#পুন্যোদয়
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব ৩
আরিজা সেদিন বিকেলের পর ক্লাস থেকে ফিরে সরাসরি বাসায় এলো।
বাড়িটা শান্ত, বারান্দায় শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে – অথচ ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
মা সারাক্ষণ ব্যস্ত, কখনো পর্দা টানছে, কখনো টেবিল গুছাচ্ছে।
বাবা ফোনে কারও সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলছেন।
আরিজা কিছুই বুঝতে পারছে না, কিন্তু জিজ্ঞেসও করছে না।
তার মন যেন কোথাও অন্যত্র – রায়ানের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। বাড়ির আলো জ্বলে উঠল।
মায়ের মুখে চাপা উত্তেজনা,
“আজ সন্ধ্যায় ওরা আসবে, তুই একটু ভালো করে রেডি হয়ে আয়।”
আরিজা শুধু মাথা নেড়ে সরে গেল।
আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল,
তারপর একটা সাদা সালওয়ার কামিজ পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। চোখে কোনো কাজল নেই, ঠোঁটে কোনো রঙ নেই।
আয়নায় তাকিয়ে নিজের মুখটাকেও যেন চিনতে পারছে না।
সন্ধ্যা গড়িয়ে এলো। বাইরের গেট খুলে গাড়ির শব্দ। বাবা এগিয়ে গেলেন অভ্যর্থনায়।
মা মুখে চাপা হাসি নিয়ে বললেন,
“আরিজা, আয় মা, সালাম কর।”
আরিজা আস্তে এসে বসল সোফার কোণে। পাত্র আসেনি, এসেছে শুধু তার মা আর বাবা। দু’জনের মুখে একরকম সৌজন্যতার হাসি। মা চা এগিয়ে দিলেন, কথাবার্তা শুরু হলো।
“মেয়েটা পড়াশোনা করে?”
“জি, বিশ্ববিদ্যালয়ে।”
“রান্না জানে তো?”
“হুম, জানে।”
“বিয়েতে মত আছে তো?”
চার-পাঁচটা প্রশ্ন,
আরিজা মাথা নিচু করে রোবটের মতো উত্তর দিল—
“জি আণ্টি… জি…”
সে কিছু ভাবছে না, শুধু বসে আছে যন্ত্রের মতো।
আলোচনার পুরো সময়টায় তার দৃষ্টি জানালার দিকে -বাইরে বৃষ্টির গন্ধ, আর কোথাও একটা নামহীন শূন্যতা।
রাত নামার আগেই অতিথিরা চলে গেল।
মা এসে নিঃশব্দে বললেন,
“ওরা তোকে খুব পছন্দ করেছে, আরিজা। বলেছে বিয়ের কথা পাকাপাকি করতে চায়।”
আরিজা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বিছানায় বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার কানে ভেসে আসছে বাবা-মায়ের ফিসফিসানি,
“ছেলেটার মা খুব খুশি, কালই নিশান পাঠাবে।”
পরদিন সকালবেলা দরজার ঘণ্টি বাজল। দরজায় এসে দেখা, আগের সেই মহিলা। হাতে ছোট একটা বাক্স।
মা হাসিমুখে ভিতরে নিয়ে এলো, আরিজার হাতে তুলে দিল।
ভেতরে একটা সোনালি লকেট আর মিলানো ব্রেসলেট।
মা বললেন,
“ওরা তোকে এইটা নিশান হিসেবে পাঠিয়েছে, খুব পছন্দ করেছে তোকে।”
সবকিছু এমন দ্রুত ঘটে গেল যে আরিজা বুঝতেই পারল না—
সে কবে “বিয়ের মেয়েটা” হয়ে গেল।
সে পাত্রটাকে দেখেওনি,
বাবা-মা দেখেছে, পছন্দ করেছে, ঠিকও করে ফেলেছে।
বিকেলে মা যখন ছবিটা দেখাতে চাইলেন,
আরিজা শুধু বলল,
“না, দরকার নেই।”
তার গলায় তখনও সেই লকেটটা ঝুলছে-অন্যের পছন্দের প্রতীক,আর তার চোখের ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা,
যেন কেউ তার জীবনটা নিজের মতো লিখে দিয়ে গেছে,
আর সে শুধু চুপচাপ পড়ে যাচ্ছে-পড়তে পড়তেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নিজের মধ্যেই।
শেষবারের মতো ক্যাম্পাসে পা রাখল আরিজা। চারপাশের গাছপালা, করিডরের পরিচিত শব্দগুলো আজ কেমন অচেনা লাগছে। যেন সবকিছু তাকে নিঃশব্দে বিদায় জানাচ্ছে।
গেট পেরোতেই দেখা হয়ে গেল লিয়ার সঙ্গে। লিয়া আগেই আরিজার মায়ের কাছ থেকে খবর পেয়ে গেছে। মুখে হাসি টানার চেষ্টা করলেও চোখে একধরনের অস্থিরতা।
সে এগিয়ে এসে আলতো করে আরিজার পিঠে হাত রাখল,
“সবকিছু মন থেকে করছিস তো?”
আরিজা কিছু না বলে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। সেই মুহূর্তেই অদূরে চোখে পড়ে রায়ানকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে-চেনা ভঙ্গিতে, এক জুনিয়র মেয়ের সঙ্গে হাসি-হাসি মুখে কথা বলছে। মেয়েটার চোখে মুগ্ধতার ঝিলিক, একদম সেই আগের মতো… ঠিক যেমনভাবে দু’ বছর আগে রায়ানের কথায় ডুবে গিয়েছিল সে নিজেও।
রায়ানের চোখের চাহনি, তার কথার ভঙ্গি—সবই যেন সেই পুরোনো দিনের প্রতিচ্ছবি।
আরিজার বুকের ভেতর হালকা এক দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে। মনে মনে বলতে ইচ্ছে করে,
“ওর কথায় ফেঁসো না, মেয়ে। শেষ হয়ে যাবে।”
কিন্তু ঠোঁট খুলেও কিছু বলতে পারে না।
শুধু একফোঁটা নিঃশব্দ হাসি ছুঁয়ে যায় তার মুখে-হয়তো তিক্ত, হয়তো মুক্তির।
রায়ান ধীরে ধীরে ওদিক থেকে এগিয়ে আসছে। মুখে সেই পরিচিত হালকা হাসি। আরিজা স্থির হয়ে বসে থাকে,চোখে অনিশ্চিত এক দৃষ্টি। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন, যেন অতীত আর বর্তমানের মাঝখানে আটকে গেছে সে।
ঠিক তখনই,মোবাইলের স্ক্রিন হঠাৎ জ্বলে ওঠে।
একটা অচেনা নাম্বার।
মেসেজটা খুলতেই চোখ আটকে যায়—
> “দুনিয়াবী এসব দুদিনের খেলা। হারামের পথে শান্তি নেই, আছে ক্ষণস্থায়ী মরীচিকা। হালালের পথে ভাবুন, কারণ সেখানে আছে স্থিরতা, আছে রাহমত।
আল্লাহকে শুকরিয়া জানান এই ভেবে যে আপনি হারামে ডোবার আগেই আল্লাহ আপনাকে তার আসল রূপ দেখিয়ে দিয়েছেন।
আজ রাতে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে শুকরিয়া আদায় করুন।”
আরিজা কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনের দিকে।
অচেনা নাম্বার!
কিন্তু… সে যে রায়ানের দিকেই তাকিয়ে ছিল, সেটা এই মানুষটা জানল কীভাবে?
চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয় সে। পুরো মাঠের হালকা বাতাস বইছে, দূরে ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিংয়ের সামনে ভিড় জমেছে।
অগণিত মুখ, চলমান মানুষ,তাদের মাঝখানে কে এমন বার্তা পাঠাতে পারে?
মুহূর্তটায় বাতাসটা যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে।
একটা অদেখা উপস্থিতি, এক রহস্যময় দৃষ্টি, যেন দূর থেকে তাকে দেখছে-চুপচাপ, কিন্তু জানে সব।
আরিজার হঠাৎ চোখ পড়ে ডিপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের দিকে। দূরের দুতলার করিডোর ধরে কেউ হেঁটে যাচ্ছে,ইতিহাসের নতুন প্রভাষক, ইহেতেশাম স্যার।
সাদা পাঞ্জাবি, কালো ঘড়ি, নিঃশব্দ ভঙ্গিতে একা হাঁটছেন।
দূর থেকেও যেন শান্ত এক আবহ ছড়িয়ে আছে তার চলাফেরায়।
আরিজার মনে পড়ল, যেদিন অচেনা আগন্তুক তাকে সাহায্য করেছিল, সেদিনও ঠিক এমনই সাদা পাঞ্জাবি পরা ছিল সে।
হুট্ করে বুকের ভেতর এক ঝলক আলো নেমে এলো।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে থামালো সে—
“আরে, পাগল নাকি আমি! দুনিয়ায় কত ছেলেই তো সাদা পাঞ্জাবি পরে!”
মৃদু হেসে মাথা নাড়ল আরিজা।
তবু মনের ভেতর কেমন যেন অস্থিরতা।
সে দ্রুত ফোন বের করল, নাম্বারটাতে কল দিল।
কল গেল না—নেটওয়ার্ক নয়, যেন কেউ ইচ্ছা করেই বন্ধ করে রেখেছে।
পাশে বসা লিয়াকে প্রশ্ন করল,
—“তুই আমার নাম্বার কাউকে দিছিলি?”
লিয়া অবাক মুখে তাকাল,
—“না তো, কেন?”
আরিজা কিছু বলার আগেই আবার একটা মেসেজ এল—
> “যে আপনাকে ভালোবাসেনি, তার কথা ভেবে নিজের সময় নষ্ট করবেন না। সেই সময়টা আল্লাহর সাথে কাটান—
উনি আপনার জন্য আরও সুন্দর পথ রেখেছেন।”
স্ক্রিনে লেখা কথাগুলো যেন বুকের ভেতর কাঁপন তুলল।
সে আবারও কল দিল, কিন্তু এইবারও বন্ধ।
ঠিক তখনই রায়ানের হাসির আওয়াজ কানে এলো।
ও পাশ থেকে রায়ান সেই জুনিয়র মেয়েটার সঙ্গে হাঁটছে, হালকা কথা, হালকা হাসি।
আরিজার বুকের ভেতর হঠাৎ এক চাপা ঝড় বয়ে গেল।
চুপচাপ ব্যাগটা তুলে নিল সে। কোনো কথা না বলেই লিয়াকে ইশারা করল। দু’জন ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল,আরিজা একবারও পিছনে তাকাল না।
শুধু অনুভব করল, তার পেছনে কোথাও একটা অদৃশ্য দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে,যে তাকে জানে, বোঝে, আর হয়তো রক্ষা করছে।
#চলবে ইন শা আল্লাহ।
