পর্ব : ০৬
গল্প: #তুমি_এলে_হঠাৎ_বৃষ্টি_হয়ে…
লেখিকা: #মৈথালী_নিথু (#কল্পকথা)
মেহুলকে আজ পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিলো। তাদের কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে তাদের মেহুলকে পছন্দ হয়েছে।
মেহুল একটু শান্তির সময় কাটাতে এসেছিল কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে এক সপ্তাহ এখানে থাকার সিদ্ধান্ত তার ভুল ছিল যদি সাথে সাথে চলে যেত তাহলে তাকে এই বিয়ের ঝামেলায় পড়তে হতো না। মেহুলের আজ পুরো দিনটাই খারাপ গিয়েছে।
রাতে পাত্রপক্ষ জানিয়েছে তাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে তারা কথাবার্তা আগাতে চায়। এটা শুনে মেহুলের অস্থির আর খারাপ লাগলেও তার কিছুই করার নেই। বাবা-মা সব সময় সবকিছুতে মেহুলকে সাপোর্ট করেছে। তারা এটাও বলেছে মেহুলের কোন পছন্দ থাকলে যেন তাদের বলে তার সাথেই মেহুলকে বিয়ে দিবেন তারা কিন্তু সেটাও তো নেই এখন মেহুলের তাই বাবা-মা’র পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করতে হবে তাকে।
ছেলে পক্ষ মেহুলকে দেখে যাওয়ার পরপরই সব কিছু খুবই দ্রুত হয়ে গেলো। তার বাবা গিয়ে ছেলের বাড়ি দেখে আসলো। ছেলের বাড়ি তাদের গ্রামের দুই গ্রাম পরেই ছেলের ব্যবসা আছে বাজারে৷ মেহুলের বাবার ছেলের বাড়িঘর পছন্দ হওয়ায় বিয়ের তারিখও ঠিক করা হয়ে গেলো। মেহুল ছেলের সাথে আলাদা কোনো কথা বলে নি। একদম পারিবারিক ভাবেই হচ্ছে সব কিছু।
—-
সাবিহা,নাবিল আর রাফিন এক সাথে রাতের খাবার খেতে বসেছে। নাবিল রাফিনকে খায়িয়ে দিচ্ছে সাথে নিজেও খাচ্ছে। রাফিন খাচ্ছে আর বলছে-
“মেহুাল আন্টি আমাকে সুন্দর করে খায়িয়ে দিতে পারে তুমি পারো না বাবা৷ আন্টি আবার কবে আসবে বাবা! আই মিস হার ”
রাফিনের কথা শুনে সাবিহা জাহান বললেন-
” মেহুল আর আসবে না।”
কথাটা শুনে নাবিলের হাত থেমে গেলো। রাফিনও অবাক হয়ে দাদির দিকে তাকালো। নাবিল জানতে চাইলো-
” আসবে না মানে?”
” রুমা ভাবি কল দিয়েছিলেন। মেহুলের নাকি হঠাৎ করেই বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। সামনের শুক্রবার বিয়ে তাই আমাদের তিনজন কে দাওয়াত করলেন রুমা ভাবি। ”
নাবিলের বুকটা কেঁপে উঠলো এমন কথা শুনে। এমনটাই তো হওয়ার ছিল একদিন তবুও নাবিলের কেন এতো খারাপ লাগছে?
” হঠাৎ বিয়ে যে!”
” হ্যা হঠাৎ ই ঠিক হয়ে গেছে, ভালো ছেলে পেয়েছে তাই তারা হাত ছাড়া করতে চায় নি। আমাদের যেতে হবে রুমা ভাবি অনেকবার করে বলে দিয়েছেন তাই তুই তোর কাজ সামলিয়ে ছুটির ব্যবস্হা করিস।”
—
কিভাবে যেন পাঁচ দিন কেটে গেলো। মেহুলের বিয়ের আর দুই দিন বাকি আছে। এখনই তাদের কাছের আত্মীয়রা সব আসা শুরু করে দিয়েছে। রুমা বেগম বার বার সাবিনা কে কল দিয়ে বিয়ের দুইদিন আগে আসতে বলেছিলেন কিন্তু নাবিল যেতে রাজি হয় নি। তাই তারা
মেহুলের গায়ে হলুদের দিন সকালে আসলো। মেহুল আর মাহিন গেলো তাদের আনতে বাস স্ট্যান্ড।
নাবিলের কোন ইচ্ছে ছিল না মেহুলের বিয়েতে যাওয়ার। মেহুলের বিয়ে হয়ে যাবে মেহুলকে আর দেখতে পাবে না এটা ভাবলেই নাবিলের ভিতরে অস্থিরতা কাজ করে। মেহুলের বিয়ে হলে যে তার সাথে আর দেখা হবে না এটা রাফিন বুঝে না সে তার মেহুল আন্টির কাছে যাচ্ছে এতেই সে বিরাট খুশি।
তারা ভোর ৪ টার বাসে চরে এসেছে তাই সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছে মেহুলদের গ্রামে। নাবিল বাস থেকে নেমে দেখলো মেহুল আর তার সাথে একটা ছেলে মানে তার ভাই মাহিন দাঁড়িয়ে আছে। মেহুলকে এতোদিন পর দেখতে পেয়ে নাবিলের ভিতরে একটু শান্তি অনুভূত হলো। রাফিন দৌড়ে গেলো তার কাছে। মেহুলও কোলে তুলে নিলো রাফিনকে তারপর গালে চুমু খেলো।
সাবিহা আর নাবিলের সাথে কুশল বিনিময় করে তারা বাড়ির পথে রওনা দিলো।
বাড়িতে চলে আসলে সবার সাথে সাবিহা, নাবিলের কুশল বিনিময় হলো তারপর তাদের রেস্ট নিতে পাঠিয়ে দিলেন রুমা বেগম।
সন্ধ্যায় মেহুলের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান ছোট করে করা হবে বাড়ির আঙ্গিনায় তাই মেহুলকে ওর কাজিনরা বিকেল থেকেই সাজিয়ে দিচ্ছিলো। রাফিন আসার পর থেকেই মেহুলের সাথে আঠার মতো লেগে আছে। নাবিলকে দেখে মেহুলের দুইটা কাজিন নাকি ক্রাশ খেয়েছে কিন্তু যখন জানলো তার একটা ছেলে আছে তখন তারা আফসোস করতে লাগলো। রাফিনকে এতো মেহুলের সাথে দেখে মেহুলের খালারা আবার এটা পছন্দ করছে না। রুমা বেগমের সাথে সাবিহা জাহান আসার পর থেকেই সবসময় কথা বলছেন আর কাজে সাহায্য করছেন বলে তারা রুমা বেগম কে এসব বলতেও পারছেন না। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।
—–
রাত বাজে বারো টার উপরে। মেহুলের ঘুম আসছিলো না বলে সে ঘরের বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। সুন্দর ভাবেই তার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান হয়ে গেছে। সবাই এখন ঘুমোচ্ছে।
কাল মেহুলের বিয়ে ব্যাপার টা কেন যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না। সবকিছু কেমন যেন খুবই দ্রুত হয়ে গেলো। মেহুলের কিছুই ভালো লাগছে না, বিয়ে করতে তার মন মানছে না । সে মনে মনে ভাবলে-
” ইস কাল যদি বিয়ে টা কোন ভাবে না হতো তাহলেই ভালো হতো ।”
ভাবনার মাঝেই মেহুল বুঝলো কেউ তার পাশে এসে দাড়িয়েছে। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো নাবিল। তাকে এতো রাতে মেহুল আশা করে নি তাই একটু হকচকিয়ে গেলো সে৷
” নাবিল! আপনি এখানে এতো রাতে?”
নাবিল মেহুলের দিকে না তাকিয়েই বললো-
” একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি মেহুল আপনাকে?”
নাবিলের এমন উদাস কন্ঠ শুনে মেহুলের একটু কেমন যেন লাগলো।
” জ্বি বলুন ”
” এভাবে হঠাৎ বিয়ে কেন করছেন মেহুল?”
এ প্রশ্নের উত্তরে মেহুলের কি বলা উচিত সে বুঝলো না। মেহুলকে চুপ থাকতে দেখে নাবিল আবার বললো-
” বিয়ে সারা জীবনের ব্যাপার কিন্তু সেই ব্যাপারটাতেই এভাবে হুট করে সিদ্ধান্ত নিলেন তাই আর কি জানতে চাইলাম।”
” বিয়ে তো একদিন করাই লাগতো, আমার বয়সও হচ্ছে দিন দিন। নিজেরও কোন পছন্দ নেই তাই বাবা-মা’র পছন্দেই করছি৷ আমি জানি তারা আমার জন্য সঠিক কাউকেই বাছাই করেছেন। ”
—-
রাতে এক ঘন্টা ও ঠিক মতো ঘুমাতে পারেনি মেহুল সে সারা রাত ছটফট করেছে শুধু। কেন যেন তার ঘুম আসছিলো না। রাতে নাবিলের বলা কথায় আরো ছটফট করেছে সে। নাবিলকে তো বলে দিয়েছে বিয়ে করার বলে করছে কিন্তু আসলে ভিতরে ভিরতে সে অচেনা কাউকে বিয়ে করতে চায় না৷ তার অসহ্য লাগছে সব এসব ভেবে।
রুমা বেগম নয়টা বাজে মেয়েকে ডাকতে এলেন।
” মেহুল ও মেহুল…. এবার উঠ মা আরো ঘুমালে পরে তৈরি হতে দেরি হয়ে যাবে রে এখন উঠ। ”
মেহুল তো সজাগ-ই ছিল মা’য়ে চিল্লানোতে সে আরো বিরক্ত হলো।
” আহ্ মা এতো চেঁচামেচি করছো কেন! আমি সজাগ-ই আছি। উঠছি ”
” হ্যা রে মা উঠ.. আমি তোর নাস্তা বারছি তারপর গোসল করে পার্লারে যেতে হবে। বরযাত্রী তো দুপুরেই চলে আসবে।”
” আচ্ছা আর মা শুনো ”
” হ্যা!”
” রাফিন ঘুৃম থেকে উঠেছে? ”
” হ্যা উঠেছে তো অনেক আগেই ”
“আচ্ছা তাহলে ওকে আমার কাছে পাঠাও আর ওর খাবার টাও আমার সাথে দিও আমি খায়িয়ে দিবো।”
রুমা বেগম একটুপর খাবার দিয়ে গেলেন সাথে রাফিনকেও নিয়ে আসলেন। মেহুল শেষ বারের মতো রাফিনকে খায়িয়ে দিতে লাগলো । আর কখনো এভাবে পারবে কিনা তা তো সে জানে না তাই ছেলেটাকে ভালোবেসে নিচ্ছে যতোটুকু পারছে।
একটু পর মেহুলের ছোট খালা ওর ঘরে এসে দেখলো সে রাফিনকে খায়িয়ে দিচ্ছে আর নিজেও খাচ্ছে। এটা দেখে সে মুখ বেকিয়ে আদিখ্যেতা বলে চলে গেলো বাইরে। বাইরে এসে অন্য খালাদের সাথে বললো-
” মেহুলের ঘরে গেছিলাম এহন জানো গিয়া কি দেখছি? দেখছি ওয় ওই পোলাডা আছে না! ঢাকা থাইকা যে আইলো ওই পোলারে খাওয়াই দিতাছে। আজকা ওর বিয়া আর ওয় অন্যের পোলার লগে করে ডং। মানুষ দেখলে তো কইবো এডা ওরই পোলা। ”
একটু দূরেই সাবিহা জাহান বসে ছিলেন যা খালারা খেয়াল করে নি৷ সাবিহা সব কথাই শুনলেন।
—-
নিজের ঘরে বউ সেজে বসে আছে মেহুল। একটু আগে পার্লার থেকে সেজে এসেছে সে। সাজতে বেশি সময় লাগে নি কারণ সে বলেছে তাকে হালকা ভাবে বউ সাজিয়ে দিতে তাই সে অনুযায়ী-ই তাকে কম মেক-আপ করে দিয়েছে। এখন বাজে দুই টার উপরে সবাই বরযাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে। মেহুলের পাশে ওর কাজিনরা ওকে নিয়ে মজা করছে। কিন্তু এসব মেহুলকে প্রভাবিত করতে পারছে না। ঘরে আসার সময় নাবিলের সেই চাহনি যেটা এখনও মেহুলকে অস্থির করে তুলছে।
মেহুল যখন পার্লার থেকে সেজে নিজের ঘরে যাচ্ছিলো তখন নাবিল উঠোনেই দাঁড়িয়ে ছিল৷ সাবিহা রাফিনকে নিয়ে খাবার খেতে গিয়েছে৷ নাবিল যায় নি কারণ তার কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। সে দাঁড়িয়ে ফোন টিপছিল তখন মেহুল এসে রিকশা থেকে নামলো। বউ সাজে মেহুলকে দেখে নাবিলের অন্তর টা হাহাকার করে উঠলো। সে তাকে দেখে মুগ্ধ হচ্ছে আবার কষ্টও পাচ্ছে কারণ মেহুল অন্য কারো জন্য বউ সেজেছে। আজ সে অন্য কারো জীবনসঙ্গী হয়ে যাবে৷ একই সাথে মুগ্ধতা আর অসহায় চাহনিতে সে মেহুলকে দেখতে লাগলো। মেহুলও নাবিলের সেই চাহনি দেখলো।
—
“বলো মা কবুল”
“….!”
” বলো কবুল”
“মেহুল কবুল বল তারাতারি ”
” কিরে মেহুল বলছিস না কেন?”
“………! ”
” কবুল..”
আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ।
চলবে….?
