#ফর্মুলা_শেষ_থেকে_শুরুর ( প্রথম পর্ব )
#ঈপ্সিতা_মিত্র
<১>
রৌনক এর মাঝে মাঝে মনে হয় ওর জীবনে যেন সবটা শেষ হয়ে গেল | আর কিছুই বাকি নেই ! আর কোনো কারণ নেই হাসার, আনন্দ করার | সারাক্ষন যেন একটা ফাঁকা ফাঁকা ভাব ঘিরে ধরে থাকে ওকে | মনে হয় কিছু একটা নেই ! আজকাল বার বার ফোনটার দিকে চোখ চলে যায় আনমনে | একটা ম্যাসেজ কি এলো ? একবার কি ফোনটা বেজে উঠলো সেই নাম্বার থেকে? কিন্তু না , বার বারই মনটা ভেঙ্গে যায় | আসলে ওদের সব কথা তো শেষ এখন | হয়ত আর কিছুই বাকি নেই লেখার ! কিছুই আর বলার নেই |তিন মাস ধরে এই শূণ্যতাকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচছে রৌনক | হ্যাঁ, তিন মাস, নব্বইটা দিন |
নাতাশার সাথে যখন প্রথম দেখা হয়েছিল ওর অফিস পার্টিতে, এক সেকেন্ড এর জন্য ও চোখ ফেরাতে পারেনি সেদিন | ওর কথা বলা, ড্রেসিং সেন্স , হেয়ার স্টাইল , পার্সোনালিটি সবটাই রৌনককে মুগ্ধ করে দিয়েছিলো |ঠিক এই রকমই একটা মেয়ে তো চাইতো নিজের লাইফ এ | যদিও সেইদিন শুধু হাই হ্যালো ই হয়েছিল ওদের | কিন্তু দিন যত এগোতে থাকলো আস্তে আস্তে কথাও বাড়তে থাকলো দুজনের | প্রথমে অফিস এ দেখা হলে শুধু কাজের কথাই হত ! তারপর, কিছুদিনের মধ্যে অকাজের কথাগুলোও শুরু হয়ে গেল |রৌনক তো যেন সব দিক থেকে নাতাশাকে ইমপ্রেস করতে চাইতো রোজ | যেমন পারপেল কলর নাতাশার খুব পছন্দের, তাই ওই রঙের শার্ট , টি-শার্ট এ আলমারি ভরিয়ে দিয়েছিলো নিজের | তারপর যখন জানলো নাতাশার ফেভারিট হিরো ব্র্যাড পিট্ , ব্যাস, আর কি ! সেইদিনই ফেসবুকে ব্র্যাড পিট্ এর সব পেজ লাইক করে দিয়েছিলো | শুধু কি তাই , ইমরান হাশমির সিনেমা ছেড়ে রাত দিন শুধু ব্র্যাড পিট্ এর ই সিনেমা দেখত বসে বসে | এই করে চোখের পাওয়ার বেড়ে মাইনাস 3 .3 থেকে মাইনাস 4 .4 হয়ে গিয়েছিল | তারপর , নাতাশার যেহেতু হেলদি ফিট বডি পছন্দ, একদম ব্র্যাড পিট্ এর মতন, তাই রোজ অফিস শেষে রৌনক জিম এ যেত | উইক এন্ডস এ যেই ছেলে দুপুর ১২ টার আগে ঘুম থেকে উঠত না , সেই ছেলে সকাল ৮ টার মধ্যে জিম এ পৌঁছে তিন ঘন্টা ধরে ওয়ার্ক আউট করত ! কত করোলার জুস খেয়েছে শুধুমাত্র নাতাশাকে ইমপ্রেস করবে বলে | এমন কি হেভি ওয়েট তুলে তুলে শেষে ওর ব্যাক প্রবলেম শুরু হয়ে গিয়েছিল ! কিন্তু কোমরে ব্যাথা নিয়েও কুছ পরোয়া নেহি ! নাতাশা ওর প্রেমে পড়লেই হলো | তাহলেই জীবন স্বার্থক | আর এত কিছু কষ্ট সহ্য করার ফলও পেয়েছিল রৌনক , অফিসে যেই মেয়েটা সবার ড্রিম গার্ল ছিল , একদিন সে ই রৌনকের গার্লফ্রেন্ড হয়েছিল | অফিসের সবাই তারপর রৌনককে দেখত, আর জ্বলত | আর এসব দেখে ওর গর্বে বুকটা দু ইঞ্চি বেড়ে যেত |
এক বছর ধরে রিলেশন ছিল ওদের , ঠিকঠাকই চলছিল সব | আর তার সাথে রৌনক এর ব্যাক প্রবলেম , চোখে ব্যথা , ব্র্যাড পিট্ হওয়ার চেষ্টা সবই এগোচ্ছিল , নিজের তালে, নিজের ছন্দে ! কিন্তু হঠাৎই একদিন ছন্দপতন | বিনা নোটিশে ব্রেক আপ | নাতাশা নিজে দেখা করে মুখের ওপর সব কিছু শেষ করে দিল রৌনকের সাথে | “ইউ আর নট মাই টাইপ..”, ব্যাস , এই একটা লাইনেরই যুক্তি দিয়েছিলো ও ব্রেক আপ এর সময় | রৌনকের এই কথাটা শুনে চোখ কপালে উঠে গিয়েছিলো একেবারে | রিয়ালি ! ‘নট হার টাইপ’ মানেটা কি ? এত দিন ধরে কি তাহলে ঘাস কাটছিল রৌনক ! তাই সেইদিন জিজ্ঞেস করেই ফেলেছিলো , যে আর কি কি করতে হবে নাতাশার টাইপের হওয়ার জন্য ! উত্তরটাও কি কনভিন্সিং ছিল সেদিন নাতাশার | দু সেকেন্ডও সময় না নিয়ে বলেছিলো , “আর কিছু করার দরকার নেই | আই ফাউন্ড সমওয়ান .. আর তোমার সাথে আমার কখনো সেই কনেক্সনটাই তো ফিল হয়নি ! সো বাই, টেক কেয়ার …” ব্যাস, এই বলেই সব শেষ | এক বছরের রিলেশন এক মিনিটে শেষ | এত সহজে ! আর এরপর অফিসেও তো এই নিয়ে কম কথা হয়নি ! রৌনককে দেখে কেউ স্বান্তনা দিত, কেউ নাতাশার নিন্দা করত, আবার কেউ কেউ এসে মুখের ওপরই বলে দিত, “প্রেম টেম নিজের স্ট্যান্ডার্ড দেখেই করা উচিত | তুই কি ই বা ছিলিস বল নাতাশার সামনে ! ব্রেক আপ তোদের আজ না হলেও কাল হয়েই যেত | ”
(২)
এসবের পর এখন অফিসটাও জোড় করেই যায় রৌনক | নাতাশাকে দূর থেকে দেখলেও রাস্তা বদলে নেয় নিজের | আসলে ওর সামনাসামনি যেতে যেন কেমন লজ্জা করে এখন ! পার্টি , ডিস্ক কোনো বন্ধুদের আড্ডা কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না আর ওর | গেলেই তো ওই একই স্বান্তনা, অথবা ওই রকম গা জ্বালানো কথাবার্তা | তাই শনি রবিবার গুলো আজকাল বাড়িতে একা একা নিজের ঘরে বসেই কেটে যায় ! দিনগুলো যেন চালানোর জন্য চলে | মন থেকে আর কিছুই আসে না | এসবের মধ্যে আজকের দিনটাও সকাল থেকে কেমন অন্ধকার | কালো মেঘের ভিড় চারিদিকে | সারাক্ষন বৃষ্টি পড়ছে | কিন্তু এই বৃষ্টির মধ্যেও অফিস থেকে ফিরে রৌনক এর নিজের ফ্ল্যাট এ যেতে ইচ্ছে করছে না আজ | ওই বদ্ধ ঘরটা ! তার থেকে মনে হচ্ছে বৃষ্টিই ভালো | একটু নয় ভিজলোই এই জলে ! তাই নিজের এপার্টমেন্ট এর সামনের গার্ডেন এ , বেঞ্চটাতে বসেছিল | ভিজছিল নিজের মনে | কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টির জলটা ওর মাথার ওপর পরা বন্ধ হয়ে গেল | চোখ তুলে দেখলো একটা ছাতা ধরে নীড় দাঁড়িয়ে আছে ওর পাশে | কিন্তু নীড় এখানে এখন কি করছে ! রৌনক একটু অবাক হয়েই বলল, “তুই?”
এটা শুনে নীড় বেশ দৃঢ় গলায়ই বললো , “প্রশ্নটা তো আমার করা উচিত | রাত ন-টার সময় অফিস থেকে ফিরে বাড়ি না গিয়ে তুমি এখানে কি করছ ? তা ও বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে !”
রৌনকের এবার এক কথায় উত্তর , “বসে আছি | ”
নীড় এটা শুনে একটু অধৈর্য হয়েই বললো , “সেটা তো আমিও দেখতে পাচ্ছি যে দাঁড়িয়ে নেই | কিন্তু হঠাৎ এই সিচুয়েশনে এই ভাবে বসে থাকার কারণ ?”
নীড়ের এই প্রশ্নের কি আর জবাব দেবে রৌনক ! কিছু বলে গিয়েও ওর কথা আটকে গেল এখন | আর বলবেই বা কাকে ! ওর এক্স কে ? যার সাথে ক্লাস ইলেভেন থেকে কলেজ এর ফাইনাল ইয়ার অব্দি প্রেম করেছিল | তারপর নিজে ওই নাতাশার ডায়লগটা দিয়েই ছেড়েছিল , “ইউ আর নট মাই টাইপ ..”.. সত্যিই কি এরপর আর কিছু বলার আছে এখন ! আর যদি এসব ভুলে বলেও দেয় নাতাশার সাথে ব্রেক আপ এর কথা ,তাহলে হবে কি ! নীড় তো মনে মনে আনন্দে নাচবে | সবার মতন কথা শোনাবে | আর ভাববে যে যা হয়েছে ওর সাথে , একদম ঠিক হয়েছে | রৌনকের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এইসব ভাবনাগুলো মাথায় এসে ভিড় করলো , আর তখনই নীড় বলে উঠলো , “শোনাব না কথা ! আর এটাও ভাবব না যে যা হয়েছে ঠিক হয়েছে ! ডোন্ট ওরি , ইউ ক্যান শেয়ার ..”
রৌনক কথাগুলো শুনে আরো একবার অবাক হয়ে গেল, “তুই কি করে বুঝলি আমি কি ভাবছি ?”
নীড় এবার একটু মুচকি হাসলো | তারপর ওর পাশে বসে বলল, “স্কুল লাইফ থেকে চিনি, তারপর ৬ বছরের ব্যর্থ প্রেম | এই টুকু বোঝাটা টাফ না | এবার বলো কি হয়েছে ?”
কি অদ্ভুত, এখনো একটা অধিকারবোধ কাজ করে নীড়ের রৌনক এর ওপর | এতদিন বাদেও | আর সেটা রৌনক কখনো না ও করতে পারে না | তাই আজ আর চুপ থাকলো না ও | হঠাৎ মনে হলো এত দিন বাদে এমন কেউ এসেছে যে সত্যি শুনতে চায়, সত্যি বুঝতে চায় ওর অবস্থা | তাই আজ প্রথম নিজের কথাগুলো বললো | ওই বৃষ্টির মধ্যে ওই ছাতার ভেতরে বসে ওর এক বছরের প্রেম আর তারপর তিন মাসের ডিপ্রেসিভ লাইফ , সবটাই এক নিঃশ্বাসে বলে দিল | আর এসবের পর পাঁচ মিনিট দুজনেই চুপ | তারপর রৌনকই নিঃস্তব্ধতা ভেঙ্গে বলল,
“কি হলো ? কিছু বলবি না ? কিছু স্বান্তনা টান্তনা ?”
এটা শুনে নীড় শান্ত গলায় বললো , ” কিছু তো বলার নেই | শুধু শোনার ছিল | তাই শুনলাম |”
“মানে ?” রৌনক এবার অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করলো |
“মানে তিন মাসের জমানো কথা শুনলাম | এখন নিশ্চই হালকা লাগছে | এবার চলো | কাকু কাকিমা নইলে চিন্তা করবে !.. ”
সেইদিন নীড়ের কথাগুলো শুনে এরপর আর ওই বেঞ্চটাতে বসে থাকেনি রৌনক | ওর সব কথা বলে সত্যিই হালকা লাগছিলো এখন | মনে হচ্ছিলো এই তিন মাস যেই বোঝাটা নিয়ে ঘুরছিল সারাক্ষন , হঠাৎ যেন সেটা আর নেই ! কোথাও একটা ভ্যানিশ হয়ে গেছে | সেই রাত্রে তাই একটা দারুন শান্তির ঘুম হলো ওর | অনেক দিন বাদে |
চলবে।
