#ফর্মুলা_শেষ_থেকে_শুরুর ( দ্বিতীয় পর্ব )
#ঈপ্সিতা_মিত্র
(৩)
”থ্যাংকস … তুই কালকে সবটা শুনলি | এতদিনের জমা কথা কাল শেয়ার করে অনেক দিন বাদে রাতে খুব ভালো একটা ঘুম হয়েছে |”… কফি শপের কোণার টেবিলটাতে বসে নীড়কে এই থ্যাংকসটা না দিয়ে পারলো না রৌনক | আজকে রবিবার | তিন মাস বাদে ও উইক এন্ডস এ নিজের ঘর থেকে বেড়িয়েছে | ওদের পাড়ার এই কফি শপটাতে এসেছে দুজনে | নীড় ভাগ্গিস জোড় করেছিল আজ | নইলে এই রোববারটাও ওই বদ্ধ ঘরটায়ই কেটে যেত ! আজ এখানে এসে রৌনকের হঠাৎ খুব পুরোনো কথা মনে পড়ছে আনমনে | এই কফি শপের প্রত্যেকটা টেবিল এ বসে নীড় আর ও কত আড্ডা দিত একটা সময়ে | প্রায় তিন বছর হয়ে গেল, এখানে আর আসাই হয় না ! আজকে এত দিন বাদে সেই চেনা জায়গায় ফিরে এসে ওই পুরনো কোল্ড কফিটা খেতে বেশ ভালোই লাগছিল রৌনকের | আর কি অদ্ভুত ! তিন বছরে কিন্তু এই কফিটারও টেস্টটা পাল্টায়নি | রৌনকের এইসব ভাবনার ভিড়েই নীড় বলে উঠলো , ———- ” থ্যাংকস বলার কিছু নেই ! আর আমি জানি খারাপ লাগে | কষ্টও হয় | কিন্তু এর মানে এই না যে সব শেষ | নাতাশা তোমার লাইফে আসার আগেও তো তুমি বাঁচতে, হাসতে | তাহলে এখন কেন না ?”
কথাটা শুনে রৌনকের একটা দীর্ঘ্যশ্বাস আপনাআপনি চলে এলো , —- ” আসলে তুই জানিস না , অফিস এ সবাই এত কথা বলে | আর ওকে এই তিন মাসে একবারও ফেস করতে পারিনি আমি | এত লজ্জা লাগে আমার ! রাগ হয় নিজের ওপর | ”
এটা শুনে নীড় দু মিনিট চুপ থেকে একটু ভেবে বললো, “ওকে , বুঝলাম | তবে আর এইভাবে থাকবে না | তুমি কাল করবে নাতাশাকে ফেস | বুঝলে|” কথাটা হঠাৎ যেন রৌনকের কানে লাগলো খুব , —— “মানে ? তুই কি পাগল হয়েছিস ? ইম্পসিবেল.. ওকে দেখেই আমি পাঁচ মাইল দুরে চলে যাই |” নীড় এবার শান্ত গলায়ই উত্তর দিলো , ” হ্যাঁ, জানি | বুঝেছি তোমার অবস্থাটা | কিন্তু কাল থেকে আর এটা করা যাবে না | নাতাশাকে তোমাকে ফেস করতেই হবে , নইলে কখনো এক ইঞ্চি ও লাইফে এগোতে পারবে না |”
রৌনক এসব শুনে আর মাথা ঠান্ডা রাখতে পারলো না | একটু গলার ভলিউমটা বাড়িয়েই বললো , “ইম্পসিবেল.. আমি পারব না, একা একা !”
নীড় এবার বেশ দৃঢ় গলায় উত্তর দিলো , “একা একা কে বলল ! আমি তো থাকব |”
সেইদিন বুঝতে পারেনি রৌনক কথাটার মানে | নীড় কি করে থাকবে ওর সাথে অফিস এ ! তবে বেশি অপেক্ষা করতে হলো না , পরের দিনই বুঝে গেলো সবটা | ওয়াকি টকি | সত্যি সাইন্স অনবদ্য | এটা যদি আবিস্কার না হত ! তাহলে যে কি হত ! এইসব ভাবতে ভাবতেই রৌনক অফিসের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো | কিন্তু হঠাৎ পা টা থমকে গেলো | দূর থেকে নাতাশা আসছে | অন্য দিন হলে রৌনক রাস্তা বদলেই নিত নিজের | কিন্তু আজ আর না | এখন নীড়ের কথাটা মাথায় এলো হঠাৎ | স্পিড ডায়েল এ নীড়ের নাম্বারটা সেভ করাই ছিল , সঙ্গে সঙ্গে ফোন , আর ওপার থেকে সেই চেনা গলার আওয়াজটা শুনতেই রৌনক বলে উঠলো , ” নীড় , আসছে সামনে থেকে | কি করব এখন ! নার্ভাস লাগছে খুব |”
নীড় এটা শুনে বেশ দৃঢ় গলায় বললো , “বি স্টেডি .. নার্ভাস লাগার মতন কিছুই হয়নি | একটা ব্রেক আপই হয়েছে | সামনে এগিয়ে যাও | মুখটা তুলে |নীচু করে না | আর সামনাসামনি নাতাশা এলেই মুখটা ঘুরিয়ে নেবে , একদম নাইন্টি ডিগ্রী এঙ্গেল এ , বুঝলে | ”
এসব শুনে একটা জোড়ে নিঃশ্বাস নিয়ে রৌনক এগিয়ে গেল সামনে | আর তারপর নীড় যেটা বলেছিলো সেটাই করলো | যেই দেখলো নাতাশা ওর সামনাসামনি একদম চলে এসেছে তখনই ইন্সট্রাকশন অনুযায়ী মুখটা ঘুরিয়ে দিলো | না , তবে নাইন্টি ডিগ্রী হয়নি ! কিন্তু সিক্সটি ডিগ্রী ছিল | তারপর নিজের কেবিন এ গিয়ে সে কি আনন্দ ! এত দিন বাদে নাতাশাকে ফেস করা, তারপর মুখ ঘোরানো , এতটা একদিনে ভাবতে পারেনি ! তাই সেইদিন খুব মন থেকেই বলেছিলো , — ” থ্যাংক ইউ নীড় ..থ্যান্কস আ লট… এত ভালো লাগছে এখন , তোকে বলে বোঝাতে পারব না | ”
কথাটা শুনে নীড় শান্ত গলায় বললো , —- “জানি , ভালো তো লাগবেই | আর আজকে যেটা করলে সেটা যখনই দেখা হবে রিপিট করবে | ব্যাস, হয়ে গেল ! আর একটা কথা মনে রাখবে , কাউকে ভালোবাসার মধ্যে কোনো লজ্জা নেই রৌনক | লজ্জা তাদেরই যারা এটাকে রাখতে পারে না | এনিওয়ে হ্যাভ আ গুড ডে. বাই..”
নীড়ের এই শেষ কথাটা হঠাৎ যেন রৌনকের ভেতর থেকে লাগলো | সত্যিই তো , লজ্জা তাদেরই যারা ভালোবাসাটা ধরে রাখতে পারে না ! যেমন একটা সময় রৌনক এই ভুলটা করেছিল ! তখন হয়তো নীড়েরও ভেতরটা শেষ হয়ে গিয়েছিলো , যখন ছ বছরের রিলেশনশিপ এক সেকেন্ডে ভেঙে দিয়েছিলো রৌনক ! কিন্তু নীড় কি আজও এই সব কথা মনে রেখে দিয়েছে ! প্রশ্নটা এসেই মিলিয়ে গেলো | না, মনে রাখলে রৌনকের এতটা হেল্প তো করত না ! আর আজ সত্যিই নীড়ের বন্ধুত্বটা ওর খুব দরকার |
(৪)
এসবের পর সেই দিন অফিস থেকে রৌনক সোজা নীড়দের ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির | আজকাল নীড়ের সাথে কথা বলে এত ভালো লাগে ! ছোটবেলার বন্ধুত্ব মনে হয় একেই বলে | এই সবই ভাবছিল , তখনই নীড় হঠাৎ ওর ফোনটা চেয়ে বসলো , —– “তোমার ফোনটা দাও , দরকার আছে |”
যাহ বাবা ! ওর ফোন নিয়ে নীড় কি করবে এখন ! ভাবতে ভাবতেই নীড়ের হাতে নিজের ফোনটা ধরিয়ে দিলো | আর তখনই দেখলো ফোনটা নিয়ে নীড় সোজা ‘মাই এলবামস ‘ এ গেল , তারপর একের পর এক স্যাড সংগস ডিলিট করতে শুরু করলো | রৌনক তো অবাক ! ওর মুখের এক্সপ্রেশনটা দেখে নীড় আর সাসপেন্স না বাড়িয়ে বলে উঠলো ,——- ” আসলে তোমার জন্য এখন কিছু কিছু গান একদম ঠিক না | সেটাই ডিলিট করছি |”
রৌনক তো যেন এবার আকাশ থেকে পড়লো , ——— ” গান ঠিক না ! কি বলছিস টা কি ?”
নীড় এবার আলতো হেসে উত্তর দিলো ,—- ” স্যাড সংগস , মানে দুঃখের গান এখন তোমার স্বাস্থের পক্ষ্যে খুবই ক্ষতিকর | আসলে ব্রেক আপ এর পর ‘বিন তেরে’, ‘তেরে বিন’, ‘কবীরা’, ‘তুম বিন’ এই সব গানই শুনতে ইচ্ছে করে সবার | আর গান শুনতে শুনতে সেই পুরনো দিনে হারিয়ে যাওয়া , আর মন খারাপ | তাই এই সব গান এখন তোমার ফোন এ থাকার একদম দরকার নেই | এইসব ডিলিট করে দিচ্ছি |”
রৌনকের মুখটা এবার হাঁ ! সত্যিই তো , তিন মাস ধরে ও শুধু স্যাড সংগস- ই শুনছিলো রোজ .! তাই ও চোখ দুটো বড়ো বড়ো করেই জিজ্ঞেস করলো নীড়কে , —— “তুই কি ডাক্তার ? নিজেকে কেমন যেন পেশেন্ট বলে ফিল হচ্ছে |”
এটা শুনে নীড় আর নিজের হাসিটাকে কন্ট্রোল করতে পারলো না , —– “সেই, তুমি তো পেশেন্টই ! যাই হোক , গুগুল থেকে তোমাকে কিছু ওষুধ দিলাম ডাউনলোড করে | ‘মজা হি মজা’, ‘বাত্তামিস দিল ‘, ‘অল ইস অয়েল’ এই সব গানই এখন সকাল সন্ধ্যে শুনবে | এতে মুড ভালো থাকবে , বুঝলে |” রৌনক এসবের পর খুব বাদ্ধ ছেলের মতন সিরিয়াস মুখটা করে ঘাড় নেড়ে বলল, “ওকে, এগুলোই শুনবো | ”
এর মধ্যে নীড়ের মা সেদিন পায়েস নিয়ে হাজির | নলেন গুড়ের পায়েস , একটা সময় রৌনকের খুব পছন্দের ছিল | কিন্তু এখন তো করোলার রস খেতে খেতে ওই মিষ্টি পায়েসের স্বাদটাই ভুলতে বসেছে | আজ হঠাৎ পায়েসটা দেখে সেই পুরোনো কথা মনে পরে গেলো , নীড়কে তাই আনমনে বলে উঠলো
——“জানিস তুই , কত করোলার জুসই না খেয়েছিলাম নাতাশার জন্য | আসলে ওনার ব্র্যাড পিট্ এর মতন বয়ফ্রেন্ড চাই | এই জন্য বডি তৈরী করতে গিয়ে শেষে আমার ব্যাক প্রবলেমই শুরু হয়ে গেলো | সিরিয়াসলি , এখন যদি ওই ব্র্যাড পিট্ কে সামনে পাই না আমি ! খুনই করে দেব সিওর | ”
নীড় এবার জোড়ে হেসে ফেলল | না , এসব শুনে আর সিরিয়াস মুখ করে থাকা সম্ভব না আর | এটা দেখে রৌনক অন্ধকার মুখে বললো , —
“হাসিস না, হাসিস না | আমার স্বাধের ইমরান হাশমি কে ছেড়ে ওই ব্র্যাড পিট্ এর কত ফিল্মসই আমাকে হজম করতে হয়েছে! জাস্ট বিকস অফ হার..” নীড় এবার বেশ বৈজ্ঞানিকের মতন মুখটা করে বলল, “হুম , বুঝলাম |”
তবে সেইদিন রৌনক বাড়ি ফেরার সময় হঠাৎ নীড় ওর হাতে নলেন গুড়ের পায়েস ভর্তি একটা টিফিন কৌটো , আর সমস্ত ইমরান হাশমির সিনেমার ডিভিডি ধরিয়ে দিলো | রৌনক তো অবাক ! এক গাল হেসে বললো , ” ইমরান হাশমি আর নলেন গুড়ের পায়েস একসাথে ! কিন্তু তোর্ কাছে ওর এত ফিল্মস এর কালেকশন কোথা থেকে এলো ?”
নীড় এবার আলতো হেসে উত্তর দিলো , ——- “তোমার সাথে এক সময় প্রেম করার ফল | এবার নিজের সম্পত্তি নিজে সামলাও | মনের আনন্দে বাড়িতে গিয়ে ইমরান হাশমির কিসিং সিনস দ্যাখো নলেন গুড়ের পায়েস খেতে খেতে | ডায়েট টা আবার কিছু দিন বাদেই নয় স্টার্ট করবে ! আর একটা কথা , যদি কারোর জন্য নিজের পছন্দ অপছন্দ সবটা বদলাতে হয়, তাহলে সেটাকে ভালোবাসা বলে না | কম্প্রোমাইস করা বলে | ভালোবাসা আর কম্প্রোমাইস এর মধ্যে অনেক তফাৎ আছে |.”
সেদিন নীড়ের কথাগুলো শুনে রৌনক কিছুক্ষন থমকে দাঁড়িয়ে ছিল | সত্যিই তো , এত দিন ধরে রৌনক তো শুধু কম্প্রোমাইস ই করছিল | রোজ | প্রত্যেকটা মুহুর্তে ! নীড় কত সহজে বুঝে গেল এই কথাটা | কিন্তু নাতাশা এক বছরেও বোঝেনি এইসব কিছুই | আজ ইমরান হাশমির ডিভিডি গুলো হাতে পেয়ে একটা হাসি আপনাআপনিই চলে এলো তাই রৌনকের মুখে | আর অদ্ভুত একটা ভালো লাগা ঘিরে ধরলো মনটাকে , নীড়ের কথা ভেবে | এই রকম ভালো লাগা এর আগে কখনো লাগেনি ওর নীড়ের জন্য | যখন ওদের রিলেশন ছিল , তখনও না | এটা যেন নতুন কিছু একটা |
চলবে।
