#শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_০৬
নাহিদের খাওয়া শেষে নিজের কাঁপা হাতের আঙুলে আঁচল জড়িয়ে ছেলের মুখটা আলতো করে মুছে দিলেন নুরজাহান। যেনো বহুদিন পর এই স্পর্শের অনুমতি পেয়েছেন তিনি। সেই পুরোনো দিনের মতো যখন ছোট্ট নাহিদ দৌড়ে এসে বলতো, মা, মুখটা মুছিয়ে দাও তো। স্মৃতি চোখের কোণে টুপ টুপ করে জল এনে দিলো। তিনি সেগুলো লুকাতে মাথা নিচু করলেন।
আজ সবাই মিলে বাইরে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো নাহিদ। নাহিদের মুখে একটা উচ্ছ্বাসের ছাপ ফুটলেও নুরজাহানের মুখে উদ্বেগের ছায়া। তিনি ধীরে বললেন,
-অকারণে এতো টাকা খরচ করার কি দরকার বাবা? বাজার থেকে সামান্য জিনিস আনলেই তো ঘরে ভালো রান্না করে খাওয়া যায়। ঘরের খাবারই তো সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর।
সঙ্গে সঙ্গে নিশের চোখে-মুখে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠলো।
-আমরা বাইরে খেতে যাবো, এটাই ঠিক করেছি। আপনি দয়া করে এসব নিয়ে মাথা ঘামাবেন না, নুরজাহান আর কিছু বললেন না। শুধু নিঃশব্দে বসে রইলেন মনে মনে ভাবলেন, ছেলের ভালো চাইতেই তো বলেছিলাম।
দিনগুলো এভাবে চলতে লাগলো। নুরজাহান বেগম ধীরে ধীরে আবার আগের মতোই ঘরের কাজগুলোতে সাহায্য করা শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে ছেলের জামা কাপড় ভাঁজ করে রাখতেন, ময়লা জামা আলাদা রাখতেন। নাহিদের সমস্ত কিছুই তিনি নিজ দায়িত্বে দেখতে লাগলেন।
কখনো কখনো হাড়ির ঢাকনা সরিয়ে বলতেন,
-তরকারিতে ঝাল একটু বেশি বউমা, নাহিদের পেট তো সহ্য করতে পারে না।
এই যত্নভরা খেয়ালগুলো নিশির চোখে বিরক্তিকর লাগতো।
সে চায় না কেউ তাকে ‘শিখিয়ে’ দিক, কেউ তার কাজে নজর রাখুক বিশেষ করে শাশুড়ি।
তবুও নুরজাহান থামেন না। নিজের শরীরটাকে ভুলে গিয়ে তিনি শুধু ছেলেকে ঘিরে থাকেন। নাহিদের কোনো কিছু অপচয় হতে দেখলে ব্যথা পেয়ে বলেন,
-এই খাবার ফেলে দিও না, আমি খেয়ে নেবো, আমার ছেলে নিজের কষ্টে উপার্জন করা টাকা দিয়ে এসব কিনে এনেছে।
খেতে বসেও বলেন,
-ওটা নাহিদের জন্যে রেখে দাও, ওটাও রেখে দাও। ও অফিস থেকে এলে খাবে।
নাহিদ কখনো এসব নিয়ে কিছু বলেও না। সে বাড়ি ফিরলে নুরজাহান যখন আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ছেলের চুলে হাত বুলিয়ে দেন তখন তার চোখে মায়ার নিবিড় আলো দেখা যায়।
তার জন্যই হয়তো নুরজাহান সারাদিন ঘরের খুঁটিনাটি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন কোথাও ফোঁটা পানি পড়ে থাকলে মুছে দেন, কোথাও জিনিসপত্র বেশি দামি মনে হলে নিশিকে সাবধান করে বলেন,
-সাবধানে চালাবে বউমা, আমার ছেলের কষ্টের টাকা।
আর নিশি এসব কথা শুনলেই মনে মনে বিরক্তি জমে ওঠে। তার বাইরের শান্ত মুখের ভেতরে যেন ছাইচাপা আগুন।
কিন্তু নুরজাহান বুঝতেই পারেন না তিনি শুধু ছেলেকে ঘিরে থাকা নিজের পৃথিবীটুকুই দেখেন। প্রতিটি খাবার, প্রতিটি জিনিস, প্রতিটি সিদ্ধান্তে তিনি শুধু একটাই চিন্তা করেন।
নাহিদের যেনো কিছু না কমে। নাহিদ যেনো ভালো থাকে। নাহিদই তো তার পৃথিবী।
এভাবেই দিন গড়ায় মায়ের স্নেহে ভিজে থাকা ঘর আর বউমার নীরব বিরক্তিতে পোড়া বাতাস মিলেমিশে তৈরি হয় এক অদৃশ্য অস্থিরতা।
যেখানে নাহিদ মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেও যেনো কিছুই ঠিকমতো টের পায় না।
চিংড়ি মাছ ভেজে নাহিদের টিফিনে দিয়ে বাকিটুকু দুপুরের খাবারের টেবিলে রেখে নিশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলো। ঠিক তখনই নুরজাহান বেগম লাঠি ভর দিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন।
চিংড়ির প্লেটটার দিকে গভীর মমতা নিয়ে তাকিয়ে বললেন,
-চিংড়ি মাছ নাকি? আমার ছেলের খুব প্রিয় এটা, চিংড়িগুলো রাতের জন্য রেখে দাও বউমা, ও ফিরে এসে খাবে।
নিশির মুখের রঙ মুহূর্তে বদলে গেলো।
রাগ চেপে রাখতে না পেরে বললো,
-আপনার কি মনে হয় আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি না? সে কী খেতে পছন্দ করে আমি জানি না? আর এই বাড়িতে কি শুধু সে-ই চিংড়ি খায়? আমরা কি কেউ কিছু পছন্দ করতে পারি না?
নুরজাহান থম মেরে গেলেন।
বউমার এমন তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বরে তিনি মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
এরপর থেকে বাড়ির ভেতর যে অশান্তির ঢেউ বইতে শুরু করলো, তা আর সামলানো গেলো না।
নুরজাহান বেগমের যত চাওয়া–পাওয়া সব একটাই নাহিদ।
কোথায় যাচ্ছে, কখন ফিরছে, কী খাচ্ছে, কতটুকু খাচ্ছে, কার সাথে কথা বলছে সবই নিয়ে তার অদম্য উদ্বেগ। উনার এসব কাজে নিশি যেন প্রতিদিনই একটু একটু করে ক্লান্ত হতে লাগলো।
সকালে ভোরে ঘুম ভাঙতেই দেখা যায় নুরজাহান রান্নাঘরে। নিশি কঠোর গলায় শতবার বারণ করলেও তিনি তা শুনেন না।
কতবার করে বলেছে,
-রান্নাঘরে আসবেন না মা, আপনি শুধু শুধু জিনিসপত্র এলোমেলো করেন!
তবুও নুরজাহান লাঠি ঠুকঠুক করে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েন।
কখনো নাহিদের পছন্দের ডিমের ঝুরি বানাতে গিয়ে পুরো চুলায় পুড়ে যাওয়া ডিম ছড়িয়ে রাখেন,
কখনো সেমাই বানাতে গিয়ে দুধ উথলে পড়ে পুরো গ্যাস আর মেঝে নোংরা করেন।
নিশি বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
-আপনার এতোই যখন শখ রান্নার, তখন আপনার ছেলেকে নিয়ে আলাদা সংসার করেন না কেনো? এখানে এসে আমার সবকিছু নষ্ট করেন কেনো?
নুরজাহান ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলেন,
-বউমা, আমি তো শুধু আমার ছেলের জন্য…
এ কথাটুকুই তিনি বলতে পারেন।
তারপরই নিশির রাগে চোখ লাল হয়ে ওঠে।
বাড়িতে কেমন যেন উৎকণ্ঠার পরিবেশ তৈরি হয় প্রতিদিন।
দিন দিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো, নুরজাহান সব সময় নিজে না খেয়ে ছেলেকে খাওয়াতে চান।
সব সময়ই বলেন,
-এটা আমার নাহিদের জন্য রেখে দাও। ও ফিরলে খাবে, আমি সব সময় ওকে ভরা পেটে রাখতাম।
নিশির চোখে এটা অতিরিক্ত ভালোবাসা নয়,
বরং অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ।
বাড়িরই একটা প্লেট, একটা চামচ, এক গ্লাস পানি সব যেন নাহিদের নামে বাঁধা।
নিশির কাছে মনে হয়, এই বাড়িতে আর কেউ নেই, শাশুড়ির সেই ছেলেই একমাত্র মানুষ।
কখনো নাহিদ ছুটে এসে বলে,
-মা, তুমি কেনো রান্নাঘরে গেলে?
নুরজাহান হাসিমুখে উত্তর দেন,
-তুই খাবি বলে বানাইছিলাম বাবা, তুই পছন্দ করিস তো।
নিশি তখন পিছন দাঁড়িয়ে চোখ ঘুরিয়ে ভাবে,
”তার থেকে তার ভালোবাসার মানুষকে কেড়ে নেওয়ার জন্যই শাশুড়ির এই ছলচাতুরী।”
এভাবেই দিনের পর দিন কলহ জমতে জমতে পাহাড় হয়ে উঠলো।
আজকাল ছোট ছোট কথাতেই তাদের সংসারে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
নুরজাহান সারা বাড়ি টহল দিয়ে বেড়ান এটা নাহিদের জন্য রেখে দাও, ওটা নাহিদের এই জামাটা নোংরা পরিষ্কার করো, নাহিদের অফিসের কাপড় আলাদা করে রাখো।
নিশি রীতিমতো হাঁপিয়ে ওঠে।
তার মনে হয়, সে যেন এই সংসারের কেউ না শুধুই এক অদৃশ্য অতিথি।
আর নাহিদ?
সে খুব আবেগীও নয়, আবার কঠোরও নয়।
শান্ত স্বভাবের মানুষ।
দু’পক্ষকেই বোঝাতে চায়, কিন্তু দুই আগুনের মাঝখানে পড়ে নিজেই দগ্ধ হয়।
ঘরে ফিরলেই কখনো বউয়ের অভিযোগ, কখনো মায়ের কান্না, কখনো দুজনেরই অভিমান।
নাহিদের মন ভার হয়ে ওঠে, কিন্তু কাউকে কিছু বলতেও পারে না।
নিশি রোজকার মতোই নাহিদ অফিস থেকে ফিরলে অভিযোগের ঝুলি সামনে নামিয়ে বসে।
তার চোখেমুখে বিরক্তি, কথায় চাপা ক্ষোভ,
-আজও দেখেছো? তোমার মা রান্নাঘর তছনছ করে রেখে গেছেন, তোমার জন্যই শুধু রান্না করে, বাকিদের খাবার যেনো চোখেই পড়ে না। উনাকে তো কেউ রান্না করতে বলেনি, রান্না যখন করবেনই তখন সবাইকে দিলে কি হয়?
নাহিদ চুপ করে জুতোর ফিতা খুলতে থাকে।
ওর নীরবতা যেন চারদিকে আরও ভারী হয়ে ওঠে।
সে না প্রতিবাদ করে, না সম্মতি দেয় শুধু নিঃশব্দে সবটা শুনে যায়।
শিশুরাও এখন নিশির সুরে সুর মিলিয়ে দাদির নামে নালিশ তোলে।
-দাদি আমাদের নাস্তা বানিয়ে দেয় না! দাদি শুধু আব্বুর জন্য রাখে! দাদি রান্নাঘরে এলেই ঝামেলা করে!
নাহিদ কখনো কখন মা’কে রান্নাঘরে যেতে নিষেধ করে। নুরজাহান কিছু বলেন না।
তার অভিমান গলার ভেতরেই জমে থাকে,
চোখদুটো একটু ভিজে ওঠে যদিও তিনি তা কাউকে দেখান না।
নাহিদের কথা উঠলেই তার সমস্ত হৃদয় যেনো আলোকিত হয়ে ওঠে।
ছোটবেলা থেকেই নাহিদকে তিনি এমন আদর-যত্নে বড় করেছেন যে,
নিজের পাতে মাংস পড়ুক না পড়ুক, ছেলের থালা ভরাট করাই ছিলো জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
নাহিদ যদি একটু হাসতো তার জন্য ওটাই ছিলো উৎসব। ছেলের পছন্দের বিরিয়ানি, চিংড়ি, পায়েস সবকিছু তিনি রান্না করতেন কিন্তু নিজের মুখে তুলতেন না,মেনে নিতেন,আমার ছেলে খেয়ে তৃপ্ত থাকলেই তো আমার পেট ভরে।
এ অভ্যাস, এ ভালবাসা এত বছরের এখন কি এক মুহূর্তে পরিবর্তন হয়?
তাই আজও রান্নাঘরে গেলেই তিনি প্রথমেই ভাবেন,
নাহিদ কী খাবে? কী খেলে ওর ভালো লাগবে?
কিন্তু এই আন্তরিকতার মাঝেই নিশির চোখে পড়ে অন্যরকম দৃশ্য।
তার কাছে মনে হয়, শাশুড়ী যেন শুধু নিজের ছেলেকেই মানুষ মনে করেন,
বাকি তিনজনের অস্তিত্ব নাকি তার কাছে তুচ্ছ।
এতদিনের স্নেহ, যত্ন অভ্যাস।
সবই যেন অভিযোগের পাহাড়ে ঢেকে যায়।
নুরজাহান রান্নাঘরে একটু কাজ করলেই ঝগড়া,
-এ রান্নাঘর অগোছালো করলেন কে? আপনার এই কাজগুলো আমি আর সহ্য করতে পারছি না! আপনার ছেলে কি শুধু একাই খায় নাকি?
নুরজাহান টলমল চোখে শুধু বলেন,
-আমি তো ভাবছিলাম নাহিদ রাতে ফিরে খাবে তাই…
তার কণ্ঠে মমতা, চোখে লজ্জা, মুখে দুঃখ
তবু সেই কথা কেউ শোনে না।
এভাবে দিনে দিনে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
সামান্য কিছু নিয়েই বিতণ্ডা, রাগারাগি, ঝগড়া লেগেই থাকে।
নুরজাহানের চাওয়া বলতে কিছু নেই, নেই গহনা, নেই কাপড়, নেই নিজের জন্য কোনো দাবি। তার একমাত্র চাওয়া ছেলের মুখটা যেন হাসিমুখে থাকে। তার সকাল শুরু হয় নাহিদের খোঁজ নিয়ে,রাত শেষ হয় ছেলের জন্য কিছু আলাদা করে রেখে।
কিন্তু এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাটাই যেন সংসারের সবার চোখে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
নিশি এবার নাহিদকে চোখে চোখ রেখে বললো,
-অনেক হয়েছে, আর নয়। তোমরা মা-ছেলে দুজনেই যেন এক, এই আচরণ আমাকে ভেঙে দিয়েছে। বিগত বছরগুলোতেও উনি আমাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে এসেছেন। যখন উনার হাটাচলা সীমিত হয়ে গেল, আমি কিছুটা নিঃশ্বাস নিতে পেরেছিলাম, স্বস্তি পেলাম। আর এখন আবার সেই সব শুরু হয়ে গেছে, ঠিক যেনো পুরনো আঘাতগুলো নতুন করে জাগছে।
নিশি ধীরে ধীরে নাহিদের দিকে তাকিয়ে বললো,
-এবার তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নাহিদ। তোমার মা, নয়তো আমরা, আমার ছেলে-মেয়ে আর আমি। এই সংসারে তুমি আর দু নৌকায় পা দিয়ে চলতে পারবে না, আর আমিও আর সহ্য করতে পারছি না।
নাহিদ কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে বললো,
-তাহলে এখন কি করা উচিত?
নিশি চোখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ফুটিয়ে বললো,
-তোমার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসো, নাহলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব আমার সন্তানদুটোকে নিয়ে। আমি চাই না, কোনোদিন তাদের চোখে আমার কষ্ট দেখুক। আমি চাই না, তারা এই সংসারের অশান্তি আর জটিলতার বোঝা বহন করুক।
নাহিদের মন দোল খাচ্ছিল। একদিকে মা, যার জন্য সে জন্মেছে, যার প্রতি তার অতল ভালোবাসা, অন্যদিকে স্ত্রী ও সন্তান যারা তার দুনিয়ার আলো। চোখের সামনে দুই পথ, দুই দায়বদ্ধতা। নিশির কথাগুলো ঘুরেফিরে তার কানে বাজছে, যেনো এক গভীর সতর্কবার্তা এবার আর সময় নেই, কিছু একটা করতে হবে।
❝এতো এতো মানুষ গল্প পড়েন কিন্তু রেসপন্স করেন না কেনো? আপনাদের থেকে ভালো সাড়া আসলে লিখতেও ভালো লাগে।❞
চলবে…..
