#শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_০৫
বুয়া চলে গেলেও তার বলা কথাগুলো যেন নিশির বুকের ভেতর বীজ হয়ে আটকে রইল, মেরে দিয়ে বলতাম, মরে গেছে।
শব্দগুলো কাঁটার মতো খোঁচা দিতে লাগলো বারবার। অস্থির হয়ে চুলের গোছা কানের পেছনে সরিয়ে নিজের মাথায় হালকা চাটি মেরে বলল,
-কীসব আজেবাজে ভাবছি আমি!
কিন্তু তবুও মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই কথাগুলো আবার ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে এলো। দরজা ঠেলে নাহিদ ঘরে ঢুকতেই নিশি ভরাট নিঃশ্বাস ছাড়ল, যেন সারাদিনের চাপটা এক নিমিষে ফেলে দিতে চাইছে।
নিশি ক্লান্ত গলায় বললো,
-শোনো, আজ মা ঘরের ভেতর নোংরা করে ফেলেছিলেন।
সব একা হাতে সামলেছি, ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, তাকে গোসল করানো সবই।
তারপর একটু থেমে, নরম স্বরে বললো,
-এখন তো বুঝতে পারছো, কেন আমি ওনাকে বেশি তেল-মশলা খেতে দিই না?
-এ আর এমন কী? বুড়ো মানুষ, এ বয়সে এরকম একটু-আধটু হতেই পারে।
নাহিদের কথায় কোনো অনুভূতির টনটনানি ছিল না,
শুধু সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো, যেন বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক।
নিশি চাপা রাগ আর কষ্টে ঠোঁট কামড়ে বলল,
-হয়, সেটা আমি বলছি না। আমার কষ্টটা তখনই হয়, যখন তুমি এসব দেখেও দেখো না। তোমার ওই ভুল ধারণাটা, আমি নাকি তোমার মাকে ভালোবাসি না, এই কথাটাই আমায় সবচেয়ে বেশি আঘাত করে।
নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
-নিশি, আমারও মনে হয় না… মাকে এভাবে একা ঘরে বন্দী করে রাখা ঠিক হচ্ছে। কিছুটা মুক্ত করে দেওয়া উচিত ওনাকে।
নিশি চমকে তাকাল।
-ওই বুয়ার কথা কানে নিচ্ছো?
-বুয়া তো খারাপ কিছু বলেনি নিশি। এটা করলে খারাপ কিছু হবে না। দেখি না মায়ের শারীরিক অবস্থা একটু ভালো হয় কি না।
নিশির চোখে হতাশা জমে উঠল।
-আজও ঘর নোংরা করেছেন উনি। কাল যদি পুরো বাড়িটাই করেন? তখন কে পরিষ্কার করবে?
নাহিদ নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো,
-লোক লাগিয়ে করানো যাবে। আপাতত মাকে এই বন্দীদশা থেকে মুক্ত করা দরকার। দেখো, উনি একটু সুস্থ হলে আমাদেরই লাভ ওষুধের পেছনে অত খরচ হবে না। আর হাঁটাচলা করতে পারলে পেট খারাপ হলেও নিজেই বাথরুমে যেতে পারবেন।
নিশি আর তর্ক করল না।
-যা ভালো বোঝো, করো,
এটুকু বলেই রান্নাঘরের দিকে চলে গেল, তার চলার ভঙ্গিতে অনুচ্চারিত অভিমান স্পষ্ট।
নাহিদ নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজের রুমে গেল। কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে টেবিলে রাখতেই পাশের ঘর থেকে ভাঙা গলায় ডাক শোনা গেল,
-নাহিদ বাবা, তুই এসেছিস?
নাহিদ দরজার দিকে এগিয়ে মায়ের সামনে এসে নরম গলায় বলল,
-হ্যাঁ মা, এসেছি।
-এদিকে একটু আসবি বাবা?
ডাকে সাড়া দিয়ে নাহিদ ধীর পায়ে নুরজাহানের ঘরে ঢুকলো।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-শুনলাম আজ ঘর নোংরা করেছো?
কথাটা শুনতেই নুরজাহান বেগমের চোখ নেমে গেল নিচে।
মুখমণ্ডলে যেনো লজ্জা, কষ্ট আর বয়ঃজীর্ণ অপমৃত্যুর ছাপ একইসাথে ভেসে উঠলো।
কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে নাহিদ আবার বলল,
-কিছু দরকার আছে?
যদি না থাকে, তাহলে যাই, অফিস থেকে মাত্রই এসেছি, ক্লান্ত লাগছে।
নুরজাহান বেগম স্তব্ধ গলায় বললেন,
-আচ্ছা বাবা যা।
তার কণ্ঠের ভিতরে একরাশ অব্যক্ত বেদনাই যেনো টনটনে হয়ে রইল।
পরের দিন সকাল।
অফিসে বের হওয়ার আগে নাহিদ নীরবে মায়ের দরজা ঠেলে খুলে দিলো।
-মা, দরজাটা খোলা রাখলাম। বাইরে একটু হেঁটে নিও, ভালো লাগবে।
নুরজাহানের চোখে শিশুর মতো আলো জ্বলে উঠলো।
অনেকদিনের আটকে থাকা নিঃশ্বাস যেনো এক মুহূর্তে মুক্তি পেল।
তিনি লাঠি হাতে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন,
যেনো কারাবাস ভেঙে বের হওয়া কেউ প্রথমবারের মতো আলো দেখছে।
করিডোরের মাথায় দাঁড়িয়ে চারপাশটা দীর্ঘদিন পর গভীরভাবে দেখলেন তিনি।
দেয়াল, জানালা, বারান্দার পুরোনো বাতাস সব যেনো নতুন লাগে আজ।
তার পদচারণা ধীর, তবুও প্রাণবন্ত;
বুকভরা নিশ্বাস নিতে নিতে ফিসফিস করে বললেন,
”কতদিন পর এই মুক্তি।”
নাহিদ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
এই প্রাণচাঞ্চল্য, এই উচ্ছ্বাস কি সেই অসুস্থ, ভঙ্গুর মায়ের?
মাকে দেখে তার মনেই হলো,
মানুষকে মুক্ত করে দিলে বুঝি সে এভাবেই আবার বাঁচতে শেখে।
তবে কি এই চার দেয়ালের বন্দীদশাই আসলে তাকে কুঁকড়ে দিয়েছিলো?
ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছিলো?
নাহিদ কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল,
মুক্ত হাওয়ায় হাঁটতে থাকা নুরজাহানের মুখে যে স্নিগ্ধতার রেখা ফুটে উঠেছিল, সেটা তার চোখ এড়ালো না।
তবুও কিছু না বলে ব্যাগ কাঁধে তুলে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল সে।
নিশি ছেলেমেয়েকে স্কুলে দিয়ে ঘরে ফিরতেই দেখতে পেলো নুরজাহান বেগম ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে এগোচ্ছেন।
নিশির কণ্ঠে অস্থিরতা,
-ঘরে হাঁটছেন, হাঁটুন, রান্নাঘরে আসবেন না।
একটু পরে এই রান্নাঘরও নোংরা হবে, সব পরে আমাকে পরিষ্কার করতে হবে।
কথাগুলো শোনার পরও নুরজাহান থামলেন না।
তিনি যেনো নিজের জগৎেই ডুবে আছেন,
রান্নাঘরের দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন।
রান্নাঘরের পুরোনো ইট-সিমেন্টের দেওয়াল গুলোতে ধীরে ধীরে হাত বুলাতে লাগলেন তিনি।
যেনো হারিয়ে যাওয়া কোনো স্মৃতিকে ছুঁতে চাইছেন,
যেনো কোনো গোপন ভাষায় সেই দেয়ালগুলো তার একাকিত্ব নরম করে সয়ে নিচ্ছে।
কেটে গেছে বেশ কিছুদিন।
এই বাড়ির বাতাসে যেন একটু করে হালকা উষ্ণতা ফিরে এসেছে। নুরজাহান বেগমও আগের তুলনায় অনেকটাই সুস্থ চোখের কোণে সেই আগের ঝিম ধরা নিস্তেজতা নেই, তার বদলে আছে নিঃশব্দ এক প্রাণচাঞ্চল্য, যেন মুক্ত হাওয়া পেয়ে ভেতরের গুমোট ভাবটা একটু একটু করে সরে যাচ্ছে।
রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলেন।
কাল নাহিদের জন্মদিন আমার একমাত্র ছেলে, আমার জীবনের শেষ আশ্রয়। বহু বছর হলো নিজের হাতে কিছু রেঁধে ছেলেকে খাওয়াতে পারেনি। বুকের ভেতর যেন হঠাৎই এক পুরোনো শখ মাথা তুললো,
আগে তো জন্মদিনে পায়েস না রান্না করলে ছেলেটা খুব রাগ দেখাতো, এখনো কি সে আগের মতো খুশি হবে?
মুখে ধরা পড়লো ম্লান, তবু আশাবোধের হাসি।
এই ভাবনার ঢেউয়ে ভেসে ভেসেই ঘুমিয়ে গেলেন নুরজাহান বেগম।
সকালে ঘুম ভাঙতেই লাঠি ভর করে ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে এগোলেন তিনি।
নিশি তখনও ঘুমে, বাড়ির চারপাশে নিস্তব্ধতার নরম রেখা।
নুরজাহান বেগম আলতো করে চুলোর পাশে দাঁড়িয়ে একটা হাড়ি নামিয়ে পায়েস বসিয়ে দিলেন। দুধ ফুটতে শুরু করলে তার মুখে যেন এক শিশুসুলভ তৃপ্তির ছায়া ফুটে উঠলো।
ভালোবাসার শিশি যেন অদৃশ্য কোনো হাত রান্নার হাড়িতে উপচে ঢেলে দিচ্ছে,
চিনি দিচ্ছেন যত্নের মাপে, চাল ধুচ্ছেন মনের শুদ্ধতায়।
তার চোখে একটাই দৃশ্য, নাহিদ হেসে বসে আছে, আর সে মন ভরে ছেলেকে খেতে দেখছে।
নিজের মনেই ধীর স্বরে বললেন তিনি,
আজ আমার ছেলে খাবে আর আমি অপার শান্তিতে দেখবো। কতদিন পর আবার ওর জন্য রান্না করছি!
কিছুক্ষণ পর নিশি রান্নাঘরে এসে দেখলো ধোঁয়া ওঠা পায়েসের হাড়ি।
চোখ কপালে উঠে গেলো তার। আশপাশ তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই।
এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করলো,
কে রান্না করতে পারে এই পায়েস?
শাশুড়ি? উহুম উনি তো বৃদ্ধ মানুষ, এভাবে একা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কাজ করা কি সম্ভব?
তাহলে কে?
কৌতূহল আর অস্বস্তির মিশেলে নিশি নীরবে নুরজাহানের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
দরজার সামনে পৌঁছাতেই দেখলো নুরজাহান বেগম খাটে সোজা হয়ে বসে আছেন।
নিশি ঢুকতেই তিনি স্নিগ্ধ চোখে তাকিয়ে বললেন,
-উঠে পড়েছো বউমা?
নিশি সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকালো,
-হুম, রান্নাঘরে দেখলাম পায়েসের হাড়ি। আপনি রেঁধেছেন?
নুরজাহান বেগমের মুখে হালকা লাজুক হাসি ফুটলো,
-হ্যাঁ, আজ তো নাহিদের জন্মদিন। তাই ভাবলাম, একটু পায়েস বানাই। ও তো পায়েস খুব পছন্দ করে।
নিশির ভ্রু কুঁচকে গেলো। কথায় বিরক্তি স্পষ্ট,
-আপনি এসব করে বেড়াবেন, পরে যদি কোনো ক্ষতি হয় দোষ এসে পড়বে আমার ওপরই।
আপনার ছেলে ভাববে আমিই আপনাকে দিয়ে কাজ করাই।
নুরজাহান শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,
-আমি নাহিদকে বলে দেব বউমা, আমি নিজেই করেছি, কেউ আমাকে বলেনি।
নাহিদ ঘুম থেকে উঠতেই নিশি একটু উচ্চস্বরে বললো,
-আজ তোমার জন্মদিন, তাড়াতাড়ি তৈরি হও, নাশতা রেডি।
নাহিদ চোখ রগড়াতে রগড়াতে রান্নাঘরের দিকে এগোতেই হালকা দুধ-চালের গন্ধ নাকে এসে লাগলো।
চমকে গেলো,
-এই গন্ধটা পায়েসের না?
নিশি মুখ ফেরাল না। শুধু বললো,
-রান্নাঘরে গিয়ে দেখো।
রান্নাঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাহিদের চোখে পড়লো, ধোঁয়া-ওঠা, সাদা দুধের পায়েস।
হাতের লাঠিটা টিক টিক শব্দ করে রান্নাঘরের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন নুরজাহান বেগম।
তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, আবার লজ্জামেশানো এক মায়া।
নাহিদ অবাক হয়ে বললো,
-মা তুমি? তুমি রেঁধেছো এগুলো?
নুরজাহান বেগম মাথা নিচু করে মৃদু হেসে বললেন,
-তোর জন্মদিন বাবা, ছোটবেলায় তোকে পায়েস না দিলে তো দিনই শুরু হতো না। কত বছর পর ভেবেছি, আজ না হয় একটু করি।
কথাটা শেষ হতেই নাহিদের বুকে অদ্ভুত একটা কাঁটার মতো ব্যথা লাগলো।
সে কোনোদিন আবেগপ্রবণ নয়, আবার তেমন কঠোরও নয়, মনটা মাঝামাঝিই থাকে।
কিন্তু আজ মায়ের কণ্ঠে সেই থরথরানি, সেই লুকানো আকুলতা সব মিলিয়ে যেন মনটা একটু আলগা হয়ে এলো।
নাহিদ এগিয়ে গিয়ে ধীরে বললো,
-মা তুমি রান্না করতে গেলে কেনো? তোমার শরীর..
নুরজাহান কথা কেটে দিলেন,
-শরীর নষ্ট হলে হবে, কিন্তু মনের কষ্টটা যদি সারাজীবন নিয়েই বাঁচতে হয় তখন?
তোর হাতে একবেলা পায়েস তুলে দিতে পারলে, মনে যে একটা শান্তি আসে তা আই আর কোনো কিছুতেই খোঁজে পাই না।
বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখ দুটো হঠাৎই ভিজে উঠলো।
দু’ফোঁটা জল টুপটুপ করে ঝরে পড়লো গাল বেয়ে।
নাহিদ ধীরে মায়ের হাত ধরলো,
-মা আমি কি তোমাকে বুঝি না?
নুরজাহান মৃদু হাসলেন,
-তুই না বুঝলে আর কে বুঝবে রে বাবা?
তুই তো আমার প্রাণের টুকরো, তুই তো আমার সব।কখনো ধমক দেওয়া তো দূর, তোর সাথে আমি জোরে কথাও বলিনি। তুই ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই।
নিশি রান্নাঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে সব দেখছিলো।
মায়ের ফোঁটা ফোঁটা জল আর সেই অপার মমতায় নাহিদের মুখটাও যেন মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠলো।
নুরজাহান আবার বললেন,
-চল বাবা, পায়েস খেয়ে নে, প্রায় চার বছর পর তোর খাওয়া দেখে তৃপ্ত হবো।
নাহিদ কথা না বলে নিচু হয়ে বসে মায়ের হাতে ধরা বাটিটা নিলো।
চামচটা মুখের কাছে তুলতেই দুধ-চালের মিষ্টি ঘ্রাণে চোখে আবার একটা হালকা কুয়াশা জমলো।
মুহুর্তেই চোখ সরিয়ে ফেললো যাতে কেউ বুঝতে না পারে।
❝আপনারা যারা গল্প পড়ে প্রত্যেকে রেসপন্স করুন, এখন থেকে একদিন পর পর এই গল্প আসবে।❞
চলবে,,,,,
