#হৃদয়ের গভীরে যে তোমারই নাম প্রিয়সী
#পর্বঃ৬
#পাপড়ি জাহান
সেদিকে তাকিয়ে মেহের হাটুগেরে জোরে চিৎকার করে কাদতে কাদতে বলল আপনার এই রাজনীতীই একদিন আপনার আর আমার সব সম্পর্ক তচনছ করে দিবে ।যেমন আগুন কাঠকে
ছাই করে দেয়।
মেহের কার সাথে কোন কথা না বলে সোজা নিজের রুমে গেল।কিছুই ভালো লাগছেনা তার।রাজনীতী তার বরাবর অপছন্দ।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একজন রাজনীতীবিদি তার স্বামী হল।
ধপ করে সোফায় বসে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইল।কলি এসে পাশে বসে বলল কি রে কি হয়েছে।এমন করে তাকিয়ে আছিস কেন?
মেহের কিছু না বলে কলিকে জরিয়ে ধরে হু হু করে কেদে দিল।আর সব খুলে বললো।
কলিঃ দেখ মেহের ভাইয়া মন্ত্রী তাই তাকে তার দায়িত্ব পালন করতেই হবে।
তাই বলে বিশেষ মূহর্তে চলে যাবে..
কলি হাসল তোর মুখে এমন কথা মানাই না মেহের। তুই নিজে কি করেছিস ভুলেগেছিস।বিয়ের দিন কত নাটক করলি বিয়ে করবি না বলে।তার সাথে বিয়ের পরও যোগযোগ করলিনা।স্বামী হিসেবে তাকে যতটুকু তাকে সম্মান দেওয়া দরকার তার এক ইন্চিও সম্মান তাকে দিসনি।তাহলে তার কাছ থেকে সময় + ভালোবাসা কিভাবে আশা করিস বল আমায়।বলেই কলি চলে গেল।
প্রায় ৩ ঘন্টা পর…..
মেহের কিছু না বলে ওয়াশরুমে গেল গোসল করতে। গায়ে প্রচুর পরিমানে জ্বর তবুও একঘন্টা সময় নিয়ে গোসল করল।নিজের রাগ ও জিদ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য।
++++++++++++++++++++++++++++++++++
আয়মানঃ আমি ১ ঘন্টার ভিতর সবকটাকে আমার সামনে চাই….নাহলে তোদের সব কটাকে মেরে মাটিতে পুতে ফেলব……
ঠিক ১ ঘন্টার পর সব কয়টাকে সামনে আনা হল।আয়মান নিজে দাড়িয়ে থেকো বিচার করল।এতটায় কঠিন বিচার করল যে নেতা কর্মীরা ভয়ে থরথর করে কাপতে লাগল।
মন্ত্রালয়ের সকল কাজ শেষ করে আয়মান নিজের ফোনটা হাতে নিল দেখল রাত ৩ টা বাজে।মেহেরের নাম্বারে একবার কল করল।কিন্তু ওপাশ থেকে মেহের কল ধরলনা।যার কারনে আয়মান অস্থির হয়ে উঠল।রুমের ভিতর পায়চারি শুরু করল।
কিছুক্ষণপর কোন কিছু না ভেবে মেহের বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল।
বাড়ির সামনে এসে ভিতরে কিভাবে যাবে সেটা ভাবতে লাগল।
একপর্যায় কিছু না ভেবে আয়মান কলিংবেল চাপল।
মেহেরের বাসার কাজের মহিলা দরজা খুলে দিলো।আয়মান কোন কথা না বলে সোজা মেহেরের রুমে চলে গেল।গিয়ে দেখল।
মেহের চুপটি করে বিছানায় কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।চুলগুলো এলোমেলো ভাবে বিছানার চারপাশে পরে আছে।
আয়মান মেহেরের পাশে বসে কপালে হাত দিয়ে দেখল মেহেরের গা জ্বরে পুরে যাচ্ছে।তাই একটা বাটিতে পানি এনে জলপট্রি দিতে লাগল।
হঠাৎ মেহের ঠান্ডা স্পর্স পেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল।নিজের সামনে আয়মানকে বসে থাকতে দেখে মেহের চমকে উঠল।
আয়মান তা দেখে বাকা হেসে তাকিয়ে রইল।মুখে কিছু বললনা।
মেহের চোখ ঢলে আবার তাকাল।কিন্তু এবার আর কাউকে দেখতে পেলনা।যার কারনে মেহের থতমত খেয়ে গেল।
হায় আল্লাহ! এই জ্বরের ঘোরে কেন যে শয়তান লুচুটাকে দেখছি! মাথাটায় পুরো গরম হয়ে যাচ্ছে, চোখের সামনে শুধু ওর মুখটা ভেসে উঠছে বারবার। জানি, এসব কল্পনা — কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে যেন সত্যিই ও আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আল্লাহ, তুমি আমায় রক্ষা করো! এই ঘোর, এই বিভ্রম — সবকিছু থেকে রক্ষা কর। ! 😔
বলেই মেহের ধীরপায়ে উঠে রুমের লাইটটা জ্বালাতে চলে গেল।কিন্তু গিয়ে দেখল কারেন্ট নেই তাই রাগেরচোটে দ্রুত হাটতে লাগল।ফোনের ফ্লাস জ্বালিয়ে রুমের চারপাশে আয়মানকে খুজতে লাগল।কিন্তু কাউকে পেলনা তাই মেহের হতাশ হয়ে দাড়িয়ে রইল।
এদিকে আয়মান মুখ টিপে হাসছে।আসলে আয়মান মেহেরের সামনে না বরং পিছনে দাড়িয়ে আছে।আর মেহের কর্মকাণ্ডগুলো দেখছে।
হঠাৎ কোন কিছু না ভেবে মেহেরকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরল।মেহের প্রচন্ড ভয় পেয়ে জোরে চিৎকার করল।
আয়মান তা দেখে হু হা করে হেসে উঠল।
মেহের রাগি দৃষ্টিতে আয়মানের দিকে তাকিয়ে রইল।আয়মানের মেহেরের রাগি ফেসটা খুব পছন্দ তাই সামনে ঘুরিয়ে মেহের কোমড়টা জরিয়ে ধরল।আর নেশাখোরের মত তাকিয়ে রইল।
মেহের রাগেচোটে আয়মানের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পরল।যত ছারাতে চাইছে ততই আয়মান মেহরকে সাপের মত নিজের সাথে মিশিয়ে নিচ্ছে।কপালে কপাল ঠেকিয়ে মেহের কপালে চুমু খেল।
মেহের চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।আয়মান বাকা চোখে মেহেরের কালে বর্নের নেশাক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।যখনই আয়মান মেহেরের চোখের দিকে তাকায় তখনই ওর মন চাই সবকিছু ভুলে গিয়ে মেহেরকে নিজের আপন করতে।কিন্তু মেহেরের সম্মতি ছাড়া সেকিছুই করবেনা।
মেহেরঃ এই আপনি এখানে কেন?এত রাতে আমার কথা কেন মনে পরল? নিশ্চয়ই কোন খারাপ মতলব আছে আপনার….
আয়মান বাকা হেসে বলল গভীর রাতে বউকে কেন মনে পড়ে তা নিশ্চয়ই জানো তুমি মেহের।
মেহের ভয় পাওয়া গলায় বলল মানে…
আয়মান মেহেরের কানে কানে বলল তোমায় কাছে পেতে মন চাইছে মেহের….
মেহের এবার কোন উপায় না পেয়ে ভ্যা ভ্যা করে কেদে দিল।।
আয়মানঃ এই তুমি কাদছ কেন?
কাদব না তো কি হাসব…
আমিতো কাদার মত কিছু করেনি তাহলে কাদছ কেন?
মেহের রেগেমেগে বলল ফাও পেচাল বন্ধ করুন।এখানে চোরের মত কেন এসেছেন সেটা বলুন।
আয়মানঃ আমার পিচ্ছি বউটাকে মনে পরছিল তাই দেখতে চলে এলাম…
মেহেরঃ আমাকে কেন দেখতে হবে তাও আবার এত রাতে?
আয়মান মেহের চুলে মুখ গুজে বলল তোমার রুপে যে আমি পাগল তাই যখন তখন তোমায় দেখতে ইচ্ছে করে মেহের জান…
মেহের আয়মানের এমন কথায় আর রেগে গেল।
আয়মান সেদিকে পাওা না দিয়ে মেহের এলোমেলো চুলগুলে বেনি করে দিল।
মেহেরঃ তা আপনি কখন যাবেন হ্যা…
আয়মান: মেহমান আসলে যে আদর আপ্যায়ন করতে হয়, তা কি তুমি জানো না, মেহের? এতটুকু ম্যানার্স কি তোমার মধ্যে নেই! 😏
মেহের:
এহ! আসছেন আমাকে ম্যানার্স শেখাতে! আগে নিজে মেনার্স শিখুন।তারপর আমাকে শেখাতে আসবেন😤
নিজেই তো পুরো লুচু একটা—আপনার মাঝে একদমই ভদ্রতা, শিষ্টাচার, কিছুই ঠিকভাবে নেই। আর সেই আপনি কি না আমাকে শিক্ষা দেবেন!ব্যাপারটা হাস্যকর না।
আয়মান এবার মেহেরকে টেনে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসাল।ধপাস করে মেহেরের কোলে শুয়ে পরল।মেহের অবাক হয়ে রেগেমেগে আয়মানকে বলল এই উঠুন আপনি আমার কোল থেকে নাহলে কিন্তু ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিব।
আয়মান সেসব কথা কানে না তুলে মেহের হাত দুটো টেনে চুমু দিল।
মেহেরের মাথাটা এবার চক্কর দিয়ে উঠল।
এই আপনি যাবেন নাকি আমি চিৎকার করব…
আয়মানঃ আরে মেরি বউ কিছুতো রেসপেক্ট দেও.
কেন দিব???
কেন দিবে মানে।আমি একজন দেশের মন্ত্রী আর তুমি কিনা বলছ কেন রেসপেক্ট দিবে।তুমি কি জান আমি এখন চাইলে তোমার নামে মানহানির মামলা করতে পারি।
মেহের দাত কটমট করে তাকিয়ে রইল।আয়মান তা দেখে মেহেরকে আর ঝাপটে ধরল।
মেহের আয়মানের এমন স্পর্স পেয়ে ধরধর করে কাপতে লাগল।মনে হচ্ছে এখনই অজ্ঞান হয়ে পরে যাবে
আয়মান মেহের অবস্থা বেহাল দেখে দ্রুত উঠে দারাল।সামনের দিকে হেটে যাওয়া ধরল।হঠাৎ পিছন ফিরে মেহেরকে টেনে নিয়ে নিজের কোলে বাসল।যার ফলে মেহের পিঠ আয়মানের বুকের সাথে লাগল।
আয়মান ধীরে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল:
“আমাকে এমন ভয় পাও কেন, মেহের জান? 😏
আমার সামনে আসলেই কেন তোমার কাঁপাকাঁপি বেড়ে যায়, বল তো আমায়? আমি কি এমন করেছি, যে আমি একটুখানি কাছে এলেই তোমার নিশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে, চোখ নিচু হয়ে যায়?”
মেহেরের কিছুনা বলে মুখ ফুলিয়ে বসে রইল।
আয়মান ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল তুমি এত সুন্দর কেন?….
মেহের আয়মানের এমন ঘোর লাগা কন্ঠ শুনে শিউরে উঠল।জোরে জেরে দম ফেলতে লাগল।
আয়মানঃ এত জ্বর কিভাবে উঠল তোমার…
মেহেরঃ আসলে..বলেই তোতলাতে লাগল।
আয়মানের আর বুঝতে বাকি রইলনা।যে মেহের ওর সাথে জিদ করেই এমন জ্বর বাধিয়েছে।এই মেয়েকে নিয়ে সে সত্যিই পেরে উঠছেনা।একদিকে রাজনীতী আরেকদিকে এই মেয়ে কোনটা যে বেছে নেবে ভেবে পাচ্ছেনা..
আয়মান আর মেহেরকে ধমক দিলনা।বিছানায় শুয়ে দিয়ে জলপট্টি দিয়ে দিল।
মেহের জ্বরের ঘোরে আয়মানের একহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শুয়ে রইল।
আয়মান দেখল ভোর হয়েগেছে। সকালে ৬ টায় আবার তার মিটিং আছে প্রাধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাই মেহেরকে ছেরে উঠে দারাল।কপালে চুমু দিয়ে বলল কিছুক্ষণ রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা করনা…বলেই হাটা শুরু করল।
মেহের আয়মানকে যেতে দেখে আয়মানের হাত টেনে ধরল।জ্বরের ঘোরে বলল আজকে না গেলে হয়না।
আয়মান কি বলবে ভেবে পেলনা।
দুপুরে আবার আসব এখন আমায় যেতে দেও।
মেহের খুশিতে লাফিয়ে বলল সত্যি..
হুম বলে আয়মান মাথায় হাত দিল।এই মেয়ে জ্বরের ঘোরে কি করছে কি বলছে নিজেও জানেনা।জেগে থাকলে জীবনেও এমন আচারন করত না।
😢😢😢😢😢😢😢😮💨😮💨😮💨
রাত গভীর, রোদের বুকের ওপর শান্ত হয়ে শুয়ে ছিল তিনবছর বয়সী রায়ান। হঠাৎই ছেলেটা চোখ মেলল। ছোট্ট হাতদুটো ঘষে নিল চোখ, তারপর আধো ঘুম ঘুম গলায় তুতলিয়ে বলতে লাগল—
— “আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা…”
মিষ্টি কণ্ঠে ঘুমের দোয়া শেষ করল রায়ান।
রোদ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। নিজের ছেলেকে এত ছোট বয়সেই দোয়া পড়তে দেখে বুকের ভেতরটা অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল।
ওর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল,রায়ানের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল চল বাবা এবার দাত ব্রাশ করবি।
রোদ রায়ানকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল। হাতে ছোট্ট ব্রাশ ধরিয়ে দিল।
— “বাবা এবার দাত ব্রাশ করোতো।
রায়ান মুখ ফুলিয়ে বলল—
— “নাহ পাপ্পা, ব্রাস করব না। ব্রাস খারাপ।”
রোদ ভ্রু উঁচু করে জিজ্ঞেস করল—
— “কেন খারাপ?”
রায়ান মিষ্টি গলায় তুতলিয়ে বলল—
— “ব্রাস করলে ফেনা ফেনা হয়… আমার নাকেও ঢুকে যায়।”
রোদ হেসে মাথা নেড়ে বলল—
— “আচ্ছা তাহলে এই ব্যাপার আজ আমিও তোমার সাথে ব্রাশ করব। পাপ্পা আগে করবে, পরে তুমি করবে ওকে।”
রোদ নিজের ব্রাশে পেস্ট নিয়ে দাঁতে মাজতে শুরু করল। রায়ান একদম তাকিয়ে আছে। তারপর লাফিয়ে বলল—
— “আমিও! আমিও!”
ব্রাশ মুখে দিয়ে দাঁত মাজার ভঙ্গি করতে গিয়ে ফেনা গলায় চলে গেল। রায়ান হঠাৎ মুখ কুঁচকে বলল—
— “ইসস!নোন্তা-নোন্তা taste!”
রোদ হেসে ফেলল। ছোট্ট মাথাটা কোলে নিয়ে পানি খাওয়াল। তারপর আবার বলল—
— “বাবা, দাঁত ব্রাশ করলে তুমি সুপারম্যানের মতো শক্তিশালী হবে।”
রায়ান চোখ গোল করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
— “সত্যি?”
— “একদম সত্যি।”
রায়ান হাসতে হাসতে দাঁত মাজতে লাগল, গুনগুন করে বলছে—
— “আমি সুপারম্যান… আমি সুপারম্যান…”
রোদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকল, ভাবল— কী দুষ্ট বাচ্চা আমার, আবার কী সহজে সামলে নেয়া যায় ভালোবাসা দিয়ে।
ব্রাশ শেষ করে রায়ান মুখ ধুয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গাল ভিজে চকচক করছে। দুই হাত কোমরে রেখে বুক ফুলিয়ে আয়নার দিকে তাকাল।
— “পাপ্পা দেখো… আমি সুপারম্যান!”
রায়ান মুখ বাঁকিয়ে ঘাড় কাত করে দাঁড়াল, যেনো সে সত্যিই উড়তে পারবে। তারপর ছোট্ট হাত দুটো মেলে ধরে ঘরের ভেতর দৌড়াতে লাগল।
রোদ হেসে বলল—
— “আরে বাবা, এতো জোরে উড়তে যাস না! দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়বি।”
রায়ান থেমে একবার আয়নায় তাকাল, আবার বলল—
— “না পাপ্পা, আমি পড়ব না। আমি আকাশে যাবো… মাম্মার কাছে।”
এই কথাটা শুনে রোদের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিল।
— “না বাবা, মাম্মা এখন আল্লাহর কাছে। তুমি সুপারম্যান হয়েও মাম্মার কাছে যেতে পারবে না। তবে তুমি চাইলে মাম্মার জন্য দোয়া করতে পারো।”
রায়ান মাথা কাত করে মিষ্টি গলায় বলল—
— “আল্লাহ মাম্মাকে অনেক সুন্দর রাখো…”
রোদ চোখ বন্ধ করে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু সে হেসে বলল—
— “আমার বাবা সত্যিই সুপারম্যান।”
রায়ান হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে আলমারির ভেতর থেকে একটা ছোট্ট লাল তোয়ালে বের করল। সেটা গলায় বেঁধে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
— “পাপ্পা, এখন আমি আসল সুপারম্যান!”
তোয়ালেটা পেছনে ঝুলছে, হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে উড়ছে। রায়ান হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
— “চল পাপ্পা, আমি উড়বো!”আমি উড়বো
রোদ সোফায় বসে হেসে বলল—
— “আচ্ছা, সুপারম্যানবাবা, আগে একটু দুধ খেয়ে নেও, তারপর না হয় উড়।”
রায়ান মুখ ফুলিয়ে বলল—
— “না পাপ্পা, দুধ খেলে তো ভারি হয়ে যাবো, উড়তে পারব না।”
রোদ কাছে গিয়ে কোল তুলে নিল ছেলেকে।
— “উড়তে হলে শক্তি লাগে। সুপারম্যানও খেয়ে শক্তি বানায়। আমার রায়ান যদি না খায়, তাহলে কিভাবে মাম্মাকে রক্ষা করবে?”
এই কথা শুনে রায়ানের চোখ চকচক করে উঠল। সে মাথা নেড়ে বলল—
— “ঠিক আছে পাপ্পা, আমি খাবো! তারপর মাম্মাকে রক্ষা করব।”
+++++++++++++++++++
রোদ ঘর থেকে বের হতেই দেখল বারান্দায় তার বাবা ইজি চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। রায়ান দৌড়ে গেল তার লাল তোয়ালে-সুপারম্যান ড্রেস পরে।
দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে উঠল—
— “দাদা! দেখো আমি সুপারম্যান!”
সে হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে দাদার সামনে গিয়ে
এক লাফ দিল । তোয়ালেটা পেছনে উড়ছে, যেন সত্যিই ওড়ার চেষ্টা করছে।
রোদের বাবা চশমা নামিয়ে রায়ানকে দেখে হেসে উঠলেন।
— আমাদের ছোট্র সুপারম্যান সবাইকে বাচাবে তাইনা…
রায়ান বুক ফুলিয়ে বলল—
— “হু! আমি মাম্মাকে বাঁচাবো, পাপ্পাকে রক্ষা করব, আর তোমাকে দুষ্টু লোকের হাত থেকেও বাঁচাবো।”
রোদের বাবা হেসে হেসে কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রাখলেন। রায়ানকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন—
— “আচ্ছা দাদুভাই , সুপারম্যান হলে আগে আমাকে এক গ্লাস পানি এনে দাও দেখি,
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে রোদকে দেখে বলল—
— “পাপ্পা, আমি পানি আনতে পারব না আমি উড়বো পাপ্পা।
রোদ হেসে মাথা নেড়ে বলল—
— “বাবা শোন সুপারম্যানরা শুধু দুষ্টু মারামারি করে না , কাজও করে। যাও, মেহের সাম্মার কাছ থেকে পানি নিয়ে এসো।”
রায়ান খুশি হয়ে দৌড়ে গেল ভেতরে।রোদের বাবা ইজি চেয়ারে বসে ধীরে ধীরে বললেন,
— “রোদ, তোর আরেকটা বিয়ে করা উচিত। এভাবে একা একা কিভাবে জীবন পার করবি বল আমায়? তোর তো দিনশেষে একজনকে দরকার, যে তোর যত্ন নিবে, কথা বলবে, তোর পাশে থাকবে…”
রোদ হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। চোখে জমে থাকা একরাশ ক্লান্তি আর অভিমান মিশে গেল নীরবতায়। তারপর গভীর শ্বাস ফেলে বলল—
— “বাবা, আপনি জানেন না আমি কীভাবে বেঁচে আছি… সবকিছুই চলছে ঠিকঠাক, বাইরে থেকেও সবাই ভাবে আমি ভালো আছি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি একদম ভালো নেই, বাবা। আমি যেন একটা জীবন্ত লাশ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। একটা মানুষকে হারানোর পর তার জায়গা কেউ নিতে পারে না… কেউ না।”
কিছুক্ষণ থেমে রোদ গভীর নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর আবার নিচু গলায় বলল—
— “সুহানা শুধু আমার স্ত্রী ছিল না, সে ছিল আমার পুরো পৃথিবী। আমার হাসির কারণ, আমার শান্তি, আমার ভালোবাসা। এখন রায়ান আছে— সে-ই আমার শ্বাস, আমার বেঁচে থাকার কারণ। আমি ওর চোখে সুহানাকে দেখি, ওর হাসিতে সুহানার ছায়া পাই। আমি ওর জন্যই সারাজীবন বিয়ে না করে থাকতে পারব।”
রোদের বাবা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। তাঁর চোখেও তখন জল টলমল করছে। তবুও ধীরে ধীরে বললেন,
— “কিন্তু ছেলে, জীবন তো থেমে থাকে না।”
রোদ প্রচন্ড রাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল , চোখে জল নিয়ে বলল,
— “থামে না, জানি । কিন্তু আমার মন থেমে গেছে, বাবা। আমি আর কাউকে সুহানার জায়গায় আনতে পারব না। দয়া করে আর এই কথা তুলবেন না।”
রোদের বাবা নিঃশব্দে কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু আর কোনো কথা মুখ থেকে বেরোল না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বারান্দা থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ডাইনিং রুমে এসে চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসটা ধরলেন, কিন্তু হাত কাঁপছিল। গ্লাস নামিয়ে মাথা নিচু করলেন। হঠাৎ অজান্তেই চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রু।
তিনি ফিসফিস করে বললেন—
— “আমার ছেলেটা এতটা কষ্টের মধ্যে বেঁচে আছে, অথচ আমি কিছুই করতে পারছি না…”
#চলবে————-
আমি অনেক অসুস্থ তারপরও আপনাদের কথা ভেবে খুব কষ্ট করে গল্প লিখেছি তাই ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।কেমন হয়েছে পর্বটা।আর রায়ানকে কেমন লাগল????
নোটঃ
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করে বলেন।
‘‘হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য তুমি (অন্যান্য কাজ হতে) অবসর হও এবং ইবাদতে মন দাও; তাহলে আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দেবো এবং তোমার দারিদ্র ঘুচিয়ে দেবো। আর যদি তা না কর, তবে তোমার হাতকে ব্যস্ততায় ভরে দেবো এবং তোমার অভাব কখনোই দূর করবো না।’’ 💚
[ তিরমিযি, আস-সুনান: ২৬৫৪; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ৪১০৭; হাদিসটি সহিহ ]
