#পুন্যোদয়
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব ৫
সে খুশিমনে ক্লাসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। ক্যাম্পাসে লিয়াকে দেখতেই দৌড়ে গিয়ে লিয়ার দিকে তাকাল, চোখে উচ্ছ্বাস। লিয়াকে সেই পাত্রের ব্যাপারটা জানাতেই লিয়া কিছুটা অবাক হয়। সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
“তোর এক কথায় রাজি হয়ে গেল? বিয়ে না করার জন্য?”
আরিজা নিশ্চুপ, তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“হ্যাঁ।”
লিয়ার চোখে খানিকটা দুঃখের ছায়া ফোটে। সে মুখটা মলিন করে আবার মত ঘুরে ফেলে এবং বলে,
“তাহলে ওই লোকটাতো ভালো ছিল। কেন না করলি?”
আরিজা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর চুপচাপ জিজ্ঞেস করল,
“তুইও তো না বলতে বলছিলি। এখন আবার এ কথা কেন?”
লিয়া খানিকটা বিব্রত, তবে হালকা হেসে উত্তর দেয়,
“আমি তো ভেবেছিলাম, আবেগের বশে কোনো খারাপ পাত্রকে ধরে বিয়ে করতে যাচ্ছিস, তাই এভাবে বললাম।”
আরিজা চুপচাপ থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে,
“না, লোকটা হয়ত ভালো ছিল। নামাজের কথা বলায় আমি অনেকবছর পরে নামাজ ধরেছি।”
লিয়া মুহূর্তের জন্য চমকে যায়। সচরাচর এমন কোনো মানুষ খুব কমই দেখা যায়। সে আরও জিজ্ঞেস করে,
“সকালে আর মেসেজ দিয়েছিল?”
আরিজা হাত বাড়িয়ে মোবাইল খুঁজে দেখল,মোবাইল নেই। উত্তেজনার বশে সে ব্যাগে মোবাইল ঢুকাতে ভুলে গেছে। ভাবলো, গিয়ে চেক করবে।
হুট্ করেই লিয়ার ক্লাসের কিথা মনে পড়তেই সে আরিজাকে নিয়ে দ্রুত পা চালাতে শুরু করে,
“ভাই, ইহেতেশাম স্যারের ক্লাস। তোর পাল্লায় পড়ে, পাঁচ মিনিট লেট্! দ্রুত চল।”
দুজনেই দুরু দুরু বুক নেড়ে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ায়। ক্যাম্পাসের হালকা হাওয়ায় তাদের উচ্ছ্বাস আর অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট।
ইহেতেশাম স্যার ইতিমধ্যেই ক্লাস শুরু করে দিয়েছেন। কণ্ঠে এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা, যেভাবে তিনি ইতিহাস বোঝাচ্ছেন, তার ভেতরেও যেন একটা ধর্মীয় গভীরতা মিশে আছে।
আশ্চর্যজনকভাবে আরিজা লিয়া দুজনেই বকার প্রস্তুতি নিয়ে গেলেও তা হলো না। আজ আর স্যার কিছুই বললেন না—না কোনো তিরস্কার, না বিরক্তির ভাঁজ। শুধু একবার দৃষ্টিটা তুললেন, তারপর নিঃশব্দে বোর্ডে ফিরে গেলেন।
আরিজা একটু অবাক হলো। সাধারণত তিনি দেরি করলে স্যার অপমান করে কথা বলেন, সময়ের মূল্য বোঝান অথচ এবার কেন কিছু বললেন না?
চুপচাপ দরজা টেনে ভেতরে ঢুকে গেল সে। হাঁটতে হাঁটতে বেঞ্চের দিকে যাচ্ছিল, এমন সময় এক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে তাকালো,ঠিক তখনই স্যারের দৃষ্টি তার চোখের সাথে মিলল।
এক পলকের সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অজানা গাম্ভীর্য, আবার একফোঁটা কোমলতার ছায়াও।
ইহেতেশাম স্যার চোখ সরিয়ে ধীরে ঘুরে বোর্ডে লিখতে শুরু করলেন, চক ঘষার শব্দে ভরল পুরো ক্লাসরুম।
আরিজা নিঃশব্দে নিজের জায়গায় গিয়ে বসল, মাথা নিচু করে বই খুলে ক্লাসে মনোযোগ দিল।
—
ক্লাস থেকে ফিরেই আরিজা দ্রুত মোবাইলটা হাতে নিল। মোবাইল অন করেই প্রথম কাজ—মেসেজ চেক করা। কিন্তু স্ক্রিন নিঃস্তব্ধ, কোনো নোটিফিকেশন নেই।
একটা অজানা শূন্যতা বুকের ভেতর ছড়িয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল, তারপর মেসেজ খুলে আবারও দেখল—কিছুই না।
অদ্ভুত! একদিনের মধ্যেই ওই লোকটার প্রতি কেন যেন মায়া জন্মে গেছে তার। যেন সে মানুষটা হঠাৎই তার জীবনের এক অচেনা অথচ আপন অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে সে নিজেই মেসেজ টাইপ করল—
“আল্লাহ আমার কথা শুনেছে।”
মিনিটের মধ্যেই রিপ্লাই এলো—
“হ্যাঁ। আল্লাহকে মন থেকে ডাকলে অবশ্যই শুনেন। আল্লাহ বান্দার দোয়া শুনতে সদা প্রস্তুত। ”
“হুম।”
আরিজার মেসেজের রিপ্লাই এলো,
“আমি এখন থেকে নন-মাহরাম আপনার জন্য। আর কথা হবে না।”
আরিজার বুক কেঁপে উঠল। তার আঙুল কাঁপলো সামান্য। জানে না, কেন এমন লাগছে তার। সে আবার লিখল,
“কিন্তু আপনাদের দেওয়া গোল্ড… ব্রেসলেট?”
রিপ্লাই এলো শান্ত, অদ্ভুত প্রশান্তির মতো করেই,
“আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা উপঢৌকন হিসেবে নিন।”
আরিজা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর ধীরে লিখল,
“কিন্তু এটা তো অন্যায়।”
এইবার উত্তর এলো,
“অন্যায় না। আল্লাহর পক্ষ থেকেই উপহার হিসেবে দিলাম। ব্রেসলেটটা দেখলে আপনার আল্লাহর কথা মনে পড়বে। যে আল্লাহ আপনাকে স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলার সময় দিচ্ছে সেই আল্লাহকে কোনোদিন ছাড়বেন না।”
এরপর আবার টাইপিং করে,
“ভাবুন তো? এতদিন পরে আপনি আল্লাহকে দুহাত তুলে ডেকেছেন। তাও কিনা নিজের স্বার্থের জন্য। তিনি কি আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন?”
আরিজার ভালো লাগলো। ছোট করে লিখলো,
“না।”
“তাহলে বুঝে নিন, আল্লাহ কতোটা দয়াবান! যেখানে কারোর সাধ্য নেই সেখানে আল্লাহর আছে। আশার মতো কিছু হলে আগে আল্লাহকে শুকরিয়া জানানো উচিত।”
“জি।”
“আল্লাহর পথে আসা মানে অনেক বড়ো ব্যাপার। দুনিয়াবী এসব কিছুই না।”
এরপর থেমে আবার রিপ্লাই আসে,
“হয়তো জীবনের কোনো এক মোড়ে আমাদের আবার দেখা হবে ইন শা আল্লাহ।”
স্ক্রিনের আলোর নিচে আরিজার চোখে জল চিকচিক করল।
সে ছোট্ট করে লিখল,
“আচ্ছা।”
শেষ মেসেজ এলো,
“আল্লাহ আজকে যেভাবে আপনার সাথে ছিল, সেভাবেই থাকবে। কারোর জন্য জীবন শেষ করবেন না। জীবনের অর্থ অনেক বড়। ধৈর্য ধরলে আল্লাহ অবশ্যই প্রতিদান দেবেন। আল্লাহকে ছাড়বেন না।”
আরিজার আঙুলে শেষবার কাঁপন উঠল,
“আচ্ছা।”
“আল্লাহ হাফেজ।”
তারপর আর কিছুই নেই।
নিরবতা। আরিজা লিখতে গেল কিছু একটা। কিন্তু তার আগেই সে লক্ষ্য করল, মেসেজ আর যাচ্ছে না। অর্থাৎ নাম্বারটা ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।
আরিজার চোখের সামনে যেন পর্দা নেমে এলো। বুকটা হালকা আবার ভারী।
একজন মানুষ, যে অচেনা হয়েও তার জীবনের দিক ঘুরিয়ে দিল, ইসলাম শেখাল, তাকে নরম কণ্ঠে সোজা পথ দেখিয়ে চলে গেল—চিরদিনের জন্য।
আরিজা ব্যালকনিতে গিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। বাতাসে সন্ধ্যার হালকা ঠান্ডা গন্ধ।
সে মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“যে মানুষ শুধু আল্লাহর পথে টেনে নেয়, তাকে তো মন থেকে মুছে ফেলা যায় না।”
আরিজা জানে, এখন থেকে সে কারও প্রতি মন দিতে পারবে না। কারণ, কারও ভালোবাসার আগে, তার হৃদয়ে এখন আল্লাহর নাম জায়গা করে নিয়েছে।
—-
পরদিন ক্লাসে গিয়ে আরিজা অবাক হয়ে যায়,ইহেতেশাম স্যারের জায়গায় আজ অন্য কেউ ক্লাস নিচ্ছে। বোর্ডে নতুন হাতের লেখা, নতুন কণ্ঠ।
সে প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো স্যার অসুস্থ, বা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত। কিন্তু পেছনের সারিতে বসা এক ছাত্রী জানায়,
“ইহেতেশাম স্যার আর আসবেন না। উনি মাত্র কিছুদিনের জন্য জয়েন করেছিলেন। এখন নাকি বাইরের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে চান্স পেয়েছেন।”
আরিজার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। যেন হাওয়ায় কোনো অদৃশ্য চাপ নেমে এলো, যা তার নিঃশ্বাস আটকে দিল।
সে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করল,ঠিক যেমন কোনো অসমাপ্ত কথার মাঝখানে হঠাৎ কেউ বিদায় নেয়।
হুট্ করে কোথাও যেন মিল খুঁজে পেল সে,প্রথমদিন রাতে যে পাঞ্জাবি পরা আগন্তুক তাকে রক্ষা করেছিল, ইহেতেশাম স্যারের কাছ থেকেও সে সেই একই শান্ত, পরিচিত সুঘ্রান পেয়েছিল।
তখনো বুঝতে পারেনি কেন দুটো মুহূর্ত এত মিলছে, কিন্তু আজ, সবকিছু একসাথে জুড়ে যেতে শুরু করেছে।
পাত্র আসা, হুট্ করে বিয়ে ভেঙে যাওয়া—তারপরই ইহেতেশাম স্যারের এই চলে যাওয়া!
সব যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা ছিল, যেটা আজ খুলে গিয়ে তাকে নিঃস্তব্ধ করে দিল।
আরিজা ব্যাগ থেকে তাড়াহুড়ো করে মোবাইল বের করল।
সেই নাম্বারটা। যেটা তাকে নামাজের কথা বলেছিল, আল্লাহর পথে ডেকেছিল—এখনো ব্লক।
সে লিয়ার ফোন নিয়ে কল দিল, কিন্তু স্ক্রিনে ভেসে উঠল“নম্বরটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।”
আরিজার বুক ধক করে উঠল। কেমন একটা শূন্য ভয়, আর অদ্ভুত মায়া মিশে গেল ভেতরে।
সে নিজেকে বোঝাতে চাইল, “এটা কিছু না, সময়ের কাকতাল।”
কিন্তু বুকের কোথাও যেন ভারী এক পাথর জমে রইল।
তার মনে প্রশ্ন জাগলো—দু’দিনেই কি সত্যিই ভালোবাসা হয়? নাকি, কোনো কোনো মানুষ জীবনের এত গভীরে ছুঁয়ে যায় যে, সময়ের হিসেব সেখানে অর্থহীন হয়ে পড়ে?
#চলবে ইন শা আল্লাহ।
