#ব্যাকবেঞ্চার (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
বাবা মায়ের ঝগড়া দশ বছরের বাচ্চাটির হৃদয়ে খুব বাজে প্রভাব ফেলে। তাই তো নিজেকে শেষ করার মতো সিদ্ধান্ত নেয়। তার জন্যই তো এই ঝগড়া হচ্ছে। সে না থাকলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে, এটা ভেবে ছাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায় ফারিশ। পাঁচ তলা বিল্ডিং এর ছাদ হতে নিচে তাকাতে ফারিশের ছোট বুকটা কেঁপে উঠলো। ভয়ে পিছু ফিরতে নিয়ে থেমে যায়, তার মনে পড়ে যায় কিছু বিষাদের স্মৃতি।
ফারিশ সিকদার। এই দেশের সফল ব্যবসায়ী ইরফান সিকদারের ছোট ছেলে। ফারিশের মা জাহানারা নিতু একজন চিকিৎসক। এই দু’জন মানুষের সন্তান হয়ে ফারিশ একজন অপদার্থ। সব বিষয়ে সে ব্যর্থ। যদিও ফারিশের সব গুন দেখা হয়নি। শুধুমাত্র তার পড়ালেখায় ব্যর্থতা দেখেই এই উপাধি দেওয়া হয়েছে। বাবা প্রতি শব্দে বলে,“অপদার্থ ছেলে।”
দশ বছরের জীবনে ফারিশ এতবার এই শব্দটি শুনেছে যে এটা তার মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছে। অথচ পড়াটা মুখস্থ হয় না। সবসময় সবার থেকে কম নাম্বার পায় ফারিশ। দুই একটি বিষয় ছাড়া সব বিষয়ে ফেল। এটাই তার জন্য কাল। তার বাবার স্ট্যাটাসের সঙ্গে এমন মূর্খ সন্তান যায় না। তার বড় ভাই ক্লাস টপার। খেলাধুলায়ও বেশ পারদর্শী। সবকিছুতে সে সেরা। তার বাবা, মায়ের গর্ব এমন সন্তান। তাই ফারিশকে সন্তান হিসাবে পরিচয় দিতেও ইরফানের বাধে।
সবসময় ফারিশ খারাপ ফলাফল করে। এটা তার বাবার কানে যেতে তার মায়ের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে দেয়। শুরুটা ফারিশকে বকা দিয়ে হলেও শেষটা হয় বাবা, মায়ের ঝগড়া দিয়ে। ফারিশের বাবা তার গায়ে হাত তুলতে আসলে তার মা বাধা দেয়। তখনই মায়ের সঙ্গে ঝগড়া শুরু হয়। তার বাবার ধারণা তার মা তার দিকে নজর দেয় না, সে সবসময় দুষ্টুমি করে, পড়ালেখা করে না, এসব তার মায়ের দেখার কথা। কিন্তু সে দেখে না। তাই ফারিশের এত খারাপ অবস্থা। যার প্রতিবাদ করে মা, যেটায় ঝগড়া বড়সড় আকারে রূপ নেয়। এতটুকু বয়সে এতকিছু দেখে আজ ফারিশের সহ্য হচ্ছে না। শুধু তার বাবা তা নয়, তার বাবার ধনী বন্ধুরা যখনই বাসায় আসে তখনই ফারাজের প্রশংসা করে এবং ফারিশের ব্যর্থতা নিয়ে মজা নেয়। তারা এসে তার বাবাকে আরও রাগিয়ে দেয়। তারা খুব মিষ্টি ভাষায় বলে,“ইরফান তুমি সবসময় সবকিছুতে সেরা ছিলে। সেখানে তোমার ছোট ছেলে ক্লাসের সবার চেয়ে মূর্খ এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে। এই ছেলে আদৌ তোমার তো?”
মিষ্টি ভাষায় তেঁতো কথা। এটাই যথেষ্ট ছিলো ফারিশের বাবার রাগ বাড়িয়ে দিতে। তার বাবার এটাই সমস্যা যে সে সবকিছুতে সেরা ছিলো। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে সে জনপ্রিয় মুখ ছিলো। এখনো সে বেশ পরিচিত। আর তার বাচ্চা এমন মূর্খ, এটাই মানতে পারেন না। যেখানে তার সব বন্ধুদের সব বাচ্চারা সবকিছুতে সেরা সেখানে তার বাচ্চা পড়ালেখায় জিরো। এটা তার ইগো হার্ট করে। প্রচুর ইগো হার্ট করে। তাই তো সে ফারিশকে পছন্দ করে না। তবে ফারিশ কিন্তু কম চেষ্টা করে না। সে নিজের বাবা, মাকে খুশি করতে দিনরাত পড়াশোনা করে। বেশিরভাগ সময় পড়ার টেবিলেই থাকে। তার ব্যস্ত বাবা, মা এটা দেখে না। তাদের চোখে পড়ে না। তাদের চোখে পড়ে শুধুমাত্র তার ব্যর্থতা।অথচ ফারিশ পড়ালেখায় ফাঁকিবাজি করে না। সে প্রচন্ড চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তার মনে থাকে না। দুনিয়ার সব কথা মনে থাকে, শুধু পড়াটাই মনে থাকে না। যেটা তার বাবা, মায়ের দাম্পত্যে প্রভাব ফেলছে।
শুধু পড়ালেখা নয়, অন্যভাবেও বাবার মন জয় করার চেষ্টা করে। এই তো সেদিন তার বাবা ফ্যাক্টরিতে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে দেখে সে জুতা এগিয়ে দিলো। শুধু তাই নয় পড়িয়েও দিলো। সে ভেবেছিলো, এটা করলে তার বাবা খুশি হবে। কিন্তু না। হলো উল্টো। তার বাবা বলে,“হ্যাঁ এই কাজ করেই অভ্যাস করো। তোমার মতো মূর্খকে এভাবে অন্যের জুতাই বহন করতে হবে। তোমার দ্বারা এরচেয়ে বেশি কিছু হবে না।”
ফারিশের মনটা খারাপ হয়ে যায়। তবুও সে হাল ছাড়ে না। বাবাকে খুশি করতে তার নাস্তা এগিয়ে দেয়। ইচ্ছে করে তাকে খাইয়ে দিতে। খাইয়ে দিয়ে বলতে,“আমার যত্ন তোমার ভালো লাগে না বাবা?”
কিন্তু পারে না। যদি এটা করতে গিয়ে বাবা আরও রেগে যায়। সেজন্য দমে যায় ফারিশ। তবুও সে চেষ্টার কমতি রাখছে না। তবে মন পাচ্ছে না। যদি আজকের কথা বলা হয়, ফারাজের রেজাল্ট দেয়। সবসময়ের মতোই সে টপ করে। এটায় তার বাবা খুব খুশি হয়। খুশিমনে বলে,“আজ রাতে আমরা বাহিরে খেতে যাবো।”
মা সন্ধ্যার মাঝে বাসায় ফিরছিলো। বাহিরে তারা খেতে যাচ্ছে জেনে খুশি হয়। সে দুই ভাইকে তৈরি হতে বলে। এখানেই বাধ সাধে বাবা। সে স্পষ্ট ভাষায় বলে,“ফারিশ যাবে না। সে বাসায় থাকবে।”
“ও একা বাসায় থাকবে কেন?”
মা সহজ গলায় জানতে চায়। বাবা কিছুটা কঠিন গলায় বলে,“আমরা নামিদামি রেস্টুরেন্টে যাচ্ছি। সেখানে হয়তো আমার পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। আমি তাদের সামনে এই অপদার্থটাকে নিয়ে বিব্রত হতে চাই না।”
“এটা কেমন কথা, আমরা সবাই যাবো ও যাবে না।”
মায়ের কথায় বাবা চিৎকার করে উঠে। সে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়,“ও যাবে না। ওর কথা বাদ দিয়ে চুপচাপ রেডি হও।”
“আমি আমার ছেলেকে রেখে যাবো না।”
এটা বলে মা ফারিশকে জড়িয়ে ধরে। এতক্ষণে ফারিশ কান্না করে দেয়। তার বাবা মায়ের কথা শুনে রেগে যায়। তার জন্য ফারাজই তার সন্তান। ফারিশের মতো অপদার্থের জন্য সে ফারাজের খুশি নষ্ট করছে, তার সন্তানের খুশি। এটা সে হতে দিবে না। যার কথা শুনে মা প্রতিবাদ করে বলে,“দুটোই আমার সন্তান।তোমার কাছে দুজনের খুশি মেটার না করলেও আমার কাছে মেটার করে।”
ব্যাস। শুরু হলো তর্ক। এক পর্যায়ে রূপ নিলো বিশ্রী ঝগড়ার। বাবা তো সব রাগ ফারিশের উপর ঝাড়তে থাকে। তার জন্য সুন্দর দিনটি নষ্ট হয়েছে। সে এক পর্যায়ে ফারিশের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। মা এসে ফারিশকে টেনে নেয়। সে বাবাকে রাগ দেখিয়ে বলে,“তুমি বাড়াবাড়ি করছো। দুটো বাচ্চার মাঝে তফাৎ করছো। এটা ঠিক নয় ইরফান। কারো যোগ্যতার মাপকাঠি শুধু পড়ালেখা হতে পারে না। আমি মানছি ফারিশ পড়ালেখায় ভালো নয়। ওর ব্রেইন ফারাজের মতো নয়। এমন তো কথা নেই, সবার ব্রেইন একই রকম হবে। তাই অযথা ছেলেটার সঙ্গে এমন করো না।”
এবার বাবা আরও রেগে যায়। তার মান সম্মান সব হারাচ্ছে ফারিশের জন্য। সে তার সঙ্গে এমন করবে না তো কি করবে? এই ছেলের জন্য কোথাও মুখ দেখাতে পারে। মিস্টার খানের ছেলে ফারিশের সাথে পড়ে। সে সবসময় টপ করে। মিস্টার খান ছেলের রেজাল্ট জানিয়ে ফারিশের কথা জানতে চায়। লজ্জায় ইরফান ফারিশের কথা বলতে পারে না। তার সন্তান গন্ডমূর্খ তা বলতে পারে না। সে মুখ দেখাতে পারে না। ফারিশের সঙ্গে যেসব বন্ধুর সন্তানরা পড়ে সেসব বন্ধুকে এড়িয়ে যায় ইরফান। এই ছেলের জন্যই তো সব হচ্ছে। তো তাকে নিয়ে এত ফুর্তি কিসের? ফারাজ এবং ফারিশ দুজনেই বাবা, মায়ের ঝগড়ায় কান্না করে দেয়। ফারাজ ঝগড়া থামাতে বাবাকে বলার চেষ্টা করছে,“শুধু মা নয় ভাই না গেলে আমিও যাবো না বাবা।”
কিন্তু পারছে না। তার বাবা তার কথা শোনার মতো পরিস্থিতিতে নেই।
____
বাবা, মায়ের নিত্যদিনের এই ঝগড়া নিতে পারছে না ফারিশ। এসব কল্পনা করে ফারিশ আরও ভেঙে পড়ে। সে এবার ঝাপ দেবার প্রস্তুতি নেয়। সে না থাকলে সব ঠিক হবে। সে মনেমনে মাকে উদ্দেশ্য করে বলে,“আম্মু তোমার চোখ দিয়ে আর পানি ঝরবে না।”
অথচ তার মৃ ত্যু তার মায়ের সারাজীবনের কান্না। এটা এই অবুঝ শিশুটি বুঝতে পারছে না। তাই তো আর এক পা এগিয়ে যায়। আর এক কদম এগিয়ে গেলে, নিশ্চিত মৃ ত্যু। ফারিশ সেটাকে মেনে নিয়ে ডান পা এগিয়ে দেওয়ার জন্য উপরে তুলে। অতঃপর….
’
’
’
চলবে।
