#পুন্যোদয়
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব ১
“দুইটা বছরের সবকিছুই কি মিথ্যা ছিল? তুমি কি আমাকে একটুও ভালোবাসোনি, রায়ান ভাই?”
“না।”
শব্দটা এতটাই সহজে উচ্চারিত হলো, যেন এর ভেতর কোনো ভারই নেই। অথচ সেই এক শব্দেই যেন ভেঙে গেলো আরিজার বুকের ভেতরের সবকিছু।
“তুমি যত সহজে “না” বলতে পারলে, সবকিছু কি সত্যিই তত সহজ ছিল?”
রায়ান আরিজার পানে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল,
“তুমি আগে থেকেই ভেবে নিয়েছিলে, আরিজা। আমি তো কখনও কিছু বলিনি। আমি তোমাকে শুধুই জুনিয়র হিসেবে ট্রিট করেছিলাম। তুমি সেটা ভালোবাসা ভেবে নিয়েছো—এটা পুরোপুরি তোমার দোষ।”
আরিজার ভেতরটা কেঁপে উঠলো। তার খুব বলতে ইচ্ছে করলো,’তুমি সত্যিই জুনিয়র হিসেবে ট্রিট করেছো?’
কিন্তু মুখ খুলেও কিছু বলতে পারলো না। কথাগুলো ঠোঁটের কাছে এসে আটকে গেলো।
রায়ান নির্লিপ্তভাবে বলল,
“তুমি আশা করি বুঝতে পেরেছো।”
আরিজা মৃদু হাসলো-একটা তিক্ত, ভাঙা হাসি। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“মধ্যরাতে কল দিয়ে অনলাইনে না আসার কারণ জিজ্ঞেস করাটাও তাহলে জুনিয়র হিসেবে ট্রিট করা, তাই না?”
রায়ান তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তার চোখে কোনো অনুতাপ নেই, কেবল ঠান্ডা স্থিরতা।
“হ্যাঁ,”—শান্ত স্বরে উচ্চারণ করল সে।
“বিয়ের কথা তুলেছিলাম বলে তুমি এমন করলে, তাই না? তুমি তো আসলে আমাকে ভালোই বাসোনি!”
রায়ানের চোখে সামান্য এক ঝলক ব্যথা ফুটে উঠল, কিন্তু তার স্বর স্থির থাকলো।
“তুমি বুঝতে পারো না, আরিজা! ভালোবাসা মানে বিয়ে নয়।”
আরিজা কেবল চুপচাপ তাকিয়ে রইলো, তারপর শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে ভালোবাসার মানে কী?”
রায়ান কোনো উত্তর দিল না। তার ঠোঁটের এক ছেদও ভাঙল না। শুধু বলল,
“আজ থেকে আমাকে আর কন্টাক্ট করার চেষ্টা করো না।”
রায়ান আর কিছু বলল না। ব্যাগ কাঁধে তুলে নিলো। এরপর কুয়াশায় ঢাকা ছায়াঘেরা পথ দিয়ে ধীরে ধীরে পা ফেলে চলে গেল। আর সেই সঙ্গে আরিজার ভিতরে যেন কিছু একটার মৃ’ত্যু ঘটে গেল। হৃদয়ের এক কোণে এমন শূন্যতা, যা শব্দে বলা সম্ভব নয়।
আরিজা হঠাৎ হাসলো-একটা বিষাক্ত, কেঁপে ওঠা হাসি। মনে পড়ল, প্রথমবার যখন রায়ান কল দিয়ে কন্টাক্ট করেছিল। তখন ভেবেছিল, এই ভালোবাসা বুঝি সেই জনম জনম ধরে চলা ভালোবাসা! অথচ! দুই বছরের মাঝেই সেই সময়ের সব উচ্ছ্বাস, আনন্দ-আজ যেন ধূলিসাৎ হয়ে ঝরে পড়লো!
আরিজা স্থির হয়ে বসে রইল। চোখে রায়ানের সেই অতীতের প্রতিচ্ছবি, কিন্তু আজ আর তাকে আটকানোর কোনো ইচ্ছে হলো না।
চুপচাপ রায়ানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ২ বছর ধরে যে ছেলেটাকে সে মন দিয়ে রেখেছিল, সেই আলাদা, সুদর্শন ছেলেটাকে আজ আর ঐভাবে দেখার কোনো ইচ্ছে আর হলো না।
রায়ানের কাছে কাছে বসে থাকা মুহূর্তগুলো মনে পড়ল, অথচ আজ তা শুধু স্মৃতির আঁচড় হয়ে রইল।
চারদিক থেকে মাগরিবের আজানের মৃদু প্রতিধ্বনি ভেসে আসছে। দূরের মসজিদ থেকে আসে সেই শুদ্ধ, গভীর সুর, যা অচেনা কোনো অনুভূতিকে স্পর্শ করছে।
ছায়াঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পথের মাঝের বেঞ্চ ছেড়ে আরিজা উঠে দাঁড়াল। সন্ধ্যা হতে হতে চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে, শীতকালের ঠান্ডা হাওয়া তার মুখে ভেসে যাচ্ছে। ধোয়ামাখা রাস্তা ধরে সে হাঁটছে,প্রতিটি পদক্ষেপ যেন অতীতের স্মৃতিগুলোকে তার মনে ফিরে এনে দিচ্ছে। রায়ান তার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এই মানুষটাকে ছাড়া সে কিভাবে বাঁচবে! এই প্রশ্নটি তার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে বাজছে।
অদূরের মসজিদগুলো থেকে আজানের নিঃশব্দ সুর ভেসে আসছে। কেউ নামাজের পথে এগোচ্ছে, কেউ হয়তো ভালোবাসার ভোর থেকে ফিরে আসছে। আরিজা ঠিক জানে না, সে কোন পথে হাঁটছে-আল্লাহর পথে, নাকি নিজের পাপের পথে! শুধু জানে, আজ তার ভেতরের আলোটা নিভে গেছে।
দূরের আজানের প্রতিধ্বনি যেন তার মনকে টানে। টলটল পায়ে সে হোস্টেলের দিকে এগোচ্ছে। চায়ের দোকানের টুংটাং শব্দও তার পথকে থামাতে পারছে না। সে নিরব চুপচাপ এগিয়ে চলেছে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপে হারিয়ে যাচ্ছে নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বের ছায়ায়।
——-
এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের রাস্তা হওয়ায় সহজে কেউ আসে না। শীতকালের সন্ধ্যা শেষ হয়ে যাওয়ায় মাগরিবের পরের সময়টা খুব তাড়াতাড়ি অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে। আরিজা আশেপাশে তাকালো,কোথাও কোনো রিকশার আলো নেই, কোনো মানুষের ছায়া নেই। সে আপনমনে ধীর পায়ে হাঁটছে, নিঃশব্দতার মাঝে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
হুট্ করেই অন্ধকারের মাঝেই রাস্তার একটি গাড়ির তির্যক আলো আরিজার চোখেমুখে এসে আঁচড়ে পড়ল। রিফ্লেক্সের মতো দুহাত দিয়ে সে চোখ ঢেকে ফেলল। মনে হলো, এই বুঝি গাড়িটা তাকে পি’ষে দিয়ে চলে যাবে!
কিন্তু না,মুহূর্তের মধ্যেই কেউ এসে তার হাত ধরে রাস্তার ধারে টেনে নিয়ে গেল। গাড়িটা একদম গা ঘেঁষে চলে যাওয়ার সাথে সাথেই আগন্তুকও তাকে ছেড়ে দিল। আরিজা থমথমে হয়ে দাঁড়াল। ভয়ের চিহ্ন তার শরীরে ছড়িয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। সামনে থাকা আগন্তুকটার গায়ের অদ্ভুত সুঘ্রান নাকে এসে লাগছে। দীর্ঘক্ষন পরে চোখ খুলতে খুলতেই আবিষ্কার করল, সে একা দাঁড়িয়ে-কেউ নেই তার সামনে।
সে তড়িঘড়ি করে পেছনে ফিরে তাকালো। ল্যাম্পপোস্টের অন্ধকার আলোয় দেখা গেল, একজন সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত আগন্তুক ধীরে ধীরে অদূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। তার অবয়ব কুয়াশার সাথে মিশে যাচ্ছে, শুধু তার পেছনের দিকটুকুই আলোর মাঝে কিছুক্ষন পর্যন্ত স্পষ্ট। এরপর অন্ধকারে তার অবয়ব ধীরে ধীরে দূরের রাস্তায় মিলিয়ে গেল।
আরিজা মনে মনে ভাবল, স্বয়ং আল্লাহই হয়তো এই মানুষটিকে পাঠিয়েছে। অথচ একবারও সেই মানুষটার চেহারা দেখতে পেল না!
আরিজা পেছন থেকে ডাক দিল, কিন্তু আগন্তুক পিছু ফিরে তাকাল না। নিঃশব্দতা তার চারপাশে আরও গভীর হয়ে উঠল, আরিজার হৃদয়ে এক অদ্ভুত রকমের শীতল কাঁপন ছড়িয়ে দিল।
অনাকাংক্ষিতভাবে আগন্তুকটা অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই একটি রিকশা এসে হাজির হলো। আরিজা দ্রুত রিকশায় উঠে বসল। রিকশা ছুটতে শুরু করল, আর সে একবার পেছনে তাকাল,অন্ধকারে ঢাকা সেই রহস্যময় রাস্তার দিকে। যেখানে এক স্বপ্নের মতো মানুষ তার জীবনকে অদ্ভুতভাবে ছুঁয়ে গেছে। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো একটাই শব্দ,অদ্ভুত!
কে এই আগন্তুক! বাঁচিয়ে গেল অথচ একবার দেখাও দিল না!
#চলবে ইন শা আল্লাহ।
