#পুন্যোদয়
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব ৬(অন্তিম পর্ব)
ক্লাস শেষে আরিজা সোজা বাসায় ফিরে আসে।
সন্ধ্যার আলো নিভে যেতে যেতে তার ঘরে নেমে আসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
একদিন কেটে গেলেও বুকের ধুকপুকানি যেন থামছেই না। যেন ভেতরে কেউ আছে, নিঃশব্দে কড়া নাড়ছে।
প্রথমে সে বিষয়টাকে পাত্তা দেয়নি। ভেবেছিল, এটা হয়তো সাময়িক আবেগ, একধরনের কৌতূহল মাত্র।
কিন্তু এখন মনে হয়, সেই অচেনা মানুষটা ধীরে ধীরে তার চিন্তায়, তার নিঃশ্বাসে জায়গা করে নিচ্ছে।
রাতের বাতাসে জানালার পর্দা দুলছে, আরিজা সেদিকেই দৃষ্টি স্থাপন করে ফোনটা তুলে নেয়। লিয়াকে কল দেয়। আরিজা প্রথম দিনের সেই আগন্তুকের কথা, ইহেতেশাম স্যার আর পাত্রের কথা বলতেই ওপাশে লিয়ার কণ্ঠে বিস্ময়ের সুর,
“মানে, তিনজনই একজন!”
আরিজা চুপ থাকে। লিয়া শুধায়,
“তুই ওই মানুষটাকে ভাবছিস? যাকে তিনবারের মধ্যে একবারও কখনো দেখিসনি?”
আরিজা কিছু বলে না, শুধু নিঃশব্দে নিশ্বাস ফেলে।
লিয়া একটু থেমে বলে,
“যে মানুষ তোকে শুদ্ধর পথে নিয়ে এসেছে, নামাজে দাঁড়াতে শিখিয়েছে, সেই পাত্রকেই তুই ভালোবেসে ফেলেছিস—না দেখেই!”
লিয়ার কণ্ঠে অবিশ্বাস, তবুও কোথাও যেন মায়া মেশানো।
আরিজা জানে, এ ভালোবাসা চোখের নয়। এটা একধরনের শান্তির ভালোবাসা, যে ভালোবাসা মানুষকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়।
রাত গভীর হয়।
আরিজা বিছানার পাশে বসে অনেক ভেবে নেয়। তারপর সাহস সঞ্চয় করে বাবার ঘরের সামনে গিয়ে থামে।
মুহূর্তের ভেতর তার বুক কেঁপে ওঠে, তবুও দরজায় কড়া নাড়ে।
ভেতর থেকে বাবার গম্ভীর কণ্ঠ,“কি হয়েছে, মা?”
আরিজা ধীরে ভিতরে ঢুকে দাঁড়ায়। কণ্ঠটা কাঁপছে, তবু চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে বলে,
“বাবা, আমি বিয়ে করবো… এবং যার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা হয়েছিল, সেই পাত্রকেই।”
বাবা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
এরপর দীর্ঘক্ষন পরে তিনি শুধায়,
“সেই পাত্রকেই!”
“হ্যাঁ।”
আরিজা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন প্রথমবার নিজের মনের কথাটা উচ্চারণ করলো, কিন্তু তাতেই যেন নিজের অজান্তেই কোনো অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে ভেতরে।
বাবা প্রথমে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকেন মেয়ের মুখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে গম্ভীর স্বরে বলেন,
“তুই সত্যিই ওকেই বিয়ে করতে চাস?”
আরিজা কোনো কথা বলে না, শুধু মাথা নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলে,
“হ্যাঁ, বাবা। ওর মধ্যেই আমি শান্তি খুঁজে পাই।”
এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে আসে ঘরে। মেয়ের চোখের ভেতরকার দৃঢ়তা দেখে বাবা আর কিছু বলেন না।
পরদিন সকালে অফিস থেকে ফিরে তিনি গম্ভীর মুখে আরিজার সামনে বসেন। তার চোখে একধরনের ক্লান্তি।
“খোঁজ নিয়েছি,” তিনি বলেন ধীরে, “সেই পাত্র… নেই।”
আরিজা চমকে ওঠে। “মানে?”
“সে নাকি চলে গেছে। বাইরে কোথাও। কবে ফিরবে, কেউ জানে না।”
এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে যায় যেন। আরিজা স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে। বুকের ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত শূন্যতা জমে ওঠে। মনে হয়, কেউ যেন হাওয়ায় তার ভরসাটা কেড়ে নিয়েছে।
কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে,একদিনেই মানুষ কি এভাবে গায়েব হয়ে যেতে পারে!
চারপাশের শব্দগুলো দূরে সরে যায়। কেবল নিজের হৃদয়ের ধুপধুপানি শুনতে পায় সে,অস্তিত্বহীন এক মানুষকে ভালোবেসে ফেলার ভয়াবহ সত্যটা যেন বুকের ভেতর পাথরের মতো নেমে বসে।
—-
এরপরের দিনগুলোতে আরিজা নিঃশব্দে ক্যাম্পাসে ফিরে যায়। ক্লাসরুম, করিডর, হল,সবকিছুই আগের মতো, অথচ তার ভেতরটা বদলে গেছে অচেনাভাবে।
হলের দরজায় ঢোকার আগে একবার চোখ তুলে দেখে। রায়ান দাঁড়িয়ে আছে দূরে, বন্ধুবৃত্তে ঘেরা। দু’জনের চোখ মুহূর্তের জন্যে মুখোমুখি হয়, কিন্তু আরিজা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, যেন চেনে না। বুকের ভেতর কাঁপুনি উঠলেও সে মাথা নিচু করে হাঁটে।
আল্লাহর ভয় ঢুকে গেছে তার হৃদয়ের গভীরে, সেই রাতের সেই আগন্তুক মানুষটার কথা মনে পড়তেই শরীরটা কেঁপে ওঠে।
হলের করিডোরে এসে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। জানালার পাশে হেলে থাকা আলোয় তার চোখে ভেসে ওঠে সেই রাতের ঘটনাটা। অন্ধকারের ভেতর সেই অপরিচিত মানুষ,যার কথা তাকে আজও কাঁপিয়ে দেয়।
সেই স্মৃতি যেন তাকে পুরোপুরি বদলে দেয়।
এরপর থেকে আরিজা ধীরে ধীরে নিজেকে নতুন করে গড়তে শুরু করে। কথাবার্তা কমিয়ে দেয়, চোখ নিচু করে হাঁটে, নামাজে মন দেয়। একদিন নিজের আয়নায় তাকিয়ে চুপচাপ ওড়নাটা মাথায় টেনে নেয়।
সেদিন থেকেই সে শুরু করে পর্দা। এক নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা যেন নিজের আর আল্লাহর মাঝে, যে প্রতিজ্ঞা আরিজাকে নতুন পথে নিয়ে যায়, নীরব অথচ আলোকিত পথে।
—
দুই বছর কেটে গেল। নীরব, ধীর কিন্তু গভীর দুটি বছরযেন চোখের পলকেই কেটে গেল।
আরিজা এখন এক মাদ্রাসায় সময় কাটায়; সকালে শিশুদের সঙ্গে নিয়েই কাটে তার দিন। ছোটদের চোখে পড়া কোরআনের আখেরি, তাদের ঠোঁটের প্রথম তিলাওয়াত। এসবই এখন তার শান্তির উৎস। জীবনের ভাঙা অংশটা ধীরে ধীরে নতুন করে গাঁথা হয়ে উঠছে।
এক বিকেলে লিয়া এসে আরিজার পাশে বসে পড়ল। আড্ডার মাঝেই কড়া হাসি হেসে বলল,
“আর কতদিন এবার? বিয়ে-সাদি, কিছু তো কর।”
আরিজা অচেনা অস্থিরতাকে ছেড়ে নির্ভার কণ্ঠে জবাব দিল,
“না।”
লিয়া চোখ কুঁচকে- “নাহ! কিসের না? কিসের অপেক্ষা করছিস তুই? রায়ানও তো ফিরে এসেছে—ওকেই করলেই হলো। ওর দহনে পুড়েই তুই ওই লোকটার কাছে গিয়েছিলি না?”
আরিজা শান্ত হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলো, তারপর বলল,
“হ্যাঁ। কিন্তু রায়ানকে নয়। ওই মানুষটাকেই চাই আমি।”
লিয়া কিছু বলতে পারল না, কেবল অবাক চোখে আরিজাকে প্রশ্ন করলো,—“এতো জোর আসে কোথা থেকে তোর?”
আরিজা এক পলক চুপ করে তার হাতে পরিহিত সেই ব্রেসলেটটার দিকে তাকালো। ছোট্ট, নরম-চকমক একটি চেনা চিহ্ন। তার চোখে ভেসে উঠল অনেক কিছু: সেই মেসেজ, যেটাতে স্পষ্ট করে বলেছিল, এটা আল্লাহর কাছ থেকে উপঢৌকন হিসেবে নিন।
আরিজা মলিন শ্বাস ফেলে ধীরেসুস্থ ভাবে শুধায়,
“হ্যাঁ। ওই লোকটাই শিখিয়েছে।”
বক্তব্যটা যত সরল, ততই ভারী। যেন যে মানুষটি তাকে খোদার পথে ফিরিয়েছে, তার জন্যে আরিজার ভেতরে যে বাসা বেঁধে গেছে, সেটি আর কোন কিছুর বদলে নয়।
শূন্যতা নয়,এটা বিশ্বাস;
অস্থিরতাও নয়,এটা এক ধরণের দৃঢ় আশ্বাস।
মাদ্রাসার সামনে আজ এক বিশাল ইসলামি সম্মেলন।
মাইকে ভেসে আসছে এক গম্ভীর, গভীর কণ্ঠস্বর,
প্রধান অতিথির বক্তব্য।
আরিজার হৃদপিণ্ড থেমে আসে যেন।
এই কণ্ঠস্বর!
সে তো চেনে… এই সুর, এই উচ্চারণ, এই শান্ত অথচ শক্ত গলায় বলা বাক্যগুলো-ইহেতেশাম স্যার!
“দেখ…” লিয়া কিছু বলতে গিয়েই থেমে যায়।
কারণ তখনই আরিজা ছুটা শুরু করেছে। পথের ধুলো উড়ছে তার পায়ের নিচে, ওড়নাটা হাওয়ায় দুলিয়ে চোখে এক অদ্ভুত আলো নিয়ে সে দ্রুত পা বাড়ায়।
এক মুহূর্ত দেরি না করে সে দৌড়ে যায় ভিড়ের দিকে।
হাতে থাকা নিকাব আলগা হয়ে যায় মুখ থেকে।
মানুষের ভিড় ঠেলে, অনিশ্চিত পায়ে সে এগোয়,চোখ তার থমকে যায় এক জায়গায়।
সাদা পাঞ্জাবি, শান্ত মুখ, দৃঢ় ভঙ্গিতে কথা বলছেন যিনি—
ঠিক সেই সন্ধ্যার আগন্তুকের মতো।
একদম হুবহু!
আরিজা নিঃশ্বাস ফেলে দেয়।
এই মানুষটাই তো… এই কণ্ঠ, এই পেছন দিকের অবয়ব,সব মিলে যায় একসাথে।
ইহেতেশাম স্যার বক্তৃতা শেষ করে নামছেন মঞ্চ থেকে।
গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে।
ভিড়ের চাপ প্রচণ্ড।
আরিজা ছুটে যেতে চায়, কিন্তু পারে না।
পা আটকে যায় ভিড়ের ঢেউয়ে।
এক মুহূর্তে সে বুক ভরে এক চিৎকার দেয়,
“স্যার!”
জনতার ভেতর থেমে যায় সব শব্দ।
ইহেতেশাম ঘুরে দাঁড়ান।
এক পলকেই,নিকাবের ভেতরে থাকা সেই দু’টি চোখ চিনে ফেলেন তিনি।
তারও চোখে আলো জ্বলে ওঠে, ঠোঁটে থমকে থাকা বিস্ময়ের রেখা ধীরে ধীরে বদলে যায় প্রশান্ত হাসিতে।
আরিজা স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে, নিকাবের আড়ালে চোখ ভিজে আসে তবুও ঠোঁটে হাসি। তার মনে কেবল একটাই বাক্য প্রতিধ্বনি তোলে,
“আল্লাহ তো তাঁর প্রতিশ্রুতি রেখেছেন…”
তার জোরের বিশ্বাসটাকে, আজ আল্লাহ সত্যিই বাস্তব করে দিয়েছেন।
#সমাপ্তি।
