পর্ব : ০৫
গল্প: #তুমি_এলে_হঠাৎ_বৃষ্টি_হয়ে…
লেখিকা: #মৈথালী_নিথু (#কল্পকথা)
“নিজেকে একটু ভালোবাসুন মেহুল। আপনি ছাড়া আপনার কেউ নেই তাই জীবনে যতোই দুঃখ আসুক নিজেকে ভালো রাখুন। নিজেকে ভালোবাসতে জানলেই আপনি সুখী হতে পারবেন। ”
নাবিলের কথাটার গভীরতা ছিল অনেক। নাবিল হঠাৎ এসব কথা কেন বললো মেহুল বুঝতে পারছে না। সে কিভাবে জানে মেহুল ভালো নেই!
মেহুল মুখ ফুটে কিছু বলতে যাবে তখনই দরজায় টোকা পড়লো। দরজা ঠেলে সাবিহা জাহান ঘরে এলেন। ওনাকে দেখে মেহুল আর নাবিল বারান্দা থেকে ঘরে আসলো।
” খেতে এসো তোমরা তারপর না হয় গল্প করো। আসো মেহুল ”
” জ্বি আন্টি ”
বলেই মেহুল সাবিহা জাহানের সাথে ডাইনিং রুমে চলে আসলো। নাবিল আসলো একটু পর। এসেই রুমা বেগমের সাথে কুশল বিনিময় করলো।
” আসসালামু আলাইকুম আন্টি৷ আমি নাবিল। ”
“ওয়ালাইকুমুস সালাম ”
” এই যে ভাবি এটাই আমার একমাত্র ছেলে নাবিল ”
” মাশাআল্লাহ আপা রাজপুত্রের মতো ছেলে আপনার।”
সাবিহা রুমা বেগমের কথা শুনে হাসলেন। মেহুলের সামনের চেয়ারে এসে নাবিল বসলো। এতে মেহুল একটু অস্তিত্বতে পরে গেলো। আজকাল নাবিলকে দেখলেই ওর কেন যেন লজ্জা লজ্জা অনুভূতি কাজ করে। নাবিলের চোখের চাহনিতে এতো গভীরতা থাকে যে মেহুলের মনে হয় সে যদি ওই চোখে তাকায় তাহলে চোখের গভীরে হারিয়ে যাবে।
মেহুল নিচের দিকে তাকিয়ে চুপ চাপ খেতে লাগলো।
সাবিহা আর রুমা বেগম এখানেও কথা বলছেন। এতো কথা যে কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে তাদের কে জানে!
” একি মেহুল তুমি তো কিছুই নিচ্ছো না। এভাবেই খাও বুঝি বাসায়?”
” আর বইলেন না আপা। এই মেয়ের খাওয়া নিয়ে আমি আর পারি না। ছোট থেকেই খাবার নিয়ে ঝালিয়েছে আমাকে, খেতেই চায় না। দেখেনটা কম কম খেয়ে শরীরের কি হাল বানিয়েছে। একা থাকে তাই আমিও এখন আগের মতো জোর করে খাওয়াতে পারি না।”
মেহুল এমনিতেই নাবিলের সামনে বসে খেতে লজ্জা পাচ্ছিলো তার উপর আবার তার মা এমন ভাসন দিলো যে মেহুলের এখন লজ্জায় মাটির নিচে চলে যেতে ইচ্ছে করছে। ইস নাবিল কি জানি ভাবছে এখন ওকে নিয়ে।
” হ্যা বুঝেছি ভাবি। এই মেহুল প্লেট এইদিকে দেও আর নাবিল গরুর মাংস টা এই দিকে দে তো বাবা। ”
” তোমার কষ্ট করতে হবে না মা আমিই দিয়ে দিচ্ছি। ”
কথাটা বলে নাবিল মেহুলের প্লেটে তিন চামচ গরুর মাংস দিলো। মেহুল তো এটা দেখে চোখ বড় বড় করে নাবিলের দিকে তাকালো। নাবিল আবার সেটা দেখে বললো-
” কি এভাবে তাকাচ্ছেন কেন?
“আপনি আমাকে এতো দিয়েছেন কেন? আমি এতো খেতে পারবো না। ”
“এতোটুকু খাওয়া কোন ব্যপার না মেহুল। আস্তে আস্তে খেয়ে নিন। আপনি পারবেন আমি জানি। আন্টি কষ্ট করে আপনার প্লেটটা একটু এই দিকে বাড়ান। ”
এবার সে রুমা বেগমের প্লেটেও মাংস বেড়ে দিলো। রুমা বেগম সন্তুষ্ট হলেন নাবিলকে দেখে। তিনি মনে মনে ভাবছেন কি ভালো ছেলেটা। এমন একটা ছেলে যদি তিনি মেহুলের জন্য পেতেন। নাবিল ঠিক ছিল কিন্তু ছেলেটার আগেও বিয়ে হয়েছে এটা ভেবেই তিনি ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেললেন।
খাওয়া শেষে মেহুলরা আরো কিছুক্ষণ সোফায় বসে আড্ডা দিয়ে তারপর বাসায় ফিরে এসেছে। রাফিন আর ঘুম থেকে উঠে নি । কাল সকালে নিশ্চয়ই আবার এটা নিয়ে মন খারাপ করবে ছেলেটা ভাবলো মেহুল।
**–
এভাবেই চলতে চলতে এক মাস কেটে গেলো। মেহুল এখন নিয়মিত ভার্সিটিতে যাচ্ছে। রাফি’র সাথে সেখানে তার মাঝে মাঝে দেখা হলেও সে রাফি কে ইগনোর করে চলাফেরা করেছে। রাফি ও আর ওর সাথে আগবাড়িয়ে কথা বলে নি।
নাবিলের সামনে মেহুল যখনই পরে তখন ওর কেন যেন লজ্জা কাজ করে। রাফিন তো এখন মেহুল ছাড়া কিছুই বুঝে না। সব জায়গায় মেহুলকে লাগে তার। রাফিন চার বছরে পরেছে তাই তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হবে জানুয়ারি মাস থেকে তাই বাসাতেই সে এখন পড়ালেখা করে। মেহুলই এখন ওকে পড়াচ্ছে যার কারণে রাফিনদের বাড়িতে প্রতিদিনই তার যাওয়া লাগে। রাফিনকে পড়ানো শেষে মেহুল সাবিহার সাথে বসে কিছুক্ষণ গল্প করে তারপর বাসায় ফিরে।
সাবিহা জাহান মেহুলকে বলেছিলেন তাদের বাড়িতেই ছাদের চিলেকোঠা ঘরে যেন মেহুল এসে থাকে কিন্তু এতে মেহুল রাজি হয় নি। সম্পর্ক এখন যেমন আছে এতেই ভালো, বেশি ঘাটতে গেলে যেমন পানি ঘোলা হয় তেমন সম্পর্কও হোক তা মেহুল চায় না।
***
“হ্যালো আসসালামু আলাইকুম ভাবি কেমন আছেন? ”
” ওয়ালাইকুমুস সালাম আপা৷ জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন তো?”
” জ্বি ভাবি আছি আলহামদুলিল্লাহ। ”
” বাসার সবাই ভালো তো? ”
” জ্বি জ্বি আপা। ”
সাবিহা আর রুমা বেগম ওই দিনই নাম্বার আদানপ্রদান করেছিলেন।তারপর থেকে প্রায়ই তাদের কথা হয় ফোনে। প্রথম দিন তো তারা ফোনে ঘন্টা পার করে কথা বলেছিলেন। তাদের দেখলে যে কেউ বলবে যেন ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া দুই সখি অনেক বছর পর আবারও মিলিতো হয়েছে। কথার এক পর্যায়ে সাবিহা বললেন –
” ভাবি নাবিলের জন্য তো মেয়ে খুঁজছি জানেনই। ভালো কোন মেয়েই খুঁজে পাচ্ছি না। টেনশনে আমার প্রেসার লো হচ্ছে কয়দিন পর পর। কি যে করি ভাবি। ”
” এতো চিন্তা করছেন কেন আপা। নাবিল এতো ভালো,যোগ্য একটা ছেলে ওর জন্য মেয়ে পেতে এতো ভোগান্তি কেন পোহাতে হচ্ছে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”
” নাবিল সমস্যা না ভাবি সমস্যা রাফিন৷ বাচ্চাটার জন্য কেউই মেয়ে দিতে রাজি হয় না৷ নাবিল তো এমন মেয়েকে বিয়ে করবে না যে রাফিনকে অবহেলা করবে। এই জন্যই মেয়ে মিলাতে পারছি না।”
” চিন্তা করবেন না আপা ইনশাআল্লাহ ওর জন্য ভালো একটা মেয়ে পাবেন৷ আল্লাহ দেরিতে হলেও আপনাদের নিরাশ করবে না আশা করি।”
” তাই যেন হয় আপা।”
***
সকাল সকাল মেহুলের ঘুম ভাঙ্গে তার ভাইয়ের এক্সিডেন্টের খবর শুনে। মেহুলের ভাই মাহির সাইকেল থেকে পড়ে হাত ভেঙে ফেলেছে। প্লাস্টার করা হয়েছে হাতে তাই মেহুল ভাইকে দেখতে সকাল সকাল বাসে চড়ে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
মেহুলের তার বাড়িতে যেতে যেতে দুপুর হয়ে গেলো। অনেকদিন পর মেহুলের তার গ্রামে এসে অনেক শান্তি লাগছে্। মেহুলের বাড়ি এতোটাও অজোপাড়া গাঁয়ে না। তাদের গ্রামে শহরের ছোঁড়া ভালো ভাবেই লেগেছে। রাস্তা ঘাট সব কিছুই পাকা করে করা হয়েছে কয়েকবছর আগে। মেহুলের বাবার বাজারে মুদির দোকান আছে আর তার ছোট ভাই ক্লাস এইটে পড়াশোনা করছে।
মেহুল বাড়িতে এসে দেখলো বাড়িতে একদম সুনশান নিরবতা বিরাজ করছে। সে মা কে ডাকতে লাগলো-
” মা…. মা….. মাহিন! ”
মেহুলের ডাকে মাহিন ঘর থেকে বের হয়ে এলো। মেহুলকে দেখে সে অনেক খুশি হলো।
” আপু তুই তাহলে এসেছিস! ”
” কি রে কেমন আছিস মাহিন? হাতে কি বেশি ব্যথা পেয়েছিস!”
” আরে না রে আপু বেশি পাই নি। মায়ের একটু বেশি বলার স্বাভাব জানিসই তো । ”
” তাই না…! হাত তো ঠিকই ভেঙ্গে বসে আছো আবার মায়ের দোষ! ”
” ছেলেদের এতে কিছুই হয় না আপু৷ তোদের মেয়েদের মতো এতো দূর্বল না আমরা ছেলেরা।
” হয়েছে এসব পাকা পাকা কথা রাখ মা কই বাড়িতে নেই? ”
” মা লিমা আপাদের বাড়ি থেকে তোর জন্য দেশি মুরগী কিনতে গেছে। আয় ভিতরে তুই। ”
মেহুল নিজের ঘরে আসলো। আহ্ কি শান্তি। অনেকগুলো মাস পর আজ সে নিজের ঘরে এসে যেই শান্তি পেলো তা ঢাকার বাসা তে ও পায় না সে।
মেহুল ফ্রেশ হতে হতে ওর মা ও বাড়িতে চলে এসেছে।
“মেহুল মা কই রে! ”
মেহুল ওর মায়ের ডাক শুনে ঘর থেকে বের হলো
” আসসালামু আলাইকুম মা। কেমন আছো! ”
” ওয়ালাইকুমুস সালাম। আমিতো ভালোই আছি তুই কেমন আছিস রে মা? আসার সময় কোনো সমস্যা হয় নি তো রাস্তায় ? ”
” না মা সব ঠিক ছিল তুমি তো আমাকে এখনও বাচ্চাই ভাবো। কতো বার আসা-যাওয়া করেছি তারপরও তোমার শুধু টেনশন। ”
” সন্তান যতোই বড় হোক মা-বাবা রা তো টেনশন করবেই, তুই আগে মা হো তখন বুঝবি। এই দেখ দেশী মুরগী এনেছি তোর জন্য রাতে রান্না করবো বলে। আয় এখন ভাত খাবি চল।”
“হুম চলো, মাহিন তুইও আয়। ”
—-
মেহুল বিকেলে গ্রামের ঘুরতে বের হলো। অনেকদিন পর তার গ্রামটা বেরাতে তার অনেক ভালো লাগলো। সে বছরে বাড়িতে আসেই ২-৩ বার তাই যখনই আসে তখনই গ্রাম ঘুরে দেখে সে। আজ দিনটাও তার খুবই ভালো কাটলো।
রাতের জন্য রুমা বেগম রান্না করছিলেন । সন্ধ্যায় মেহুল বাড়িতে এসে মা’কে রান্নায় সাহায্য করলো আর গল্প করলো মা’র সাথে।
রান্না প্রায় শেষ তখনই মেহুলের বাবা ইকবাল সাহেব বাড়িতে আসলেন। মেহুল ওনাকে দেখে দৌড়ে এসে জরিয়ে ধরলো –
” আসসালামু আলাইকুম বাবা… কেমন আছো?”
” ওয়ালাইকুমুস সালাম মা কেমন আছিস!
” ভালো বাবা। ”
তারপর তারা বাবা-মেয়ে অনেকক্ষণ বসে এতোদিনের জমানো কথা সব বলতে লাগলো। আজ মেহুল তার পুরো পরিবারের সাথে খুবই আনন্দ আর মজা করে রাতের খাবার খেল।
এভাবেই দুই দিন কেটে গেলো মেহুলের তার বাড়িতে। মেহুলকে তার মা-বাবা এক সপ্তাহ থাকতে বলেছে আর তারও এবার কিছু দিন থাকতে ইচ্ছে করছে তাই সে এক সপ্তাহ থাকবে ঠিক করেছে৷
রাতে মেহুলের মা আসলো তার ঘরে। মেহুল তখন গল্পের বই পড়ছিল।
” মেহুল তোর সাথে একটু কথা ছিল।”
” হ্যা মা বলো। ”
” তুই বাড়িতে এসেছিস শুনে তোর সাফিয়া আন্টি তোর জন্য একটা বিয়ের সম্বন্ধ এনেছে। কাল তোকে দেখতে আসতে চাচ্ছে। তোর কি আলাদা কোন পছন্দ আছে?”
বিয়ের কথা শুনে মেহুলের মুখটা ফেকাসে হয়ে গেলো। সে এখন কোন ভাবেই বিয়ে করতে চায় না।
” মা তোমাদের কতোবার বলবো আমি এখনই বিয়ে করবো না। এতোটাকা খরচ করে পড়াচ্ছো কি এখনই মাঝ পথে বিয়ে দেওয়ার জন্য? ”
” তোকে আগে কখনো আমরা বিয়ের কথা বলি নি মেহুল কিন্তু তোকে ও তো বুঝতে হবে তোর বয়স দিন দিন বাড়ছে। আত্মীয় থেকে শুরু করে গ্রামের মানুষ অব্দি আলোচনা করে তোকে নিয়ে। মেয়েদের তারাতারি বিয়ে হলেই ভালো। এবার তোর বাবা ও রাজি সেই তোর সাথে কথা বলার জন্য পাঠিয়েছে আমাকে। আর বিয়ের পরও তুই পড়ালেখা করতে পারবি সে ব্যবস্তা করেই বিয়েতে আগাবো আমরা তাই এটা নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না। এখন এটা বল তোর কোন পছন্দ আছে কিনা । ”
পছন্দের কথা তোলাতে মেহুলের সবার প্রথমে রাফি’র কথা মনে পরলো। আজ যদি রাফি’র সাথে সব কিছু ঠিক থাকতো তাহলে এখন রাফি’র কথা মা-বাবা কে জানাতে পারতো সে। রাফি’র পর হঠাৎ মেহুলের কেন যেন নাবিলের কথা মনে পড়লো। সে জানে না কেন সে নাবিলকে ভাবছে বিয়ের কথা শুনে।
রুমা বেগম তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে উত্তর জানার জন্য। মেহুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো-
” না মা আমার কোন পছন্দ নেই । ”
তাহলে কাল আসবে তারা তুই নিজেকে প্রস্তুত করিস তাদের সামনে যাওয়ার জন্য। ”
—-
অন্যদিকে রাফিন প্রতিদিন বায়না করে মেহুলের কাছে যাবে বলে। মেহুল কেন এখনও আসছে না এসব বলে সে সারাদিন। মেহুলকে নাকি অনেক মিস করছে। মেহুলকে মিস তো নাবিলও করছে অনেক। তার ও কেমন যেন খালি খালি লাগছে। মেহুলকে প্রতিদিন একবার হলেও দেখতো সে। অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তাই তার ও মেহুলকে খুব করে মনে পড়ছে। সাবিহা জাহান কথা বলেছিল রুমা বেগমের সাথে তখনই জেনেছে মেহুল আরো এক সপ্তাহ পর আসবে।
চলবে….?
