#পুন্যোদয়
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব ২
এরপর কেটে গেছে দু’দিন।
এই দু’দিনে সকাল-সন্ধ্যা, আলো-অন্ধকার,সবকিছুই আরিজার কাছে একই রকম।
সময় যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে।
ফোনে কারও নাম জ্বলে ওঠে না,চায়ের কাপের ধোঁয়াও আর তার ঘর ভরে না।একসময় সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখে,চোখদুটো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
আজ ক্লাস টেস্টের তারিখ। লিয়া ফোন দিয়ে জানিয়েছে,যেতেই হবে।
তবু মন বলে, “কি দরকার?”
আরিজা বিছানায় শুয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর অনিচ্ছায় উঠে পড়ে।
দুইদিন তেমন একটা ঘুম হয়নি, চোখ জ্বা’লাপোড়া করে উঠে। নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে হোস্টেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল।
ক্লাসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে হালকা হাঁপাচ্ছে সে। ক্লাসরুমের ভেতরে অস্বাভাবিক নীরবতা। সবাই চুপচাপ। সাধারণত এরকম নীরব বা মান্য তো ওরা না। আরিজা অবাক হলো। উঁকি দিয়ে দেখতে পেল,বোর্ডের সামনে এক যুবকমতন দাঁড়িয়ে আছে। গাঢ় নীল পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা।
চক ধরে বোর্ডে কিছু লিখছে, “মানুষ সময়ের মধ্যে বেঁচে থাকে,কিন্তু ইতিহাস তাদের কাজের মধ্যে।”
“যে জাতি ইতিহাস ভুলে যায়, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ হারায়।”
আরিজা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। ইনাকে তো টিচারের মতো লাগছেই না!
সে মিনমিন করে শুধায়,
“আসবো?”
তখনই কণ্ঠটা গম্ভীরভাবে উচ্চারিত হলো,
“আপনি?”
আরিজা চমকে তাকালো। তারপর শান্ত কণ্ঠে আওড়ালো,
“আরিজা রহমান।”
লোকটার চোখ এক মুহূর্ত তার দিকে গেল, তারপর নিঃশব্দে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। বোর্ডে চক রেখে ঠান্ডা গলায় বলল,
“কত লেট?”
আরিজা হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“দু’মিনিট।”
“এর মূল্য জানেন?”
প্রতুৎতরে আরিজা কিছু বলতে পারলো না। সে স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
“এই দু’মিনিটে আপনাদের জীবন আল্লাহ চাইলে উলটে যেতে পারে। সময়ের মূল্য দিতে শিখুন। ”
আরিজা মিনমিন করে উত্তর দেয়, “সরি স্যার। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে।”
লোকটা একটু হেসে দিয়ে আওড়ায়,
“কি প্রাউডলি স্বীকারও করছে!”
“সরি স্যার। আর হবে না।”
“এতো ক্ষণ কে ঘুমায়?”
আরিজা একটু থেমে বলল,
“স্যার, রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়েছে।”
বিপরীত পাশ থেকে চোখ না তুলেই উত্তর এলো,
“নামাজ পড়েন?”
আরিজা চুপ। মাথা নিচু করে ফেলল।
“আমি তো ভাবলাম, তাহাজ্জুদ পড়েছেন। তাই বোধহয় ঘুম আসতে দেরি হয়েছে।”
আরিজা মাথা নিচু করে ফেলল। এ কার পাল্লায় পড়লো। এরকম জানলে সে ক্লাসের এক ঘন্টা আগে এসে বসে থাকতো। মনে মনে লিয়াকে গালি দিলো। মেয়েটা তাকে বললও না যে, নতুন তেড়া টিচার এসেছে!
“আমার ক্লাসে কেউ যেন এক সেকেন্ডও এদিক ওদিক না করে। যে করবে, সে যেন আর আমার ক্লাসে উপস্থিত না হয়। ” বলেই আরিজাকে ঢুকতে বলল।
আরিজা আস্তে হেঁটে গিয়ে ক্লাসে ঢুকতেই অদ্ভুত একটা সুঘ্রান নাকে এসে বিধঁতেই তার পিলে চমকে উঠে। একটা গভীর, পরিচিত গন্ধ।
চেনা, অথচ অবিশ্বাস্য।
এটা গতদিনের তাকে বাঁচানো সেই আগন্তুকটার মতো ঘ্রানটা! যে নিঃশব্দে এসে আবার তেমনি নিঃশব্দে হারিয়ে গিয়েছিল।
আরিজা স্থির দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে।
চোখ বুলিয়ে দেখল, পরিচিত মুখ ছাড়া কেউ নেই এখানে।
সবাই তার সহপাঠী, চেনাজানা মানুষ।
তবুও এই ঘ্রাণটা কোথা থেকে এল?
মনে মনে বলল,
“না, এটা নিশ্চয়ই ভ্রম। হয়তো কারো পারফিউম…”
আর ক্লাসের সবাই তো তাকে চিনে। চেনাজানার মধ্যে কেউ বাঁচালে সে নিশ্চই ক্রেডিট নেয়ার জন্য দুচারটে কথা আরিজাকে অবশ্যই বলতো।
সে নিজের ভ্রম ভেবে পেছনের বেঞ্চে বসল।
তারপর লোকটা বোর্ডে লেখা মুছে ফেলে সোজা দাঁড়িয়ে পরিচয় দিল,
“আমি ইহতেশাম আহমেদ। ইতিহাস বিভাগের নতুন প্রভাষক। হয়তো আমার পড়ানোর ধরণ তোমাদের কাছে নতুন লাগবে, কারণ আমি শুধু ইতিহাস নয়, জীবনের ইতিহাসও শেখাতে চাই।”
ক্লাসের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
আরিজা প্রথমবারের মতো স্থির বসে তার কণ্ঠ শুনল মন দিয়ে।
একটা অদ্ভুত শান্তি ভেসে বেড়াচ্ছে সেই কণ্ঠে,যেন শব্দ নয়, দাওয়াত; জ্ঞানেরও নয়, ঈমানের পথে ফেরার আহ্বান। কেউ এভাবে তাদের পড়ায়নি!
—–
ক্লাসরুম থেকে বের হতেই আরিজা থমকে গেল।
সামনের বটগাছের নিচে রায়ান বসে আছে—কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে গল্পে মেতে।
হাসছে, চায়ের কাপ হাতে, যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তা নেই।
আরিজার চোখ পড়তেই সে মুহূর্তের জন্য চুপ করে গেল,
তারপর হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নিল—
যেন আরিজা তার জীবনের কেউই নয়,
যেন এই মেয়েটা কখনো তার গল্পে ছিলই না।
আরিজা স্থির দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ,
তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে লাইব্রেরির দিকে হাঁটল।
চারপাশে বিকেলের আলো নরম হয়ে আসছে,
গাছের পাতার ছায়া মেঝেতে পড়ছে।
লাইব্রেরিতে ঢুকে এক কোণে বসে সে ব্যাগ খুলল,
ফোনটা বের করে আনল—
স্ক্রিনে তখনও রায়ানের সেই শেষ মেসেজটা জ্বলজ্বল করছে:
> “আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি, আরিজা।”
আরিজার শ্বাস ভারী হয়ে এল, কিন্তু চোখের কোণে কোনো জল নেই।
কখনো কখনো ব্যথা এত নিঃশব্দ হয়,
যে চোখের জলও লজ্জা পেয়ে বেরোতে চায় না।
তার পাশেই লিয়া বসে আছে।
চুপচাপ তাকিয়ে দেখছে মেয়েটার মুখ।
আরিজার চোখ শুকনো, কিন্তু ভিতরে কিছু একটা ধসে পড়ছে,যেন ভিতরের পুরো শহরটা হঠাৎ অন্ধকারে ডুবে গেছে।
লিয়া ভাবছে,
“বাবামায়ের এতো আদরের মেয়ে… এমন নিরব কষ্ট কেউ কিভাবে পায়?”
ঘড়ির কাঁটা তখন চারটা ছুঁয়েছে।
সূর্যের রোদ জানালা দিয়ে ঢুকে বইয়ের পাতায় ছড়িয়ে পড়ছে।
অক্ষরগুলো যেন ঝাপসা হয়ে গেছে,
যেন প্রতিটা লাইনের মাঝেই লুকিয়ে আছে আরিজার না বলা কষ্ট।
তখনই ফোনটা কাঁপল।
স্ক্রিনে লেখা,বাবা কলিং…
আরিজা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল,
তারপর ধীরে কলটা রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে বাবার কণ্ঠ,
“মা কাল ক্লাস শেষে একবার বাড়ি চলে আয়। কিছু কথা আছে।”
এই কথাটাই তো সে বহুবার শুনেছে।
প্রতিবারই মানে একটাই,নতুন একটা পাত্র।
প্রতিবারই সে না বলেছে।
কিন্তু আজ… আশ্চর্যভাবে মুখ থেকে শুধু একটা শব্দ বেরোল,
“ঠিক আছে।”
লিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
চুপচাপ মেয়েটার চোখে যেন কোনো সিদ্ধান্ত ঝুলছে।
সে ভয় পেল,
এই ভাঙা মুহূর্তেই যদি আরিজা জীবনের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে!
বাইরে বিকেলের রোদ ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
হাওয়ায় বইয়ের পাতা উল্টে যায়,
একটা পাতার কোণে লেখা,
> “হারিয়ে গেলে কখনো কখনো নিজেরই খোঁজ মেলে।”
আরিজা পাতা বন্ধ করে মাথা নিচু করল।
তার মনেও কোথাও যেন সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটার ঘ্রাণ ভাসছে,যে মানুষটা হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকেই একবার এসেছিল,আর এখন দূর থেকে তাকিয়ে আছে…
—
আরিজা জানালার পাশে বসেই বাইরে তাকিয়ে ছিল। আজ ক্লাস শেষ করেই বাড়ির পথে রওনা দিবে সে।
দূরের আকাশে রোদের রঙটা কেমন জানি ফ্যাকাসে লালচে, অথচ তাতে কোনো ভালো লাগা নেই।
মন আজ যেন কোথাও স্থির হয় না।
ঠিক তখনই ঠুস! শব্দে একটা মার্কার পেন এসে পড়ল তার মাথায়।
“আফ!”
আরিজা মাথা চেপে কিছুক্ষণ স্থির রইল। ভ্রু কুঁচকে ভাবল— পাশের লিয়াই বোধহয় মেরেছে।
সে নিচে তাকিয়ে চোখ রাগে টকটক করে লাল করে ফেলল।
লিয়া হঠাৎই চোখ বড়ো করে ইশারা করল,
“চুপ! সামনে তাকাও!”
আরিজা কৌতূহল নিয়ে বোর্ডের দিকে তাকাতেই কণ্ঠটা কানে বাজল,
“এই যে মিস!”
সেই একই গম্ভীর কণ্ঠ।পুরো ক্লাস চুপচাপ।
আরিজা থমকে গেল।
“মন কোথায়?”
চোখে তাকাতে পারল না সে। আস্তে করে উঠে দাঁড়াল,
“সরি, স্যার…”
ইহতেশাম নিচু হয়ে টেবিলের খাতা গুছাতে গুছাতে শান্ত স্বরে বলল,
“একে তো লেট করে আসবেন, তার উপর মন বাইরে দিবেন?”
তারপর দৃষ্টি না তুলেই যোগ করল,
“এরকম হলে, নেক্সট টাইম থেকে সোজা বের হয়ে যাবেন। এখানে এমন স্টুডেন্টের দরকার নেই যার নিজের লাইফের কোনো গোল নেই। যে নিজের উদ্দেশ্য জানে না, সে কিভাবে শিখবে আর অন্যকে শেখাবে?”
পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ।
তারপর তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বাকিদের উদ্দেশ্যে বললেন,
“এখন আপনারা এমন বয়সে আছেন, যখন আপনাদের অন্যকে শেখানোর কথা। অথচ এখনো আপনাদের শেখাতে হচ্ছে,সময়, শৃঙ্খলা আর দায়িত্বের মানে কী! জীবন কি এতই তুচ্ছ?”
শেষ কথাটায় আরিজা কেমন যেন কেঁপে উঠল।
মনে হলো, কথাগুলো যেন সরাসরি তার বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধছে।
সে ভাবল, লোকটা কি ওর দিকেই ইঙ্গিত করল?
কিন্তু কেনই বা করবে! ক্লাসেই তো তাদের প্রথম দেখা!
সে একটু সাহস করে তাকালো,
না, ইহতেশামের চোখ তার দিকে নয়; দৃষ্টি স্থির বোর্ডে।
লিয়া আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“টিচারটা অন্যরকম। মেয়েদের দিকে তাকায় না।”
আরিজা চুপচাপ মাথা নিচু করে ফেলল।
‘সরি’ বলেও লাভ হলো না।
একটু পরই ইহতেশাম ঠান্ডা গলায় বলল,
“আপনি বাইরে যেতে পারেন।”
আরিজা স্তব্ধ হয়ে ব্যাগ তুলে নিল।
কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে। এখন গন্তব্য বাসার দিকে।
#চলবে ইন শা আল্লাহ।
