#হিমেল_রাতের_অতিথি।
পর্ব:- তিন।
লেখা:- সিহাব হোসেন।
আজ সায়ন অন্যদিনের চেয়ে একটু আগেই বাড়ির পথে পা বাড়ালো। সন্ধ্যার আবছা আলোয় চেনা রাস্তাঘাটগুলোও কেমন যেন অচেনা আর ভুতুড়ে লাগছিল। শহরের বুকে চেপে বসা আ*তঙ্কের ছায়াটা যেন আরও গভীর হয়েছে। এলাকার মোড়ের চায়ের দোকানটা, যা কি না রাত দশটা পর্যন্ত আড্ডায় মুখর থাকতো, আজ সন্ধ্যেতেই তার ঝাঁপ বন্ধ। মানুষ ভয় পেলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও কতটা অস্বাভাবিক হয়ে যায়!
বাড়িতে পৌঁছে কলিংবেল চাপতেই দরজা খুলে দিল অধরা। তার ফোলা ফোলা চোখ, এলোমেলো চুল দেখে সায়নের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মেয়েটা কেঁদেছে। ভেতরে ঢুকে সায়ন দেখলো, তুষার বাসায় নেই। ঘরটা অস্বাভাবিক রকমের শান্ত।
– “কী হয়েছে? কান্না করেছো কেন?” সায়নের কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ ফুটে উঠলো।
– “কই, কান্না করিনি তো।”
অধরা চোখ নামিয়ে মিথ্যা বলার এক ব্যর্থ চেষ্টা করলো। – “একটু ঘুমিয়েছিলাম, তাই হয়তো চোখ দুটো ফোলা লাগছে।”
– “আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়, অধরা।”
সায়নের কথায় অধরা আর কোনো উত্তর দিতে পারলো না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখের কোণে আবার জল এসে জমা হয়েছে, কিন্তু সে প্রাণপণে তা আটকে রাখার চেষ্টা করছে। চারদিকে যে অদৃশ্য ফাঁদ পাতা! সামান্য একটা ভুল পদক্ষেপ সায়নকে ভয়ঙ্কর বিপদে ফেলে দিতে পারে।
– “তুষার ভাই কোথায়?” সায়ন প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য জিজ্ঞেস করলো।
– “এখানে কার সাথে যেন দেখা করতে গেছে। ফিরতে রাত হবে বলেছে।”
– “আচ্ছা।”
সায়ন ফ্রেশ হয়ে নিজের ঘরে এসে ফোন নিয়ে বসল। কিছুক্ষণ পর অধরা এক বাটি ধোঁয়া ওঠা নুডলস নিয়ে এলো। বাটিটা টেবিলের ওপর রেখে কোনো কথা না বলেই সে চলে যেতে উদ্যত হলো। তার ভেতরটা তখন ছটফট করছে। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে সায়নকে সব বলে দিতে, শহরে ঘটে চলা এই নৃশংস হ*ত্যাকাণ্ড গুলোর পেছনে আর কেউ নয়, তারই স্বামী তুষার জড়িত। কিন্তু বলার কোনো উপায় নেই। সামনে-পেছনে, সবখানে তুষারের লাগানো সিসি ক্যামেরার অদৃশ্য চোখ তাকে পাহারা দিচ্ছে। একমাত্র সায়নের ঘরটাই নিরাপদ, কিন্তু সেখানে বেশিক্ষণ থাকলে তার ফল কতটা মারাত্মক হবে, তা সে খুব ভালো করেই জানে।
নুডলস খাওয়া শেষ হলে অধরা বাটিটা নিতে এলো। নিঃশব্দে বাটিটা তুলে নিয়ে সে যখন চলে যাচ্ছে, হঠাৎ কী ভেবে যেন থমকে দাঁড়ালো। সায়ন তার দ্বিধাগ্রস্ত চোখের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
– “তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে, তুমি কিছু বলতে চাও। কিছু হয়েছে কি?”
অধরা জোর করে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলল,
– “কই? না তো।”
এই বলে সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে প্রায় ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সায়নের মনটা খচখচ করতে লাগল। অধরা আর তুষারের মধ্যে যে কিছু একটা গণ্ডগোল চলছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানো ঠিক হবে না ভেবে সে চুপ করে রইলো। আনমনে তার চোখ চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। সায়নের ঘর থেকে রান্নাঘরটা পরিষ্কার দেখা যায়। হঠাৎ একটা জিনিস তার চোখে পড়লো। রান্নাঘরের দরজার ঠিক ওপরে লাইটের যে হোল্ডারটা ছিল, সেটা এখন নেই। তার জায়গায় কালো রঙের খাপের মতো কী একটা লাগানো, যার মাঝখানে ছোট্ট একটা ছিদ্র। ব্যাপারটা সায়নের কাছে অদ্ভুত লাগলো। তার মনে পড়লো, অনেক সময় এভাবেই গোপন ক্যামেরা লাগানো হয়।
হঠাৎ করেই সে অধরাকে ডাকলো। ঘরের আবছা অন্ধকারে অধরা আসতেই সায়ন ইশারায় রান্নাঘরের দিকে দেখিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
– “লাইটের ওই জায়গায় তোমার স্বামী নতুন কিছু লাগিয়েছে?”
প্রশ্নটা শুনেই অধরার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে থতমত খেয়ে বলল,
– “না… ও তো কিছু করেনি।”
– “আচ্ছা।”
অধরা আর দাঁড়ালো না, দ্রুত চলে গেল। সায়নের সন্দেহটা এবার আরও দৃঢ় হলো। কিছু একটা তো নিশ্চিত ঘটেছে, নইলে অধরা এভাবে ঘাবড়ে যাবে কেন? তাছাড়া, পুরোনো সেই প্রাণোচ্ছল অধরার সাথে আজকের এই ভীত, সন্ত্রস্ত অধরার কোনো মিলই নেই। ব্যাপারটা আর স্বাভাবিক লাগছে না।
শহরের এক অন্ধকার গলির ভেতরে এক জীর্ণ বাড়িতে বসে আছে তুষার। তার সামনে ধূপ আর আগরবাতির ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এক রহস্যময় পরিবেশে বসে আছে এক বয়স্ক লোক। লোকটির মুখ ভর্তি জটা পাকানো সাদা দাড়ি, পরনে টকটকে লাল পাঞ্জাবি। সে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র আওড়াচ্ছিল। হঠাৎ চোখ খুলে সে পাশ থেকে একটা ছবি বের করে তুষারের দিকে এগিয়ে দিল।
– “তোর পরবর্তী টার্গেট এই লোক।”
তুষার ছবিটা হাতে নিয়ে চমকে উঠলো। ছবির মানুষটাকে সে চেনে। একসময় তার সাথেই ব্যবসা করতো, বেশ ভালো সম্পর্কও ছিল। অনেকদিন ধরেই সে এই শহরে তার খোঁজ করছিল। লোকটি শীতল কণ্ঠে বলল,
– “এর পর আর মাত্র দুটো বলি। তাহলেই তুই এমন ধনসম্পদের মালিক হবি, যা দিয়ে তোর সাত পুরুষ বসে খেতে পারবে।”
তুষারের চোখে ফুটে উঠলো লোভ আর হিং*স্রতার এক ভ*য়ঙ্কর মিশ্রণ।
কীভাবে বলি দিতে হয়, সেই কৌশল তুষারের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তার বিশ্বস্ত দুই সহযোগী, মনির আর দিপু, অন্ধকারে মিশে গিয়ে ঠিক শি*কারি হা*য়েনার মতো তাদের শিকারকে তুলে আনলো। ছবির মানুষটা, যার নাম আহসান, তাকে তারা শহরের শেষ প্রান্তে, নদীর ধারের নির্জন এক কাশবনে নিয়ে এলো। চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয় সাদা কাশফুলগুলোও যেন আজ ভয়ার্ত দেখাচ্ছিল। তুষার আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিল। বস্তাবন্দী শরীরটাকে মাটিতে ফেলতে দেখেই তার চোখে এক পা*শবিক উল্লাস ফুটে উঠলো। সে অধৈর্য হয়ে দিপুকে নির্দেশ দিল,
– “জলদি বস্তার মুখ খোল!”
দিপু বস্তার মুখ খুলতেই আহসানের অচেতন মুখটা বেরিয়ে এলো। আজ পর্যন্ত তুষার যতগুলো ব*লি দিয়েছে, তারা প্রত্যেকেই ছিল তার অন্ধকার জগতের কৃতকর্মের সাক্ষী। মনির আর দিপুকে ইশারা করে সরে যেতে বলে সে আহসানের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লো। লোকটাকে জ্ঞান ফেরানো দরকার। এক মুহূর্ত ভেবে তুষার এক জঘন্য কান্ড করে বসলো, আহসানের মুখে প্রস্রাব করে দিল। সেই তীব্র অপমানে আর দুর্গন্ধে আহসানের জ্ঞান ফিরলো। সে মাথা তুলে তাকাতেই তুষারের ভারী বুটের এক প্রচণ্ড লা*থি এসে লাগলো তার মুখে।
আহসানের নাক ফে*টে গল*গল করে র*ক্ত বেরিয়ে কাশফুলের সাদা জমিন লাল করে দিল। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে তুষার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। আহসান ভাঙা নাক চেপে ধরে য*ন্ত্রণাকাতর চোখে তাকিয়ে বলল,
– “স্যার… আপনি!”
– “হ্যাঁ রে, আমি।
– “আমাকে এভাবে ধরে এনেছেন কেন? আমি আপনার কী ক্ষতি করেছি?”
– “তোরা সবাই আমার পাপের সাক্ষী। তোদের শেষ না করতে পারলে আমি কোনোদিন আমার পাপ থেকে মুক্তি পাবো না। আর মুক্তি না পেলে আমার দেনা শোধ হবে না, কোনো ধন-সম্পদও আমি পাবো না।”
এরপর সে মনির আর দিপুর দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলো,
– “দেরি করছিস কেন? এই হা*রামজা*দার হাত-পা শক্ত করে চেপে ধর!”
তুষারের নির্দেশে তারা দুজন ছটফট করতে থাকা আহসানের হাত-পা চেপে ধরলো। তুষার তার ব্যাগ থেকে সেই চকচকে ধা*রালো দা-টা বের করে আনলো। আহসানের চোখের আতঙ্কিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে সে এক পোঁ*চে দা-টা চালিয়ে দিল তার গ*লায়। কয়েক মুহূর্তের অসহ্য ছটফটানির পর আহসানের শরীরটা নিস্তেজ হয়ে গেল।
– “আগের মতোই ওর লাশ থেকে সব প্রমাণ মুছে ফেল। তারপর বস্তাবন্দী করে ফেলে আয়। খেয়াল রাখবি, কেউ যেন কিচ্ছু বুঝতে না পারে।”
দীপু ইতস্তত করে বলল,
– “স্যার, যেখানে ফেলে আসার কথা বলছেন, তার চারপাশে এখন সিসি ক্যামেরা লাগানো। ওটা মেইন রোড, ওখানে ফেলে আসা এখন আর সম্ভব না। ধরা পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাছাড়া, পরপর এতগুলো খুনের পর পুলিশ, গোয়েন্দা সবাই আমাদের ধরার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।”
– “তাহলে এখন থেকে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিবি। এটাই সবচেয়ে নিরাপদ।” তুষার নতুন পরিকল্পনা বাতলে দিল।
মনির সায় দিয়ে বলল,
– “হ্যাঁ স্যার, এটাই ঠিক হবে।”
তারা আহসানের নিথর দেহটাকে নদীতে ভাসিয়ে দিল। রাতের নদীর কালো জলে একটা জীবনের শেষ চিহ্নটুকুও মিলিয়ে গেল। তুষারের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক ক্রুর, বিজয়ীর হাসি।
একসময় এই তুষারই ছিল শহরের নামকরা, সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু সাফল্যের চূড়ায় ওঠার জন্য সে এমন কোনো নোংরা কাজ নেই যা করেনি। নিজের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সবার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার পথের কাঁটা হয়ে যে-ই দাঁড়িয়েছে, তাকেই সে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বিশাল অঙ্কের দেনার দায় তার ঘাড়ে চেপে বসেছে। সেই দেনা থেকে বাঁচতেই সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যেই তার খোঁজ মেলে সেই রহস্যময় সাধকের। সাধকই তাকে পথ দেখিয়েছে, তার পাপের সাক্ষীদের একে একে ব*লি দিতে পারলেই নাকি তার সব বিপদ কেটে যাবে, সে ফিরে পাবে হারানো ধন-সম্পদ। সাধকের দেখানো কিছু প্রমাণে বিশ্বাস করে সে এই ভয়ঙ্কর পথে পা বাড়িয়েছে।
এখন তার পাপের সাক্ষী হিসেবে বেঁচে আছে শুধু একজন, তার স্ত্রী, অধরা। আর তুষারের মনে কেন যেন একটা কাঁটার মতো খচখচ করছে যে, অধরা যেকোনো মুহূর্তে সব কথা সায়নকে বলে দিতে পারে। তাই তার পরবর্তী দুটো টার্গেট স্থির হয়ে গেছে। এবার বলির মঞ্চে উঠবে সায়ন আর অধরা।
চলবে…..!
