#পুন্যোদয়
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব ৪
লিয়া অবাক হয়ে আরিজার দিকে তাকিয়ে থাকে।
এতো সহজে আরিজা স্থির হয়ে গেছে। মনে হয় শক্তির একটা আবরণ হয়ে বসেছে তার ভেতরে।
সাথে রায়ানও আছে, কিন্তু সে যেন আরিজার কাছে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না।
মেয়েটা এত সহজে “মুভ অন” করে গিয়েছে,কয়েক দিন আগে যা নরম, আজ তা নেই।
লিয়া ধীরে বলল,
—“তুই এই বিয়েতে সত্যিই সুখী হবি কি?”
আরিজা, রোবটের ন্যায়, ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দিল,
—“কেন হবো না?”
লিয়া চোখ চেয়ে দেখে, মাথা নেড়ে বলল,
—“তুই তো সব আবেগের বশে কাজ করছিস। রোবটের ন্যায়।”
আরিজা হালকা হেসে বলল,
—“হয়তো তাই।”
লিয়া আবার ভ্রু ভাঁজ করে বলল,
—“বোধহয় তুই এই বিয়েতে রাজি হয়ে ভুল করেছিস। তোর আরো সময় নেওয়া দরকার ছিল।”
আরিজা চুপচাপ কিছুক্ষন নীরব থাকে, তারপর স্বীকার করে,
—“আমি হয়ত ভুল করে ফেলেছি।”
লিয়া মলিন শ্বাস ফেলে।
তার নজর চলে যায় আরিজার হাতের দিকে—
—“ব্রেসলেট কে দিয়েছে?”
আরিজা শান্তস্বরে উত্তর দেয়,
“ওই পাত্রপক্ষ।”
“তাহলে তুই বলে দেয়। না করে দেয়। সময় নেয়।”
আরিজা চুপ করে থাকল।
লিয়া আরও চাপ সৃষ্টি করল।
শ্বাস ফেলে আরিজা। মনে হলো, সে ঘোর থেকে বের হয়েছে।
সে বুঝতে পারছে, হ্যাঁ বলাটা তখন আবেগের বশে হয়েছিল, ঠিক হয়নি।
কেন যেন অন্যজনকে ঠকানো বা দেখানোর জন্য নিজের জীবন এবং ওই পাত্রের জীবন ধ্বংস করবে—এটা কখনোই ঠিক নয়।
একটু চুপচাপ দাঁড়িয়ে, চোখে শক্তি আর মননে স্বচ্ছতা নিয়ে সে লিয়াকে সম্মতি প্রকাশ করে শুধায়,
“না, এবার অন্য কারও জন্য নয়, নিজের জন্যই না বলবো।”
—–
রাতটা নেমে এসেছে নিঃশব্দে। বাড়ির ভেতর আলো ঝলমল, হাসির শব্দে মুখর চারদিক।
মা–বাবা, আত্মীয়স্বজন—সবাই বিয়ের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত।
কিন্তু আরিজা নিঃস্তব্ধ বসে আছে নিজের ঘরের ব্যালকনিতে।
দূরের অন্ধকারে একটা হালকা হাওয়া বইছে, কিন্তু তার ভেতরটা ভারী হয়ে আছে।
সে ফোনটা হাতে তুলে নেয়। সকালের সেই অচেনা নাম্বারটার দিকে তাকায়,
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে টাইপ করে—
“কে আপনি? এভাবে আমাকে নজরদারি করেন?”
মাত্র দুমিনিটের ব্যবধানে রিপ্লাই আসে—
“কারণ, ভবিষ্যতে আপনি আমারই হতে যাচ্ছেন।
শুদ্ধপথে নিয়ে আসা আমার দায়িত্ব, কর্তব্য দুটোই।”
আরিজার বুকটা ধক করে ওঠে।
মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সে।
মুহূর্তেই যেন সব পরিষ্কার হয়ে গেল—
এটা সেই পাত্র, যার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
সে আবার মেসেজ পাঠায়—
“কিন্তু আমার ক্যাম্পাসের খবর আপনি কিভাবে জানেন?”
রিপ্লাই আসে সংক্ষেপে—
“সিক্রেট থাকুক।”
আরিজা ফোনটা একটু শক্ত করে ধরে।
তারপর গভীর চিন্তায় পড়ে যায়।
হালকা আলোয় তার মুখে দ্বিধা আর দৃঢ়তার মিশ্র ছায়া।
কিছুক্ষণ পর টাইপ করে—
“আচ্ছা।”
তারপর থেমে যায়।
মুহূর্ত পরে আবার লিখে ফেলে—
“আপনার সাথে কথা বলা যাবে?”
সাথে সাথেই রিপ্লাই আসে—
“বলছেনই তো।”
আরিজা চোখ নামায়, আঙুল থেমে থাকে স্ক্রিনে কিছুক্ষণের জন্য।
তারপর ছোট করে লিখে ফেলে—
“সিরিয়াস কথা। বিয়ের আগে বলা জরুরি।”
রিপ্লাই আসে আগের মতোই স্থির ভঙ্গিতে—
“মেসেজে বলুন।”
আরিজা ফোনটা কোলে রেখে একটু শ্বাস নেয়।
নিজেকে প্রস্তুত করে।
সে জানে না, এই কথার পর কী জবাব আসবে,
কিন্তু আজ না বললেই নয়—
এই কথাগুলো না বললে সে নিজের প্রতিচ্ছবির কাছেও দায়ী থাকবে।
মুহূর্তেই আরিজা টাইপ করল—
“আমি হয়ত এই বিয়েতে রাজি না।”
ফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।
তারপর ধীরে ধীরে একটা রিপ্লাই ভেসে উঠল—
“কেন?..”
আরিজা আঙুল থামায়নি।
লিখে ফেলে—
“আমার ইচ্ছে করছে না। আমি নিজেকে সময় দিতে চাইছি।
আমার মনে হচ্ছে, এটা আমার জন্য উপযুক্ত সময় নয়।”
মেসেজটা পাঠিয়ে সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
ভাবছিল, হয়তো এইবার লোকটা রেগে যাবে, তিরস্কার করবে,
কিন্তু না—স্ক্রিনে ভেসে উঠল শান্ত একটা উত্তর—
“আপনার মতামত না থাকলে না করে দিন।”
আরিজা হতবাক হয়ে যায়।
তারপর লিখে ফেলে—
“আমি বলতে পারছি না।”
রিপ্লাই আসে—
“ঠিক আছে। আল্লাহকে বলুন।
আল্লাহ অনেক ভালো। আপনি মন থেকে বললে,
আল্লাহ কোনো উপায়ে বিয়ে ভেঙে দিবে। যেখানে পাত্র পাত্রীর যেকোনো একজনেরও মত না থাকে সেখানে বিয়ে হওয়াটা অন্যায়। ”
আরিজা কিছুটা অবাক হয়ে যায়।
লিখে ফেলে—
“আপনিই পরিবারকে বলুন।”
রিপ্লাই আসে সঙ্গে সঙ্গেই—
“না, আমিও আপনার মতো অবস্থায়।
তবে আল্লাহকে মন থেকে বললে, উনি আপনার কথা শুনবেন।”
আরিজা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর টাইপ করে—
“ঠিক আছে, বলবো।”
সেই অপরিচিত মানুষটি লিখল—
“রাতে নামাজ পড়ে নিয়ে বলে দেখুন।
দেখবেন, বিয়েটা হবে না।”
আরিজা বিস্মিত হয়।
“কিন্তু আমাদের তো নিকাহর কথাবার্তা হয়ে গেছে।”
রিপ্লাই এল একদম শান্তভাবে—
“সমস্যা নেই।
আল্লাহ যেটা ভালো মনে করবে, সেটা অবশ্যই হবে। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে হবে না। ”
“ঠিক আছে।”
“ভালো থাকুন। আল্লাহকে ছাড়বেন না কোনোদিন।”
আরিজা কেবল একটা শব্দ লিখল—
“আচ্ছা।”
তারপর ফোনটা রেখে দিল।
মনে একধরনের হালকা কষ্ট, আবার আশ্চর্য শান্তিও।
লোকটার কথাগুলো অদ্ভুতভাবে মনে দাগ কেটে গেল।
সে ঠিক করল, আজ রাতে নামাজ পড়বে—
অনেক বছর পরে, হয়তো অনেক ভুলে যাওয়া এক রুটিনে ফিরে যাওয়া।
এশার নামাজ শেষে সে নিঃশব্দে সিজদায় গেল।
চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল না, কিন্তু মন কাঁপছিল।
সেই কাঁপা মনেই সে বলল—
“আল্লাহ, এই বিয়েতে আমার মত নেই। বিয়েটা হলে অন্যজনকে ঠকানো হবে। কোনোভাবে যেন না হয়।”
নামাজ শেষ করে বসে থাকে।
হঠাৎ মনে পড়ে ফোনটা।
স্ক্রিনে নতুন মেসেজ—
“বলেছেন তো আল্লাহকে?”
আরিজা লিখল—
“হ্যাঁ।”
রিপ্লাই এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে—
“ঠিক আছে। এবার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন।
আপনার দোয়া কবুল হবে।”
আরিজা ফোনটা বালিশের পাশে রেখে দিল।
চোখ বুজতেই মনে হলো, বুকের ভার যেন হালকা হয়ে যাচ্ছে।
সত্যি সত্যিই—অনেকদিন পরে, একদম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
—-
ভোরের আলোটা আজ অদ্ভুত শান্ত লাগছিল।
চেনা পাখির ডাক, দূর থেকে আজানের প্রতিধ্বনি—
সব যেন একসাথে মিলে কোনো নতুন শুরু ঘোষণা দিচ্ছে।
আরিজা আধোঘুমের ঘোরেই শুনতে পেল ড্রয়িংরুমে মায়ের কণ্ঠ—
উত্তেজিত, আবার একটু হতাশ।
—“এই বিয়েটা হবে না।”
মুহূর্তে তার ঘুম ভেঙে গেল।
শরীর নিস্তব্ধ, মনটা থমকে রইল কিছু সেকেন্ড।
তারপর যেন হাওয়ার মতো হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে।
কিছু জিজ্ঞেস করল না, কিছু জানতেও চাইল না।
কারণটা জানার প্রয়োজন নেই—
যেটা হয়েছে, সেটাই তো তার চাওয়া ছিল, আল্লাহর ইচ্ছায়।
সে চুপচাপ রুমে ফিরে এলো।
রোদ পর্দা ভেদ করে তার মুখে পড়ছিল,
আরিজার মুখে উচ্ছ্বাসের আলো—
যেন একটা ভারী শিকল খুলে গেছে বুক থেকে।
মোবাইলটা টেবিলে পড়ে আছে।
স্ক্রিনে আগের রাতের সেই মেসেজগুলো মনে পড়ছে,
“আল্লাহকে বলুন। আপনার দোয়া কবুল হবে।”
আরিজা তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য মুচকি হাসল।
তারপর ধীরে ধীরে পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল।
আকাশটা আজ অনেক নরম, অনেক কাছের লাগছে।
তার মনে হলো, এটাই হয়তো ছিল আল্লাহর উত্তর।
দুনিয়াবী বন্ধন ছিঁড়ে দিয়ে তিনি খুলে দিয়েছেন এক নতুন দরজা—শুদ্ধতার, শান্তির, আর ফিরে আসার পথে।
#চলবে ইন শা আল্লাহ।
