#হিমেল_রাতের_অতিথি।
পর্ব:- এক।
লেখা:- সিহাব হোসেন।
“আমার প্রাক্তন প্রেমিকা অধরা তার স্বামীকে নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে কয়েক মাসের জন্য এসে থাকতে চাইছে। কি যেন একটা বিপদে পড়েছে।”
সায়নের শান্ত কণ্ঠের কথাগুলো চায়ের কাপে ঝড় তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল। ওর বন্ধু রাকিবের হাতটা কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। সে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে সায়নের দিকে এমনভাবে তাকালো, যেন অচেনা কাউকে দেখছে। তার চোখের তারায় বিস্ময় আর অবিশ্বাস মিলেমিশে একাকার। সায়ন বন্ধুর এই চাহনি দেখে মৃদু হেসে বলল,
– “এভাবে কী দেখছিস?”
– “তুই পা*গল হয়ে গেলি কি না, তাই দেখছি। রাকিবের কণ্ঠে রাজ্যের বিস্ময়।
– “পা*গল হওয়ার কী আছে? যা সত্যি, তাই বললাম।”
– “যে মেয়েটা তিন বছর আগে তোর মুখের ওপর অ*পমান করে, তোকে পথের ভিখিরি বলে ফেলে চলে গিয়েছিল, তাকে তুই তোর ফ্ল্যাটে আশ্রয় দিবি? তাও আবার তার স্বামীকে নিয়ে! যখন তারা তোর ছাদের নিচে এক ঘরে থাকবে, একসাথে ঘুমাবে, তখন তোর কেমন লাগবে? সহ্য করতে পারবি এই দৃশ্য?” রাকিবের প্রতিটি শব্দ যেন সায়নের অতীতকে খুঁ*চিয়ে দিচ্ছিল।
সায়ন কোনো উত্তর না দিয়ে জানালার বাইরে ধূসর হয়ে আসা আকাশের দিকে তাকালো। একটা দীর্ঘশ্বাস তার বুকের ভিতর বেরিয়ে এলো। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল,
– “যেদিন অধরার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, সেদিনই আমি আমার ভালোবাসাকে নিজের হাতে কবর দিয়েছি, রাকিব। এখন যে অধরা আছে, সে আমার কাছে কেবলই একজন পুরোনো বন্ধু, এর বেশি কিছু নয়। আমাদের সম্পর্কের শুরুতে যেমনটা ছিলাম, ঠিক তেমন।”
– “তোর যা ভালো মনে হয় কর। কিন্তু কী বিপদে পড়েছে, কিছু বলেছে?”
– “সম্ভবত বিশাল অঙ্কের ঋণে জড়িয়েছে। পাওনাদারদের চাপ থেকে বাঁচতেই হয়তো কিছুদিন দূরে থাকতে চায়।”
– “এত বড়লোক! তার আবার ঋণের কী হলো?”
– “জানি না, আর জানতেও চাই না। এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আচ্ছা, আমি এখন আসি।”
সায়ন পকেট থেকে টাকা বের করে চায়ের বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়ালো। রাকিব কোনো কথা না বলে অবাক চোখে বন্ধুর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল পুরোনো দিনের স্মৃতি। সায়ন, তার ছোটবেলার বন্ধু, একসময় কী ভীষণ হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত ছিল! সবার সাথে মিশে গিয়ে আড্ডা জমিয়ে তুলতে ওর জুড়ি ছিল না। কলেজে ওদের বিশাল এক বন্ধুত্বের জগৎ ছিল। সেই জগতেই ধূমকেতুর মতো আগমন ঘটেছিল অধরার। মিষ্টি চেহারার, খুব সুন্দর করে কথা বলা এক মেয়ে। সেও ছিল সায়নের মতোই মিশুক। কিন্তু বন্ধুত্বের আড়ালে কখন যে তাদের মধ্যে এক গোপন প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা অনেকেই টের পায়নি। সায়ন অধরাকে তার সবটা দিয়ে ভালোবেসে ফেলেছিল। কিন্তু অধরা কি কখনো ভালোবেসেছিল? উত্তরটা আজও অজানা। যদি সত্যিই বাসত, তবে তিন বছর আগে সায়নকে অমন নির্দয় ভাবে অপমান করে অন্যের হাত ধরত না। যাওয়ার আগে তার বলা শেষ কথাগুলো আজও রাকিবের কানে বাজে,
– “তোমার মতো এক সাধারণ ছেলেকে আমার স্বামী হিসেবে কোনোদিনও দরকার পড়বে না। আমি যাকে বিয়ে করতে চলেছি, সে একাই একশ।”
অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আজ সেই সায়নেরই তার দরকার পড়েছে।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। হেমন্তের প্রথম হিমেল হাওয়া চারদিকে একটা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। সায়ন তার ফ্ল্যাটের বেলকনিতে একটা চেয়ারে একা বসে আছে। হাতে ধরা ফোনটার স্ক্রিন অন্ধকার। থেকে থেকে দমকা বাতাস এসে তার শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এমন অনুভূতিই একসময় হতো, যখন অধরা চুপিচুপি তার পাশে এসে বসতো। তখন বাতাসে ভেসে আসা অধরার পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ আর তার শরীরের নারীসুলভ ঘ্রাণ মিলেমিশে সায়নের শরীরে এক অন্যরকম শিহরণ জাগাতো। সায়ন আনমনে ভাবলো, আজকের এই হিমেল বাতাসের অনুভূতি আর সেদিনের সেই শিহরণ, দুটোই কি এক? নাকি তাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে? উত্তরটা পাঠকদের জন্য তোলা রইল।
হঠাৎ হাতে থাকা ফোনটার স্ক্রিন জ্বলে উঠলো। ভেসে উঠল একটি নাম “অধরা”। একসময় এই নামটা দেখলেই সায়নের হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে যেত, সারা শরীরে এক অদ্ভুত কাঁপন ধরে যেত। কিন্তু এখন? এখন কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না। সায়ন নিজেকেই প্রশ্ন করল, “আমি কি দিন দিন অনুভূতিশূন্য এক পাথর হয়ে যাচ্ছি?”
ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো অধরার কিছুটা গম্ভীর স্বর।
– “কেমন আছো?”
– “জ্বী, ভালো।”
– “আমি কেমন আছি, জানতে চাইলে না?” অধরার কণ্ঠে সামান্য অভিমানের সুর।
– “প্রয়োজন বোধ করছি না।”
ওপাশ থেকে অধরার দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর সে বলল,
– “তো… আমরা কি আসতে পারি?”
– “হুম, এসো। কোনো সমস্যা নেই।”
– “আমরা কাল আসছি। আচ্ছা, কেউ কিছু জানতে পারবে না তো? মানে, আমাদের পুরোনো সম্পর্কের ব্যাপারে?”
– “চিন্তা করো না। এই একতলা বাড়ির পুরোটাই আমি নিয়ে থাকি। নিশ্চিন্তে এসো, কেউ কিছু বলবে না। আর তোমরা তো স্বামী-স্ত্রী। যদি কেউ জিজ্ঞেস করেও, আমি বলব তোমরা আমার কাজিন।”
– “আচ্ছা।”
ফোনটা কেটে গেল। সায়ন ফোনটা পাশে রেখে আবার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালো। কাল থেকে তার এই শান্ত, একাকী জীবনে এক নতুন ঝড়ের আগমন ঘটতে চলেছে। যে ঝড় হয়তো তার কবর দেওয়া অতীতকে আবার জাগিয়ে তুলবে।
পরদিন বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যার ছায়া দীর্ঘ হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই একটা পুরোনো অটোরিকশা সায়নের বাড়ির সামনে এসে ক্যাঁচ করে শব্দ করে থামলো। সায়ন ব্যালকনি থেকেই দেখছিল। দরজা খুলে ভেতর থেকে যে নারীমূর্তিটি বেরিয়ে এলো, তাকে দেখে সায়নের বুকের ভেতরটা ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। এ কি সেই অধরা? তিন বছর পর এই প্রথম দেখায় তাকে চেনা প্রায় দায়। চেহারার সেই লাবণ্য আর উজ্জ্বলতা যেন এক নিমিষে উধাও হয়ে গেছে। চোখের নিচে জমে থাকা কালি দীর্ঘ নির্ঘুম রাতের সাক্ষী দিচ্ছে। একদা রেশমের মতো মসৃণ চুলগুলো এখন অযত্নে উস্কোখুস্কো। মনে হচ্ছে, এক ঝোড়ো বাতাস তার জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে সব এলোমেলো করে দিয়েছে।
এরপরেই অটো থেকে নামলো এক ভদ্রলোক। তার হাতে ধরা বাদামি রঙের একটি স্যুটকেস। পরনে পরিপাটি কোট-প্যান্ট, চুল নিখুঁতভাবে ছোট করে ছাঁটা, আর মুখে দাড়ির লেশমাত্র নেই। চেহারায় এক ধরনের আভিজাত্যের ছাপ, যা তার বর্তমান পরিস্থিতির সাথে বেমানান। ভাড়া মিটিয়ে সে সায়নের দিকে তাকালো।
অধরা সায়নের সামনে এসে দাঁড়াতেই কেমন যেন গুটিয়ে গেল। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ, ঠোঁট দুটো কাঁপছে কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। যেন জমে থাকা হাজারো কথা লজ্জার বরফে চাপা পড়ে গেছে। এই অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙলো অধরার স্বামী, তুষার। সে সায়নের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে একগাল নিখুঁত হাসি হেসে বলল,
– “আপনিই মিস্টার সায়ন, তাই না?”
– “জি।” সায়ন হাত মেলালো।
– “অধরার কাছে আপনার ব্যাপারে অনেক শুনেছি। আজ সামনাসামনি দেখে খুব ভালো লাগলো। আগামী দুই-তিন মাসের জন্য আপনাকে বিরক্ত করতে এলাম। কিছু মনে করছেন না তো?” তুষারের কণ্ঠস্বরে অদ্ভুত এক সাবলীলতা।
সায়নও একটা সৌজন্যের হাসি ফিরিয়ে দিয়ে বলল,
– “আরে না না, বিরক্ত হওয়ার কী আছে? বিপদের দিনে বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে না পারলে সেই বন্ধুত্বের কোনো অর্থ হয়?”
– “আগে অধরা আপনার বন্ধু ছিল, আজ থেকে আমিও।” তুষার সায়নের কাঁধে আলতো করে চাপড় দিল।
– “জি অবশ্যই। আসুন, ভেতরে আসুন।”
অধরা এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। সায়নের আহ্বানে সে যন্ত্রচালিতের মতো ভেতরে প্রবেশ করলো। সায়ন তাদের জন্য নির্ধারিত ঘরটি দেখিয়ে দিল। মাঝারি আকারের একটি ঘর, একপাশে দেয়াল ঘেঁষে একটা তোশক পাতা, সাথে একটা ছোট টেবিল আর দুটো চেয়ার। এর বেশি আসবাব নেই। সায়ন কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলল,
– “এই ঘরটা আপনাদের জন্য। দুঃখিত, খাটের ব্যবস্থা করতে পারিনি। একা থাকি তো, তাই…।”
– “কোনো সমস্যা নেই। আমাদের আরামে চলে যাবে।” তুষার স্যুটকেসটা তোশকের পাশে রাখতে রাখতে বলল। তারপর অধরার দিকে তাকিয়ে কৌতুকের সুরে বলল,
– “কী ব্যাপার? পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে তোমার তো কথার ফুলঝুরি ফোটানোর কথা। এমন চুপসে গেলে কেন?”
অধরা নিচু স্বরে জবাব দিল,
– “না, এমনি। আসলে কী বলবো, ঠিক ভেবে পাচ্ছি না।”
তুষার মৃদু হেসে ওয়াশরুমে চলে গেল। ঠিক তখনই অধরা এগিয়ে এলো সায়নের কাছে। তার কণ্ঠে অপরাধবোধ আর দ্বিধা মেশানো।
– “এখনো বিয়ে করোনি কেন?”
– “একা বেশ ভালো আছি।”
– “আসলে… সেদিন তোমাকে বড্ড বেশি অপমান করে ফেলেছিলাম আমি।”
– “আমি ওসব কিছু মনে রাখিনি। আর পুরোনো কথা না তুললেই আমি খুশি হবো।”
সায়ন আগে থেকেই রান্না করে রেখেছিল। তিনজন একসাথে রাতের খাবার খেতে বসলো। তুষার অসম্ভব মিশুক প্রকৃতির মানুষ। অল্প সময়ের মধ্যেই সে এমন ভাবে কথা বলতে শুরু করলো, যেন সায়নের সাথে তার বহুদিনের পরিচয়। কিন্তু এই সহজ আলাপচারিতার মাঝেও একটা চাপা অস্বস্তি কাজ করছিল। খাওয়া শেষে অধরা ও তুষার তাদের ঘরে চলে গেল।
সায়নের অফিসের কিছু কাজ বাকি ছিল। সে ল্যাপটপ খুলে বসলো। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ পাশের ঘর থেকে ভেসে এলো অধরার খিলখিল হাসির শব্দ। যে হাসির শব্দ শোনার জন্য একসময় অধির আগ্রহে বসে থাকতো, আজ সেই হাসিই তার বুকে অসহ্য য*ন্ত্রণা তৈরি করছে। সে প্রাণপণে কাজে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলো।
কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই ঘরটা থেকে ভেসে আসতে লাগল অসংলগ্ন কিছু চাপা শব্দ আর শীৎ*কার। সায়ন স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মানুষটাকে সে নিজের সমস্তটা দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছিল, তার সুখের মুহূর্তের সাক্ষী সে আজ হতে বাধ্য হচ্ছে, নিজেরই বাড়িতে, পাশের ঘরে। এই অনুভূতিটা অপ*মানের চেয়েও ভয়ঙ্কর। সে আর সহ্য করতে না পেরে কানে হেডফোন গুঁ*জে দিয়ে গানের ভলিউম বাড়িয়ে দিল।
মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে সায়ন সদর দরজা খোলার একটা ক্ষীণ শব্দ পেল। কিন্তু ক্লান্ত শরীর আর ভারাক্রান্ত মন সেটাকে পাত্তা দিল না। মনের ভুল ভেবে সে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
সকালের ঘুম ভাঙলো বাইরের হইচই আর চিৎকারে। সায়ন বেরিয়ে এসে যা শুনলো, তাতে তার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। পাশের বাড়ির এক ভদ্রলোককে কেউ গত রাতে নৃশংসভাবে খু*ন করে ফেলেছে।
চলবে……!
