#হিমেল_রাতের_অতিথি।
পর্ব:- পাঁচ(শেষ)
লেখা:- সিহাব হোসেন।
কীভাবে অধরার বাবা-মায়ের খোঁজ পাওয়া যাবে, তা ভেবে সায়ন দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। ঠিক তখনই অধরা তাকে তুষারের দুই বিশ্বস্ত সঙ্গী, মনির আর দিপুর কথা বলল। এমনকি তাদের গোপন আস্তানার ঠিকানাও সে জানিয়ে দিল। সব শুনে সায়ন অধরার কাঁধে হাত রেখে তাকে আশ্বস্ত করলো।
– “তুমি শুধু সাবধানে থেকো। আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসছি।”
অধরা সায়নের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে আকুতি ভরা গলায় বলল,
– “প্লিজ, একটু তাড়াতাড়ি করো। আমি এই ন*রক য*ন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই।”
সায়ন অধরার গালে আলতো করে হাত রেখে বলল,
– “চিন্তা করো না। আমি আসছি।”
এক মুহূর্তও দেরি না করে সায়ন বেরিয়ে পড়লো। সে সোজা চলে গেল স্থানীয় থানায়। পুলিশ অফিসার মাহবুব আহমেদের কাছে সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা খুলে বলল। এই সিরিয়াল কি*লিংয়ের কেসটা নিয়ে পুলিশের ওপর তখন প্রচণ্ড চাপ। মাহবুব সব শুনে কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,
– “অপরাধী আপনার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আছে, অথচ আপনি কিছুই জানতেন না?”
– “না, স্যার। আর অধরাও তার বাবা-মায়ের জীবনের ভয়ে মুখ খুলতে পারেনি।”
– “বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনি ওদের দুই সঙ্গীর যে ঠিকানা দিলেন, সেটা সঠিক তো?”
– “হ্যাঁ, স্যার। এখন পর্যন্ত ঠিকানাটা গোপনই আছে।”
মাহবুব আর দেরি করলেন না। বিশাল এক পুলিশ ফোর্স নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন। শহরের শেষ প্রান্তে, এক পরিত্যক্ত গোডাউনে হানা দিল পুলিশ। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তারা মনির আর দিপুকে ধরে ফেললো। সেখানেই প্রচণ্ড মা*রধ*রের মুখে তারা দুজন সব সত্যি বলে দিল। কিন্তু তাদের মুখ থেকে যে ভয়ঙ্কর সত্যটা বেরিয়ে এলো, তার জন্য সায়ন প্রস্তুত ছিল না। তারা স্বীকার করলো, অধরার বাবা-মাকে তারা অনেক আগেই তুষারের নির্দেশে খু*ন করে ফেলেছে। কথাটা শুনে সায়নের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। সে বুঝতে পারছিল না, অধরার কাছে ফিরে গিয়ে সে কী জবাব দেবে।
এদিকে, অধরা নিজের ঘরে বসে ছটফট করছিল। এমন সময় তুষার বাসায় ফিরলো। সে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে তার সেই ভয়ঙ্কর দা-টা পরিষ্কার করতে লাগলো। অধরা ঘৃ*ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
– “আর কতজনের জীবন এভাবে কে*ড়ে নেবে তুমি?”
তুষার ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,
– “প্রতিশোধ শেষ। এবার শুধু শেষ দুজন বাকি।”
অধরা চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলো,
– “কারা?”
তুষার ক্রুর হেসে বলল,
– “তুই, আর তোর প্রেমিক সায়ন। তোর বাবা-মাকে তো অনেক আগেই ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছি। এবার তোর পালা।”
বাবা-মায়ের মৃ*ত্যুর খবরটা যেন বুকে খু্ব গভীর ভাবে আ*ঘা*ত করলো। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো। সে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। পাশে রাখা একটা ক্রিকেট ব্যাট তুলে নিয়ে সে তুষারকে আ*ঘা*ত করতে যাবে, ঠিক তার আগেই তুষার বাজপাখির মতো ক্ষি*প্রতায় তার দুটো হাত এমনভাবে চে*পে ধরলো যে, অধরা নড়তেও পারছিল না। সে অধরার কানের কাছে সাপের মতো হিসহিস করে বলতে লাগলো,
– “আজ রাতে তোদের দুজনকে এমনভাবে শেষ করব যে, সবাই ভাববে তোরা পালিয়ে গেছিস।”
– “তুমি এটা কখনোই পারবে না!”
– “পারব কি না, সেটা তো দেখতেই পাবি।”
এই বলে সে অধরার হাতটা এমনভাবে মু*চড়ে দিল যে, যন্ত্রণায় তার মুখ দিয়ে তীব্র এক আ*র্তনা*দ বেরিয়ে এলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজাটা সজোরে খুলে গেল। সায়ন ভেতরে ঢুকে এক টানে তুষারকে অধরার কাছ থেকে ছিটকে সরিয়ে দিল। তুষার মাটিতে পড়ে গিয়েও পৈ*শাচিক ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বলল,
– “বাহ্, চমৎকার! আজ দেখি ছবির হিরো একেবারে সঠিক সময়ে হাজির।”
– “তোর খেলা শেষ, তুষার। দিপু আর মনির ধরা পড়েছে। এবার তোর পালা।”
তুষার ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
– “তাই নাকি?”
তার কথা শেষ হতে না হতেই অফিসার মাহবুব পুলিশ ফোর্স নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন। তিনি তুষারের দিকে বন্দুক তাক করে বললেন,
– “অনেক মানুষ মে*রেছিস। এবার চল আমাদের সাথে।”
– “ঠিক আছে।”
তুষার এমনভাবে বলল যেন কিছুই হয়নি।
– “দেখি, কতক্ষণ আমাকে আটকে রাখতে পারেন।”
তুষার শান্তভাবে পুলিশের দিকে এগিয়ে আসছিল। কিন্তু হঠাৎই সে ঘুরে মাটিতে পড়ে থাকা সেই ধারালো দা-টা তুলে নিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে অধরার মাথা বরাবর কো*প বসালো।
– “অধরা!”
সায়নের গলা চিরে একটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো।
অফিসার মাহবুব এক মুহূর্তও দেরি না করে তুষারের হাতে গুলি চালালেন।
অধরা দু’হাতে মাথা চেপে পড়ে গেল। তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। তুষার ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে দেখলো, উত্তেজনার বশে সে দা-এর ধা*রালো দিক দিয়ে নয়, উল্টো দিক দিয়ে আঘাত করেছে। সে ব্যঙ্গ করে বলল,
– “ধুর শালি! কপালটা ভালো তোর, মনে হয় ম*রবি না।”
মাহবুব আর তার দল টেনে-হিঁচড়ে তুষারকে নিয়ে গেল। সায়ন ছুটে গিয়ে অধরাকে কোলে তুলে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটলো। মাথায় গুরুতর চোট পেয়েছে সে। ডাক্তাররা জানালেন, সুস্থ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে।
এরপরের দিনগুলো সায়ন অধরার পাশেই কাটিয়ে দিল। সে নিবিড়ভাবে তার দেখাশোনা করতে লাগলো, তার খেয়াল রাখতে লাগলো।
পুলিশি জেরার মুখে তুষার ভেঙে পড়তে বেশি সময় নেয়নি। সে গড়গড় করে তার সব অপরাধ স্বীকার করে নিল। একে একে সব খুনের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিল, আর এর পেছনের কারণ হিসেবে দায়ী করলো এক রহস্যময় সাধককে। অফিসার মাহবুব তুষারের দেওয়া ঠিকানা নিয়ে সেই সাধকের আস্তানায় হানা দিলেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে কেবল শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই পেলেন না। সাধক যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
ঠিক দুদিন পর, জেলের কনডেমড সেলে তুষারের সাথে দেখা করতে এলো এক অপ্রত্যাশিত অতিথি, তার পুরোনো বন্ধু মেহরাব। যে বন্ধুকে সে নির্দ*য়ভাবে প্র*তা*রণা করে পথের ভিখারি বানিয়েছিল, সেই মেহরাব আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে। এতদিন পর তাকে দেখে তুষার অবাক হয়ে বলল,
– “তুই! তুই এতদিন পর কোত্থেকে এলি?”
– “যেখানে থাকার কথা, সেখানেই ছিলাম। যাইহোক, দেখলি তো, মানুষের ক্ষতি করলে নিজেরও একদিন কত বড় ক্ষতি হয়। তোর মতো ধুরন্ধর একটা লোক যে সামান্য এক সাধকের কথায় প্রভাবিত হয়ে এসব করবে, তা আমি ভাবতেও পারিনি।”
– “আমি টাকার লোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তো…”
কথা বলতে বলতে হঠাৎ তুষার থেমে গেল। তার চোখে বিস্ময়।
– “কিন্তু সাধকের কথা তুই জানলি কীভাবে?”
মেহরাব অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। সেই হাসিতে ছিল বিজয় আর ঘৃণা।
– “কারণ, সেই সাধক আর কেউ নয়, আমিই ছিলাম। তুই যাদের দিয়ে আমার সর্বনাশ করিয়েছিলি, তাদের প্রত্যেককে আমি তোরই হাতে শেষ করালাম। আর এখন দেখ, তুই নিজেও শেষ। শেষ পর্যন্ত জয়টা কিন্তু আমারই হলো।”
এই বলে মেহরাব হাসতে লাগলো। তুষার রাগে ক্ষোভে খাঁচার ভেতর বন্দি পশুর মতো গর্জে উঠে বলল,
– “তোকে আমি শেষ করে দেব!”
– “আর সেটা সম্ভব নয়, বন্ধু। কারণ তোর মৃ*ত্যুর ঘণ্টা ইতিমধ্যেই বেজে গেছে।”
এই বলে মেহরাব হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। জেলের বাইরে এসে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বহু বছর পর আজ তার বুকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এসেছে। প্রতিশোধের আগুন অবশেষে নিভেছে।
চার মাস পর…
হাসপাতালের সাদা বিছানায় চার মাস কাটানোর পর অধরা আজ বাড়ি ফিরছে। মাথার আ*ঘা*তটা বেশ গুরুতর ছিল, কিন্তু এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ। শুধু চোখের দৃষ্টিতে সামান্য সমস্যা হওয়ায় এখন থেকে তাকে চশমা ব্যবহার করতে হবে। এই কঠিন সময়টাতে সায়ন আর তার মা ছায়ার মতো অধরার পাশে ছিল। আর তুষার? ধরা পড়ার ঠিক চারদিন পরই জেলের ভেতরে তার নিথর দেহ পাওয়া গিয়েছিল। কীভাবে তার মৃ*ত্যু হয়েছে, তা আজও এক রহস্য।
সায়ন অধরাকে নিয়ে যখন তাদের চেনা ফ্ল্যাটটায় এসে পৌঁছালো, তখন চারপাশটা ছিল অন্ধকার। কিন্তু দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই এক ঝটকায় সব আলো জ্বলে উঠলো। অধরা দেখলো, তার কলেজের পুরোনো সব বন্ধুরা সেখানে উপস্থিত। ঘরের মাঝখানে একটা টেবিলে রাখা সুন্দর একটা কেক। সবাই একসাথে চিৎকার করে বলে উঠলো, “হ্যাপি বার্থডে, অধরা!”
অধরার আজ জন্মদিন, অথচ এই ডামাডোলে সে নিজেই তা ভুলে গিয়েছিল। সায়ন আলতো করে অধরার হাত ধরে তাকে কেকের সামনে নিয়ে এলো। রাকিব এগিয়ে এসে বলল,
– “এমন একটা দিনের অপেক্ষায় আমরা সবাই ছিলাম। অবশেষে তোদের দুজনের মিল হলো।”
তার আরেক বান্ধবী হেসে বলল,
– “তুই সত্যি অনেক ভাগ্যবান, অধরা। সায়নের মতো একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছিস।”
সায়নের আরেক বন্ধু দুষ্টুমি করে বলল,
– “মামা, এবার কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ‘চাচ্চু’ ডাক শুনতে চাই!”
সবার কথায় হাসির রোল পড়ে গেল। সায়ন অধরার হাতে হাত রেখে তার চোখের দিকে তাকালো। কোনো কথা হলো না, কিন্তু তাদের চোখের ভাষায় বিনিময় হয়ে গেল হাজারো না বলা কথা, ভালোবাসা, নির্ভরতা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সবাই মিলেমিশে কেক কাটলো। অধরার মনে হচ্ছিল, গত কয়েকটা মাস সে যেন এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখছিল। আজ সেই দুঃস্বপ্ন ভেঙে গেছে। সে যেন আবার সেই তিন বছর আগের প্রাণোচ্ছল দিনগুলোতে ফিরে গেছে।
শুধু বুকের ভেতর একটা চাপা কষ্ট রইল, তার এই নতুন, সুখী জীবনটা তার বাবা-মা আর দেখতে পেলেন না।
(সমাপ্ত)
