিছু আর এখন ভাবতে পারছে না | হঠাৎ করে সব হিসেবগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওর | একটা কে ও আর মেলাতে পারছে না |নীড় দেখে বুঝতে পারছিলো ওর অবস্থাটা , তাই রৌনকের পাশে এসে বসলো | তারপর কিছু কথা ভেবে বললো , —–
“আমি জানি তোমার খুব খারাপ লাগছে | কিন্তু আমি সত্যিই তোমাকে খারাপ লাগাতে চাইনি | আর একটা কথা , কারোর জন্য কিছু থেমে থাকে না রৌনক | আমার লাইফ এ ও থাকেনি , আর তোমার লাইফ এ ও থাকবে না | যেইভাবে নাতাশাকে ভুলেছ ,সেই ভাবে আমাকেও ভুলে যাবে একদিন |আর ফর্মুলা গুলো তো তোমাকে শিখিয়ে দিয়েছি | সব ঠিক হয়ে যাবে | ট্রাস্ট মি | আর আমি তো আছিই , যদি কখনো বন্ধু হিসেবে আমাকে দরকার হয়, আমি সব সময় তোমার সঙ্গে থাকবো | এনিওয়ে এখন আসি | সৌগত ওপরে ওয়েট করছে আমার জন্য |.”
কথা গুলো বলে নীড় আর দাঁড়ালো না রৌনকের কাছে | আস্তে আস্তে রৌনকের চোখের সামনেই অনেক দুরে চলে গেল ! ওকে একেবারে নিঃস্ব করে | আসলে বন্ধুত্ব তো আজ আর রৌনক চায় না নীড়ের কাছ থেকে ! এখন আরও বেশি কিছু চায় | কিন্তু একদিন যাকে না ভেবে কাঁদিয়েছিল, ছেড়ে দিয়েছিল, কোনো দিন যে তাকে আবার নিজের করে পেতে ইচ্ছে করবে এতো ! রৌনক সেটা কখনো ভাবেনি | তাই ওর চারিদিকটা হঠাৎ আবছা হয়ে এলো ! আবার চোখে জল জমেছে | এই সময়ে আকাশেও কালো মেঘ এসে ভিড় করেছে | বৃষ্টির জল এসে ভিজিয়ে দিচ্ছি চারিদিক | কিন্তু রৌনক এখনো ওই বেঞ্চটাতে বসে আছে | ভিজছে সেই আগের দিনটার মতন | কিন্তু আজ আর ছাতাটা ধরার মতন কেউ নেই ওর কাছে |
( সমাপ্ত )
