#হৃদয়ের গভীরে যে তোমারই নাম প্রিয়সী
#পর্বঃ৭
#পাপড়ি জাহান
পরের দিন থেকে মেহের ও আয়মানের বিয়ের বড় সরভাবে তোড়জোড় চলছে।আজ আয়মান ও মেহেরের এনগেজমেন্ট।চারদিকে খুব সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে।আয়মানের বাড়িতে বসেই এ অনুষ্ঠান হবে।কত শত আয়োজন আয়মান মেহেরের জন্য করেছে হিসেব নেই।যা দুর থেকে দেখে ওর বন্ধুরা হেসেছে।কেউ কেউ আবার ঠাট্টাও করেছে।কিন্তু সেদিকে আয়মানের ভ্রুক্ষেপ নেই।
মেহেরের অদ্ভুত অনুভুত হচ্ছে।কালকে থেকে ও ওর নেতাসাহেবের সাথে থাকবে ভাবতেই ওর গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।বিছানার চাদর খামছে ধরে আয়মানের কথা ভাবতে লাগল।
কলি এসে বলল কি ম্যাডাম তৈরিতো নিজের স্বপ্নপুরুষের কাছে যাওয়ার জন্য?
মেহের লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইল।
কলি হেসে বলল পার্লার থেকে বিউটিশিয়ন এসেছে তোকে সাজানোর জন্য।
মেহের তারাতারি উঠে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসল।বিউটিশিয়নরা খুব সুন্দর করে মেহেরকে সাজাতে লাগল।সাদা একটা গাউন পরাল।সাথে খুব নেচ্যারাল মেকাপ করল।ঠোটে লাল লিপিস্টিক কানে হিরের ছোট দুইটা টপ।হাতে একটা বেসলাইট গলায় ভারি একটা নেকলেস পরাল।সব মিলিয়ে মেহেরকে রাজকুমারীর মত লাগছিল।
বিউটিশিয়ন খুশি হয়ে বলল মাশআল্লাহ খুব সুন্দর লাগছে তোমায়….মন্ত্রীসাহেব তোমার দিকে থেকে চোখই ফেরাতে পারবেনা বলেই সবাই হেসে উঠল।
হঠাৎ রায়ান দৌড়ে এসে বলল সাম্মা দেখো তো আমায় কেমন লাগতে?
মেহের রায়ানকে কোলে তুলে নিয়ে ভালো করে দেখল।পরনে সাদা শার্ট ও সাদা ব্লেজার।।
আমার সুপারম্যানকে অনেক সুন্দর লাগছে।
রায়ান খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল সত্যি???
হুম তিন সত্যি….
রোদ রুমে এসে এসব দেখে হাসল।তারপর মেহের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল আমার ছোট্র পিচ্ছি বোনটা যে কবে এত বড় হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না।
মেহের এসব শুনে রোদ কে জরিয়ে ধরে কেদে দিল।
এই মেহের এভাবে কান্নাকাটি করে মেকাব নষ্ট করিস না পরে দেখা যাবে।আয়মান তোকে দেখে পালাবে।
ওমনি দুজনের মধ্য শুরু হলো মারামারি আর ঝগরা।
————
দীর্ঘ ৩ ঘন্টা জার্নি করার পর গাড়ি এসে থামল আয়মানদের বাড়ির সামনে।সবাই একে গাড়ি থেকে নামল।আশেপাশে থাকা সকল সাংবাদিকরা মেহেরকে ঘিরে দরল।যার কারনে মেহের অসস্তিতে পরল।চোখ বুলিয়ে চারপাশে তাকাল কিন্তু কোথাও আয়মানকে দেখতে পেলনা।হয়ত জরুরি কাজে বাহিরে গিয়েছে।নিরা এসে মেহেরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ভিতরে নিয়ে গেল।এইদিকে সাংবাদিকরা একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছিল।—
—“মেহের মেম, আজকের অনুষ্ঠানে কি পরিকল্পনা করেছেন?”
—“আয়মান স্যারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক এখন কেমন?”
—“আপনি কি ভাবছেন, নির্বাচনে কোন প্রভাব ফেলবেন?”
—“আপনি কি কিছু বিশেষ বার্তা দিতে চান জনতার জন্য?”
প্রশ্নের ঢল থামছিল না, সেদিকে নিরা পাওা না দিয়ে মেহেরকে নিয়ে তিন তলায় গেল।
পুরো হলরুমটা একদম সুরুচিপূর্ণভাবে সাজানো। সাদা গোলাপের কোমল সুবাস বাতাসে ভেসে চলছিল, আর ঝলমল করা বেলিফুলগুলো রুমের প্রতিটি কোণকে আলোকিত করছিল। পুরো পরিবেশটাই যেন শান্তি আর রোমান্টিকতার এক মৃদু মিশ্রণ তৈরি করেছিল।
বউ এসেছে শুনে সকল নেতাকর্মীর বউগুলো একসাথে মেহরকে ঘিরে ধরল। রুমটা মুহূর্তেই হাসি-ঠাট্টার ঝলকানিতে ভরে উঠল। কেউ ওর রূপের প্রশংসা করল, কেউ আবার খুনসুটি মিশিয়ে মজা করতে লাগল।
হঠাৎ একজন বউ অবশেষে জিজ্ঞেস করল—
—“কেমন করে পটালে মন্ত্রীসাহেবকে?”
মেহরের চোখ ম্লান হয়ে গেল। সে লজ্জা পেয়ে কিছু বলতে পারল না। তার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। ।
মেহেরের এমন নিরাবতা দেখে সবাই জোরে জোরে হেসে উঠল। হালকা ঠাট্টা করতে করতে বলল,
—“হায় এমন লজ্জা পেলে বাসর রাতে কি করবে বলোতো?
—“মন্ত্রীর মন পটাতে গেলে একটু লজ্জা কমাতে হবে মেহের।
মেহর শুধু লাজুক হেসে মাথা নেড়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের হাসি আর ঠাট্টার মধ্যে সে ভিতরে ভিতরে ভাবল, কোথায় আপনি নেতা সাহেব এখন আসছেননা কেন??
সবাই চলে গেল নিচে মেহের হল রুমে বসে আয়মানের কথা ভাবতে লাগল।আজকের এমন দিনেও আয়মান কেন ব্যাস্ত থাকবে।ওর অনুভুতির কি কোন মূল্য নেই।কেন এত ব্যাস্ত আয়মান।একে একে রাগের চোটে মেহের চারগ্লাস সরবত খেল।তবুও ওর রাগ কমছেনা।হঠাৎ বাহির থেকে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শোনা গেল।সবাই একনাগারে বলছে মন্ত্রী আয়মান সাদিক এসেছে।
শুনামাত্রই মেহেরের রাগ লজ্জায় পরিনত হল।হঠাৎ ওর ফোন বেজে উঠল।স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল আয়মান কল করেছে।
মেহের তা দেখে ঠোট কামড়ে নিজেকে সামলালো।কারন আজ কেন জানি ওর বার বার অজ্ঞান হতে ইচ্ছে করছে।আয়মানের সেদিনের করা স্পর্স গুলো মনে পরছে।মেহের চোখ বন্ধ করে ভাবল আজকে আমি শেষ হয়ে যাব নেতাসহেব।তাও আপনার প্রেমে….
আবার ফোন বাজতেই মেহের কল রিসিভ করে আগে সালাম দিল।আর সমান তালে হাপাতে লাগল।
তা দেখে অপরপাশ থেকে আয়মান সালামের জবাব দিয়ে বলল তুমি কি নাভার্স মেহের?
মেহের হাপাতে হাপাতে বলল হয়ত….
আয়মান হেসে বলল আমিও কিন্তু নাভার্স মনে হচ্ছে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি…
মেহের অবাক হয়ে আয়মানের কথা শুনল।তবে কিছু বললোনা।
আয়মান তা দেখে ঠোট কামড়ে বলল আমি মন্ত্রী হয়েও কেন নাভার্স জানতে চাইবেনা?
মেহের বোকার মত বলল কেন নাভার্স আপনি।আচ্ছা আপনি কি অসুস্থ?
হুম অনেক অসুস্থ আমি তোমার প্রেমে পরে অসুস্থ হয়ে পরেছি।
কি বলেন এসব মাথা ঠিক আছে😐
যা সত্যি তাই বললাম
আমি আবার কি করলাম?🙄
কি করনি সেটা বল।এত সুন্দর হয়ে কে তোমাকে জন্মাতে বলেছে বল আমায়।তার উপর এত সুন্দর করে কেন সেজেছো মেহের।আমি যে তোমার এমন রুপ দেখে পাগল হয়ে যাচ্ছি।নিজেকে কেমন জানি কন্ট্রোললেস মনে হচ্ছে।
মেহের লজ্জা পেয়ে বলল অসভ্য….
হুম অসভ্য শুধু তোমার কাছে মেহের।আমি না আর অপেক্ষা করতে পারছিনা মেহের।বড্ড তোমাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে।তোমার কোলে মাথা রেখে আকাশটা দেখে ইচ্ছে করছে।রাতের অন্ধকারে হাটতে ইচ্ছে করছে তোমার হাত ধরে।মাঝে মাঝে তোমার ফর্সা হাতদুটোতে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।ফিউচারে প্লান করতে ইচ্ছে করছে?আচ্ছা আমি যদি খুব দ্রুত বাচ্ছা নিতে চাই তাতে কি তুমি রাগ করবে???
মেহের আর সহ্য করতে না পেরে বলল চুপ করুন নেতা সাহেব আপনার এমন নিলজ্জমার্কা কথা সহ্য করার মত ক্ষমতা আমার নেই।বলেই ফোন কেটে দিয়ে বালিশে মুখ গুজল।লজ্জায় ওর পুরো শরীর কাপছে।আদ্ভুত এক শিহরন ওর সারা শরীরে বইতে লাগল।আয়মান সহজে কার সাথে কথা বলে না সবসময় চুপচাপ থাকে।তাহলে ওর সামনে কেন এত কথা বলে?ভালোবাসে বলে নাকি অন্য কোন কারনে???কি ভয়ংকর কথা বলে আয়মান।আচ্ছা ওর কি একটুও লজ্জা করে না।এসব কথা বলতে নাকি পুরুষ মানুষের লজ্জা বলতে কিছুই নেই।
মেহের আয়মানের একটা ছবি দেখে বলল এত লাগামহীন কেন আপনি নেতা সাহেব…
++++++++++++++++++++++++++++
রোদ অতিথিদের সাথে কথা বলছে।পাশে রায়ান খেলছে হঠাৎ ছোট্ট কণ্ঠে বলল—
— “পাপ্পা… মাম্মা কি আর আসবেনা?”
রোদ চমকে উঠে বলল—
— “নাহ, পাপ্পা… কারন মাম্মা আল্লাহর কাছে চলে গেছে।”
রায়ান কেঁদে কেঁদে বলল—
— “আমিও… আমিও আল্লাহর কাছে যাব!”
রোদ রায়ানের মুখে এমন কথা শুনে রায়ানকে বুকের মাঝে জরিয়ে ধরল।
— “না, বাবা… এসব কথা বলতে নেই। … সব ঠিক হয়ে যাবে।চিন্তা কর না”
রায়ান কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— “কিন্তু পাপ্পা… মাম্মা…”
রোদ হালকা কণ্ঠে, ছেলের কাঁদা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
— “আমি জানি, বাবা… আমি জানি। কিন্তু তুমি এখন আমার কাছে আছো, আমি তোমার সঙ্গে আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ছোট্ট রায়ান বাবার কোলে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— “মাম্মা… মাম্মা…”
রোদ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। চোখে জল জমল, কিন্তু ছোট্ট রায়ানের কান্না আর ব্যথা অনুভব করে রোদ আরও দৃঢ়ভাবে বলল—
— “হ্যাঁ বাবা… আমরা একদিন ইশআল্লাহ মাম্মার সাথে দেখা করব।, বুঝেছো?” —
রায়ান এসব শুনে আর জোরে চিৎকার করে কাদতে লাগল।
এসব দেখে রোদ কিছু বলার আগেই, হঠাৎ পেছন থেকে নীরা এগিয়ে এলো। তার চোখে মায়া, মুখে মৃদু হাসি।
সে ধীরে ধীরে রায়ানের সামনে এসে নরম কণ্ঠে বলল—
— “রায়ান… বাবা, কাঁদছ কেন তুমি?”
রায়ান মুখ তুলে তাকাল। চোখ ভরা জল, ঠোঁট কাঁপছে।
নীরা একটু ঝুঁকে এসে তাকে নিজের কোলে তুলে নিল। ছোট্ট রায়ান প্রথমে কিছু বলল না, কিন্তু নীরার কোলে মাথা রাখতেই যেন ওর মনে শান্তি নেমে এলো।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ রায়ান মিষ্টি গলায় বলল—
— “তুমি… তুমি আমার মাম্মা হবে?”
নীরা অবাক হয়ে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু মুখে স্নেহভরা হাসি।
সে রায়ানকে বুকে টেনে নিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল—
— “চাইলে হবো বাবা… চাইলে আমি হবো তোমার মাম্মা।”
রায়ান তখন মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল—
— “হুম… আজ থেকে তুমিই আমার মাম্মা…”ওকে
রোদের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চোখে জল চলে এলো, কিন্তু সে মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন কেউ বুঝতে না পারে।
তার মনে হচ্ছিল—হয়তো আল্লাহ রায়ানের ছোট্ট মুখ দিয়েই এক টুকরো শান্তি পাঠিয়ে দিয়েছেন তার জীবনে। —
রায়ান নীরার কোলে মুখ গুঁজে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেল।
ছোট্ট হাতটা নীরার গলার চারপাশে আলতো করে জড়িয়ে আছে।
বাইরে হালকা বাতাস বইছে, জানালার পর্দা ধীরে ধীরে দুলছে ।ছাদে একটা নিঃস্তব্ধ শান্তি—যেন সময় থেমে গেছে।
নীরা চুপচাপ রায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।কতটা শান্ত, কতটা নির্ভরতার সঙ্গে ও ঘুমাচ্ছে তার বুকে।তার ঠোঁট কাঁপছে, কণ্ঠ ভারী—
— “রোদ… , আমায় যদি আপনি বিয়ে করতেন,তাহলে হয়তো রায়ান অনেক ভালো থাকত। ওর এখন একজন মা দরকার, যাকে ও মাম্মা বলে জড়িয়ে ধরতে পারবে…”
রোদ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে কোনো ভাব নেই, কিন্তু চোখে গভীর এক ব্যথা খেলা করছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— “নীরা… আমি এখনও সুহানাকে ভালোবাসি।
সে নেই, কিন্তু আমার জীবনের প্রতিটা জায়গায়, প্রতিটা নিঃশ্বাসে সে আছে।
আমি আর কাউকে সেই জায়গা দিতে পারব না।”
নীরা চোখ নামিয়ে ফেলল। রায়ানের মুখে হাত বুলিয়ে বলল—
— “ভালোবাসা কখনও মরে না রোদ, কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য নতুন আলো দরকার।”
রোদ কিছু বলল না।
তার চোখ রায়ানের শান্ত মুখে থেমে রইল, আর মনের ভেতরে ঝড় বইতে লাগল—
ভালোবাসা, হারানো, আর এক নতুন সম্ভাবনার অদৃশ্য সংঘাত
# চলবে—-
নোটঃ
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এক হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘মিরাজের সময় আমাকে এমন সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো- যাদের নখ ছিল তামার। তারা তাদের মুখমণ্ডল ও দেহ আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরাইলকে (আ.) জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা তাদের ভাইদের গীবত করত ও ইজ্জতহানী করতো। -মাজহারি
আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘গীবত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক গোনাহ। গীবত ইসলামি শরিয়ত মতে হারাম।
