কল্পকথা নয় তো,
রুচিরা সুলতানা
__একটু দূরে গিয়া বসেন। আম্মাজান আর ভাইজান কিন্তুক ঘুমায় নাই… ওরা তো দেখতাসে সব… আপনে হুজুর মানুষ।
বিয়ের দ্বিতীয় রাতে, নতুন বউ সালমা বানুর কথা শুনে মাওলানা আশরাফ আলী চমকে উঠলেন ।
গতকাল শুক্রবার দিন বাদ জুম্মা, আশরাফ আলীর বিয়ের কাজ সুসম্পন্ন হয়েছে। কনে, বড় হুজুরের একমাত্র মেয়ে সালমা বানু ।
আজ সকালে নতুন বৌকে নিয়ে নিজের বাড়িতে এসেছে… মা, বড় বোন এবং আত্মীয়স্বজনের দোয়া নিতে ।
যে সাজানো খাটে আশরাফ আলী তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে বসে রয়েছে, সেটি অনেক পুরনো… একটু নড়লেই, ক্যাচক্যাচ শব্দ হয়।
স্ত্রীর কথা শুনে আচমকা পিছনে সরে বসতে গিয়ে, খাটে ক্যাচক্যাচ শব্দ হলো।
চারপাশটা এতো নীরব… সম্ভবতঃ এই শব্দ আশেপাশের ঘর পর্যন্ত গেলো।
খাট মেরামত করবে বা নতুন খাট কিনবে, মাওলানা সাহেবের বাড়িতে এমন লোক কই ? ছোট দুইভাই দুবাই প্রবাসী, বাড়িতে আছে কেবল বয়স্ক মা আর বিধবা বড় বোন।ঘরদোরের সাজসজ্জায় তাদের আগ্রহ নাই।বিয়ে উপলক্ষে খাট সাজানোর বন্দোবস্ত করতে বলায়, তারা কিছুটা অসন্তুষ্ট।
মাওলানা আশরাফ আলী ছোটবেলা থেকেই মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছে। সেখানেই থাকা খাওয়া সব।
দাখিল পাশ করার পর, মাদ্রাসার বড় হুজুর ফয়েজুল খান সাহেবের বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে থাকা শুরু করেছিল… আল্লাহ পাকের মেহেরবানিতে, সেই বাড়িরই জামাই হয়ে গেলো আশরাফ আলী।
নিজের একান্ত প্রচেষ্টার জোরে, বড় হুজুরের একান্ত সাগরেদ হয়ে উঠেছিল এই মাওলানা আশরাফ আলী।
বহুবছর যাবৎ বড় হুজুরের মাথায় ব্যামো।
খুব জটিল কিছু নয়, তবে মাঝেমাঝেই বড় হুজুর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কখনো আবার মাথায় তীব্র যন্ত্রণা হয়। তাই, হুজুরের বাড়ির দীর্ঘদিনের পুরনো মক্তবখানার দেখাশোনার সকল দায়িত্ব মাওলানা আশরাফ আলীর।
এই বাড়িতে থেকে মক্তবখানা দেখাশোনার পাশাপাশি, কামিল পাশ করেছে আশরাফ আলী।সেই সাথে ছোট দুই ভাইয়ের লেখাপড়া, বিদেশে পাঠানো, অসুস্থ মা আর বিধবা বড়বোনের খরচপত্র যোগান দিয়েছে ।
মাওলানা আশরাফ আলীকে বড় হুজুর এতোটাই ভরসা করেন যে, সংসারের যাবতীয় কাজের দায়িত্ব নিশ্চিন্তে তার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। সবশেষ, নিজের একমাত্র মেয়ে সালমা বানুকেও উনার হাতেই তুলে দিয়েছেন।
এজন্যে অবশ্য আশরাফ আলী নিজেকে সৌভাগ্যেবান মনে করে। বড় হুজুরের ভরসার দাম রাখতে প্রয়োজনে জান হাজির তার ।
বড় হুজুরের বাড়িতে দীর্ঘ আট বছর যাবৎ আছে মাওলানা আশরাফ আলী ।এই পরিবারের মোটামুটি সবকিছুই তার জানা। বড় হুজুরের স্ত্রী লতিফা বানু এবং একমাত্র ছেলে ফরিদুল খান একযুগ আগে ইন্তাকাল করেছে ।সালমা বানুর বয়স তখন মাত্র সাত বছর।
এতগুলো বছর পার হয়ে যাবার পরেও বড় হুজুর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। বরং স্ত্রীর শোকে শোকে মাথার ব্যামোতে আক্রান্ত হয়েছেন ।
এইসব আশরাফ আলীর অজানা নয়।
অবশ্য বড় হুজুরের স্ত্রী আর ছেলের মৃ*ত্যু নিয়ে গ্রামে নানারকম গল্প শোনা যায়। বড় হুজুরের ছেলে স্বাভাবিক ছিল না। জন্মগত জটিল রোগে আক্রান্ত ছিল সেই ছেলে।
লোকজন বলাবলি করে, লজ্জায় নাকি ছেলেকে কারো সামনে বের করতেন না, বড় হুজুরের স্ত্রী। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে নিজের হাতে মে*রে, নিজেও আত্ম*ঘাতী হয়েছিলেন তিনি।
যদিও আশরাফ আলী এসব কথা বিশ্বাস করে না। কারন বড় হুজুর নিজের মুখে বলেছেন, উনার স্ত্রী এবং ছেলে পানিতে ডুবে মা*রা গেছে। অসুস্থ ছেলেকে পানি থেকে উদ্ধার করতে গিয়েই হুজুরের স্ত্রীর মৃ*ত্যু হয়েছে।
বড় হুজুরকে অবিশ্বাস করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না আশরাফ আলী।
কিন্তু গতকাল সালমা বানুকে বিয়ে করার পর থেকে, কেমন একটা অদ্ভূত অনুভূতি হচ্ছে। বাবার মতো মেয়েরও কি মাথায় গন্ডগোল আছে? নাকি অতিরিক্ত রূপসী হবার কারনে কোনো দুষ্ট জি*নের আসর হলো?
আশরাফ আলী চারপাশে তাকিয়ে বললো,
__কি বলতেসো এইসব, সালমা বানু ? কার আম্মা, কার ভাই? এই ঘরে তো তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ নাই।তাছাড়া আম্মাজান আর ভাইজান কি দুনিয়ায় আছে?
সালমা বানু ফিসফিস করে বললো,
__ কি বলেন এইসব উল্টা পাল্টা কথা? আম্মাজান আর ভাইজান খাটের তলায় লুকাইয়া আছে।ওরাও আমার সংগে এই বাড়িতে আসছে।আমারে ছাড়া থাকনের অভ্যাস নাই তো, তাই। আবার শরমে সবার সামনে আসতে পারতাসে না। কুটুমবাড়ি না?সারাদিন কিছু খায় নাই… তাই, ঘুমাইতে পারতেসে না ।একটু খাওন দিলে ঘুমাই যাইবো। আমি নতুন বউ, লজ্জায় কাউরে কিছু বলতে পারি নাই। আপনে দুইজনের জন্য একটু খাওয়নের ব্যবস্থা করেন।
সঙ্গে সঙ্গে খাটের তলায় খুটখাট শব্দ হলো।
আশরাফ আলীর বুকটা কেঁপে উঠলো।কিন্তু পুরুষ মানুষের এতো অল্পতে ভয় পেলে চলে না।
আশরাফ আলী যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বললো,
__সালমা বানু আমি একজন মাওলানা। তার চেয়ে বড় কথা, আমি তোমার স্বামী ।মরহুম মা ভাই নিয়া, আমার সঙ্গে এই ধরনের ঠাট্টা তামাশা করাটা কি তোমার উচিত হচ্ছে?
সালমা বানু বিরক্ত চোখে আশরাফ আলীর দিকে তাকালো।তারপর গম্ভীর গলায় বললো,
__আম্মাজান , ভাইজানরে নিয়া ঘুমাই পড়েন।রাইতে খাওনের আশা বাদ ।মাওলানা সাহেবরে যেমন দিল দরিয়া মনে করসেন, তেমন না। খাওনের ব্যবস্থা আমারেই করতে হইবো।রাইতটা পোহাক, ব্যবস্থা একটা করমু আমি।
আশরাফ আলী স্পষ্ট শুনতে পেলো, খাটের নীচে কেউ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে ।
জোরে জোরে দোয়া পড়তে পড়তে আশরাফ আলীর পাঞ্জাবী ঘামে ভিজে গেলো ।
এরপর চোখের সামনে চারপাশটা অন্ধকার হয়ে গেলো। আবছা ভাবে সালমা বানুর কেমন একটা ফ্যাসফ্যাসে গলা শুনলো আশরাফ আলী,
__আম্মাজান, মাওলানা সাহেবের জ্ঞান নাই। আপনারা উপরে উইঠা আসেন ।
সঙ্গে সঙ্গে একটা ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢাকা নারী খাটের নিচ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলো। সাথে একটা ছেলে… তার শরীরে একটুকরো কাপড়ও নেই।
ছেলেটি ঘোমটা পরা নারীকে জড়িয়ে ধরে বললো,
__ভয় লাগতাসে আম্মাজান, খুব ভয় লাগতাসে…
ছেলেটির গলার স্বর অবিকল মেয়েদের মতো।
হারিকেনের আলোয় মৃদু আলোয়, ছেলেটি ভয়ার্ত চোখে আশরাফ আলীর দিকে তাকালো।
সেই দৃষ্টি দেখতে দেখতে আশরাফ আলী জ্ঞান হারালো।
চলবে…
